টাটা ট্রাস্টে নেতৃত্ব সংকট: রতন টাটার পর নতুন অধ্যায় বিভাজনের পথে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সংস্থা Tata Trusts, যা টাটা গ্রুপের ৬৬ শতাংশ মালিক, বর্তমানে এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে রতন টাটা ছিলেন এই সংস্থার মুখ্য ট্রাস্টি, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই উত্তরাধিকার ও নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে রতন টাটা প্রয়াত হওয়ার পর বোর্ড দ্রুত নোয়েল টাটা-কে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তেই ফাটল ধরেছে ট্রাস্টের অভ্যন্তরে। বোর্ড এখন দুই ভাগে বিভক্ত — একদিকে রয়েছেন নোয়েল টাটা, ভেনু শ্রীনিবাসন ও বিজয় সিংহ, অন্যদিকে মেহলি মিস্ত্রি, প্রমিত ঝাভেরি ও দারিয়াস খামবাটা। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো নতুন নীতিমালা, যেখানে বলা হয়েছে ট্রাস্টির মেয়াদ আজীবন থাকবে এবং যদি কেউ অন্য ট্রাস্টির পুনর্নিয়োগে আপত্তি জানায়, তার নিজের পদও ঝুঁকিতে পড়বে। এই নিয়মকে অনেকেই “গভর্নেন্সে অস্বচ্ছতা” বলে অভিযোগ করেছেন। এদিকে, Shapoorji Pallonji Group, যারা Tata Sons-এর ১৮% অংশীদার, IPO-র মাধ্যমে তাদের শেয়ার বিক্রির অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে সেই প্রক্রিয়াও থমকে গেছে। SP Group এখন RBI-এর কাছে Tata Sons-কে “Upper Layer NBFC” শ্রেণি থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে তাদের শেয়ার পরিচালনা করতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্থিক নিয়ন্ত্রকের নজর এখন এই পুরো ঘটনার দিকে, কারণ Tata Trusts শুধু একটি দাতব্য সংস্থা নয়, বরং দেশের বৃহত্তম কর্পোরেট নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র। এই সংঘাত দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রতন টাটার নেতৃত্বে যে স্বচ্ছতা ও নৈতিক মানদণ্ড ছিল, সেটাই এখন হারানোর পথে। বর্তমান বোর্ডরুমের ক্ষমতার লড়াই টাটা গ্রুপের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখন প্রশ্ন একটাই — শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান কি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মিটিয়ে আগের গৌরব ফিরে পাবে, নাকি বিভক্ত বোর্ডের কারণে “টাটা” নামটাই নতুন এক অধ্যায়ে বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠবে
ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী দাতব্য সংস্থা এবং টাটা গ্রুপের নিয়ন্ত্রক ভিত্তি Tata Trusts-এর ভেতরে বর্তমানে এক গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই সংগঠনটি শুধু দাতব্য কাজেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং Tata Sons-এর প্রায় ৬৬ শতাংশ মালিকানা তাদের হাতে। সেই কারণে টাটা গ্রুপের শীর্ষ সিদ্ধান্ত, পরিচালনা, এমনকি নেতৃত্ব নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই ট্রাস্ট। কিন্তু গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে রতন টাটা-র অবসরের পর, বোর্ডরুমে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ক্ষমতার টানাপোড়েন যা এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে রতন টাটা ছিলেন টাটা ট্রাস্টের মুখ্য ট্রাস্টি ও নীতিনির্ধারক। তাঁর নেতৃত্বেই টাটা গ্রুপ কর্পোরেট দুনিয়ায় নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ৯ অক্টোবর ২০২৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। বোর্ডের একাংশ চেয়েছিল নোয়েল টাটা (Ratan Tata-র সৎ ভাই)-কে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করতে। অন্য অংশের ট্রাস্টিরা মনে করেন, ট্রাস্টের গঠন ও বিধিমালা অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ছিল না। ফলে, বোর্ডরুমে প্রথমবারের মতো ফাটল প্রকাশ পায়।
বর্তমানে টাটা ট্রাস্টের বোর্ড দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত —
একদিকে রয়েছেন নোয়েল টাটা, ভেনু শ্রীনিবাসন, ও বিজয় সিংহ;
অন্যদিকে রয়েছেন মেহলি মিস্ত্রি, প্রমিত ঝাভেরি, ও দারিয়াস খামবাটা।
বোর্ডের বিতর্কের সূত্রপাত হয় “আজীবন মেয়াদ” সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রাস্টি একবার নিযুক্ত হলে তার মেয়াদ আজীবন থাকবে এবং তার পুনর্নিয়োগ বা অপসারণ অন্য ট্রাস্টির সম্মতির উপর নির্ভর করবে। যদি কেউ অন্য ট্রাস্টির পুনর্নিয়োগে আপত্তি জানায়, তবে তার নিজের পদও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই নীতিকে অনেকেই “আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের উপর আঘাত” বলে সমালোচনা করেছেন।
এই বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ বোর্ড ভোটে সমান ভাগ পড়ে। সিদ্ধান্ত হয় নোয়েল টাটা নতুন চেয়ারম্যান হবেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পর মেহলি মিস্ত্রি বোর্ড থেকে ইস্তফা দেন এবং একে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানান। ফলে, টাটা ট্রাস্টের ভেতরে আইনি লড়াই শুরু হয়।
Tata Sons-এর প্রায় ১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে Shapoorji Pallonji Group-এর হাতে, যারা বহু বছর ধরে গ্রুপে অংশীদার। তাদের দাবি, কোম্পানির তালিকাভুক্তি (IPO) হলেই তারা তাদের অংশ বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে IPO-র প্রক্রিয়া থমকে আছে।
এই অবস্থায় SP Group, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র কাছে আবেদন করে Upper Layer NBFC শ্রেণি থেকে Tata Sons-কে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানায়, যাতে তারা স্বাধীনভাবে তাদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ পায়। এর ফলে, টাটা সন্সের আর্থিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
Tata Trusts ভারতের অন্যতম বৃহত্তম দাতব্য সংস্থা। এদের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাই কেন্দ্রীয় সরকার ও অর্থ মন্ত্রকের নজরও এখন এই সংস্থার দিকে। এমন বিশাল এক গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন দেখা দিলে, তা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও বাজারের স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্পোরেট বিশ্লেষকরা বলছেন, রতন টাটা-র সময়ে টাটা ট্রাস্ট যেমন নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার মডেল হিসেবে কাজ করেছিল, বর্তমান বিভাজন সেই ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে। বিশেষত যখন বোর্ডের সিদ্ধান্ত “অভ্যন্তরীণ রাজনীতি” দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন সংস্থার জনবিশ্বাস কমে যায়।
এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো — যতই বড় বা সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হোক না কেন, গভর্নেন্সে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। Tata Trusts-এর মতো শতবর্ষী সংস্থা যদি উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা দেশের কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য এক সতর্ক সংকেত।
বর্তমানে নোয়েল টাটা কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু বোর্ডের একাংশ এখনো সন্তুষ্ট নয়। আইনগত ও নীতিগত বিরোধ চলতে থাকলে ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ নীতি, Tata Sons-এর শেয়ার কাঠামো, এমনকি গ্রুপের কৌশলগত দিকেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ — বোর্ডে স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ ও সম্মিলিত নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করা। না হলে, টাটা গ্রুপের দীর্ঘদিনের “বিশ্বাসযোগ্যতা”র প্রতীকও প্রশ্নের মুখে পড়বে।