মেসির কলকাতা সহ ভারত সফরের প্রধান আয়োজক শতদ্রু। শনিবার যুবভারতীতে তাঁকে দেখতে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও হতাশ ভক্তেরা, কারণ গ্যালারি থেকে মেসির দেখা মেলেনি। এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন আয়োজনে গাফিলতি ছিল কি না, ভক্তদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে কি না।
কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহটা হয়তো অনেকদিন মনে থাকবে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লিয়োনেল মেসির ভারত সফরকে ঘিরে যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল, সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সেই বহুল আলোচিত অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বিশৃঙ্খলা, হতাশা এবং প্রশ্নের জটে। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট এবার ছ’জনকে তলব করেছে, যাঁদের মধ্যে আয়োজক শতদ্রু দত্তের সংস্থার কয়েকজন কর্তাব্যক্তিও রয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁদের থানায় হাজিরা দিতে বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
শনিবার বিকেলে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী অধিনায়ক মেসির আগমন ঘিরে কলকাতা ছিল উত্তেজনায় টগবগে। স্টেডিয়ামের বাইরে সকাল থেকেই জমতে শুরু করে ভক্তদের ভিড়। হাতে পোস্টার, কারও গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, কারও কণ্ঠে অবিরাম মেসির নামধ্বনি। প্রচারমাধ্যমে আগেই জানানো হয়েছিল যে মেসি স্টেডিয়ামের মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন, কথা বলবেন, ভক্তদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাবেন। সেই আশাতেই বহু মানুষ ৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত দামের টিকিট কেটে যুবভারতীতে পৌঁছন। অনেকের কাছে এটা ছিল জীবনে একবার আসা সুযোগ, বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাকে কাছ থেকে দেখার স্বপ্ন। কিন্তু বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। দর্শকদের প্রবেশে অব্যবস্থা, গেটের সামনে ধাক্কাধাক্কি, আসনবিন্যাসে গণ্ডগোল, নিরাপত্তাকর্মীদের বিভ্রান্তি—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় অস্থিরতা। কোথাও দেখা যায় একাধিক গেটে একসঙ্গে ভিড় জমে গেছে, কোথাও আবার নির্দেশ ঠিকমতো না পৌঁছনোর কারণে দর্শকরা দীর্ঘক্ষণ আটকে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে গ্যালারিতে ঢোকার পরও অনেকেই নিজেদের আসন ঠিকভাবে খুঁজে পাননি। অভিযোগ উঠেছে, কয়েক জায়গায় অতিরিক্ত দর্শক নিষিদ্ধ এলাকাতেও উঠে পড়েন, ফলে নিরাপত্তা বলয় আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে সন্ধ্যার দিকে মেসি মাঠে প্রবেশ করতেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রত্যাশা ছিল নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তিনি অনুষ্ঠানস্থলে যাবেন এবং দর্শকরা গ্যালারি থেকেই তাঁকে দেখতে পারবেন। বাস্তবে দেখা যায়, নিরাপত্তার বলয় ভেঙে কয়েকশো মানুষ মাঠের ভেতর ঢুকে তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে নেতা-মন্ত্রী, আয়োজক সংস্থার কর্তা, বিভিন্ন সংস্থার অতিথি, ছবিশিকারি ও ফটোসাংবাদিকদের ভিড় ছিল বলে অভিযোগ। ফলে গ্যালারিতে বসা সাধারণ ভক্তরা, যাঁরা টিকিট কেটে এসেছিলেন, তাঁরা কার্যত কিছুই দেখতে পাননি। অনেকের দাবি, দূর থেকে শুধু মোবাইলের আলো আর মানুষের জটলা দেখা গেছে, মেসির মুখ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়নি। সেই মুহূর্তে হতাশা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের মধ্যে। অনেকে মোবাইল তুলে ভিডিও করার চেষ্টা করেন, কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়েন, আবার কেউ রীতিমতো চিৎকার করে অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আরও বিশৃঙ্খলা বাড়ে বলে অনেকে দাবি করেছেন।
সবচেয়ে বড় চমক আসে যখন মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠান কার্যত শেষ হয়ে যায়। মেসি, দি মারিয়া, মার্টিনেজদের দ্রুত মাঠ ছাড়তে হয়। দর্শকরা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে যাঁকে দেখার জন্য এত টাকা খরচ করে, এত দূর থেকে, এত ভিড় ঠেলে তাঁরা এসেছেন, তিনি এত তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন। তখনই অনেকের মধ্যে অনুভূতি তৈরি হয় যে তাঁদের আশা, উচ্ছ্বাস এবং ব্যয়—সব কিছু যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, এত বড় আন্তর্জাতিক তারকার নিরাপত্তা বলয় কেন এত দুর্বল ছিল, এবং আয়োজকরা আগে থেকে কেন এমন ভিড় নিয়ন্ত্রণের কড়া ব্যবস্থা করেননি।
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উঠে আসছে আয়োজক শতদ্রু দত্তের নাম। ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে বহুদিন ধরে তিনি প্রশাসনিকভাবে যুক্ত এবং তাঁর সংস্থাই এই ইভেন্টের প্রধান আয়োজক ছিল বলে জানা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, আয়োজকরা যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেননি, অতিরিক্ত পাস ইস্যু করা হয়েছিল, এবং মাঠে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে কার্যত কোনও কড়াকড়ি ছিল না। কিছু দর্শক অভিযোগ করেছেন, তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি, বরং অনুষ্ঠান বাতিল বা সংক্ষিপ্ত হওয়ার বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ঘোষণা ছিল না। অনেকেই বলেন, তাঁরা মেসিকে সামনে থেকে দেখবেন ভেবেই এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেসি কোথায় ছিলেন, সেটাই বুঝতে পারেননি। এই ক্ষোভ শুধু স্টেডিয়ামেই থামেনি, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমেও। অনেকেই লিখেছেন, এটা ছিল মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এক গর্বের মুহূর্ত হওয়ার কথা, কিন্তু তা হয়ে উঠল অব্যবস্থাপনার প্রদর্শনী। কেউ বলেন, এত টাকা খরচ করেও কিছুই দেখা গেল না, এটা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন, যদি অনুষ্ঠানটি আসলে ভিআইপিদের জন্যই ছিল, তাহলে সাধারণ দর্শকদের কাছ থেকে টিকিটের নামে এত টাকা নেওয়া হল কেন।
এই অভিযোগ ও বিশৃঙ্খলার পরপরই বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট নিজে থেকে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা যায়। রবিবার রাতেই কয়েকটি বিভাগ থেকে রিপোর্ট তোলা হয়, বিশেষ করে নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং আয়োজক কমিটির ভূমিকা নিয়ে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অনুমতির বাইরে অনেক ব্যক্তিকে মাঠে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল এবং অতিরিক্ত পাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি হয়েছিল। সোমবার রাতে পুলিশ ছ’জনকে নোটিস পাঠায় হাজিরার নির্দেশ দিয়ে। তাঁদের মধ্যে শতদ্রু দত্তের সংস্থার কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মী ও নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানায় তাঁদের হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। পুলিশের এক সিনিয়র আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় একাধিক স্তরে গাফিলতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এবং কারা কীভাবে মাঠে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন, টিকিট বিক্রি ও পাস বিতরণের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আয়োজক সংস্থার কাছ থেকে সমস্ত অনুমোদনপত্র, ফায়ার সেফটি রিপোর্ট এবং নিরাপত্তা চুক্তি সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। নিয়মভঙ্গ বা প্রতারণার প্রমাণ মিললে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেই ইঙ্গিত পুলিশের।
আয়োজক সংস্থা অবশ্য দায় এড়িয়ে বলেছে বলে শোনা যাচ্ছে যে তারা নিয়ম মেনেই কাজ করেছে এবং কিছু অনিয়ন্ত্রিত অতিথি প্রবেশ করেছিলেন, যা তাদের জানা ছিল না; নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব পুলিশের ছিল। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সাধারণ দর্শক ও জনমনের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি সব কিছু নিয়ম মেনে হয়ে থাকে, তাহলে মেসি কেন মাত্র ১৬ মিনিটে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন। সেই সঙ্গে আরও বড় প্রশ্ন উঠে আসে, আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রোটোকল, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং মাঠের ভেতরে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ও টিকিট বিক্রির মধ্যে ভারসাম্য রাখা হয়নি, মাঠে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ছিল, ভিআইপি পাস বিতরণের কোনও সুনির্দিষ্ট তালিকা বা নিয়ন্ত্রিত কাঠামো ছিল না, এবং মঞ্চ, মিডিয়া ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। এই সবকিছুই মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায় এবং পরিণতি হয় দর্শক হতাশা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে।
এই ঘটনায় শুধু আবেগগত ক্ষতি নয়, অর্থনৈতিক ও ভাবমূর্তিগত ক্ষতিও কম নয় বলে অনেকে মনে করছেন। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ, একাধিক স্পনসরের যুক্ত থাকা এবং আন্তর্জাতিক প্রচার—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একটি স্মরণীয় অধ্যায় তৈরি করা। কিন্তু এর বদলে তৈরি হল অসন্তোষ, অভিযোগ এবং তদন্তের আবহ। ভবিষ্যতে বিদেশি তারকা বা আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারত সফর বা বড় ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে কি না, সেটাও প্রশ্নের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। মেসি নিজে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য না করলেও, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মাঠে প্রবেশের পরপরই ভিড় বাড়তে থাকায় তাঁকে দ্রুত নিরাপত্তা বলয়ে ফিরিয়ে আনা হয় এবং অনুষ্ঠানটি কার্যত ব্যর্থ হয়। এই ঘটনায় কলকাতা এক ঐতিহাসিক সুযোগ হারাল বলেই মনে করছেন বহু ফুটবলপ্রেমী, কারণ কয়েকজনের অব্যবস্থাপনা, স্বার্থ এবং আত্মপ্রচার প্রবণতা মিলিয়ে এক গৌরবময় মুহূর্ত পরিণত হয়েছে বিতর্কে। এখন তদন্তের ফলাফলই বলবে, দায় কার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।