পূর্ব বর্ধমান জেলার বুদবুদ থানার অন্তর্গত কুলুপুকুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হল এক ভিন্নধর্মী, আধ্যাত্মিক পরিবেশে ভরপুর বিশাল ধর্মীয় জলসা। ২৯শে কার্ত্তিক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১৬ই নভেম্বর ২০২৫, রবিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এই জলসায় হাজারো মানুষের সমাগমে গ্রামপ্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মহতী মিলনমেলায়। পুরো অনুষ্ঠানটির দায়িত্বে ছিল কুলুপুকুর জলসা কমিটি, যারা সুসংগঠিতভাবে এলাকার বহু মানুষকে একত্রিত করে সফলতার সঙ্গে এই ধর্মীয় অধিবেশন সম্পন্ন করেন। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন প্রধান বক্তা জনাব সেখ সিদ্দিকুল্লা সাহেব—একজন জনপ্রিয় ও সম্মানিত ইসলামিক চিন্তাবিদ, যিনি তাঁর প্রাঞ্জল বক্তব্যের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন জয় করেন। তিনি কোরআন-হাদিসের আলোকে মানবতা, নৈতিকতা, সত্যের পথে চলা এবং সমাজসেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে ইসলাম শুধুমাত্র রীতি বা আচার নয়, বরং মানুষের আচরণ, চরিত্র, এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধই একজন সত্যিকারের মুসলমানের পরিচয় বহন করে। তাঁর ভাষণে যুবসমাজকে নেশা, অপসংস্কৃতি এবং সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার প্রসার, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা এবং সমাজে শান্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পূর্ব বর্ধমানের বুদবুদ থানার অন্তর্গত কুলুপুকুর গ্রাম রবিবার সন্ধ্যায় সাক্ষী থাকল এক মনোমুগ্ধকর, ধর্মীয় আবেগে ভরপুর এবং হাজারো মানুষের সমাগমে পরিপূর্ণ মহান জলসার। ২৯শে কার্ত্তিক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (১৬ই নভেম্বর, ২০২৫)—এই দিনটিকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষজন, আশপাশের এলাকা, এমনকি দূরবর্তী গ্রাম থেকেও অসংখ্য ভক্ত-শ্রোতা ছুটে আসেন।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কুলুপুকুর জলসা কমিটি, আর সভাপতিত্ব করেন হজরত মৌলানা আব্স্থল হাকিম সাহেব। প্রধান বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট ধর্মগুরু জনাব সেখ সিদ্দিকুল্লা সাহেব, এবং বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্মানীয় হজরত হাফেজ মৌলানা সুলাইমান সাহেব।
এই জলসার বিশেষ বক্তা ছিলেন জনাব হজরত হাফেজ মৌলানা সুলাইমান সাহেব। তিনি কোরআনের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে মানুষের জীবনে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেন। নৈতিকতা, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর বক্তৃতা শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি তুলে ধরেন যে মানুষ যতো বেশি ভালো কাজে যুক্ত হবে, ততো বেশি আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করবে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবতার গুরুত্ব অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হয়।
জলসার সভাপতিত্ব করেন হজরত মৌলানা আব্স্থল হাকিম সাহেব, যিনি সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্ব এবং নারীদের উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় শান্তি, হিংসা পরিহার, এবং মানবতার জয়গান প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উঠে আসে।
অনুষ্ঠানটি মাগরিব নামাজের পর শুরু হয় এবং রাত পর্যন্ত চলে শ্রোতাদের ধৈর্যের উপর নির্ভর করে। পুরো এলাকাজুড়ে ছিল নিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম এবং নারী-পুরুষের আলাদা বসার সুব্যবস্থা। কুলুপুকুর জলসা কমিটির সদস্যরা সার্বিক দিকনির্দেশনা ও দায়িত্ব পালন করে অনুষ্ঠানটিকে সফল করে তুলেছিলেন। এর ফলে পুরো জলসাটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এসে জলসায় অংশগ্রহণ করেন। ধর্মীয় বক্তৃতার পাশাপাশি মানুষ নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য, স্নেহ এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করেন। স্থানীয়দের মতে, এমন বড় পরিসরের জলসা তাঁদের গ্রামে খুব কম হয় এবং এবার যে ভিড় দেখা গেছে তা অভূতপূর্ব। অনেকেই একথা জানান যে এই ধরনের অনুষ্ঠান শুধু ধর্মীয় শিক্ষার উৎস নয়, বরং সমাজকে একত্রিত করার বড় মাধ্যম।
পুরো জলসা জুড়ে ছিল আধ্যাত্মিক আবহ, শান্ত পরিবেশ, হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা এবং আলোকিত বার্তা। সবমিলিয়ে কুলুপুকুর গ্রামের এই ধর্মীয় জলসা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি সামাজিক-ধর্মীয় আয়োজন হয়ে থাকবে। মানুষ যে শুধু ধর্মীয় উপদেশ গ্রহণ করেননি, বরং সামাজিক সম্প্রীতি, শান্তি এবং মানবতার বার্তাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছেন, তা এই জলসার প্রতিটি মুহূর্তেই স্পষ্ট। কুলুপুকুর জলসা কমিটির সুনিপুণ পরিচালনা এবং বিশিষ্ট বক্তাদের গভীর জ্ঞানসমৃদ্ধ আলোচনা এই অনুষ্ঠানকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছে।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মাগরিব নামাজের পর জলসার মূল পর্ব শুরু হয়। আকাশে সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইক, আলোকসজ্জা ও সাজানো প্যান্ডেলের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ধীরে ধীরে ভরে ওঠে। সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ধর্মপ্রাণ যুবক, বয়স্ক, মহিলা—সকলেই এক অভূতপূর্ব উৎসাহ নিয়ে যোগ দেন।
স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের বৃহৎ পরিসরের জলসা কুলুপুকুরে অনুষ্ঠিত হলেও এবার মানুষের উপস্থিতি ছিল রেকর্ডসংখ্যক।
প্রধান বক্তা জনাব সেখ সিদ্দিকুল্লা সাহেব দীর্ঘক্ষণ ধরে অত্যন্ত সাবলীল ও হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য রাখেন। তিনি ইসলাম ধর্মের মূল আদর্শ, নবী করিম (সা.)-এর জীবনী, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা, নৈতিকতা এবং মানবতার গুরুত্ব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন।
তিনি বলেন—
“ধর্ম শুধু নামাজ, রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ম মানুষের চরিত্রে, আচরণে, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে নবীজি (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করি, তাহলে সমাজে মতভেদ, হিংসা, বিদ্বেষের জায়গা কখনই থাকবে না।”
তিনি বিশেষভাবে যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেন—
“আজকের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথের দিশা দিতে হবে। নেশা, সহিংসতা, বদভ্যাস থেকে দূরে রেখে শিক্ষার প্রতি, সমাজসেবার প্রতি তাঁদের আরও দায়িত্ববান করে তুলতে হবে।”
শ্রোতারা মনোযোগ সহকারে তাঁর বক্তব্য শোনেন এবং বহুবার করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিবাদন জানান।
অনুষ্ঠানের বিশেষ বক্তা হাফেজ মৌলানা সুলাইমান সাহেব আল কোরআনের বিভিন্ন আয়াত উল্লেখ করে শান্তি, সাম্য, ক্ষমাশীলতা এবং সত্যের পথে চলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বলেন—
“মানুষের প্রকৃত পরিচয় ধর্ম নয়, জাত নয়—মানুষত্ব। যে ব্যক্তি মানুষের উপকার করে, যে অন্যের কষ্টে পাশে দাঁড়ায়, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।”
তিনি পরকালের জবাবদিহিতা, সৎপথে চলার পুরস্কার এবং পাপ থেকে মুক্ত থাকার উপকারিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
সুলাইমান সাহেব বলেন—
“রোজ হাশরের ময়দানে আল্লাহ বান্দাকে জিজ্ঞাসা করবেন—‘তোমার সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছ? সময় কোথায় ব্যয় করেছ? অথচ আমার দেওয়া সুযোগগুলো কি মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজে লাগিয়েছ?’—এই প্রশ্নগুলো মনে রেখেই জীবন কাটাতে হবে।”
তার বক্তব্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়, বহু শ্রোতা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
অনুষ্ঠান পরিচালনায় কুলুপুকুর জলসা কমিটি ছিল অত্যন্ত সফল ও প্রশংসনীয় ভূমিকায়।
তাঁরা আগেই যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিলেন—
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
যানবাহন চলাচলের সঠিক নির্দেশনা
আলোকসজ্জা
নারী-পুরুষের আলাদা বসার ব্যবস্থা
পানীয় জলের ব্যাবস্থা
সাউন্ড সিস্টেম
স্টেজ ম্যানেজমেন্ট
এসবের ফলেই অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
কমিটির সদস্যরা বলেন—
“আমরা বছরের পর বছর ধরে এই জলসা আয়োজন করি। কিন্তু এ বছর মানুষের উপস্থিতি এবং উৎসাহ ছিল অতীতের সব রেকর্ড ছাড়ানো।”
সভাপতি হজরত মৌলানা আব্স্থল হাকিম সাহেব বক্তব্যে বলেন—
“বর্তমান সময়ে মানুষ বিভ্রান্তিতে ভুগছে। ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ ইসলাম একমাত্র ধর্ম যে শান্তি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। আজকের এই জলসা তারই উদাহরণ।”
তিনি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব, নারী-পুরুষ উভয়ের সমান সুযোগ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সমাজের সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আয়োজকদের ভাষায়—
“মাগরিবের পর থেকে শ্রোতাদের ধৈর্য্য যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ চলবে জলসা”—এই ঘোষণাই আসলে মানুষকে আরও উৎসাহী করে তোলে।
অনুষ্ঠান চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
অনেকেই দাড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ আবার মাটিতে চট বিছিয়ে বক্তব্য শুনেন।
মহিলা উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
আলোর সাজ, ধর্মীয় গানের সুর, বক্তাদের হৃদয়ছোঁয়া কণ্ঠ—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক আধ্যাত্মিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
গ্রামের মানুষ বলেন—
“এই ধরনের জলসা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটা আমাদের সামাজিক ঐক্যের উৎসব। বড়রা, ছোটরা সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়। সবাই শান্তি, নৈতিকতা ও ভালোবাসার শেখানো বার্তা নিয়ে বাড়ি ফেরে।”
অন্য এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়—
“ধর্মীয় জলসা আমাদের মনকে নির্মল করে। সমাজের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহ দেয়। আমরা চাই প্রতিবছর আরও বড় পরিসরে এই অনুষ্ঠান হোক।”
বিশাল মানুষের উপস্থিতি
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ
দুই বিশিষ্ট বক্তার মূল্যবান বক্তব্য
অসাধারণ আয়োজন
সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক
সব মিলিয়ে ১৬ নভেম্বর, ২০২৫-এর এই জলসা কুলুপুকুরের মানুষের হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।