Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাজ্যে বিজেপি আসার পর জায়গায় জায়গায় বিজয় মিছিল ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা

রাজ্যে বিজেপির সাফল্যের পর বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে বিজয় মিছিল। কোথাও উৎসবের আবহ, আবার কোথাও রাজনৈতিক তরজা ও উত্তেজনার অভিযোগ উঠছে। প্রশাসন পরিস্থিতির উপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।

রাজ্যে বিজেপির সাফল্যের পর বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে ব্যাপক বিজয় মিছিল, আর সেই মিছিল ঘিরেই ক্রমশ বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। শহর থেকে গ্রাম, বাজার থেকে মোড় একাধিক জায়গায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ঢল দেখা গিয়েছে। দলীয় পতাকা, আবির, ঢাক-ঢোল, বাজি এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকা। সমর্থকদের একাংশের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এই সাফল্য তাদের কাছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক জয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের ইচ্ছার প্রতিফলন। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, কিছু জায়গায় বিজয় মিছিলের নামে অশান্তি ও উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। ফলে গোটা পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিজয় মিছিল নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই ভোটের ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নামে। তবে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই ধরনের মিছিল আরও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বিজেপির সাম্প্রতিক উত্থান এবং সংগঠনের বিস্তার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মত অনেকের। তাই ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, আসানসোল, বর্ধমান সহ একাধিক জেলায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিজয় মিছিল নজর কেড়েছে। কোথাও মোটরবাইক র‍্যালি, কোথাও পদযাত্রা, আবার কোথাও বিশাল জমায়েত করে উদযাপন করতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় কর্মীরা আবির খেলেন, মিষ্টি বিতরণ করেন এবং আতসবাজি ফাটান। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, মানুষের সমর্থন ও আস্থা পাওয়ার কারণেই এই উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি, রাজ্যের মানুষ পরিবর্তন চাইছেন এবং সেই বার্তাই নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে এই বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে একাধিক এলাকায় উত্তেজনার খবরও সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু জায়গায় মিছিল চলাকালীন উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও বিরোধী দলের কার্যালয়ের সামনে জমায়েত ঘিরে বচসা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। যদিও বিজেপির তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলের দাবি, বিরোধীরা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় অযথা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, তাদের কর্মীরা গণতান্ত্রিক উপায়ে বিজয় উদযাপন করছেন এবং কোথাও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দল দেয়নি।

অন্যদিকে শাসকদল ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের একাংশের দাবি, নির্বাচনের ফলকে কেন্দ্র করে রাজ্যে শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বাড়ির সামনে স্লোগান, পোস্টার বা শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ ও প্রশাসন ইতিমধ্যেই একাধিক স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলিকে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করার আবেদন জানানো হয়েছে। কোথাও যেন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার এলাকা এবং ব্যস্ত রাস্তার আশেপাশে মিছিলের কারণে যাতে যানজট বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, তার জন্য পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজয় মিছিল অনেক সময় শুধুমাত্র আনন্দ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই তা রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়, তখন এই ধরনের মিছিলকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিও সেই আশঙ্কাকেই সামনে আনছে বলে মনে করছেন অনেকে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই বিজয় মিছিল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ভিডিও, ছবি এবং লাইভ সম্প্রচার মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে পড়ছে। কোথাও হাজার হাজার মানুষের জমায়েত, কোথাও মোটরবাইকের দীর্ঘ র‍্যালি, আবার কোথাও রাজনৈতিক স্লোগানে মুখর রাস্তার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সমর্থকদের একাংশ এই ঘটনাকে “গণতন্ত্রের উৎসব” বলে উল্লেখ করলেও সমালোচকদের দাবি, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।

অনেক সাধারণ মানুষও এই পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। কেউ বলছেন, গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দল বিজয় উদযাপন করতেই পারে। আবার কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত শক্তি প্রদর্শন সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের অতীত ইতিহাস রয়েছে, সেখানে প্রশাসনের আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলে মত স্থানীয়দের একাংশের।

রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে এই ধরনের বিজয় মিছিল আরও বাড়তে পারে। কারণ নির্বাচনের ফলাফলকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে। বিজেপির ক্ষেত্রেও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠন বিস্তার এবং জনসংযোগ বাড়ানোর প্রচেষ্টা আরও জোরদার হতে পারে। অন্যদিকে শাসকদলও নিজেদের শক্তি ধরে রাখতে পাল্টা কর্মসূচি নিতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

news image
আরও খবর

রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান বজায় রাখা জরুরি। রাজনৈতিক কর্মসূচি যেন কখনও সামাজিক বিভাজন বা ভয়ের পরিবেশ তৈরি না করে, সেই দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব অনেক সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর পড়ে।

এদিকে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, কোথাও কোথাও প্রশাসন যথেষ্ট দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আবার অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। আইন ভাঙলে যে কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিজয় মিছিল ঘিরে ব্যবসায়ী মহলও কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় রাস্তা বন্ধ থাকায় যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। বাজার এলাকায় ভিড় বাড়ায় সাধারণ মানুষের অসুবিধাও হয়েছে। যদিও সমর্থকদের দাবি, উৎসবের আবহে কিছুটা সমস্যা হতেই পারে এবং তা সাময়িক।

শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক জয়-পরাজয় গণতন্ত্রের অংশ হলেও সেটিকে শান্তিপূর্ণ ও সংযতভাবে উদযাপন করা উচিত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ তুলে ধরা জরুরি। কারণ বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ সমাজের উপরও প্রভাব ফেলছে বলে মত অনেকের।

গ্রামাঞ্চলেও বিজেপির বিজয় মিছিলকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক জায়গায় প্রথমবার এত বড় রাজনৈতিক মিছিল দেখেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। দলীয় কর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানানোর কর্মসূচিও নিয়েছেন। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, মানুষের আশীর্বাদ নিয়েই তারা আগামী দিনে আরও বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলিও রাজনৈতিকভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। তাদের দাবি, শুধুমাত্র মিছিল করে মানুষের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষক সমস্যা, শিল্প পরিস্থিতি  এই সমস্ত বাস্তব বিষয় নিয়েই মানুষের বেশি উদ্বেগ রয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের। ফলে আগামী দিনে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে কিছু এলাকায় প্রশাসনের তরফে মাইক ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। শব্দদূষণ ও সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। যদিও কিছু রাজনৈতিক কর্মী এই নিয়ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে সাধারণ মানুষের একাংশ শান্তির বার্তাও দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতেই পারে, কিন্তু তার জন্য সমাজে বিভেদ তৈরি হওয়া উচিত নয়। উৎসব ও উদযাপন যেন মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়ায়, সেই দিকেই রাজনৈতিক দলগুলির নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, রাজ্যে বিজেপির সাফল্যের পর শুরু হওয়া বিজয় মিছিল এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদযাপন নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কোথাও এটি পরিবর্তনের দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কোথাও আবার শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকার উপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে।

বর্তমানে গোটা বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা চলছে। একদিকে বিজেপি কর্মী সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের সতর্ক অবস্থান  এই তিনের সমন্বয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে এই বিজয় মিছিল ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়বে নাকি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে, সেদিকেই এখন নজর রাজ্যবাসীর।

Preview image