শীতের শুরুতেই কলকাতার পারদ নেমে পৌঁছেছে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। উত্তুরে হাওয়ার প্রভাবে গোটা শহর জুড়ে অনুভূত হচ্ছে ঠান্ডার আমেজ, আর IMD জানাচ্ছে—আগামী দিনে আরও কমতে পারে তাপমাত্রা।
কলকাতার শীত মানেই বিশেষ এক অনুভূতি, যা শহরের মানুষের মনে চিরকালীন নস্টালজিয়ার মতো বাস করে। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে শীতের সকালে কুয়াশার চাদর, আলতো রোদ, আর গরম চায়ের কাপে আঁকা ভাপ—সব মিলিয়ে শহর যেন অদ্ভুত এক ছন্দে বাঁধা পড়ে। এবারের শীতে সেই ছন্দ শুরু হয়েছে আগেই। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, কলকাতায় চলতি মরশুমে প্রথমবার পারদ নেমে এসেছে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সাধারণত ডিসেম্বরে গিয়ে নেমে আসে। কিন্তু ঋতুর সময়ের আগেই এমন শীতের অনুভব শহরবাসীকে যেমন চমকে দিয়েছে, তেমনি অনেকের মধ্যে আনন্দের ঢেউও তৈরি করেছে। কারণ, গত কয়েক বছরের মধ্যে এমন আগাম ঠান্ডা শহরে খুব কমই দেখা গেছে।
এই হঠাৎ তাপমাত্রা পতনের পিছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে পশ্চিমবঙ্গের ওপরে নেমে আসা উত্তুরে বাতাস। হিমালয় থেকে নামা এই ঠান্ডা, শুষ্ক হাওয়া বিহার-ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের দিকে নেমে এসেছে। আবহবিদদের মতে, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এই বাতাস নামতে শুরু করলেই কলকাতায় শীতের অনুভূতি দ্রুত বাড়ে। সাধারণত নভেম্বরে এমন প্রবণতা খুব একটা দেখা যায় না, কিন্তু এ বছর মৌসুমি চরিত্রে পরিবর্তন হয়েছে। ফলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে।
প্রতি বছরই কলকাতায় শীত দেরিতে আসে বলে অভিযোগ শোনা যায়। একসময় নভেম্বর শেষ হতেই শহরে সকালের কুয়াশা নেমে আসত, শীতের আমেজ স্পষ্ট হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেই প্রবণতা বদলে গেছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পরিবেশ দূষণ, নগরায়ণের ফলে তৈরি তাপদ্বীপ প্রভাব—সব মিলিয়ে শীত যেন ধীরে ধীরে কমতে বসেছে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। দিনের বেলায় সূর্যের আলো থাকলেও, রাতের দিকে ঠান্ডার তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত। বিশেষ করে ভোরের দিকে তাপমাত্রা কমে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা অনুভব করছেন অনেকেই।
অন্যদিকে, আবহাওয়া দফতরের তথ্য বলছে, এই তাপমাত্রা পতন আগামী কয়েক দিন বজায় থাকতে পারে। এমনকি কিছুদিন পর পারদ আরও ১–২ ডিগ্রি কমে যেতে পারে। আবহবিদেরা জানিয়েছেন, উত্তুরে হাওয়ার গতি যদি অব্যাহত থাকে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আর্দ্র হাওয়া ঢুকতে না পারে, তবে শীত আরও তাড়াতাড়ি নামতে পারে। কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি এবং নদিয়ার জেলাগুলিতেও তাপমাত্রা দ্রুত কমছে। রাতের দিকে সেখানে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। কিছু জায়গায় আবার ১৪ ডিগ্রি পর্যন্ত নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবার শীত আগেভাগে নামলেও বাতাস তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার আছে। গত কয়েক বছরে নভেম্বরে কলকাতার দূষণের মাত্রা বেড়ে যেত। ধুলোকণা, গাড়ির ধোঁয়া, আবর্জনা পোড়ানো—সব মিলিয়ে শহরের AQI দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ত। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। শুষ্ক উত্তুরে বাতাসের কারণে আকাশ পরিষ্কার আছে, ফলে দূষণ জমতে পারেনি তেমন। তবে ডিসেম্বরের দিকে গেলে অবস্থার বদল হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদেরা।
মানুষজনের দৈনন্দিন জীবনে এই ঠান্ডা ইতিমধ্যেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সকালে স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের মোজা-মাফলার পরে বেরোতে হচ্ছে। অফিসযাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ আবার হালকা জ্যাকেট বা শীতবস্ত্র পরে বেরোচ্ছেন। ফুটপাথের দোকানগুলোতে শীতের জামাকাপড় কেনাকাটা বাড়ছে। গরম জামার দোকান থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের স্টলে গরম টুপি, উলের হাতমোজা, সোয়েটার—সবই বিক্রি হচ্ছে জোরকদমে। চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বেড়েছে। বিস্কুটের সাথে গরম চা যেন শীতের সকালকে আরও উপভোগ্য করে তুলছে।
শহরের পার্ক, লেক, ময়দান—এসব জায়গায় সকালের হাঁটা বা ব্যায়াম করতে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। শীতে অনেকেই আবার আলোর সময় কমে যাওয়ায় বিকেলের দিকে বাইরে বেরোতে ভালোবাসেন। এই সময়টায় কলকাতার রাস্তায় একটা আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, যা গরমকালে দেখা যায় না। শীতের হাওয়া মানুষকে যেন বাড়ির বাইরে টেনে আনে।
এদিকে, তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগবালাই বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ডাক্তারেরা বলছেন, এই সময়ে সর্দি-কাশি-জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। বিশেষ করে যাঁদের শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের সাবধানে থাকতে হবে। সকালবেলা কুয়াশা থাকলে ঠান্ডা বাতাস বুকের মধ্যে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই শিশু ও প্রবীণদের সকালে বেরোনোর সময় মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের অন্যান্য জেলাগুলিতেও শীতের আমেজ ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে। দার্জিলিং, কালিম্পং–এ ইতিমধ্যেই পারদ ৮–৯ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেছে। উত্তরবঙ্গের আরও কিছু জায়গায় রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমছে। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার—এই সব জায়গায়ও শীত এখন পুরোদমে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে পর্যটকদের ভিড়ও বাড়ছে পাহাড়ে। কলকাতা থেকে অনেকেই এখন ছুটির দিনে দার্জিলিং বা সানটেলে ঘুরতে চলে যাচ্ছেন, কারণ শীতের শুরুতে পাহাড়ের সৌন্দর্য যেন আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।
এবারের শীতে আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—বৃষ্টি নেই। গত কয়েক বছরে নভেম্বরের শেষদিকে দক্ষিণবঙ্গে সক্রিয় নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হত। এর জেরে বর্ষণও হতো যথেষ্ট। এতে শীত দেরিতে নামত। কিন্তু এবার বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্ত নেই, নিম্নচাপও তৈরি হয়নি। ফলে আকাশ পরিষ্কার, আর উত্তুরে বাতাস অনায়াসে দক্ষিণবঙ্গের দিকে নেমে আসছে। এই কারণেই শীত তাড়াতাড়ি অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহবিদেরা।
কলকাতার বাসিন্দারা অবশ্য এই শীতকে স্বাগত জানিয়েছে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই লিখছেন, “এবার ঠিক কলকাতার মতো শীত পড়ছে।” অনেকে আবার দোষ চাপাচ্ছেন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের উপরে—“এবার অন্তত শীত বাঁচল!” এমন সব মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে। দোকানপাটে কেক, পিঠে, নিমকি—সব ধরনের শীতকালীন খাবারের চাহিদাও বাড়তে শুরু করেছে। শহরের বেকারি গুলো ক্রিসমাসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাস্তায় গরম ভুট্টার ব্যবসাও জমে উঠছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কলকাতা ধীরে ধীরে শীতকে আপন করে নিচ্ছে। শীতের হাওয়া শহরের দৈনন্দিন জীবনে নতুন প্রাণ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়া দফতর যদিও সতর্ক করছে যে এখনও শীতের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণবঙ্গ, আসল শীত এখনও আসেনি। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর কলকাতায় শীত আরও গাঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সময় শহরে তাপমাত্রা ১২–১৩ ডিগ্রির কাছাকাছি নামার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগেই ১৬ ডিগ্রির এই অভিজ্ঞতা শহরবাসীর শীতপ্রেমকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী কয়েক দিনে আকাশ পরিষ্কার থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাতাসের গতিও বাড়তে পারে, যা শীতকে আরও তীব্র করে তুলবে। তবে কোনও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। রাতে ঠান্ডা বাড়লেও দিনের বেলায় রোদ থাকবে। ফলে সকালের ঠান্ডা আর দিনের নরম রোদ—এই দুইয়ের মিলনে শহর উপভোগ করবে এক মনোরম আবহাওয়া।
এই হঠাৎ তাপমাত্রা পতন কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তনই নয়, কলকাতার মানুষের মনের পরিবর্তনও নিয়ে এসেছে। সারাবছরের গরম আর আর্দ্রতা ভুলে গিয়ে মানুষ এখন শীতের স্বাদ নিচ্ছে। রাস্তায় বেরোলেই দেখা যাচ্ছে শীতের পোশাকে নিজেদের সাজিয়ে নিচ্ছেন সবাই—এ যেন শীতকে স্বাগত জানানোর নিজস্ব এক উৎসব। শহরের রাস্তায় আলোর মালা ঝুলতে শুরু করেছে, পার্ক স্ট্রিট প্রস্তুত হচ্ছে ক্রিসমাসের জন্য, আর কলকাতার মানুষ অপেক্ষায় আছে ডিসেম্বরের চাদরে মোড়া সেই মায়াবী শীতের জন্য।
সবশেষে বলা যায়, এ বছরের শীতকে আগেভাগে পাওয়ার আনন্দে কলকাতা এখন উদ্যাপনের মেজাজে। আবহাওয়া দফতরও জানিয়ে দিয়েছে যে এই শীত আরও বাড়বে, আর শহর ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে ঠান্ডার গভীরে। তাই এখনই সময় এই শীতকে উপভোগ করার, রোদ–ঠান্ডার এই সুন্দর মেলবন্ধনকে সোহাগ করে বাঁচিয়ে রাখার। শীতের এই প্রাক্কালে কলকাতা যেন নতুন ছন্দে, নতুন মেজাজে জেগে উঠেছে—আর সেই ছন্দই আগামী কয়েক সপ্তাহ শহরবাসীর জীবনকে করে তুলবে আরও প্রাণবন্ত, আরও উপভোগ্য।সবশেষে বলা যায়, এ বছরের শীতকে আগেভাগে পাওয়ার আনন্দে কলকাতা এখন উদ্যাপনের মেজাজে। আবহাওয়া দফতরও জানিয়ে দিয়েছে যে এই শীত আরও বাড়বে, আর শহর ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে ঠান্ডার গভীরে। তাই এখনই সময় এই শীতকে উপভোগ করার, রোদ–ঠান্ডার এই সুন্দর মেলবন্ধনকে সোহাগ করে বাঁচিয়ে রাখার। শীতের এই প্রাক্কালে কলকাতা যেন নতুন ছন্দে, নতুন মেজাজে জেগে উঠেছে—আর সেই ছন্দই আগামী কয়েক সপ্তাহ শহরবাসীর জীবনকে করে তুলবে আরও প্রাণবন্ত, আরও উপভোগ্য।