Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দিনভরের চাপ দূর করবে এই আসন, সাথে কমবে পেটের মেদও

মাটিতে আরাম করে পা মুড়ে বসে শরীরের উপরের অংশকে হালকা মোচড় দেওয়াই এই আসনের মূল কৌশল। খুব সহজ ও স্বচ্ছন্দভাবে করা যায় বলে যেকোনো বয়সের মানুষই অনায়াসে এই আসনটি অনুশীলন করতে পারেন। নিয়মিত চর্চায় শরীর পায় আরাম, বাড়ে নমনীয়তা এবং থাকে ফিট।

পরিবর্ত সুখাসন: ক্লান্ত শরীরকে আরাম দেওয়া ও পেট-কোমরের মেদ ঝরানোর সহজতম আসন

সারা দিনের ব্যস্ততা, দৌড়ঝাঁপ, দায়িত্ব, কাজের চাপ আর মানসিক ক্লান্তির ভিড়ে নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়ার সময় অনেকেরই থাকে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানান কাজে ছুটতে ছুটতে যখন অবশেষে বাড়ি ফেরা হয়, তখন শরীর-মন দুটোই থমকে দাঁড়াতে চায়। সেই সময় ভারী কোনও ব্যায়াম করার কথা মাথায় এলেও বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষই আর সেই শক্তি বা উৎসাহ পান না। দীর্ঘক্ষণ অফিসে বসে কাজ করা, পথের ক্লান্তি, মানসিক চাপ সব মিলিয়ে শরীর তখন শুধু বিশ্রামই খোঁজে। ফলে আলস্য গ্রাস করে, এবং শরীরচর্চার কথা মনে এলেও মনে হয়—এমন ক্লান্ত শরীরে আর ব্যায়াম করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ঠিক এই অবস্থাতেই যদি সামান্য কিছু সহজ নড়াচড়া করা যায়, এমন কিছু যা শরীরকে খুব বেশি কষ্ট না দিয়ে বরং আরাম দেয়, তাহলে শরীরের পক্ষে সেটা অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। কারণ দিনের শেষে শরীরকে সম্পূর্ণ নিশ্চল রাখলে অনেক সময় মেদ জমতে শুরু করে, পেশির জোর কমে যায়, রক্ত সঞ্চালন কমে ঝিমুনি বাড়ে, এমনকি মানসিক ক্লান্তিও গাঢ় হয়ে ওঠে। অথচ খুব কম সময়ের একটি সহজ ব্যায়াম শরীরকে ফিরিয়ে দিতে পারে নতুন প্রাণ, মনোযোগ, হালকা অনুভূতি, এবং পরের দিনের জন্য প্রস্তুতি।

ঠিক এমনই একটি সহজ অথচ অত্যন্ত কার্যকর যোগাসন হল পরিবর্ত সুখাসন। ভারী ব্যায়াম না করে, দাঁড়ানোর প্রয়োজন না রেখেই, কেবল মাটিতে বসে করা যায় এই আসন। অনেকেই সুখাসনের নাম শুনেছেন—মাটিতে পা মুড়ে স্বচ্ছন্দে বসে থাকা। সেই পরিচিত ভঙ্গিতেই সামান্য মোচড় যোগ করলেই তৈরি হয় পরিবর্ত সুখাসন, যা শরীরের পক্ষে একই সঙ্গে আরামদায়ক এবং ফলপ্রদ।

এই আসনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি করতে কোনও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন নেই। যে কোনও বয়সের মানুষ, এমনকি যারা সাধারণত ব্যায়াম না করেন, তারাও অনায়াসে এই আসনটি করতে পারেন। মাটিতে আরাম করে পা মুড়ে বসে, পিঠ সোজা রেখে, শরীরের উপরের অংশে ডান-বাঁ দুই দিকে হালকা মোচড় দেওয়াই এ আসনের মূল কৌশল। দেখতে যতটা সহজ, উপকারিতা ততটাই গভীর।

পরিবর্ত সুখাসনের নিয়মিত অভ্যাসে পেট ও কোমরের মেদ কমানোর ক্ষেত্রে বেশ ভালো ফল দেখা যায়। কারণ মোচড় দেওয়ার ফলে পেটের পাশের পেশিগুলোর ওপর সরাসরি চাপ পড়ে, যা এই অংশের অতিরিক্ত চর্বি কমতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকার ফলে মেরুদণ্ড যে শক্ত হয়ে যায় বা টান ধরে, এই আসন সেই জমে থাকা টান কমায়। ফলে শরীর হয় হালকা, ব্যথা কমে, পিঠ ও কোমরের পেশি সচল হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই আসন স্ট্রেচিং-এর জন্য দারুণ কাজ করে। শরীরের উপরের অংশ মোচড় দেওয়ার সাথে সাথেই ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমর—সব জড় ভাব কেটে যায়। রক্ত সঞ্চালন বেড়ে মনোযোগ বাড়ে, ক্লান্তি দূর হয়, এবং শরীর অনেকটাই ঝরঝরে লাগে। যারা দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য এই আসন অত্যন্ত উপকারী।

এছাড়া পরিবর্ত সুখাসন মনকেও প্রশান্ত করে। মোচড় দেওয়ার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যা মনকে স্থির করে এবং মানসিক চাপ কমায়। কর্মদিবস শেষে মন যখন ক্লান্ত থাকে, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের এই আসন মনোযোগ এবং মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনে।

শরীরের নমনীয়তা বাড়ানোর জন্যও এটি দারুণ একটি অনুশীলন। নিয়মিত করলে মেরুদণ্ড আরও নমনীয় হয়, ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ে, এবং ভবিষ্যতে আরও কঠিন যোগাসন করার জন্য শরীর প্রস্তুত হয়ে ওঠে। যাদের হজমের সমস্যা আছে, তাদের জন্যও এই আসন উপকারী হতে পারে, কারণ মোচড় দেওয়ার ফলে পেটের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয়, যা হজমে সহায়তা করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পরিবর্ত সুখাসন হল একটি “অল-ইন-ওয়ান” সহজ যোগাভ্যাস—যা খুব কম সময় নিয়ে, শরীরকে খুব বেশি কষ্ট না দিয়েও, অসাধারণ সব উপকার এনে দেয়। দিনের শেষে যখন ক্লান্তি চেপে বসে, তখন মাত্র পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে এই আসন করলে শরীর-মন দুটোই অনেকটাই সতেজ হয়ে ওঠে। এ কারণে এটি শুধু একটি যোগাসন নয়, বরং ব্যস্ত জীবনে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার এক সহজ, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত উপায়।


কেন পরিবর্ত সুখাসন এত উপকারী?

শরীরচর্চা মানেই যে কঠিন ব্যায়াম বা জটিল যোগাসন করতে হবে—এ ধারণা অনেক সময় আমাদের অনুৎসাহিত করে। অথচ যোগব্যায়ামের মূল দর্শনই হল এমন ভঙ্গি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল যার মাধ্যমে শরীর ও মনকে নিজের মতো করে আরাম দেওয়া যায়। পরিবর্ত সুখাসন ঠিক তেমনি একটি আসন, যেটি—

  • আলতোভাবে মেরুদণ্ডকে সক্রিয় করে

  • পেট ও কোমরের পাশের অংশে স্ট্রেচিং ঘটায়

  • শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ শেখায়

  • মনকে শান্ত করে

  • শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়

দিনভর বসে কাজ করা, কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের ফলে মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে যাওয়া, কোমর ব্যথা, ঘাড়ে টান, হজমের সমস্যা, অবসাদ—এসবের থেকে মুক্তি পেতে এই আসন অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। বাড়তি সুবিধা হলো, এই আসনটি করতে কোনও বিশেষ জায়গা বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই; ঘরে বসেই যে কেউ এটি করতে পারেন।


আসনের সহজ পদ্ধতি: ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

১) প্রস্তুতি: আরাম করে বসুন

মাটিতে একটি যোগম্যাট বিছিয়ে সোজা হয়ে বসুন। পা মুড়িয়ে সুখাসনের ভঙ্গি নিন। পিঠ সোজা এবং টানটান থাকবে। কাঁধ ঢিলে রাখুন যেন শরীর স্বাভাবিক থাকে।

২) হাতের অবস্থান

ডান দিকে মোচড় দিতে চাইলে ডান হাত শরীরের পিছনে মাটিতে রাখুন। বাঁ হাত রাখুন ডান হাঁটুর ওপর বা সামান্য কাছে।

৩) মোচড় দেওয়ার কৌশল

শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কোমর ও বুকের দিক ডান দিকে ঘুরিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন শরীর ঝুঁকিয়ে মোচড় দেবেন না—মোচড় আসতে হবে মেরুদণ্ড বরাবর, বুক প্রসারিত থাকবে।

৪) শ্বাস-প্রশ্বাস

এ অবস্থায় ধীরে ধীরে শ্বাস নিন। কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন।
তারপর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন।

৫) অন্য দিকেও একইভাবে

একই পদ্ধতিতে এবার বাঁ দিকে মোচড় দিন।
ডান-বাঁ উভয় দিকেই ৩-৫ সেট করতে পারেন।


পরিবর্ত সুখাসনের বিস্তৃত উপকারিতা

১) পেট-কোমরের মেদ ঝরাতে কার্যকর

এই আসনে শরীরের পাশের পেশি (obliques) সক্রিয় হয়, যা পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত করলে কোমর সরু লাগে।

২) ক্লান্তি দূর করে শরীর ঝরঝরে করে

দিনের শেষে জমে থাকা চাপ ও স্ট্রেস দূর করতে এটি চমৎকার। মোচড় দেওয়ার ফলে মেরুদণ্ডের টান কমে, শরীর অনেকটা হালকা লাগে।

৩) সারা শরীরের স্ট্রেচিং হয়

বিশেষভাবে মেরুদণ্ড, কোমর, কাঁধ ও ঘাড়ের টান কমাতে সাহায্য করে।
ফলে রক্ত সঞ্চালনও বাড়ে।

৪) পেশির জোর বাড়ায়

শুধু পেট নয়—পিঠ, কোমর ও কোর মাংসপেশির শক্তি বাড়ে।
ফলে শরীরের ভর বহনক্ষমতাও বাড়ে।

৫) পিঠ-কোমরের ব্যথা উপশম করে

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা বা ভুল ভঙ্গিতে হাঁটার কারণে তৈরি ব্যথা কমে যায়। অনেক সময় হালকা ডিসকমফোর্টও দূর হয়।

৬) হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে

মোচড় আসনগুলি পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সক্রিয় করে, যার ফলে হজম ভালো হয়।

৭) মনঃসংযোগ বাড়ায়, মানসিক শান্তি দেয়

শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ মনকে স্থির করে, অবসাদ কমায়, কাজের উৎসাহ বাড়ায়।


কারা এই আসনটি করবেন না?

যদিও পরিবর্ত সুখাসন অত্যন্ত সহজ, তবুও কিছু পরিস্থিতিতে এটি করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—

news image
আরও খবর
  1. হাঁটুতে ব্যথা বা চোট থাকলে মাটিতে পা মুড়ে বসা চাপ বাড়াতে পারে।

  2. স্লিপ ডিস্ক বা গুরুতর মেরুদণ্ডের সমস্যা থাকলে মোচড় দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

  3. পিঠে তীব্র ব্যথা থাকলে আসনটি না করাই ভালো।

  4. সার্জারি-পরবর্তী অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করা উচিৎ নয়।

যদি এই সমস্যাগুলোর কোনওটি থাকে, তাহলে প্রথমে বিশেষজ্ঞ বা যোগগুরুর পরামর্শ নেওয়া উচিত।


নিয়মিত অভ্যাসের সময় কিছু সতর্কতা

  • মোচড় দেওয়ার সময় শরীর ঝুঁকিয়ে নয়, সোজা রেখে ঘুরবেন।

  • শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে হবে, জোর করে নিঃশ্বাস ছাড়বেন না।

  • ব্যথা অনুভব করলে আসন থামিয়ে দিন।

  • শুরুতে কম সময় ধরে করে ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।

  • ক্ষুধার্ত অবস্থায় বা ভারী খাবারের পরপরই করবেন না।


দিনের কোন সময়ে করবেন?

পরিবর্ত সুখাসন দিনের যে কোনও সময়ই করা যায়, তবে—

  • সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর

  • কাজের ফাঁকে

  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে

  • ধ্যান বা প্রাথমিক যোগাভ্যাসের অংশ হিসেবে

এই সময়গুলো সবচেয়ে উপযোগী।


কেন এই একটি আসনই দিনশেষে যথেষ্ট হতে পারে?

  • কারণ এটি শরীরের বেশ কয়েকটি অংশে একই সঙ্গে প্রভাব ফেলে।

  • ব্যায়ামের মতো ক্লান্তি দেয় না, বরং ক্লান্তি দূর করে।

  • শরীরকে পরের দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করে।

  • স্ট্রেস ও মানসিক চাপ কমায়।

  • অল্প সময়েই পাওয়া যায় দৃশ্যমান উপকার।

আসল কথা হলো—অনেকেই দিনে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করেন। ফলে কোমর, পিঠ, ঘাড়ে ব্যথা কিংবা পেটের মেদ বৃদ্ধি খুব সাধারণ সমস্যা। পরিবর্ত সুখাসন এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকার একটি সহজ পথ।


সংক্ষেপে: কেন পরিবর্ত সুখাসন করবেন?

  • সহজ

  • সময় কম লাগে

  • বসে বসেই করা যায়

  • কোনও ঝুঁকি নেই (বিশেষ সমস্যায় বাদে)

  • শরীর ও মনকে একসঙ্গে সুস্থ রাখে

নিয়মিত ১০-১৫ মিনিট এই আসন করলে ধীরে ধীরে পেট-কোমরের মেদ কমবে, শক্তি বাড়বে, মন সক্রিয় থাকবে এবং শরীর থাকবে হালকা ও প্রাণবন্ত।

Preview image