Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সন্তান হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে লাগাতার হুমকি নদিয়ায় সেই কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা নিহত তমন্নার মায়ের দাবি পরিবার

মঙ্গলবার রাতে বাড়িতে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েন তমন্না খাতুনের মা সাবিনা বিবি। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং আপাতত তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল

নদিয়ার কালীগঞ্জের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তমন্না খাতুনের হত্যাকাণ্ডের পর তার মা সাবিনা বিবি যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, তা পুরো এলাকার মধ্যে শোক এবং আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। তমন্নার মর্মান্তিক মৃত্যু এবং তার পরে সাবিনা বিবির মানসিক অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতির দিকে চলে গিয়েছিল। তমন্না খাতুনের হত্যার পরেই তার মা সাবিনা বিবি এক গভীর মানসিক শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন, কারণ হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমিয়েও কোনো দোষীকে গ্রেফতার করা হয়নি। এটি সাবিনার জন্য এক গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বাড়ির দুষ্কৃতীরা তাদের নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিল, যা তার মানসিক অবস্থাকে আরও সংকটময় করে তুলেছিল। তমন্নার হত্যার পর সাবিনা বিবির জীবনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা তাকে পুরোপুরি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, ওই দুষ্কৃতীরা সাবিনাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। এসব পরিস্থিতি তাকে সহ্য করা অসম্ভব করে তোলে। এর ফলে মঙ্গলবার রাতে সাবিনা বিবি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

এদিন রাতে ঘুমের ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা খেয়ে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েন। তাকে সেদিন রাতেই পলাশির প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে তার শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে তাকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। এই ঘটনার পর পুরো পরিবার শোকাহত এবং আতঙ্কিত, কারণ সাবিনা বিবির শারীরিক অবস্থা এখনও বিপদমুক্ত নয়। তবে আপাতত তার অবস্থায় স্থিতিশীলতা এসেছে।

সাবিনা বিবির আত্মহত্যার চেষ্টা শুধু তার মানসিক অবস্থা এবং হতাশার চিত্রই নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের এক গভীর সমস্যাকেও প্রতিফলিত করে। একদিকে তমন্নার মৃত্যু, অন্যদিকে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেওয়া এবং দুষ্কৃতীদের লাগাতার হুমকি—এই সব কিছুই একত্রিত হয়ে সাবিনাকে এক চরম মানসিক অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যে পরিবারে তাদের সন্তান হারানোর পরেও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে, সে পরিবারটির ভেতরে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে, সেটি আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি।

তবে তমন্নার হত্যাকাণ্ডের পর সাবিনার আত্মহত্যার চেষ্টা এটি আমাদের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে একটি বড় বার্তা দেয়। যখন একজন মা তার সন্তানকে খুন হওয়ার পর এমন মানসিক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না, তখন সমাজের দায়িত্ব কী? এটি আমাদের প্রশ্ন জাগায় যে আইনব্যবস্থা ও প্রশাসন কীভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। যদি তমন্নার খুনের বিচার দ্রুত না হয় এবং অভিযুক্তদের শাস্তি না হয়, তবে সমাজে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

এটি আমাদের বোঝাতে সাহায্য করে যে সমাজের প্রতিটি সদস্যকে নিরাপত্তা এবং শান্তি চাইতে হবে। সকলের জন্য ন্যায্যতা এবং দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। বিচার ব্যবস্থা যদি দ্রুত কাজ না করে, তাহলে এর ফলাফল শুধু ওই পরিবার বা ব্যক্তির জন্যই ক্ষতিকর হবে না, পুরো সমাজের জন্যও তা ভয়াবহ হতে পারে। তাই আমাদের উচিত যেন এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং একই সাথে এমন সকল পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে যারা এমন বিপদগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন এবং সমাজের প্রত্যেকটি সদস্যকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে কেউ আর এই ধরনের মানসিক বিপর্যয়ের শিকার না হয়।

পরিবারের সদস্যদের মতে, তমন্নার হত্যার পর থেকে তাদের জীবনে এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে নিজের সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে সেই হত্যাকাণ্ডের দোষীদের এখনও ধরতে না পারা, এই সমস্তই সাবিনার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। তাছাড়া, ওই দুষ্কৃতীরা নিয়মিতভাবে তাদের হুমকি দিয়ে আসছে। সাবিনা বিবি এবং তার পরিবার এখনও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, কারণ তারা জানেন না কখন ওই দুষ্কৃতীরা তাদের আবার আক্রমণ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সাবিনার মানসিক অবস্থা অবনতির দিকে চলে গিয়েছিল এবং তিনি হতাশ হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

news image
আরও খবর

তমন্নার বাবা হুসেন শেখ বলেন, ‘‘আমরা এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি। আমাদের চোখের সামনে মেয়ের মৃত্যু ঘটেছিল। সে দৃশ্য এখনো ভুলতে পারিনি। মেয়ের খুনিরা এখনও অধরা, এবং তারা আমাদের পরিবারকে নিয়মিতভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তারাই সাবিনাকে এতটা আতঙ্কিত করে তুলেছিল যে, তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।’’ তিনি আরও জানান, তমন্নার হত্যার পর তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

তবে তমন্নার হত্যার ঘটনা এবং সাবিনার আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনে শুধু পারিবারিক দুঃখই নয়, স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি বড় প্রভাব রয়েছে। ১৯ জুন কালীগঞ্জে বিধানসভার উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটের ফল ঘোষণার দিন, ২৩ জুন, শাসক দলের বিজয়মিছিলের সময় সিপিএম সমর্থকদের বাড়িতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। তমন্নার মৃত্যু হয় এই বোমা হামলায়। তমন্নার পরিবার জানিয়েছে, তারা এলাকায় পরিচিত সিপিএম সমর্থক ছিলেন, যার কারণে তারা হামলার শিকার হয়েছেন।

এই বোমা হামলার ফলে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে। তমন্নার পরিবার এখন জানায়, এখনও পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তবে আরও অনেক অভিযুক্ত এখনও ধরা পড়েনি। সাবিনা বিবির পরিবারের দাবি, এই অধরা অভিযুক্তরা এখনও তাদেরকে হুমকি দিচ্ছে, এবং সেই কারণে তারা অনবরত আতঙ্কে আছেন।

সাবিনা বিবির এই আত্মহত্যার চেষ্টা শুধু তার মানসিক অবস্থারই চিত্র নয়, বরং এটি আমাদের সমাজে চলমান সহিংসতা, অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক চাপের গভীর প্রভাবকেও প্রকাশ করে। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে, যখন কোনও পরিবার এমন ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে, তখন তারা কতটা নিঃস্ব এবং অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হতে পারে। সাবিনা বিবির আত্মহত্যার চেষ্টা সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করেছে।

পরিবারের সদস্যরা দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন যে যতদিন না তমন্নার হত্যাকারীদের পুরোপুরি শাস্তি দেওয়া হচ্ছে ততদিন তাদের জীবনে শান্তি ফিরে আসবে না। তাদের মতে তমন্নার হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ক্ষতি নয় বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী দুঃখজনক ঘটনা যা পরিবারের সবার মনকে গভীরভাবে আহত করেছে। সাবিনা বিবি এবং তার পরিবার একসঙ্গে কাজ করছে যাতে তারা ন্যায়ের পথে চলতে পারে এবং তাদের লড়াই একদিন সফলতা পাবে। তবে তাদের বর্তমান মানসিক ও শারীরিক অবস্থা এমন যে, যতদিন না সঠিক বিচার পাওয়া যাচ্ছে, তাদের জীবন কখনই স্বাভাবিক হবে না। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন যে বিচার ব্যবস্থা দ্রুত কাজ করবে এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে, যা তাদের শোককে কিছুটা প্রশমিত করবে।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুঃখকষ্টের চিত্র নয় বরং এটি সমাজের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও শারীরিক আঘাত সহ্য করতে থাকে। এই ধরনের ঘটনাগুলি শুধুমাত্র শিকার ব্যক্তির জীবনে নয়, তাদের পরিবারের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। এটি এক ধরনের সমাজের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেখানে মানুষ তাদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং সাধারণ জীবন যাপন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি সেই ধরনের পরিবারের জন্য এক চরম চাপ হয়ে দাঁড়ায় যেখানে তারা নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত থাকে এবং কখনও কখনও তা চূড়ান্ত পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দেয়। সাবিনা বিবির আত্মহত্যার চেষ্টা এমন এক পর্যায়ের চিত্র, যেখানে তিনি তার জীবনের ভার আর নিতে পারছিলেন না এবং দুষ্কৃতীদের হুমকির কারণে তার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিখতে হবে যে সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, আইনগত ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া, এবং অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যখন এক ব্যক্তি বা পরিবার এই ধরনের সহিংসতা এবং হুমকির শিকার হয়, তখন তাদের জীবন সাধারণ হয়ে ওঠে না। তাদের প্রতি সরকারের বা প্রশাসনের দায়িত্ব থাকে যাতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং দ্রুত বিচার করা হয়। যদি এটি না করা হয়, তবে তা সমাজে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করে এবং সমাজের অন্য সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এর ফলে, তারা তাদের জীবনকে বিপদের মধ্যে ফেলে এবং মানসিকভাবে ধ্বংস হয়ে পড়ে।

যতদিন না আমরা সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করি, ততদিন এই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। আমাদের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যাতে কোনো পরিবার আর এই ধরনের সন্ত্রাসী হুমকির শিকার না হয় এবং তাদের জীবন ধ্বংস না হয়। সাবিনা বিবির পরিবার তার জীবনের অত্যন্ত বড় ক্ষতির মুখোমুখি হলেও তারা তাদের অধিকার এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জানে যে তাদের এই লড়াই একদিন সফল হবে এবং তাদের মেয়ে তমন্নার হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে। তবে তাদের লড়াই এক্ষেত্রে শুধু তাদের পরিবারের জন্য নয়, বরং সমাজের সকলের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Preview image