অভিনেত্রী শ্যামৌপ্তি মুদলিকে এবার দর্শক দেখবেন সম্পূর্ণ নতুন রূপে। এই প্রথম ওয়েব সিরিজ়ে অভিনয় করতে চলেছেন তিনি। গত দেড় বছরে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়শৈলীতে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, যা এবার পর্দায় ধরা পড়বে নতুন মাত্রায়।
পরনে সুতির শাড়ি, কপালে লাল টিপ, হাতে শাঁখা-পলা— এই চেনা বাঙালি সাজেই যেন মুহূর্তের মধ্যে এক অন্য রূপে ধরা দিলেন অভিনেত্রী শ্যামৌপ্তি মুদলি। এত দিন দর্শক তাঁকে চিনেছেন মূলত ছোটপর্দার এক পরিচিত মুখ হিসেবে— কখনও প্রাণবন্ত, কখনও আবেগপ্রবণ, আবার কখনও সাবলীল অভিনয়ে মন জয় করা অভিনেত্রী হিসেবে। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক, যা দর্শকের কাছে তাঁকে আপন করে তুলেছিল।
কিন্তু অভ্রজিৎ সেন পরিচালিত ওয়েব সিরিজ় ‘রঙ্কিনী ভবন’-এ শ্যামৌপ্তিকে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আঙ্গিকে। এখানে তিনি শুধু একটি নতুন চরিত্রে অভিনয় করছেন, এমন নয়— এই সিরিজ় যেন তাঁর অভিনয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। চরিত্রের ভাবনা, সংযত অভিব্যক্তি আর পরিমিত আবেগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাঁর অভিনয়ের পরিণত রূপ।
এই প্রথম ওয়েব সিরিজ়ে কাজ করছেন শ্যামৌপ্তি, আর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে বিশেষ। ছোটপর্দার পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আত্মপ্রকাশ মানেই আলাদা ধরনের প্রস্তুতি, আলাদা মানসিকতা। ‘রঙ্কিনী ভবন’-এ তাঁর চরিত্রে যে স্থিরতা ও গভীরতা দেখা যায়, তা গত কয়েক বছরে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
শ্যামৌপ্তির অভিনয়ে এখন আর শুধুই স্বতঃস্ফূর্ততা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিজ্ঞতার ভার, জীবনের বাস্তব বোধ। এই সিরিজ়ে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি ধীরে ধীরে নিজের অভিনয়কে আরও পরিণত ও বহুমাত্রিক করে তুলছেন। দর্শক তাই ‘রঙ্কিনী ভবন’-এ শুধু এক নতুন চরিত্র নয়, এক নতুন শ্যামৌপ্তি মুদলিকেই আবিষ্কার করবেন— যিনি আত্মবিশ্বাসী, সংযত এবং অনেক বেশি গভীর।
‘রঙ্কিনী ভবন’-এ শ্যামৌপ্তির চরিত্রে রয়েছে এক ধরনের স্থিরতা, সংযম আর আত্মবিশ্বাস— যা বয়স বা অভিজ্ঞতার চেয়েও জীবনের নানা স্তর ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আসে। সুতির শাড়ির সহজ সাজের আড়ালে যে গভীরতা, যে অভিজ্ঞতার ছাপ, তা দর্শকের চোখ এড়াবে না। এই প্রথম ওয়েব সিরিজ়ে কাজ করছেন শ্যামৌপ্তি, আর সেই প্রথম কাজেই তিনি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। ছোটপর্দার অভ্যস্ত ছক ভেঙে তিনি এখানে অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি আত্মসচেতন।
গত দেড় বছরে শ্যামৌপ্তির জীবনে এসেছে একাধিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন শুধু বাইরের সাজে বা অভিনয়ের ধরনে নয়, তাঁর চিন্তাভাবনা, জীবনবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাতেও স্পষ্ট। এই বদলের নেপথ্যে কি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে? বিশেষ করে অভিনেতা রণজয় বিষ্ণুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কি এই পরিণতির অন্যতম কারণ? এই প্রশ্ন উঠছে অনিবার্য ভাবেই।
শ্যামৌপ্তি নিজেও স্বীকার করেন, জীবনের প্রতিটি সম্পর্কেই আদান-প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা, বন্ধুবান্ধব বা সঙ্গী— প্রত্যেকের সঙ্গেই যত্ন, বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, “প্রচুর যত্নের দরকার হয়। এটা ঠিক যে, দেড় বছর আগে শ্যামৌপ্তিকে আমি যেমন দেখেছি, এখন নিজেকে অন্য ভাবে দেখি। এই বদলের ক্ষেত্রে রণজয়ের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
শ্যামৌপ্তির মতে, জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু প্রতিভা বা পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে দরকার একটি ভাল সঙ্গ, একটি ইতিবাচক পরিবেশ। তিনি মনে করেন, সঠিক মানুষ পাশে থাকলে নিজের ভিতরের সম্ভাবনাগুলোকে চিনে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। রণজয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে সেই জায়গাটায় পৌঁছতে সাহায্য করেছে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
একটা সময় ছিল, যখন শ্যামৌপ্তি ইন্ডাস্ট্রির বাইরের বন্ধুদের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন। সেই বন্ধুত্বগুলো নিঃসন্দেহে আন্তরিক ছিল, কিন্তু তাঁর কাজের জগত, অভিনয়ের জটিলতা বা একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর লড়াই বোঝার মতো মানুষ খুব একটা ছিলেন না। তখন বয়সও কম ছিল তাঁর, অভিজ্ঞতাও সীমিত। তিনি বলেন, “তখন বাস্তবের সঙ্গে আমার কেউ পরিচয় করায়নি। একটা কল্পনার জগতে, স্বপ্নের জগতে বাস করতাম।”
সেই কল্পনার জগৎ সুন্দর হলেও, বাস্তবের মাটিতে পা না রাখলে দীর্ঘ পথ চলা সম্ভব নয়— এই সত্যটা তিনি বুঝেছেন অনেক পরে। শ্যামৌপ্তির জীবনে সেই বাস্তবের মুখোমুখি করানোর কাজটাই করেছেন রণজয়। অভিনেত্রীর কথায়, “এই প্রথম কেউ আমার জীবনে এসে সেই বাস্তবের মুখোমুখি করালো। এই সমাজে থাকতে গেলে, নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে গেলে কী করতে হয়, তা বুঝিয়েছে ও।”
রণজয় কোনও দিনই তাঁকে হাতে ধরে সব কিছু শিখিয়ে দেননি। বরং সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন, এমন কিছু দিক দেখিয়েছেন যেগুলো নিয়ে ভাবার প্রয়োজন ছিল। বই পড়া, বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে আলোচনা, গল্পের গভীরে ঢুকে ভাবা— এই সব কিছুর মধ্য দিয়েই শ্যামৌপ্তির চিন্তার জগৎ আরও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলেন, “এই সব আলোচনা আমার কাছে অনেক বড় পাওনা। কারণ এখনকার দিনে খুব কম মানুষই চায়, পরস্পরের পাশে থেকে পরস্পরের উন্নতি দেখব।”
শ্যামৌপ্তি মনে করেন, এই জায়গাটায় তিনি সত্যিই ভাগ্যবতী। ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন নিঃশর্ত ভালবাসা আর সঠিক পরামর্শ। সেই শিক্ষাই তাঁকে জীবনের নানা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জুগিয়েছে। আর এখন, জীবনের এই নতুন পর্বে এসে তিনি তাঁর সঙ্গীর কাছ থেকেও পাচ্ছেন ঠিক তেমনই সমর্থন আর দিকনির্দেশ।
এর ফলেই আজ তিনি নতুন কাজ বাছাই থেকে শুরু করে চরিত্র নির্বাচন— সব সিদ্ধান্ত অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিতে পারছেন। আর কারও উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে, নিজের বিচারবুদ্ধির উপর ভরসা রাখার ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে তাঁর। এই স্বাধীনতাই একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে।
‘রঙ্কিনী ভবন’ আসলে শ্যামৌপ্তি মুদলির জীবনের ও অভিনয়ের পরিবর্তনেরই এক স্পষ্ট প্রতিফলন। এই সিরিজ়ে তাঁর অভিনয়ে কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, নেই অপ্রয়োজনীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ। বরং সংযত অনুভূতি, মেপে বলা সংলাপ আর চোখে-মুখে ধরা পড়া এক ধরনের জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর চরিত্রকে করেছে আরও বিশ্বাসযোগ্য। তিনি এখানে আর শুধু একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন না; চরিত্রটিকে গভীর ভাবে বুঝে নিচ্ছেন, তার ভাবনা ও অনুভূতিকে নিজের ভিতর দিয়ে বয়ে যেতে দিচ্ছেন। সেই কারণেই তাঁর অভিনয় আলাদা করে নজর কাড়ে।
ছোটপর্দা থেকে ওয়েব সিরিজ়ে যাত্রা করা অনেক অভিনেত্রীর কাছেই কঠিন এক পরীক্ষা। টেলিভিশনের পরিচিত ছক, দর্শকের প্রত্যাশা আর অভিনয়ের ধরন বদলে নতুন মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু শ্যামৌপ্তির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন যেন আশ্চর্য রকম স্বাভাবিক। কারণ, এই বদলটা শুধু কাজের জায়গায় নয়, এসেছে তাঁর ভিতরের মানুষটির মধ্যেও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেমন নিজেকে চিনেছেন, তেমনই জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে করেছে আরও স্থির ও বাস্তববাদী। জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এখন অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
‘রঙ্কিনী ভবন’-এ সেই পরিণতির ছাপ স্পষ্ট। চরিত্রের আবেগকে তিনি সংযমের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে ভেঙেছেন আবার গড়েছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি এখন আর শুধু অভিনয়ের উপর নির্ভর করেন না, বরং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, তার সামাজিক অবস্থান ও জীবনের প্রেক্ষাপটকেও গুরুত্ব দেন। এই গভীর প্রস্তুতিই তাঁকে একজন অভিনেত্রী হিসেবে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে।
এই সিরিজ়ে দর্শক তাই শুধু একটি নতুন চরিত্র নয়, এক নতুন শ্যামৌপ্তিকেও আবিষ্কার করবেন। এই শ্যামৌপ্তি জানেন কী ভাবে জীবনের স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। কল্পনার জগৎ যে সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজন, তা যেমন তিনি বোঝেন, তেমনই বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েই যে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হয়, সেটাও তিনি উপলব্ধি করেছেন। সেই উপলব্ধিই তাঁর অভিনয়ে এনে দিয়েছে গভীরতা ও সত্যতা।
এই পরিণত শ্যামৌপ্তি মুদলি যে ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ ও অর্থবহ কাজ উপহার দেবেন, সে বিষয়ে আশাবাদী তাঁর অনুরাগীরাও। ‘রঙ্কিনী ভবন’ হয়তো তাঁর সেই দীর্ঘ যাত্রাপথেরই প্রথম ধাপ, যেখানে একজন অভিনেত্রী নিজের ভিতরের পরিবর্তনকে সার্থক ভাবে পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছেন। এই সিরিজ়ের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের অভিনয়ের নতুন দিক উন্মোচন করেননি, বরং প্রমাণ করেছেন— সময়ের সঙ্গে বদলাতে জানাটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি।