২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রেলকর্মীর মৃত্যুর পর, তাঁর স্ত্রী গ্র্যাচুইটির ৯,১০ লক্ষ টাকা পান। এই টাকা নিয়ে শাশুড়ি বৌমার মধ্যে উত্তপ্ত বিবাদ শুরু হয়। অবশেষে, শাশুড়ি এক বন্ধুকে দিয়ে বৌমাকে খুন করান।
মহারাষ্ট্রে শাশুড়ি-বৌমার বিবাদে চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহারাষ্ট্রের ঠানেতে ঘটে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা সবার মনেই গভীর দাগ রেখে গেছে। রেলকর্মী বিলাস গাঙ্গুরে তাঁর গ্র্যাচুইটির ৯-১০ লক্ষ টাকা স্ত্রী রূপালি বিলাস গাঙ্গুরে নামের এক মহিলাকে দিয়ে যান। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ওই টাকার অধিকার নিয়ে শুরু হয় এক ভয়াবহ শাশুড়ি-বৌমার বিবাদ। শেষপর্যন্ত, সেই বিবাদই পরিণতি নেয় এক হত্যাকাণ্ডে। শাশুড়ি লতা নাথা গাঙ্গুরে, ৬০ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা, তাঁর পুত্রবধূ রূপালি গাঙ্গুরেকে খুন করিয়ে দেন। এই ঘটনা মহারাষ্ট্রের ঠানেতে ঘটেছিল, যা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন রেলকর্মী বিলাস গাঙ্গুরে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর স্ত্রী রূপালি গ্র্যাচুইটির ৯-১০ লক্ষ টাকা পান, যা পরবর্তী সময়ে শাশুড়ি লতা দাবি করতে থাকেন। তবে, রূপালি সেই টাকার পুরোটাই নিজের হিসেবে দাবি করেন এবং তাঁর সংসারের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে চান।
এটি নিয়ে শাশুড়ি বৌমার মধ্যে শুরু হয় বিবাদ। লতা মনে করেন, তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পর গ্র্যাচুইটি টাকা তাঁরই প্রাপ্য। অন্যদিকে, রূপালি মনে করেন, ওই টাকার ব্যবহার তাঁকেই করা উচিত, কারণ তাঁর সংসার চালাতে সেই টাকাই প্রয়োজন।
এদিকে, বিষয়টি আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন শাশুড়ি লতা জানিয়ে দেন, তাঁর ছেলের চাকরি ১৫ বছর পর নাতি পাবে। কিন্তু রূপালি তখনই নিশ্চিত হন যে তাঁকে এখনই চাকরি করতে হবে, কারণ তাঁর পরিবারের চলার জন্য সেই উপার্জন অত্যন্ত প্রয়োজন। এই নিয়ে শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্ক আরও তিক্ত হতে থাকে এবং বিবাদ মারাত্মক আকার ধারণ করে। লতা, ক্ষিপ্ত হয়ে, শ্বাশুড়ি রূপালির চাকরি পাওয়ার বিষয়ে একরকম হুমকি দেন এবং জানান যে তাঁর নাতিই সেই চাকরি পাবে যখন সে সাবালক হবে। তবে রূপালি তাতে রাজি হননি।
এমন পরিস্থিতিতে, লতা এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করেন তিনি বৌমাকে খুন করার জন্য এক বন্ধু, জগদীশের সহায়তা নেন। লতা, যিনি নিজের পুত্রবধূকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন, শ্বাশুড়ি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, কিন্তু আসলে তিনি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চাইছিলেন তাঁর পুত্রবধূকে।
এদিন, একদিন সকালে, লতার বন্ধু জগদীশ রূপালি গাঙ্গুরেকে আক্রমণ করে। জগদীশ লোহার রড দিয়ে রূপালির মাথায় আঘাত করেন এবং তাঁর জীবন কেড়ে নেন। রূপালি যখন মাটিতে পড়ে যান, তখন তিনি গুরুতর জখম অবস্থায় ছিলেন। খুনের পর, জগদীশ রূপালিকে ঠানের কল্যাণ সেতুর কাছে ফেলে রেখে চলে যান। রূপালির সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং দ্রুতই চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে তিনি আগেই মারা গিয়েছেন।
পুলিশের তদন্তে, লতা নিজেই থানায় গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করেন, দাবি করেন যে তাঁর পুত্রবধূ ২৪ ঘণ্টা ধরে নিখোঁজ। কিন্তু ঘটনার পরবর্তী সময়ে, তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকরা শীঘ্রই এ ব্যাপারে চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেন। পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে লতা, হত্যাকারী জগদীশের মাধ্যমে বৌমাকে খুন করিয়ে দিয়েছেন।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, "এটা ছিল ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত খুন।" পুলিশ তৎক্ষণাৎ তদন্ত শুরু করে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সমস্ত রহস্য উন্মোচন করেন। লতা, যিনি তাঁর পুত্রবধূর খুনের জন্য দায়ী, নিজে থানায় গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করতে এসেছিলেন, এবং একদিকে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে চেয়েছিলেন।
এই চাঞ্চল্যকর খুনের পর, লতা এবং তাঁর সহযোগী জগদীশকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায় যে, লতা এই হত্যার জন্য জগদীশের সহায়তা নিয়ে রূপালিকে খুন করিয়েছিলেন। পুলিশ তীব্র তদন্তের মাধ্যমে হত্যার বিষয়টি পরিষ্কার করে এবং দ্রুত তাঁদের গ্রেফতার করে। রবিবার, তাঁদের আদালতে পেশ করা হবে।
পরিণতি এবং সমাজে প্রভাব
মহারাষ্ট্রের ঠানেতে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর শাশুড়ি-বৌমার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সমাজের মধ্যে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এই ধরনের ঘটনা যে শুধু একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের মধ্যে বিদ্যমান আর্থিক, সাংস্কৃতিক এবং মানসিক সমস্যার গভীরতা ও ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলছে, তা স্পষ্ট। বিশেষ করে, যখন বিষয়টি সম্পত্তি, আর্থিক সুবিধা বা দায়বদ্ধতার সঙ্গে জড়িত হয়, তখন পারিবারিক সম্পর্কগুলি অদৃশ্যভাবে আঘাত পায় এবং কখনো কখনো এমন সহিংসতার দিকে চলে যায় যা আমরা ভাবতেও পারি না।
এই হত্যাকাণ্ডের পর, মহারাষ্ট্রসহ সারা দেশে এক ধরণের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে একদিকে শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাত, অন্যদিকে একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর শাশুড়ির চাওয়া পাওয়ার কাহিনী, আমাদের সামাজিক কাঠামোর উপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন বসাচ্ছে। এই ঘটনা আমাদের সমাজের এমন দিকগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেগুলি সাধারণত আড়ালে থাকে।
যেহেতু রেলকর্মী বিলাস গাঙ্গুরের মৃত্যু পর তাঁর স্ত্রী রূপালির হাতে ৯-১০ লক্ষ টাকার গ্র্যাচুইটি চলে আসে, সেই টাকার মালিকানা এবং ব্যবহার নিয়ে শাশুড়ি লতা নাথা গাঙ্গুরের চাহিদা ছিল। এটি ছিল তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই শাশুড়ি-বৌমার মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বিবাদ শুধু একটি টাকার বিষয় ছিল না, বরং এর অন্তরালে ছিল নানা মানসিক চাপ, পরস্পরের প্রতি অভিমান এবং পরিবারে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ।
মহিলা সমাজে এই ধরনের আর্থিক বিষয়গুলি যখন সিলসিলা হয়ে দাঁড়ায়, তখন পারিবারিক বন্ধনও দূর্বল হয়ে পড়ে। এই ধরনের অশান্তি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না, বরং সমাজে স্থায়ী দাগ রেখে যায়। আর্থিক লোভ, ক্ষোভ, প্রতিহিংসার মত অনুভূতিগুলি মানুষের মধ্যে অনৈতিকতার জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, একদিকে এক ব্যক্তির জীবন নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে পুরো পরিবার নষ্ট হওয়ার পথে চলে গেছে।
শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্কের অবনতির ফলে, এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের রূপে বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং এটি সমাজে আরও গভীর একটি প্রশ্ন তুলেছে। আমরা একে 'পারিবারিক কলহ' বলতে পারি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এটি একাধিক সমস্যা জটিলতার চিত্র। আর্থিক চাপ, সম্পর্কের মধ্যে শোষণ, অন্যায়ের প্রতি সহিষ্ণুতা, এবং বিচারবিহীন আচরণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। একদিকে শাশুড়ি নিজের পুত্রের মৃত্যুর পর যে ক্ষোভ অনুভব করছেন, অপরদিকে বৌমার নিজের অধিকার এবং সংসার চালানোর জন্য আক্ষেপ, এ সব মিলে এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে।
এ ধরনের পারিবারিক সমস্যা, যখন ক্ষোভে পরিণত হয়, তখন মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এই চাপ অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। 'শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্ক' এমন একটি বিষয়, যা সমাজে অনেক সময় সঠিকভাবে বোঝা হয় না। তবে, এটি যে একটি সংবেদনশীল এবং গভীরভাবে মানবিক বিষয়, তা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আমাদের সমাজকে একটি শিক্ষা দিতে পারে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তখন তাদের সমস্যা মেটানোর পথ খুঁজে বের করা খুব জরুরি। একে অপরকে সহ্য করতে না পারলে, সেটি মানবিক সম্পর্কের মধ্যে রগড় তৈরি করে এবং সেই সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত কোনো ভয়াবহ পরিণতির দিকে চলে যায়। পরিবারের মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে সহায়ক হতে পারে।
এছাড়া, সম্পর্কের মধ্যে অসীম টানাপোড়েনের সময়ে কিছু সময়ের জন্য দূরত্ব এবং পরস্পরের মানসিক অবস্থার প্রতি সহানুভূতি থাকতে পারে। আমাদের সমাজের মধ্যে এটা একটি বড় শিক্ষা, যে কাউকে নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে রাখা আর্থিক বা পারিবারিক দুশ্চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি সমাজে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অন্ধকার দিক নিয়ে আসতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর, সমাজে একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে: মানবিক মূল্যবোধের কোথায় যে ঘাটতি রয়েছে, তা কিভাবে পূর্ণ করা হবে? সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের মানসিক শক্তি কমে আসছে। এক দিকে পরিবারগুলি যেখানে আগে একে অপরের জন্য সহায়তা প্রদান করত, সেখানে বর্তমানে অনেক পরিবারে পারস্পরিক সহানুভূতির অভাব দেখা যাচ্ছে। মানুষ নিজের স্বার্থে অপরকে আঘাত দিতে দ্বিধা করছে না, এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যকেও।
এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ আমরা যখন একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে পারব না, তখন সম্পর্কের ভিত দুর্বল হতে থাকবে। এই সমস্যাটি আরও গভীর হয় যখন আমাদের সমাজের মানুষ সঠিক পরামর্শ বা সাহায্য না পেয়ে সহিংস পথ বেছে নেয়। তাই, সম্পর্কের মধ্যে আন্তরিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ানো আমাদের কর্তব্য।
সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়। যদিও বর্তমানে আমরা অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি, তবুও একটি পরিবারের অটুট বন্ধন এখনও আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি। এসব সম্পর্ক যখন দুর্বল হয়, তখন এটি সমাজের সামাজিক, মানসিক, আর্থিক এবং মানবিক দিকগুলিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি অবশ্যই আমাদের সকলের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় যে, পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য সহানুভূতি, শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন পেশাদার সাহায্য এবং সঠিক পথনির্দেশনা।
এই খুনের ঘটনাটি আমাদের সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। পারিবারিক কলহ এবং আর্থিক সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ, প্রতিহিংসা এবং সহিংসতার দিকে পরিচালিত হতে পারে। এটি আমাদের সকলকে মনে করিয়ে দেয় যে, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আমাদের সামাজিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে, এমন সহিংসতা এবং কলহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।