আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে তারা গভীরভাবে শোকাহত একই সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র হামলা’র হুঁশিয়ারি দিয়ে কড়া প্রত্যাঘাতের বার্তা দিল ইরানের শক্তিশালী বাহিনী।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিজের দফতরে বসে কাজ করছিলেন—এমন সময় আচমকাই সেখানে বোমা আছড়ে পড়ে। ইরানের সংবাদমাধ্যমের দাবি, বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন খামেনেই। তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর কন্যা, জামাই এবং নাতনিরও। দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তেহরান জানিয়েছে, এই হামলা ছিল ‘কাপুরুষোচিত’ এবং এর জন্য দায়ী আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ বাহিনী।
সরকারি সংবাদসংস্থা জানায়, শনিবার ভোরের দিকে এই হামলা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “হামলার সময় সর্বোচ্চ নেতা নিজের দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাষ্ট্রের কাজের মাঝেই তাঁকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে।” পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর খামেনেইয়ের কন্যা, জামাই ও নাতনির ‘শহিদ’ হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি) খামেনেইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে—এই হামলার প্রত্যাঘাত হবে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র’। আইআরজিসির বিবৃতিতে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বাহিনীকে সরাসরি নিশানা করে বলা হয়েছে, প্রতিশোধমূলক অভিযান খুব শিগগিরই শুরু হবে।
ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক শহরে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ধর্মীয় স্থানে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন চলছে। দেশের রাজনৈতিক মহলেও চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট Donald Trump সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে দাবি করেছেন, “সবচেয়ে খারাপ লোক খামেনেই নিহত। ইতিহাসের পাতায় অন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তি।” তাঁর কথায়, খামেনেইয়ের বাহিনীর হাতে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে শান্তি ফেরাতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ বোমাবর্ষণ চলতে পারে।
ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-ও শনিবার রাতেই খামেনেইয়ের মৃত্যুর দাবি করেন। তিনি জানান, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে খামেনেইয়ের এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। ইজ়রায়েলি সূত্রে দাবি, ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian-কেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।
শনিবার সকাল থেকেই ইজ়রায়েল ইরানে আক্রমণ শুরু করে। পরে জানা যায়, মার্কিন সেনাও সেই অভিযানে সহায়তা করছে। যৌথ বাহিনীর হামলায় তেহরান-সহ একাধিক বড় শহরে বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আছড়ে পড়ে। ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা হামলা শুরু হয়। শুধু ইজ়রায়েল নয়, পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলিকেও নিশানা করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই ও আবু ধাবিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। কাতার ও সৌদি আরবেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে ইরান। বিস্তীর্ণ এলাকায় বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
খামেনেইয়ের মৃত্যু-দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে এখনও যাচাই-বাছাই চলছে। তবে যদি এই দাবি সত্যি প্রমাণিত হয়, তা হলে এটি হবে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা।
আয়াতোল্লা Ali Khamenei শুধু ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের নীতিনির্ধারণী কাঠামোকে প্রভাবিত করেছেন। তাঁর অবস্থান ছিল সংবিধানগতভাবে সর্বোচ্চ—রাষ্ট্রপতি, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, এমনকি সশস্ত্র বাহিনীও তাঁর অধীনস্থ কাঠামোর অংশ। ফলে তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক গভীর ভূমিকম্পের মতো প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার পদটি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, কার্যত সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্র। সংবিধান অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। খামেনেইয়ের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যারা তাঁর মতাদর্শে আস্থাশীল। তাঁর অনুপস্থিতিতে এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে পারে।
বিশেষ করে Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি) বা রেভলিউশনারি গার্ডের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন দশকে আইআরজিসি কেবল সামরিক শক্তি হিসেবেই নয়, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরে তারা আরও দৃশ্যমান রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে পারে—যা ইরানের শাসনব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও সামরিকমুখী করে তুলতে পারে।
খামেনেইয়ের আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত Joint Comprehensive Plan of Action (জেসিপিওএ) চুক্তি ছিল সেই দীর্ঘ আলোচনার ফল। যদিও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়, ইরান তার কর্মসূচি আংশিকভাবে চালিয়ে যায়। খামেনেইয়ের অনুপস্থিতিতে পারমাণবিক নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হতে পারে—বিশেষ করে যদি বর্তমান সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্ব যদি পশ্চিমবিরোধী অবস্থানকে জোরদার করে, তা হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দ্রুতগতিতে এগোতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ইরান ও ইজ়রায়েলের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই শত্রুতাপূর্ণ। সিরিয়া, লেবানন, গাজা—বিভিন্ন ফ্রন্টে পরোক্ষ সংঘর্ষ চলেছে। ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu বারবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ইরান ইজ়রায়েলকে ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করে।
খামেনেইয়ের সম্ভাব্য মৃত্যু যদি ইজ়রায়েলি হামলার ফল হয়, তবে তা সরাসরি যুদ্ধের পথ খুলে দিতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই ‘তীব্রতম প্রত্যাঘাত’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এর ফলে লেবাননের হিজ়বুল্লা, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী কিংবা ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সক্রিয়তা বাড়তে পারে। সংঘাত সীমান্ত ছাড়িয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট Donald Trump ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে আরও সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়লে তা কেবল ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ন্যাটো মিত্র, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং রাশিয়া-চিনের মতো শক্তিগুলিও অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চিনও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও অবকাঠামো চুক্তিতে আবদ্ধ। ফলে সংঘাত বাড়লে তা এক বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সঙ্কটে পরিণত হতে পারে—যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক পথের সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস মজুতের দেশ। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা দেখা দিলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি রফতানি হয়—সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। ইরান যদি ওই পথ আংশিকভাবে অবরুদ্ধ করে, তা হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং শেয়ারবাজারে পতন—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মুদ্রাস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার—এই উপসাগরীয় দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের প্রভাব নিয়ে সতর্ক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছিল। খামেনেই-পরবর্তী অনিশ্চয়তায় তারা আবারও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করতে পারে।
তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একদিকে ন্যাটো সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক স্বার্থ জড়িত। ফলে আঙ্কারার অবস্থানও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।
খামেনেইয়ের মৃত্যু-দাবি যদি সত্যি হয়, তবে ইরানের অভ্যন্তরে সংস্কারপন্থী ও কট্টরপন্থীদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হতে পারে। প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তিনি তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী ভাবধারার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর।
জনগণের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া ভিন্নমুখী হতে পারে। কেউ শোকাহত, কেউ আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের কাছে এটি নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা।
মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন হতে পারে। বিমান চলাচল ও বাণিজ্যিক নৌপথে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সাইবার হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে—কারণ ইরান ও ইজ়রায়েল উভয়ই সাইবার যুদ্ধে দক্ষ।
১. নিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধ ও সীমিত সংঘাত – উভয় পক্ষ সীমিত সামরিক পদক্ষেপে থামতে পারে।
২. পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ – একাধিক রাষ্ট্র জড়িয়ে বড় যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
৩. কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ – জাতিসংঘ বা আঞ্চলিক শক্তির মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি।
৪. ইরানে নেতৃত্বের দ্রুত রদবদল – স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে, যদি নতুন নেতৃত্ব দ্রুত নির্বাচিত হয়।
খামেনেইয়ের সম্ভাব্য মৃত্যু শুধু একটি দেশের নেতার অবসান নয়; এটি একটি যুগের সমাপ্তি হতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে ইরান যে পথচলা শুরু করেছিল, তা এখন নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সবকিছুই এই ঘটনার প্রভাবে নতুন করে বিন্যস্ত হতে পারে।
তবে এখনও আন্তর্জাতিক মহলে এই মৃত্যুদাবি যাচাই চলছে। তথ্য-যাচাই সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। কিন্তু যদি এই দাবি সত্যি প্রমাণিত হয়, তা হলে ২১শ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে এটি হবে এক মোড়-ফেরানো মুহূর্ত—যার প্রতিধ্বনি বহু বছর ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে শোনা যাবে।
Is this conversation helpful so far?