পুরুলিয়ার হাসপাতাল মোড় এলাকায় প্রশাসনের বড় অভিযান। ফুটপাত দখল করে থাকা একাধিক অস্থায়ী দোকান ভেঙে সরিয়ে দেওয়া হল। যানজট কমানো ও পথচলতি মানুষের সুবিধার জন্য নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ।
পুরুলিয়া শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত হাসপাতাল মোড় এলাকায় বড়সড় উচ্ছেদ অভিযান চালাল প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে তৈরি হওয়া অস্থায়ী দোকান, চায়ের স্টল, ফলের দোকান, খাবারের স্টল এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসা একে একে ভেঙে সরিয়ে দেওয়া হল। মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রশাসনের এই অভিযান ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকাজুড়ে। বিশাল পুলিশবাহিনী, পুরসভার কর্মী এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপস্থিতিতে চলে এই অভিযান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতাল মোড় এলাকার দীর্ঘদিনের দখলমুক্ত ফুটপাত পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতাল মোড় এলাকায় বেআইনিভাবে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য দোকান। ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে ব্যবসা চলায় সাধারণ পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন প্রচণ্ড যানজটও তৈরি হত। অ্যাম্বুল্যান্স চলাচল, রোগী নিয়ে আসা গাড়ি এবং সাধারণ যানবাহন সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ছিল বহুদিনের।
অবশেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন। সকাল থেকেই এলাকায় মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশবাহিনী। সঙ্গে ছিল পুরসভার কর্মী, বিদ্যুৎ দফতরের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন আধিকারিক। প্রথমে মাইকিং করে দোকানদারদের এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেকেই নিজেরাই দোকানের মালপত্র সরিয়ে নিতে শুরু করেন। তবে কয়েকটি দোকান সরানো নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এরপর শুরু হয় মূল উচ্ছেদ অভিযান। একের পর এক দোকানের টিন, ত্রিপল, বাঁশের কাঠামো এবং অস্থায়ী নির্মাণ ভেঙে ফেলা হয়। প্রশাসনের বুলডোজার ও শ্রমিকরা দ্রুতগতিতে পুরো এলাকা পরিষ্কার করতে শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতাল মোড় এলাকার ফুটপাত একেবারে খালি হয়ে যায়।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের একাংশ প্রশাসনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় পথচলা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। রাস্তার ওপরই দোকান বসে যাওয়ায় যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে হাসপাতালের সামনে এই অবস্থা রোগীদের জন্য মারাত্মক সমস্যার কারণ হয়ে উঠছিল।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে এই উচ্ছেদ অভিযানের দাবি জানাচ্ছিলাম। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনও জায়গা ছিল না। রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসা মানুষদের খুব সমস্যায় পড়তে হত। আজ প্রশাসন ঠিক কাজ করেছে।”
আরও এক ব্যবসায়ী বলেন, “রাস্তার অর্ধেকটাই দোকানে ভরে গিয়েছিল। সকাল-বিকেল প্রচণ্ড জ্যাম হত। অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত আটকে থাকত। এখন অন্তত সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে।”
তবে উচ্ছেদ হওয়া দোকানদারদের মধ্যে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, হঠাৎ করে দোকান ভেঙে দেওয়ায় তাঁরা বড় সমস্যায় পড়েছেন। অনেকেরই দাবি, এই ছোট দোকানই ছিল তাঁদের একমাত্র রোজগারের পথ। এক দোকানদার বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। আগে কখনও এভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎ দোকান ভেঙে দিলে আমরা পরিবার চালাব কীভাবে?”
আরও এক মহিলা দোকানদারের অভিযোগ, “আমাদের পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। শুধু দোকান ভেঙে দিলেই তো হবে না, আমাদের বাঁচার পথও দেখাতে হবে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, বেআইনি দখলদারি কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। হাসপাতাল মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার ফলে জনসাধারণের অসুবিধা হচ্ছিল। বহু অভিযোগ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক প্রশাসনিক আধিকারিক বলেন, “ফুটপাত সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য। সেটি দখল করে স্থায়ীভাবে দোকান বসানো আইনবিরুদ্ধ। হাসপাতাল এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠছিল। তাই অভিযান চালানো হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতেও যাতে নতুন করে কেউ ফুটপাত দখল করতে না পারে, তার জন্য নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে। প্রয়োজনে আবারও উচ্ছেদ অভিযান হবে।
পুরুলিয়া হাসপাতাল মোড় এলাকাটি শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই রাস্তা ব্যবহার করেন। হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, বাসস্ট্যান্ড এবং বাজার এলাকায় যাওয়ার জন্য এই মোড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হত। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছিল।
স্থানীয়দের দাবি, বহুবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও দীর্ঘদিন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে এবার বড়সড় অভিযান চালানোয় অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
এদিকে রাজনৈতিক মহলেও এই উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশ অভিযোগ করেছে, ছোট ব্যবসায়ীদের বিকল্প ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের উচিত ছিল আগে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা।
যদিও শাসকদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা ভেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, হাসপাতালের সামনে যানজট ও দখলদারির সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। তাই প্রশাসন বাধ্য হয়েই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমেও এই অভিযান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ ছোট ব্যবসায়ীদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। অনেকেই হাসপাতাল মোড়ের আগের ও পরের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “অবশেষে দখলমুক্ত হল ফুটপাত।”
ভিডিওতে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের সময় এলাকায় ব্যাপক ভিড় জমে যায়। বহু মানুষ দাঁড়িয়ে পুরো অভিযান দেখছিলেন। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন, কেউ আবার প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
এক কলেজ ছাত্র বলেন, “ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় আমাদের রাস্তায় হাঁটতে হত। এখন অন্তত নিরাপদে হাঁটা যাবে।”
এক বৃদ্ধ রোগীর আত্মীয় বলেন, “হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসতে খুব সমস্যা হত। অ্যাম্বুল্যান্স আটকে যেত। আজকের পর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে আশা করছি।”
প্রশাসনের সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু হাসপাতাল মোড় নয়, শহরের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বেআইনি দখলদারি নিয়ে নজরদারি শুরু হয়েছে। আগামী দিনে আরও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের ফুটপাত দখল সমস্যা এখন শুধু পুরুলিয়ার নয়, গোটা রাজ্যের বহু শহরের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চলাচল—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তাঁদের মতে, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি করা এবং সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা জরুরি। তাহলেই সাধারণ মানুষের সুবিধা বজায় রেখেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তবে আপাতত পুরুলিয়া হাসপাতাল মোড় এলাকার চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। দীর্ঘদিনের দখলদারি সরিয়ে ফুটপাত পরিষ্কার হওয়ায় সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন। রাস্তার প্রশস্ততা বাড়ায় যান চলাচলও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
সন্ধ্যার পরেও এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয় যাতে নতুন করে কেউ দোকান বসাতে না পারে। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনওভাবেই বেআইনি দখলদারি বরদাস্ত করা হবে না।
সবমিলিয়ে, পুরুলিয়া হাসপাতাল মোড়ে এই উচ্ছেদ অভিযান এখন গোটা জেলার অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ একে সাধারণ মানুষের স্বার্থে নেওয়া জরুরি পদক্ষেপ বলছেন, কেউ আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি অবিচারের অভিযোগ তুলছেন। তবে এটুকু স্পষ্ট, প্রশাসনের এই কড়া অভিযানের পর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে বেআইনি দখলদারি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই হাসপাতাল মোড় এলাকায় অস্বাভাবিক তৎপরতা চোখে পড়ে। সকাল আটটা নাগাদ বিশাল পুলিশবাহিনী এলাকায় পৌঁছে যায়। সঙ্গে ছিলেন পুরসভার আধিকারিক, প্রশাসনিক কর্তারা, বিদ্যুৎ দফতরের কর্মী এবং উচ্ছেদ অভিযানের জন্য আনা বুলডোজার ও শ্রমিকরা। প্রথমে এলাকাজুড়ে মাইকিং করা হয়। দোকানদারদের দ্রুত নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বেআইনিভাবে ফুটপাত দখল করে থাকা কোনও দোকান আর রাখা হবে না।
প্রথমদিকে অনেক দোকানদার কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েন। কেউ দ্রুত নিজের দোকানের ত্রিপল খুলতে শুরু করেন, কেউ আবার কাঠের তাক, প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল ও অন্যান্য মালপত্র সরানোর চেষ্টা করেন। তবে কয়েকজন দোকানদার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এখানে ব্যবসা করছেন। হঠাৎ করে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই দোকান ভেঙে দিলে তাঁদের পরিবার নিয়ে বড় সংকটে পড়তে হবে।
এক দোকানদার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এই দোকানটাই আমাদের সবকিছু। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে বসে যা রোজগার হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। এখন যদি সব ভেঙে দেয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”
আরও এক ফল বিক্রেতার অভিযোগ, “আমরা তো বড় ব্যবসায়ী নই। ছোট দোকান করে কোনওরকমে বেঁচে আছি। আগে যদি অন্য জায়গা দিত, তাহলে নিজেরাই সরে যেতাম।”
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, বহুবার সতর্ক করা সত্ত্বেও ফুটপাত খালি করা হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই অভিযান চালাতে হচ্ছে। এরপরই শুরু হয় মূল উচ্ছেদ অভিযান।
বুলডোজারের শব্দে কেঁপে ওঠে হাসপাতাল মোড় এলাকা। একের পর এক দোকানের টিনের চাল, বাঁশের কাঠামো, ত্রিপল, প্লাস্টিকের ঘেরা এবং অস্থায়ী নির্মাণ ভেঙে ফেলতে শুরু করেন কর্মীরা। কোথাও চায়ের দোকানের বেঞ্চ ভাঙা হচ্ছে, কোথাও আবার খাবারের স্টলের বড় বড় কাঠের কাউন্টার সরানো হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো এলাকা যেন বদলে যেতে শুরু করে।