এই যোগাসনে শরীরের আটটি অঙ্গ ব্যবহার করা হয়, যা সমস্ত পেশির জোর বাড়ায়। নিয়মিত অভ্যাসে মেদ ঝরে, ক্লান্তি দূর হয় এবং শরীরের যাবতীয় ব্যথাবেদনা কমে যায়।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার: শরীরের শক্তি বাড়ানোর একটি প্রাচীন যোগাসন
বর্তমান যুগে বেশিরভাগ মানুষ শারীরিক সুস্থতার জন্য কত দ্রুত মেদ ঝরানো যায়, সে দিকে মনোযোগী। তবে শুধুমাত্র মেদ ঝরানোই নয়, শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানসিক সুস্থতার উন্নতির জন্য প্রয়োজন সঠিক ব্যায়াম। একাধিক যোগাসন রয়েছে, যা শরীরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে সহায়ক। এর মধ্যে একটি প্রাচীন যোগাসন হল "অষ্টাঙ্গ নমস্কার"। এই আসনটি সূর্য নমস্কারের একটি অংশ এবং প্রাচীন যোগজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার আসনটি শরীরের ব্যথা, মেদ এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি পেশির শক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, মনের শিথিলতা এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। যেহেতু এই আসনটি শরীরের অধিকাংশ পেশির উপর কাজ করে, এটি শরীরের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক রিস্টোরেশন থেরাপি হিসেবে কাজ করে।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার শরীরের জন্য একটি শক্তিশালী যোগাসন। এই আসনটি করতে প্রথমে একটি যোগ ম্যাটের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন এবং নিম্নলিখিত স্টেপগুলি অনুসরণ করুন:
১) প্রথম ধাপ: ম্যাটের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে যান। দু'টি কনুইয়ের উপরে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে শরীর তুলুন। পায়ের ভর থাকবে বুড়ো আঙুলের উপরে এবং শরীরটিকে টানটান রাখুন। দুই কনুই শরীরের পাশে ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকবে, এবং হাতের তালুগুলি মেঝে স্পর্শ করবে।
২) দ্বিতীয় ধাপ: এই ভঙ্গিতে শরীরটা অনেকটা প্ল্যাঙ্ক আসনের মতো দেখাবে। এর পর ধীরে ধীরে হাঁটু, বুক এবং থুতনি মেঝের দিকে নামান।
৩) তৃতীয় ধাপ: শরীরের আটটি অংশ—দুই পা, দুই হাঁটু, দুই হাত, বুক এবং থুতনি মাটি স্পর্শ করে থাকবে। এই অবস্থানে শরীরের পুরো অংশই মাটিতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
৪) চতুর্থ ধাপ: এই ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন এবং ৩০ সেকেন্ডের মতো ওই অবস্থানে থাকার চেষ্টা করুন। এরপর আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন। প্রতিদিন এই আসনটি ৫ থেকে ১০ মিনিট পর্যন্ত করতে পারেন, তবে যদি শারীরিক শক্তি বা অভ্যাস না থাকে, তবে প্রথমে কম সময় ধরে করুন এবং পরে সময় বাড়ান।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার একাধিক শারীরিক এবং মানসিক উপকারিতার সাথে আসে। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য উপকারিতা হলো:
পেশির শক্তি বৃদ্ধি: এই আসনটি শরীরের প্রায় সমস্ত পেশির ওপর কাজ করে, ফলে পেশির শক্তি বৃদ্ধি পায়। পেট, পিঠ, হাত, পা, ঘাড়—সবকটি পেশির শক্তি বাড়ানোর জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরী আসন।
ব্যথা ও অস্বস্তি কমানো: অনেক সময় আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দেয়। অষ্টাঙ্গ নমস্কার এই ধরনের ব্যথা যেমন বাতের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।
ওজন কমানো: এই যোগাসনটি পেটের মেদ কমাতে সহায়ক। যখন শরীরের সমস্ত পেশি কাজ করে, তখন তা ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে, ফলে ওজন কমে এবং শরীর টানটান থাকে।
মানসিক শান্তি: এই আসনটি কেবল শারীরিক উপকারিতাই দেয় না, বরং এটি মানসিক শান্তি এবং মনঃসংযোগ বৃদ্ধিতেও সহায়ক। শরীরের প্রতিটি পেশি শিথিল হওয়ার সাথে সাথে মনও শান্ত হয়ে যায় এবং উদ্বেগ কমে যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: নিয়মিত অষ্টাঙ্গ নমস্কার করার ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির কর্মক্ষমতা উন্নত করে এবং শরীরের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও ঝিমুনি দূরীকরণ: যারা সারাদিন অফিস বা অন্য কোনও কাজের জন্য শরীরিক বা মানসিকভাবে ক্লান্ত অনুভব করেন, তারা এই আসনটি করলে অতিরিক্ত ক্লান্তি দূর করতে পারেন এবং শরীর ও মন নতুন উদ্যমে কাজ করতে সক্ষম হয়।
শরীরের ভারসাম্য উন্নতি: এই আসনটি শরীরের ভারসাম্য এবং স্থিরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। এটি শরীরের ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং আপনাকে আরো স্থিতিশীল এবং দৃঢ় রাখে।
যদিও অষ্টাঙ্গ নমস্কার সকলের জন্য উপকারী, তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এই আসনটি করা উচিত নয়:
নতুন যোগাসন শুরু করছেন: যারা যোগাসন নতুন শুরু করছেন, তাদের অবশ্যই একটি প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে আসনটি করতে হবে। ভুলভাবে আসন করলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা: অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এই আসনটি করা উচিত নয়, কারণ এতে শরীরে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে এবং গর্ভধারণের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ এবং মাইগ্রেন: যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, তাদের এই আসনটি করা উচিত নয়। এই আসনটি শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বাস্থ্যকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
হাঁটু বা মেরুদণ্ডে আঘাত: যারা হাঁটু বা মেরুদণ্ডের সমস্যা বা আগে থেকে কোনও আঘাত পেয়েছেন, তাদের এই যোগাসনটি না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে শরীরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা আঘাতের উন্নতি প্রক্রিয়াকে বাধা দিতে পারে।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার একটি শক্তিশালী এবং গভীরভাবে প্রভাবিত যোগাসন, যা শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য উভয়ের উন্নতি করতে সক্ষম। এটি একটি প্রাচীন যোগ পদ্ধতি, যা শরীরের সকল গুরুত্বপূর্ণ পেশির উপর কাজ করে, শক্তি বৃদ্ধি, ব্যথা কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ হ্রাসে সহায়ক। এই আসনটি মূলত সূর্য নমস্কারের অংশ, এবং এটি পেশি ও জয়েন্টগুলির জন্য অত্যন্ত উপকারী। যেহেতু এটি একাধিক পেশির উপর একযোগভাবে কাজ করে, এটি শরীরকে শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল করে তোলে, পাশাপাশি মনও শান্ত রাখতে সহায়ক।
এটি একটি সম্পূর্ণ শরীরের আসন, যা শুধুমাত্র পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন ব্যক্তি অষ্টাঙ্গ নমস্কার নিয়মিতভাবে করে, তখন তার মেটাবলিজম দ্রুত হয়, শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। যেহেতু এটি একটি হালকা-থেকে-মাঝারি তীব্রতার আসন, এটি শরীরের উপর প্রাকৃতিকভাবে চাপ তৈরি করে, যা শরীরের সমস্ত পেশির উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে।
অষ্টাঙ্গ নমস্কার শরীরের আঙ্গিকের পেশির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং যাদের বাত, পিঠের ব্যথা, বা অন্য কোনো শারীরিক অস্বস্তি রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরী আসন হতে পারে। এই আসনটি পেশির ভারসাম্য বাড়ায় এবং শরীরের উপরের এবং নিচের অংশের মধ্যে শক্তি সৃষ্টি করে। পেটের মেদ কমাতে এবং শরীরের অন্যান্য অংশের স্থিতিশীলতা বাড়াতে এটি সাহায্য করে। তাছাড়া, যারা মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্যও এটি খুব উপকারী, কারণ এটি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে এবং উদ্বেগ কমাতে সহায়ক।
অষ্টাঙ্গ নমস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল যে এটি শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে এবং একটি স্থিতিশীল মনোভাব সৃষ্টি করতে সহায়ক। এটি শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং মানসিক প্রশান্তি আনতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং শরীরের ব্যথাবেদনা দূর করার জন্য এটি একটি আদর্শ যোগাসন। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে, একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন জীবনে আরও বেশি শক্তি এবং সুস্থতা অনুভব করবে।
তবে, এই আসনটি করার সময় শরীরের সীমাবদ্ধতাগুলি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি যোগাসন করতে নতুন হন, তবে আপনাকে অবশ্যই একটি প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিতে হবে, বিশেষত যদি আপনার শারীরিক অবস্থা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ, মাইগ্রেন, হাঁটু বা মেরুদণ্ডে সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই আসনটি না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যদি আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ এবং দৃঢ় হন, তবে অষ্টাঙ্গ নমস্কার শুরুর জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি হতে পারে।
অষ্টাঙ্গ নমস্কারের মাধ্যমে, শরীর এবং মন উভয়েরই সমন্বয় সাধিত হয়। এটি একদিকে শরীরের শক্তি এবং শারীরিক ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি, অন্যদিকে মানসিক সুস্থতা এবং শান্তি প্রদান করে। যেহেতু এটি শারীরিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক, এটি একটি সঠিকভাবে প্রাকৃতিক জীবনধারা গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
সুতরাং, যদি আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ এবং শান্ত থাকতে চান, তবে অষ্টাঙ্গ নমস্কার একটি আদর্শ যোগাসন হতে পারে। নিয়মিত চর্চা করলে শরীর এবং মন উভয়েরই উন্নতি ঘটবে, এবং আপনিও একটি সুস্থ, শক্তিশালী এবং শান্ত জীবন উপভোগ করবেন।