Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকলেও বিপর্যয় মোকাবিলায় বড় ফাঁক, নেই প্রশিক্ষিত কর্মী

বিপর্যয় মোকাবিলায় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের তরফে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে আধুনিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে উন্নত উদ্ধার যান, ড্রোন, বোট, ভারী কাটার মেশিন, যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নানা প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র। কাগজে কলমে এবং পরিকাঠামোর দিক থেকে বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি নেই বলেই দাবি প্রশাসনের। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা কিংবা ধসের সময় সামনে আসছে একটি বড় সমস্যা প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীর অভাব। আধুনিক যন্ত্র থাকলেও সেগুলি চালানোর মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সরঞ্জাম কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। দুর্যোগের মুহূর্তে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর, সেখানে দক্ষ জনবলের অভাবে উদ্ধার কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোথাও উদ্ধারকারী দল পৌঁছলেও যন্ত্র ব্যবহার করতে বাইরের বিশেষজ্ঞ ডাকার প্রয়োজন পড়ছে, আবার কোথাও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে পুরনো পদ্ধতির উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপর্যয় মোকাবিলা শুধুমাত্র সরঞ্জাম নির্ভর নয়, এটি মূলত মানবসম্পদ নির্ভর একটি ব্যবস্থা। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মক ড্রিল, প্রযুক্তিগত আপডেট এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা না থাকলে দামি যন্ত্রপাতি কোনও কাজে আসে না। অথচ এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দিকেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা রয়ে গেছে। অনেক জেলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা চুক্তিভিত্তিক, অল্প বেতনে কাজ করেন, ফলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকলেও বিপর্যয় মোকাবিলায় বড় ফাঁক, নেই প্রশিক্ষিত কর্মী
Administration & Disaster Management

বিপর্যয় মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা গত কয়েক বছরে বহুগুণ বেড়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেনা হয়েছে উন্নতমানের উদ্ধারযান, হাইড্রোলিক কাটার, বোট, ড্রোন, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ সুরক্ষা পোশাক এবং নানা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। কাগজে-কলমে এই প্রস্তুতি দেখে মনে হতে পারে যে বিপর্যয় মোকাবিলায় আর কোনও ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে, এই বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও বিপর্যয়ের সময় কার্যকর উদ্ধার ও ত্রাণকাজে বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সেই ফাঁকের মূল কারণ একটাই প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব।

প্রতিটি দুর্যোগের সময়ই দেখা যায়, ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও উদ্ধারকাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসে না। কোথাও আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে, কোথাও আবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। কারণ, যন্ত্র থাকলেই তা কার্যকর হয় না, তার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, দামী সরঞ্জাম গুদামে পড়ে থাকলেও মাঠপর্যায়ে কর্মীরা সেগুলি ব্যবহার করতে অভ্যস্ত নন। ফলে বাধ্য হয়ে পুরনো পদ্ধতিতেই উদ্ধার চালাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপর্যয় মোকাবিলা কোনও যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, এটি মূলত একটি মানবনির্ভর ব্যবস্থা। যন্ত্র মানুষের হাতেই কার্যকর হয়। অথচ আমাদের ব্যবস্থায় যন্ত্র কেনার উপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রশিক্ষণের উপর ততটাই কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। অনেক জেলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। আধুনিক প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়নি। ফলে যন্ত্র আপডেট হলেও দক্ষতা আপডেট হয়নি।

আরও একটি বড় সমস্যা হল কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনীহা। বহু জায়গায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত। কম বেতন, অনিশ্চিত চাকরি এবং অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে অনেক দক্ষ কর্মী এই পেশায় দীর্ঘদিন থাকতে চান না। ফলে অভিজ্ঞ কর্মীরা একে একে অন্যত্র চলে যান, আর নতুন কর্মীরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাঠে নামতে বাধ্য হন। এর ফলে বিপর্যয়ের সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং উদ্ধারকাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা ভূমিধসের পাশাপাশি শহুরে বিপর্যয় যেমন অগ্নিকাণ্ড, বহুতল ধস বা বড় দুর্ঘটনাতেও এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নত যন্ত্র থাকলেও সঠিকভাবে ব্যবহার না করতে পারায় অনেক সময় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। সেই সময়ের মূল্য চুকোতে হয় আটকে পড়া মানুষদের জীবন দিয়ে। এই পরিস্থিতি প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল স্থানীয় স্তরে প্রশিক্ষণের অভাব। কোনও বিপর্যয়ের সময় প্রথম সাড়া দেন স্থানীয় মানুষ এবং স্বেচ্ছাসেবকরাই। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশেরই কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে ভালো ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অনেক সময় নিজেরাই বিপদের মুখে পড়েন বা উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি হয়। যদি পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলগুলিকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হতো, তাহলে বিপর্যয়ের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

বিপর্যয় মোকাবিলায় সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন দফতর, বাহিনী এবং প্রশাসনিক স্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে আধুনিক সরঞ্জামও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। প্রশিক্ষিত কর্মীরা শুধু যন্ত্র চালাতে জানবেন তা নয়, তাঁরা কীভাবে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করবেন, কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কীভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, সেই দক্ষতাও অত্যন্ত জরুরি। এই সমন্বিত প্রশিক্ষণের অভাব বহু ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।                                                                                                                                                                                                                                     

এর পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলগুলিকেও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ খুবই সীমিত। দুর্যোগের সময় প্রথম সাড়া দেন স্থানীয় বাসিন্দারাই, কিন্তু সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকায় অনেক সময় তাঁরাও ঝুঁকির মুখে পড়েন। ফলে প্রশ্ন উঠছে কেবল বাজেট বাড়ালেই কি বিপর্যয় মোকাবিলা শক্তিশালী হয়, নাকি মানবসম্পদ উন্নয়নই আসল চাবিকাঠি?

সচেতন মহলের দাবি, ভবিষ্যতের বিপর্যয় মোকাবিলায় শুধুমাত্র যন্ত্র কেনার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। না হলে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকলেও বাস্তবে বিপর্যয়ের সময় তা কার্যকর হবে না, আর তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।                                                                                                                                                                      

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় কোনও দুর্ঘটনার সময় সাধারণ মানুষ প্রথমেই যে প্রশ্নটি করেন, তা হল উদ্ধারকাজ কেন সময় নিচ্ছে। আধুনিক যন্ত্র পৌঁছেও কেন মানুষকে বাঁচাতে দেরি হচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরঞ্জাম আছে কিন্তু তা ব্যবহার করার পর্যাপ্ত অভ্যাস নেই। কোথাও কোনও যন্ত্র প্রথমবার ব্যবহার করতে গিয়ে কর্মীরা দ্বিধায় পড়ছেন, কোথাও আবার প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্ধারকাজের গতি কমে যায় এবং সংকট আরও গভীর হয়।

বিপর্যয় মোকাবিলার কাজ মূলত মানুষের দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে। চরম চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা এবং ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা—এই সবই প্রশিক্ষণের ফল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে গৌণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় যন্ত্র কেনার পর সেই যন্ত্রের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয় না। ফলে কর্মীরা পুরনো অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই নতুন পরিস্থিতি সামলাতে বাধ্য হন। এতে ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে এবং কার্যকারিতা কমে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর বহু কর্মী অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত। চাকরির নিরাপত্তা না থাকায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম হওয়ায় অনেক দক্ষ কর্মী এই ক্ষেত্র ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যান। ফলে যে অভিজ্ঞতা বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়ার কথা, তা মাঝপথেই ভেঙে যায়। নতুন কর্মীরা এসে পড়েন এমন এক পরিস্থিতিতে, যেখানে তাঁদের হাতে আধুনিক যন্ত্র থাকলেও পর্যাপ্ত দিশা বা অভিজ্ঞতা থাকে না।

news image

শহরাঞ্চলে বিপর্যয়ের ধরন আলাদা হলেও সমস্যার মূলে একই সংকট। বহুতল ভবনে আগুন লাগা, ধস নামা বা বড়সড় দুর্ঘটনার সময় দেখা যায়, বিভিন্ন সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। কে আগে কোন কাজ করবে, কোন যন্ত্র কোথায় ব্যবহার হবে, কীভাবে এলাকাটি সুরক্ষিত করা হবে—এই সব প্রশ্নের উত্তর দ্রুত পাওয়া যায় না। প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ কর্মী থাকলে এই সমন্বয় অনেক সহজ হতো। কিন্তু দক্ষতার ঘাটতিতে অনেক সময় পুরো ব্যবস্থাই এলোমেলো হয়ে পড়ে।

গ্রামীণ এলাকায় এই সংকট আরও প্রকট। সেখানে আধুনিক সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হয় এবং স্থানীয় স্তরে প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। অথচ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা নদীভাঙনের মতো বিপর্যয়ে প্রথম ধাক্কা সামলাতে হয় গ্রামের মানুষকেই। তাঁরা নিজেরা ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে, কিন্তু প্রশিক্ষণ না থাকায় অনেক সময় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে যদি স্থানীয় মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হতো, তাহলে বিপর্যয়ের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

বিপর্যয় মোকাবিলায় মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্বও কম নয়। চাপের মধ্যে কাজ করার ক্ষমতা, ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানুষের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করা এই সবই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। কিন্তু এই দিকটি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। ফলে অনেক কর্মী চরম পরিস্থিতিতে মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন বা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে উদ্ধারকাজের উপর।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যয়ের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়ছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, প্রবল ঘূর্ণিঝড় কিংবা তাপপ্রবাহ এই সবই ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিপর্যয় মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। শুধু যন্ত্রের উপর নির্ভর করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুসংগঠিত, প্রশিক্ষিত এবং আত্মবিশ্বাসী মানবশক্তি।

সচেতন মহল মনে করছেন, বিপর্যয় মোকাবিলায় দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার। যন্ত্র কেনা একটি দৃশ্যমান কাজ, যা সহজেই দেখানো যায়। কিন্তু প্রশিক্ষণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার ফল ধীরে ধীরে আসে। এই কারণেই হয়তো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। অথচ এই বিনিয়োগই ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা দিতে পারে।

নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে মহড়া, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখার মতো নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। শুধু শহরে নয়, গ্রাম স্তর পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিতে হবে। তবেই বিপর্যয়ের সময় প্রতিটি স্তরে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া সম্ভব হবে।

আজ যখন কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও বিপর্যয় মোকাবিলায় বড় ফাঁক চোখে পড়ছে, তখন এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না যে আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক কোথায়। যন্ত্র অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেই যন্ত্র চালানোর দক্ষ হাত না থাকলে তা কোনও কাজে আসে না। মানুষের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তাই আসল শক্তি। এই শক্তির উপর বিনিয়োগ না করলে আধুনিক সরঞ্জাম শুধুই প্রদর্শনীর বস্তু হয়ে থাকবে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এখনই যদি এই বাস্তবতা স্বীকার করে নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী দিনের বিপর্যয় আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। প্রশিক্ষিত কর্মী ছাড়া কোনও ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ নয়। তাই বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রকৃত প্রস্তুতি তখনই সফল হবে, যখন যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দক্ষতাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সচেতন মহলের মতে, বিপর্যয় মোকাবিলায় শুধুমাত্র বাজেট বাড়ানো বা নতুন যন্ত্র কেনাই সমাধান নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া জরুরি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়, মক ড্রিল, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং কর্মীদের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা করা না গেলে এই সংকট কাটবে না। যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের দক্ষতার সমন্বয়ই পারে বিপর্যয় মোকাবিলাকে সত্যিকারের কার্যকর করে তুলতে।

বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও যদি প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাবে সেগুলি পুরোপুরি কাজে না লাগে, তবে সেই বিনিয়োগের সার্থকতা কোথায়। ভবিষ্যতে দুর্যোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নগরায়নের চাপ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে যদি মানবসম্পদের উন্নয়নে এখনই গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে এই ফাঁক আরও বড় আকার নিতে পারে।

অতএব, বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। যন্ত্র কেনার পাশাপাশি মানুষের দক্ষতায় বিনিয়োগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। প্রশিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী ও অভিজ্ঞ কর্মী ছাড়া কোনও বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থা কখনওই সম্পূর্ণ হতে পারে না। কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেগুলি চালানোর জন্য থাকবে যথাযথ প্রশিক্ষিত হাত এবং সুসংগঠিত মানবশক্তি।

Preview image