প্রসারিত পদোত্তোনাসন এমন একটি সহজ ও কার্যকর যোগাসন, যা নিয়মিত অভ্যাস করলে পেটের মেদ ধীরে ধীরে কমতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এই আসনে পা, উরু ও হাঁটুর পেশিতে ভালো স্ট্রেচিং হয়, রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং শরীরের নীচের অংশ আরও শক্তিশালী হয়। সকালে খালি পেটে এই যোগাসন করলে শরীর থাকে হালকা ও সতেজ।
ওজন কমবে, সঙ্গে হাঁটুর ব্যথাও ধীরে ধীরে সেরে যাবে এমনটা যদি কেউ বলেন, অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে চান না। কারণ বর্তমান জীবনে ওজন কমানো মানেই ডায়েট চার্ট, জিম, কঠোর ব্যায়াম আর দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা। তার উপর হাঁটুর ব্যথা থাকলে ব্যায়াম করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক যোগাসনের অভ্যাস থাকলে ওজন কমানো এবং হাঁটুর যন্ত্রণা কমানো দু’টিই সম্ভব, তাও ওষুধ ছাড়াই।
আজকের দিনে স্থূলত্ব একটি বড় সমস্যা। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভাজাভুজি ও ফাস্ট ফুডের প্রতি ঝোঁক, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা এবং শরীরচর্চার অভাব এই সব মিলিয়েই বাড়ছে ওজন। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, অতিরিক্ত ওজন শরীরের ভেতরেও ডেকে আনছে একাধিক জটিলতা। বিশেষ করে হাঁটু, গোড়ালি ও কোমরের মতো জয়েন্টে চাপ পড়ছে সবচেয়ে বেশি। ফলে অল্প বয়সেই হাঁটুর ব্যথা, গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা কিংবা আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই।
চিকিৎসকেরা বারবার সতর্ক করছেন কম বয়সে আর্থ্রাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ স্থূলত্ব। ওজন যত বাড়বে, শরীরের ভার বহন করতে গিয়ে হাঁটুর উপর চাপ তত বাড়বে। আর সেই চাপ দীর্ঘদিন ধরে চললে হাঁটুর কার্টিলেজ ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। শুরুতে হালকা ব্যথা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা মারাত্মক আকার নেয়।
কিন্তু সমস্যা হল, ওজন কমানো সহজ নয়। ডায়েট মানেই অনেকের কাছে খাবার ছেড়ে দেওয়ার নাম। আবার জিমে গিয়ে ভারী ব্যায়াম করার ক্ষমতা সবার থাকে না, বিশেষ করে যাঁদের হাঁটুতে ব্যথা রয়েছে। ফলে ওজন কমানোর চেষ্টা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক সময় ওজন কিছুটা কমলেও, পেটের মেদ বা ভুঁড়ি একেবারেই কমতে চায় না। এই ভুঁড়িই আবার শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করে হাঁটুর উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতিতে যোগাসন হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান। যোগাসন শুধু ওজন কমায় না, শরীরের ভেতরের পেশি ও জয়েন্টকে ধীরে ধীরে মজবুত করে তোলে। নিয়মিত যোগাসনের অভ্যাস থাকলে শরীরের নমনীয়তা বাড়ে, রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় এবং মানসিক চাপও অনেকটাই কমে।
এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাসন হল প্রসারিত পদোত্তোনাসন। এই যোগাসনটি এমনভাবে কাজ করে যে এক দিকে যেমন পেটের মেদ কমাতে সাহায্য করে, তেমনই অন্য দিকে পায়ের পেশি ও হাঁটুর চারপাশের অংশকে স্ট্রেচ করে শক্তিশালী করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আসন নিয়মিত করলে হাঁটুর ব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে, বিশেষ করে যদি সেই ব্যথার কারণ অতিরিক্ত ওজন হয়ে থাকে।
প্রসারিত পদোত্তোনাসন মূলত দাঁড়িয়ে করা একটি ফরোয়ার্ড বেন্ড যোগাসন। এই আসনে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝুঁকে আসে এবং মাথা মাটির কাছাকাছি পৌঁছয়। ফলে শরীরের নীচের অংশ, বিশেষ করে ঊরু, নিতম্ব, কাফ মাসল ও হাঁটুর চারপাশে গভীর স্ট্রেচ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পেটের উপর চাপ পড়ায় পেটের জমে থাকা মেদ ভাঙতে সাহায্য করে এই আসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা নিতম্বের মেদ নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন বা যাঁদের পায়ের পেশি শক্ত হয়ে রয়েছে, তাঁদের জন্য এই যোগাসন অত্যন্ত উপকারী। দীর্ঘদিন বসে কাজ করার ফলে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। প্রসারিত পদোত্তোনাসন সেই শক্ত পেশিকে ধীরে ধীরে শিথিল করে, রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং পেশির নমনীয়তা ফেরাতে সাহায্য করে।
কী ভাবে করবেন প্রসারিত পদোত্তোনাসন?
এই আসন করার আগে মনে রাখতে হবে, শরীর যেন খুব বেশি ক্লান্ত না থাকে। সকালে খালি পেটে বা বিকেলে হালকা খাবার খাওয়ার অন্তত চার ঘণ্টা পরে এই যোগাসন করা সবচেয়ে ভালো।
প্রথমে একটি যোগা ম্যাটের উপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। পিঠ থাকবে একদম টানটান, ঘাড় সোজা। শরীরের ভার দুই পায়ের উপর সমানভাবে রাখতে হবে।
এর পর দুই পায়ের মধ্যে বেশ খানিকটা দূরত্ব তৈরি করুন। পা দু’টি যেন সমান্তরাল থাকে। এই অবস্থায় দুই হাত নিয়ে যান কোমরের পিছনে। বুক সামান্য প্রসারিত রাখুন এবং চোখ থাকবে সামনে।
এ বার ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কোমর থেকে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝোঁকান। মাথা, ঘাড় ও পিঠ এক সরল রেখায় রাখার চেষ্টা করুন। প্রথম দিকে খুব নিচুতে যেতে না পারলেও সমস্যা নেই।
শরীর যতটা নিচে নামাতে পারবেন, ততটাই নামান। এর পর দুই হাতের তালু মাটিতে স্পর্শ করান। যদি প্রথম দিকে মাটিতে হাত না পৌঁছয়, তাহলে পায়ের গোড়ালির কাছে বা ব্লকের উপর হাত রাখতে পারেন।
এই অবস্থায় পিঠ যতটা সম্ভব উপরের দিকে তুলুন। হাঁটু একেবারেই ভাঙবেন না। পায়ের পেশিতে টান অনুভূত হবে এটাই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে অভ্যাস হলে এই টান আর কষ্টকর লাগবে না।
এর পর মাথা ধীরে ধীরে মাটিতে ঠেকানোর চেষ্টা করুন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন। এই ভঙ্গিতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড থাকার চেষ্টা করুন। অভ্যাস বাড়লে সময় ১ মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
আসন থেকে বেরোনোর সময় খুব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘুরতে পারে।
এই যোগাসনের উপকারিতা কী কী?
প্রসারিত পদোত্তোনাসনের সবচেয়ে বড় উপকার হল পেটের মেদ কমানো। নিয়মিত অভ্যাসে ভুঁড়ি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। পেটের পেশি সক্রিয় হওয়ায় বিপাকক্রিয়াও উন্নত হয়।
ঊরু, নিতম্ব ও কাফ মাসলের গভীর স্ট্রেচিং হয়। এর ফলে পায়ের পেশি শক্তিশালী ও নমনীয় হয়, হাঁটুর উপর চাপ কমে।
হাঁটুর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে এই আসন, বিশেষ করে যদি ব্যথার কারণ হয় অতিরিক্ত ওজন বা পেশির শক্তভাব।
কাঁধ ও পিঠের পেশি মজবুত হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার ফলে যে পিঠের ব্যথা হয়, তা কমাতে এই আসন কার্যকর।
সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। বিশেষ করে মাথা ও মুখে রক্ত প্রবাহ বাড়ে, ফলে ক্লান্তি কমে।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এই যোগাসন। মাথা নিচের দিকে থাকায় স্নায়ু শান্ত হয় এবং মনও অনেকটা স্থির থাকে।
যোগাসন যতই উপকারী হোক না কেন, সব আসন সবার জন্য উপযোগী নয়। প্রতিটি যোগাসনেরই কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ থাকে, যা অমান্য করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রসারিত পদোত্তোনাসনও তার ব্যতিক্রম নয়। এই আসনটি মূলত দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকে করা হয়, ফলে মেরুদণ্ড, কোমর, হাঁটু ও মাথার উপর একটি নির্দিষ্ট চাপ পড়ে। তাই কিছু শারীরিক অবস্থায় এই যোগাসন এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
যাঁদের মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাঁদের জন্য এই যোগাসন একেবারেই উপযুক্ত নয়। অস্ত্রোপচারের পরে মেরুদণ্ড দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকে এবং অতিরিক্ত বাঁকানো বা টান দিলে তা আবার আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। প্রসারিত পদোত্তোনাসনে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝুঁকে আসে, যা মেরুদণ্ডে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে অস্ত্রোপচারের জায়গায় ব্যথা বাড়তে পারে কিংবা জটিলতা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া এই আসন কখনওই করা উচিত নয়।
একই ভাবে যাঁদের স্লিপ ডিস্ক বা গুরুতর কোমরের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই যোগাসন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্লিপ ডিস্কের সমস্যায় মেরুদণ্ডের একটি অংশ স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে যায়, ফলে সামান্য ভুল ভঙ্গিতেই তীব্র ব্যথা হতে পারে। প্রসারিত পদোত্তোনাসনে কোমর থেকে শরীর সামনের দিকে ঝোঁকাতে হয়, যা ডিস্কের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ব্যথা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্নায়ু চাপে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এই ধরনের সমস্যায় ভুগলে বিকল্প যোগাসনের দিকে ঝোঁক দেওয়াই ভালো।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় শরীরের ভারসাম্য স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বদলে যায়। এই সময়ে সামনের দিকে গভীরভাবে ঝুঁকে পড়া শরীরের জন্য নিরাপদ নয়। এতে তলপেটের উপর চাপ পড়তে পারে, যা মা ও গর্ভস্থ সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রসারিত পদোত্তোনাসন অভ্যাস করতে চাইলে অবশ্যই প্রশিক্ষিত যোগশিক্ষক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যাঁদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তাঁদেরও এই আসন করার আগে সাবধান হওয়া প্রয়োজন। এই যোগাসনে মাথা দীর্ঘ সময় নিচের দিকে থাকে, ফলে হঠাৎ করে মাথায় রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, অস্বস্তি বা চোখে ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের রক্তচাপ খুব বেশি ওঠানামা করে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই আসন না করাই ভালো।
একই ভাবে যাঁদের চোখের সমস্যা, যেমন গ্লুকোমা, রেটিনার সমস্যা বা চোখের অস্ত্রোপচারের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় থাকলে চোখের ভিতরের চাপ বেড়ে যেতে পারে, যা চোখের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় এতে চোখে ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দেয়। তাই এই ধরনের সমস্যায় ভুগলে চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া প্রসারিত পদোত্তোনাসন করা উচিত নয়।
এ ছাড়াও যাঁদের হাঁটুতে গুরুতর আঘাত, লিগামেন্ট ইনজুরি বা সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই আসন সমস্যার কারণ হতে পারে। কারণ এই আসনে হাঁটু ভাঁজ না করে সোজা রাখতে হয়, ফলে হাঁটুর উপর চাপ পড়ে। হাঁটু দুর্বল থাকলে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যোগাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের শরীরকে বোঝা। কোনও আসন করতে গিয়ে যদি তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, বুকে চাপ বা শ্বাসকষ্ট অনুভব হয়, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে আসন বন্ধ করা উচিত। জোর করে কোনও আসন করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রসারিত পদোত্তোনাসন এমন একটি যোগাসন, যা নিয়মিত ও সঠিক ভাবে অভ্যাস করলে ওজন কমানো এবং হাঁটুর ব্যথা কমানো দু’টিতেই সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পেটের মেদ, নিতম্বের অতিরিক্ত চর্বি কিংবা পায়ের পেশির শক্তভাব নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এই আসন অত্যন্ত উপকারী।
তবে মনে রাখতে হবে, যোগাসন কোনও ম্যাজিক নয়। এর সুফল পেতে হলে ধৈর্য ও নিয়মিত অভ্যাস প্রয়োজন। হঠাৎ করে ফল পাওয়ার আশা করলে হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। পাশাপাশি নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা বুঝে নেওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি। যে যোগাসন একজনের জন্য উপকারী, তা অন্য জনের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।
ওষুধের উপর নির্ভর না করে, শরীরকে নিজের শক্তিতেই সুস্থ করে তোলার জন্য যোগাসন নিঃসন্দেহে একটি নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পথ। তবে সেই পথ বেছে নেওয়ার আগে সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।