Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মাত্র ২০ বছরেই টলিউডে বাজিমাত, বড়পর্দায় অভিষেক ঝাড়গ্রামের আরাত্রিকার

মাত্র ২০ বছর বয়সেই টেলিভিশন থেকে বড়পর্দায় পা রাখলেন ঝাড়গ্রামের মেয়ে আরাত্রিকা মাইতি। ‘খেলনা বাড়ি’ থেকে ‘মিঠিঝোরা’— একের পর এক চরিত্রে অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। এবার সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ ছবিতে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে।

মাত্র বিশ বছর বয়সেই যে কেউ টলিউডে নিজের জায়গা পাকা করতে পারে— এই কথাটা আজ যেন প্রমাণ করে দিচ্ছেন ঝাড়গ্রামের মেয়ে আরাত্রিকা মাইতি। খুব অল্প সময়েই ছোট পর্দা থেকে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ‘খেলনা বাড়ি’-র মিতুল, ‘মিঠিঝোরা’-র রাই— এমন আরও নানা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আরাত্রিকা আজ বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত মুখ। তবে এবার সেই জনপ্রিয়তা টেলিভিশনের পর্দা ছাপিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বড়পর্দায়। কারণ, খ্যাতনামা পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন এই তরুণী।

আরাত্রিকার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঝাড়গ্রামে। ছোট শহরের মেয়ে, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বিশাল। স্কুলজীবন থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান আর অভিনয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর। পরিবারের কাছেও তিনি ছিলেন ‘স্বপ্নবাজ’ মেয়ে— যিনি সবসময় কিছু একটা আলাদা করতে চান। ক্লাস নাইনের সময় প্রথম মঞ্চে নাটক করেছিলেন, আর তখন থেকেই অভিনয়ের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করার ইচ্ছে আরও প্রবল হয়।

পরিবারের উৎসাহে কলেজে ওঠার পর কলকাতায় চলে আসেন। শুরুতে অডিশন, রিজেকশন, ছোট ছোট প্রোজেক্ট— সবই জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাঁর আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। খুব বেশি সময় লাগেনি, দর্শকরা প্রথম চিনতে শুরু করেন ‘খেলনা বাড়ি’-র মিতুল হিসেবে।

‘খেলনা বাড়ি’-তে তাঁর চরিত্রটি ছিল সরল অথচ গভীর আবেগপূর্ণ। মিতুলের সংবেদনশীলতা, ভালোবাসা আর চেনা গৃহস্থ জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যে আরাত্রিকার অভিনয় আলাদা করে নজর কাড়ে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকদের প্রিয় মুখ। এরপর আসে ‘মিঠিঝোরা’, যেখানে রাই চরিত্রে তাঁকে একদম নতুন রূপে দেখা যায়— সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং আধুনিক এক তরুণী।

দর্শক ও সমালোচকরা দু’পক্ষই স্বীকার করেন, আরাত্রিকার অভিনয়ের মধ্যে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততা, যা তাঁকে আলাদা করে দেয় অন্যদের থেকে। মাত্র তিনটি ধারাবাহিকেই কাজ করেছেন তিনি, কিন্তু প্রতিটি চরিত্রে নিজের ছাপ রেখেছেন।

এবার আসল খবর— জনপ্রিয় পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নতুন ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে অভিনয় করছেন আরাত্রিকা। ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী-র চরিত্রে, যিনি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর পত্নী। আর গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর চরিত্রে রয়েছেন দিব্যজ্যোতি দত্ত।

এই খবর সামনে আসতেই টলিউডের অন্দরে ও দর্শকমহলে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কারণ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে নতুন মুখ হিসেবে সুযোগ পাওয়া মানে বিশাল এক অর্জন। তাঁর ছবিগুলোতে সবসময়ই গল্প, অভিনয় ও কারিগরি দিক থেকে এক আলাদা মাত্রা থাকে— তাই আরাত্রিকার জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ।

এক সাক্ষাৎকারে আরাত্রিকা বলেন,

“যখন অডিশন দিই, ভাবিনি আমি নির্বাচিত হব। সৃজিত দা-র মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা— এটা নিজের মতো করে একটা স্বপ্নপূরণ।”

তিনি আরও যোগ করেন, ডাবিংয়ের সময় নিজের গানের দৃশ্য দেখে তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল।

“সেই দৃশ্যে নিজেকে দেখার সময় মনে হচ্ছিল, এতটা পথ আমি কবে পেরিয়ে এলাম! বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঝাড়গ্রাম থেকে যখন কলকাতায় এসেছিলাম, তখন ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি বড়পর্দায় নিজেকে দেখব।”

ছবিটি মূলত গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে নির্মিত, যেখানে ভক্তি, প্রেম ও ত্যাগের এক অনন্য মিশেল দেখা যাবে। লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী ছিলেন গৌরাঙ্গের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর সেই চরিত্রে আরাত্রিকার অভিনয় নিয়ে সৃজিত নিজেও নাকি বেশ সন্তুষ্ট।

প্রযোজনা সূত্রে জানা গেছে, ছবির শুটিংয়ের সময় আরাত্রিকা চরিত্রটির মানসিক প্রস্তুতির জন্য নানা গবেষণা করেছেন— ভক্তিগীতি শুনেছেন, চরিত্রটির ধর্মীয় দিক বুঝতে চেয়েছেন এবং এমনকি নাট্যপ্রশিক্ষকের সাহায্যও নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়,

“আমি জানতাম, এই চরিত্রে শুধু সংলাপ মুখস্থ করলেই হবে না। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি গভীর প্রেমে বিশ্বাস করেন, অথচ ত্যাগই তাঁর পরিণতি। তাই আমি চেষ্টা করেছি লক্ষ্মীপ্রিয়ার সেই গভীরতা অনুভব করতে।”

সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে আরাত্রিকা লিখেছেন—

“আমি আমার কম্পিটিশনের সঙ্গে।”

এই লাইনটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকেই মন্তব্য করেন, এত অল্প বয়সেই আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানের এই প্রকাশ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকেই দেখা— এই মানসিকতা হয়তোই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

অবশ্য টলিউডে সাফল্য পাওয়ার পথ কখনোই মসৃণ নয়। আরাত্রিকাও জানেন, এখানে প্রতিযোগিতা তীব্র। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, “প্রতিভা ও অধ্যবসায় থাকলে সুযোগ একদিন আসবেই।”

তিনি বলেন,

news image
আরও খবর

“আমি কখনো অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করি না। আমি শুধু চাই, আজকের চেয়ে কাল একটু ভালো অভিনেত্রী হই।”

তাঁর পরিবার, বিশেষ করে মা-বাবা, শুরু থেকেই তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়ক। অভিনয়ের প্রতি মেয়ের ভালোবাসা বুঝে তাঁরা সবসময় পাশে থেকেছেন।

বর্তমানে টলিউডে নতুন প্রজন্মের অনেক প্রতিভাবান মুখ উঠে আসছে, আরাত্রিকা তাঁদের অন্যতম। মাত্র বিশ বছর বয়সেই তাঁর পরিণত ভাবনা ও পেশাদারিত্ব অনেক সিনিয়র অভিনেতার কাছেও প্রশংসিত হয়েছে। শুটিং সেটে তিনি সময়নিষ্ঠ, মনোযোগী ও সবসময় শেখার জন্য প্রস্তুত থাকেন— এমনটাই জানিয়েছেন সহ-অভিনেতা দিব্যজ্যোতি দত্ত।

তিনি বলেন,

“আরাত্রিকা খুবই নিবেদিত অভিনেত্রী। তাঁর মধ্যে যে সততা আছে, তা দর্শক বুঝতে পারবেন পর্দায়।”

দর্শকরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ মুক্তির জন্য। টলিউডের অনেকেই মনে করছেন, এই ছবিই হতে পারে আরাত্রিকার বড় ব্রেকথ্রু। বড়পর্দায় তাঁর উপস্থিতি কেমন হয়, তা দেখার জন্য এখন সবাই অপেক্ষায়।

সমালোচকরা বলছেন, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন পরিচালক যদি নতুন প্রতিভাকে বিশ্বাস করে এমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেন, তাহলে নিশ্চয়ই তার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। আরাত্রিকার অভিনয় যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাহলে তিনি টলিউডের পরবর্তী বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন।

আরাত্রিকা অবশ্য এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে চান না। তাঁর মতে, “আমি ধীরে ধীরে এগোতে চাই। ভালো চরিত্রে কাজ করতে চাই, যেগুলো আমার ভেতরকার অভিনেত্রীটাকে বিকশিত করবে।”

তিনি ভবিষ্যতে ওয়েব সিরিজ এবং থিয়েটারে কাজ করারও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি গান ও নাচ শেখেন নিয়মিত— কারণ তাঁর মতে, একজন অভিনেত্রীর শিল্পীসত্তা কখনও একমুখী হতে পারে না।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আরাত্রিকার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। ইনস্টাগ্রামে তাঁর হাজার হাজার ফলোয়ার, যারা প্রতিদিন তাঁর নতুন পোস্ট, ছবি বা স্টোরি দেখতে অপেক্ষা করেন। অনেক তরুণ-তরুণী তাঁকে ‘ইনস্পিরেশন’ বলেও উল্লেখ করেন।

তবে এই খ্যাতি নিয়েও তিনি খুবই সংযমী।

“ফলোয়ার বা লাইক দিয়ে আমি নিজেকে মাপি না। দর্শকরা আমার কাজ দেখুক, সেটাই আসল তৃপ্তি।”

এক সংবাদমাধ্যমে সৃজিত মুখোপাধ্যায় বলেন,

“আরাত্রিকার মধ্যে একধরনের সতেজতা আছে, যা পর্দায় ধরা পড়ে। লক্ষ্মীপ্রিয়া চরিত্রের জন্য আমি এমন কাউকেই খুঁজছিলাম— যিনি একদিকে নিষ্পাপ, আবার অন্যদিকে গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারেন। অডিশনে আরাত্রিকাকে দেখেই মনে হয়েছিল, এই চরিত্র ওর জন্যই।”

মাত্র বিশ বছর বয়সেই যে প্রতিভা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে এতদূর আসা সম্ভব, তার জীবন্ত প্রমাণ আরাত্রিকা মাইতি। ঝাড়গ্রামের সেই মেয়েটি আজ টলিউডের উজ্জ্বল মুখ, আর এখন বড়পর্দায় তাঁর পদার্পণ যেন এক নতুন অধ্যায়।

‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ মুক্তির পর হয়তো তাঁর ক্যারিয়ার নতুন মোড় নেবে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের প্রতি বিশ্বাস। নিজেকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা মানেই প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে তৈরি করা— আর সেই মানসিকতাই তাঁকে একদিন টলিউডের শীর্ষে নিয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই।

আরাত্রিকার নিজের ভাষায়,

“আমি জানি, এই পথ সহজ নয়। কিন্তু আমি থামব না। আমি শুধু কাজ করে যেতে চাই, ভালোবাসা নিয়ে, শ্রদ্ধা নিয়ে, আর একটা ছোট্ট স্বপ্ন নিয়ে— যেন একদিন সবাই বলে, ঝাড়গ্রামের মেয়েটা সত্যিই বাজিমাত করেছে।”

Preview image