Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আমতায় বাড়িতে আগুন লেগে নিভে গেল চারটি প্রাণ, শোকস্তব্ধ এলাকা

হাওড়ার আমতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গভীর রাতে বাড়িতে হঠাৎ আগুন লেগে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে ঝলসে যান পরিবারের সদস্যরা। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও দমকল বিভাগ।

আমতায় বাড়িতে আগুন লেগে নিভে গেল চারটি প্রাণ, শোকস্তব্ধ এলাকা
Accident or Fire Incident)

হাওড়ার আমতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: এক রাতে নিভে গেল একই পরিবারের চারটি প্রাণ

হাওড়া জেলার আমতা থানার অন্তর্গত এক গ্রামে গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড গোটা এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে একই পরিবারের চারজনের। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন এক নাবালিকা ছাত্রী, তার বাবা-মা এবং এক আত্মীয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকায়। এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না প্রতিবেশীরা—একটি স্বাভাবিক রাত কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রূপ নিল এমন ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডিতে।

হাওড়া জেলার আমতা ব্লকের এক প্রত্যন্ত গ্রামে মধ্যরাতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে আটকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে এক দম্পতি, তাঁদের কিশোরী কন্যা এবং পরিবারের এক আত্মীয়ের। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দেওয়া সেই আগুনের লেলিহান শিখা শুধু একটি বাড়ি নয়, কেড়ে নিয়েছে চারটি মূল্যবান জীবন।

গভীর রাতে হঠাৎ আগুন

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিদিনের মতোই ঘটনার দিন রাতে পরিবারের সদস্যরা খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘরের ভিতরে একটি মাত্র প্রবেশপথ ছিল এবং জানালা খুবই সীমিত। রাত আনুমানিক ২টো নাগাদ হঠাৎ করেই ঘরের একাংশ থেকে আগুনের শিখা দেখা যায়। প্রথমে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে গোটা ঘরে, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন গ্রাস করে নেয় পুরো বাড়িটি।

ঘুমের মধ্যেই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হতে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের। প্রতিবেশীদের অনেকের দাবি, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ চিৎকার শোনা গিয়েছিল, কিন্তু আগুনের তীব্রতায় ঘরের ভেতরে ঢোকার কোনও সুযোগই পাওয়া যায়নি। 

ঘটনার দিন সন্ধ্যেটা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। পরিবারটি রাতের খাবার খেয়ে প্রতিদিনের মতোই ঘুমিয়ে পড়ে। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেই রাতই হয়ে উঠবে তাঁদের জীবনের শেষ রাত। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ ঘরের এক কোণ থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধোঁয়া রূপ নেয় আগুনের ভয়াল শিখায়।

প্রাথমিকভাবে ঘরের ভেতর থাকা কেউই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারেননি। ঘুমন্ত অবস্থায় ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছনোর সুযোগও পাননি পরিবারের সদস্যরা।

আগুনের লেলিহান শিখায় আটকে পড়েন পরিবার

বাড়িটি ছিল মূলত দাহ্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি। কাঠের আসবাব, কাপড়, রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার—সব মিলিয়ে আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে নিজেরাই জল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু আগুন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে সে চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়।

দমকল বাহিনীকে খবর দেওয়া হলেও, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আগুনের মধ্যে আটকে পড়ে পরিবারের চারজন সদস্যই প্রাণ হারান। দমকল কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় চারটি নিথর দেহ।

আগুনের তাণ্ডব ও প্রতিবেশীদের অসহায়তা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে আসেন। কিন্তু আগুন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘরের ভিতরে ঢোকার কোনও সুযোগ ছিল না। কেউ কেউ জানালার গ্রিল ভাঙার চেষ্টা করেন, আবার কেউ জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দাহ্য পদার্থে ভর্তি ঘরটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুনের গ্রাসে চলে যায়।

প্রতিবেশীদের অনেকেই বলছেন, “চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল, কিছুই করতে পারলাম না।” এই অসহায়ত্বের অনুভূতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁদের।

দমকল পৌঁছনোর আগেই সর্বনাশ

খবর পেয়ে দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও, ততক্ষণে আগুন সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে পরিবারটিকে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর বাড়ির ভিতর থেকে উদ্ধার হয় চারটি দেহ। দমকল কর্মীরা জানান, আগুনের তীব্রতায় ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

এই ঘটনায় গোটা এলাকায় নেমে আসে গভীর শোক। সকাল হতেই মৃত পরিবারের বাড়ির সামনে ভিড় জমতে থাকে। আত্মীয়স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

কে এই চারজন?

মৃতদের মধ্যে রয়েছেন পরিবারের কর্তা, তাঁর স্ত্রী, তাঁদের নাবালিকা কন্যা এবং পরিবারের এক আত্মীয়। কন্যাটি স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করত এবং ভবিষ্যতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখত। শিক্ষকদের মতে, সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও ভদ্র ছাত্রী।

পরিবারটির আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও, তাঁরা কখনও অভিযোগ করতেন না। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। এই চারজনের অকাল প্রয়াণে যেন গোটা গ্রামটাই আপনজন হারিয়েছে।

মৃতদের পরিচয়

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে রয়েছেন পরিবারের কর্তা, তাঁর স্ত্রী, তাঁদের কিশোরী কন্যা এবং এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কিশোরীটি স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ত এবং পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী ছিল বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এই অকাল মৃত্যুর খবরে শোকস্তব্ধ স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।

news image
আরও খবর

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, পরিবারটি খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল। কারও সঙ্গে কোনও শত্রুতা বা বিবাদ ছিল না। সংসারের হাল ধরতে পরিবারের কর্তা দিনমজুরির কাজ করতেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

দমকল ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় আমতা থানার পুলিশ এবং দমকল বাহিনী। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরই শুরু হয় তদন্ত। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা।

দমকল আধিকারিকদের দাবি, ঘরের বৈদ্যুতিক সংযোগ অত্যন্ত পুরনো ছিল এবং বাড়ির ভিতরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ফরেনসিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এলাকায় শোকের ছায়া

এই ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। সকাল থেকেই প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের ভিড় জমতে থাকে মৃত পরিবারের বাড়ির সামনে। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। প্রতিবেশীরা বলছেন, “রাতে যদি একটু আগে আগুনটা টের পেতাম, তাহলে হয়তো এমনটা হতো না।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে শোকপ্রকাশ করেন। তাঁরা মৃত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি তুলেছেন প্রশাসনের কাছে।

প্রশাসনের ভূমিকা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মৃতদের পরিবারকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, বাড়িতে আগুন লাগার কারণ খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়েছে—পুরনো বৈদ্যুতিক সংযোগ, অরক্ষিত গ্যাস সিলিন্ডার ও দাহ্য সামগ্রী ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়ার জন্য।

রাজ্যে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েই চলেছে। শহর হোক বা গ্রাম—বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাস লিকেজ, অসতর্কতা থেকেই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতে এই ধরনের ঘটনা আরও মারাত্মক রূপ নিচ্ছে, কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ বিপদের আঁচ পায় না।

এই ঘটনাও ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিল—আমরা কি সত্যিই অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন?

বিশেষজ্ঞদের মত

অগ্নি-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি বাড়িতে অন্তত একটি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থাকা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, নিয়মিত বৈদ্যুতিক লাইনের পরীক্ষা এবং গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাঁদের কথায়, “একটু সচেতনতা অনেক বড় দুর্ঘটনা এড়াতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই বিষয়ে আরও বেশি করে প্রচার দরকার।”

মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র

এই অগ্নিকাণ্ড শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। এক মুহূর্তে একটি পরিবারের সব কিছু শেষ হয়ে গিয়েছে। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের মনে থেকে যাবে সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি।

গ্রামবাসীদের অনেকেই বলছেন, এই ঘটনা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। আগুনের লেলিহান শিখা, চিৎকার, ধোঁয়া—সব মিলিয়ে সেই রাত এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

শেষকথা

হাওড়ার আমতায় ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—জীবন কতটা অনিশ্চিত। এক মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি কেড়ে নিতে পারে একাধিক প্রাণ। শোকস্তব্ধ পরিবারের জন্য সমবেদনা জানানো ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই, তবে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, তার জন্য সচেতন হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Preview image