Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

"কলকাতায় জাঁকিয়ে শীতের আগমন! কবে থেকে অনুভব হবে শীতের প্রকোপ?"

কলকাতার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর অবশেষে শীতের আসন্ন আগমনের আভাস পাচ্ছেন। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তুরে হাওয়ার দাপটও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শনিবার, শহরের তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যদিও কুয়াশার মধ্যে বেশ কিছু সময়ই শহর ঢাকা পড়েছিল, তবুও শীতের প্রকোপ এখনই শুরু হয়নি। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের মতে, শীত পুরোপুরি জাঁকিয়ে পড়বে না, তবে শীতল হাওয়ার কারণে শহরবাসী শীতের অনুভূতি পেতে শুরু করবে। এমনকি পরবর্তী কিছুদিনে বেলা বাড়লেও তাপমাত্রা খুব একটা বাড়বে না, আর কুয়াশা থাকবে অব্যাহত। ফলে, আগামী কয়েকদিনে কলকাতায় শীতের প্রকোপ অনুভূত হবে, তবে এটি পুরোপুরি শীতল হতে আরও কিছু দিন লাগবে।

"কলকাতায় জাঁকিয়ে শীতের আগমন! কবে থেকে অনুভব হবে শীতের প্রকোপ?"
Environment & Nature

কলকাতায় জাঁকিয়ে শীতের আগমন! কবে থেকে অনুভব হবে শীতের প্রকোপ?

ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে এসে অবশেষে কলকাতায় শীতের স্পর্শ অনুভূত হতে শুরু করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শীতপ্রেমীদের মুখে হাসি ফুটেছে, যখন পারদ নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে এবং সকালের হিমেল হাওয়া শীতের আগমনের বার্তা দিচ্ছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে যে এই বছর শীতের আগমন কিছুটা বিলম্বিত হলেও, এখন থেকে তাপমাত্রা ক্রমাগত হ্রাস পাবে এবং আগামী সপ্তাহগুলিতে শীতের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাবে।

রবিবার ১৫ ডিসেম্বর কলকাতায় এই মৌসুমের সবচেয়ে ঠান্ডা দিন রেকর্ড করা হয়েছিল, যখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ১২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ডিগ্রি কম ছিল এবং গত বছরের একই দিনের তুলনায় দুই ডিগ্রি কম। এই রেকর্ড ডিসেম্বরের প্রথম পক্ষে ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে কম তাপমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন যে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত শুষ্ক ও শীতল বাতাস নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হওয়ায় এই তাপমাত্রা হ্রাস সম্ভব হয়েছিল।

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের আঞ্চলিক আবহাওয়া বিজ্ঞান কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, চলতি সপ্তাহে রাজ্যজুড়ে মূলত শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকবে। ১৯ থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গ উভয় অঞ্চলেই বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে সকালের দিকে বিভিন্ন জেলায় হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কুয়াশা পড়তে পারে, যা যানবাহন চলাচলে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি জেলায় ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে, যার জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

শনিবার ২০ ডিসেম্বর কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রবিবার ২১ ডিসেম্বর থেকে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৭ ডিগ্রির মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দিনের বেলা আকাশ পরিষ্কার থাকবে এবং রোদের দেখা মিলবে, যা পিকনিক এবং বাইরে ঘোরার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করবে। তবে সন্ধ্যার পর এবং ভোরের দিকে ঠান্ডার তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে, যার জন্য উষ্ণ পোশাকের প্রয়োজন হবে।

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামে শীতের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। এই জেলাগুলিতে রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। পুরুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছিল, যা দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে কম। স্থানীয়রা জানিয়েছেন যে এই অঞ্চলে শীতের অনুভূতি প্রতিদিন তীব্রতর হচ্ছে এবং সকাল ও রাতের দিকে বিশেষভাবে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি আরও ভিন্ন এবং শীতের প্রকোপ সেখানে অনেক বেশি। দার্জিলিংয়ে তাপমাত্রা ৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছে এবং কালিম্পঙে ১০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। তবে পাহাড়ে যারা ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত শীতের পোশাক সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারে তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে গিয়েছে, যা এই অঞ্চলগুলিতে শীতের তীব্রতার প্রমাণ।

এই বছর শীতের আগমনে কিছুটা বিলম্ব হওয়ার পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিকে এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে একাধিক নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণিঝড় ফেনজলের সৃষ্টি হয়েছিল। এই আবহাওয়া ব্যবস্থাগুলি উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত শীতল বাতাসের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছিল। ফলস্বরূপ, বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্র ও উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয়ে রাজ্যের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থেকে গিয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের সময় কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এক লাফে ২২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি বেশি।

একাধিক পশ্চিমী ঝঞ্ঝাও শীতের স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলেছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা উত্তর-পশ্চিম ভারতে সক্রিয় থাকলে তা পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনে। এর ফলে মাঝে মাঝে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং শীতের তীব্রতা হ্রাস পায়। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন যে এই বছর একের পর এক পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে শীতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। যখনই উত্তুরে হাওয়া প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং তাপমাত্রা কমতে থাকে, তখনই পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এসে সেই ধারাকে ব্যাহত করে।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নও শীতের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনছে। পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন যে বঙ্গোপসাগরের জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে ঘনঘন নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বায়ুদূষণও শীতের উপর প্রভাব ফেলছে। কলকাতার মতো শহরে কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নিঃসৃত ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে কার্বন কণা থাকে, যা তাপ ধরে রাখে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক। এর ফলে শহরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় কম অনুভূত হয়।

news image
আরও খবর

লা নিনার প্রভাবও এই বছর শীতের উপর প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হয়েছিল। লা নিনা সাধারণত শীতকালে ভারতে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু এই বছর লা নিনার প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি। ভারতীয় মৌসম বিভাগ জানিয়েছে যে এই বছর শীতকালে রাতের তাপমাত্রার গড় স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে এবং শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা এবং তীব্রতা কম হতে পারে।

তবে আশার কথা হলো, নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর এখন উত্তুরে হাওয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে যে আগামী সপ্তাহগুলিতে তাপমাত্রা ক্রমাগত হ্রাস পাবে। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে এবং জানুয়ারি মাসে শীতের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।

বড়দিনের সময় কলকাতায় শীতের মনোরম আবহাওয়া থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা নাও পড়তে পারে, তবুও শীতের মৃদু স্পর্শ উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাইরে ঘোরাফেরা এবং উৎসব উদযাপনের জন্য আদর্শ।

কলকাতার ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, শহরে রেকর্ড সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৯৯ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে তাপমাত্রা খুব কমই ১০ ডিগ্রির নিচে নামে। জানুয়ারি মাস সাধারণত সবচেয়ে ঠান্ডা মাস হিসেবে বিবেচিত হয়, যখন রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং শীতের বিদায় ঘণ্টা বাজে।

দক্ষিণবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পশ্চিম বর্ধমান জেলায় হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কুয়াশা বিশেষত ভোরের দিকে ঘন হবে এবং দৃশ্যমানতা হ্রাস করতে পারে। যানবাহন চালকদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে কুয়াশা ধীরে ধীরে কেটে যাবে এবং দিনের বেলা পরিষ্কার আকাশ এবং রোদের দেখা মিলবে।

শীতকাল কলকাতার মানুষদের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় একটি ঋতু। এই সময় শহরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবারের উৎসব এবং পারিবারিক মিলনের আয়োজন হয়। শীতের সকালে গরম চা বা কফির সাথে মুড়ি, জিলিপি বা খিচুড়ির স্বাদ নিতে কলকাতাবাসীরা ভালোবাসেন। রাস্তার কোণে ভাপা পিঠা, খেজুরের গুড়ের রসগোল্লা এবং পায়েস বিক্রেতাদের ভিড় জমে। পার্কে, ময়দানে এবং রাজ্যের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে পিকনিকের ধুম পড়ে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শীতকালে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাপমাত্রা হ্রাসের সাথে সাথে সর্দি, কাশি, ফ্লু এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। শিশু এবং বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাক পরা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া শীতকালীন স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিহাইড্রেশন এড়াতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করাও জরুরি।

আগামী দিনগুলিতে কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শীতের আমেজ আরও গাঢ় হবে। আকাশ পরিষ্কার থাকবে, রোদের উপস্থিতি থাকবে প্রতিদিন এবং রাতের তাপমাত্রা ক্রমশ নিচের দিকে যাবে। শীতপ্রেমীরা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন এবং এই সুন্দর ঋতুর পূর্ণ আস্বাদ নিতে প্রস্তুত হতে পারেন। যদিও এই বছর শীতের শুরু কিছুটা দেরিতে হয়েছে, তবে আগামী সপ্তাহগুলি প্রকৃত শীতের অভিজ্ঞতা প্রদান করবে বলে আশা করা যায়।

Preview image