দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের ফাইনালে ওঠার পথ আরও কঠিন হয়েছে। বাকি ১০টি ম্যাচে কীভাবে ভারত সম্ভাবনা ধরে রাখতে পারে, সেই জটিল সমীকরণ নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম টেস্টেই ভারতের বড় ধরনের পরাজয় যেন এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সমগ্র চিত্র। রোহিত শর্মার দলের কাছে এ পরাজয় শুধুমাত্র আরেকটি ম্যাচ হার নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা, যা তাদের জানিয়ে দিল যে, ফাইনালের পথে যাত্রা মোটেই সহজ হবে না। গত টুর্নামেন্টে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছেও ব্যর্থতা ঘোচাতে পারেনি ভারত। এবার নতুন চক্রে সেই পুরনো ভুল শুধরে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই শুরু করেছিল তারা। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার তাদের অবস্থানকে নাড়িয়ে দিলেও সুযোগ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। বরং সামনে থাকা দশটি ম্যাচই এখন ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি।
ভারতীয় দল যতটা প্রতিভাবান, ততটাই কখনও কখনও অনিয়মিত। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে, দ্রুত বাউন্স এবং সীম মুভমেন্টের বিরুদ্ধে ব্যাটিং লাইনআপের ভঙ্গুরতা দলকে বারবার সমস্যায় ফেলছে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নিয়ম এমন যে, একটি বা দুটি ম্যাচ হারলেও পুরো ক্যাম্পেইন ধ্বংস হয়ে যায় না। বরং ধারাবাহিকতার ওপর ভর করে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ভালো খেলা গেলে যে কোনও দলই চাপ কাটিয়ে উঠে আবারও ফাইনালের দৌড়ে ফিরে আসতে পারে। ভারতও সেই অবস্থাতেই রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন আত্মবিশ্বাস বজায় রাখার ওপর। দলের ভেতরে আলোচনা হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের মানসিক দৃঢ়তা এবং বোলারদের ধৈর্য ধরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে।
WTC পয়েন্ট পদ্ধতিতে প্রতিটি সিরিজের সমান মূল্য থাকায় বাকি ম্যাচগুলোতে জেতার সুযোগ ভারতের জন্য অনেকটাই খোলা। এখনও একাধিক হোম সিরিজ বাকি রয়েছে যেখানে স্বাভাবিকভাবেই ভারত নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে পারে। ভারতীয় মাটিতে স্পিন-বান্ধব উইকেট এবং নিজেদের পরিচিত পরিবেশ সবসময়ই ভারতের বড় সুবিধা। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আগামী মাসগুলোতে স্থির খেলে, তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হার ফাইনালে ওঠার পথে চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং এই হারই হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোয় আরও মনোযোগ এনে দিতে পারে।
তবে শুধু হোম সিরিজ নয়, বিদেশের মাটিতে থাকা বাকি কয়েকটি ম্যাচও ভারতের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। কারণ বিদেশে প্রতিটি জয় মূল্যবান, প্রতিটি ড্র একটি বড় সাফল্য এবং প্রতিটি পরাজয় বড় ধরনের ক্ষতি করে WTC পয়েন্ট টেবিলে। টিম ইন্ডিয়া জানে তারা ভুল করার সুযোগ আর নেই। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, রবীন্দ্র জাদেজা, রাহুল, শামি—এই সকল অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা বুঝছেন যে, এই টুর্নামেন্টে ফাইনালে পৌঁছতে হলে প্রত্যেক সিরিজেই সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখাতে হবে।
WTC এর নিয়ম অনুযায়ী, পয়েন্ট টেবিলে প্রতিটি দলের শতাংশ হিসেব করা হয়। অর্থাৎ শুধু মোট পয়েন্ট নয়, বরং দখল করা পয়েন্টের হারই দলের অবস্থান নির্ধারণ করে। এই বাস্তবতাই ভারতকে এখনও ফাইনালের আশায় বাঁচিয়ে রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হারের ফলে ভারতের শতাংশ অবশ্যই কমে গেছে, কিন্তু এখনও এমন অবস্থায় আছে যে পরবর্তী সিরিজে ধারাবাহিক জয় দলকে সরাসরি শীর্ষ দুইয়ের দৌড়ে ফিরিয়ে দিতে পারে। সমীকরণ জটিল হলেও অসম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড দুই দলই এখনও অস্থির ফর্মের মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা—এই দলগুলোরও উত্থান-পতন চলছেই। তাই ভারত যদি নিজেদের ভুল কমিয়ে বাকি ম্যাচগুলোয় সর্বোচ্চ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, তবে ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।
ভারতীয় দলের ব্যাটিং লাইনআপের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কোচিং স্টাফ এবং নির্বাচকরা আত্মবিশ্বাসী যে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা পরিস্থিতি সামলে নিতে সক্ষম। বিরাট কোহলি দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের বিরুদ্ধে অটল থেকে লড়াই করার যে মানসিক শক্তি দেখিয়েছেন, তা দলকে প্রেরণা দেবে। রোহিতের ব্যাট থেকেও বড় ইনিংস যে কোনও সময় বেরিয়ে আসতে পারে। তরুণ ব্যাটার শুভমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল বা শ্রেয়স আইয়াররাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আরও দায়িত্ব নিয়ে খেলতে চাইবেন। বোলিং বিভাগেও ভারতের আশার আলো রয়েছে। জসপ্রীত বুমরাহর ধারাবাহিক স্পেল, শামির অভিজ্ঞতা, সিরাজের গতি এবং জাদেজা-অশ্বিনের স্পিন যুগল—সব কিছুই ভারতের শক্তি। শুধু সঠিক পরিকল্পনায় এগোতে পারলেই সাফল্য ধরা দেবে।
টিম ম্যানেজমেন্টের মূল ফোকাস এখন মনোবল ধরে রাখা। দক্ষিণ আফ্রিকায় পরাজয়ের পর dressing room–এ নাকি কঠোর আলোচনা হয়েছে। কোচ দ্রাবিড় নাকি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ধরনের উইকেটে ব্যাটসম্যানদের আরও ধৈর্য, আরও পরিণত সিদ্ধান্ত এবং আরও দৃঢ় ফুটওয়ার্ক প্রয়োজন। যাতে কঠিন পরিস্থিতিতেও দল সহজে ভেঙে না পড়ে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের ব্যাটসম্যানদের টেকনিক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে প্রতিটি খেলোয়াড়কে নিজের শক্তি এবং দুর্বলতার ওপর আরও মনোযোগ দিতে হবে।
WTC ফাইনালের লড়াই সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদি। একটি খারাপ সিরিজ বা একটি ম্যাচ দিয়ে সারা টুর্নামেন্ট বিচার করা যায় না। এই কারণেই সমস্ত দলই প্রতিটি সিরিজে পরিকল্পনা সাজিয়ে খেলে থাকে। ভারতের সামনে থাকা দশটি ম্যাচ শুধু সংখ্যা নয়, বরং এসব ম্যাচই দলকে আবারও ফেরাতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত ফাইনালে। বিশেষ করে হোম সিরিজ, যেখানে ভারত অপরাজেয় দলগুলোর অন্যতম। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলরাই ভারতের মাটিতে একাধিকবার চাপে পড়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভারতীয় দলের চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বহুবার দেখা গেছে, ভারত যখন কোনো বড় টুর্নামেন্টে শুরুতেই চাপের মুখে পড়ে, তখনই তারা নিজেদের সেরাটা দিতে শুরু করে। ঠিক তেমনই মনোভাব যদি WTC এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তবে সামনে থাকা প্রতিটি ম্যাচই ভারতের পক্ষে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ভারতের ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত রেকর্ড, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হাল ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। দলের প্রতিটি সদস্য জানে যে ভারতের কোটি কোটি সমর্থকের প্রত্যাশা তাদের ওপর, এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্যই তারা নিজেদের সেরাটা দিতে চাইবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরাজয় যতটা কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, ততটাই নতুন সুযোগও তৈরি করেছে সামনে এগোনোর। কারণ কঠিন সময়ই আসলে দলকে আরও শক্তিশালী করে। ভারতের সামনে থাকা পথ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এখন দরকার স্থিরতা, দৃঢ়তা এবং প্রতিটি ম্যাচে জয়ের লক্ষ্য। এই মনোভাব বজায় রাখতে পারলে ভারত আবারও ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের নাম উজ্জ্বলভাবে রাখতেই পারে। শেষ পর্যন্ত টিম ইন্ডিয়া এমন এক দল, যারা বারবার প্রমাণ করেছে যে চাপের মুহূর্তেই তারা সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম টেস্টে ভারতের পরাজয় অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। ম্যাচ শুরুর আগে রোহিত শর্মার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলকে ফেভারিট বলা হলেও বাউন্সি উইকেটে ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে পুরো ম্যাচের ছবিটাই বদলে যায়। প্রথম ইনিংসে ভারত অল্প রানে অলআউট হয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাটারদের অনিয়মিত পারফরম্যান্স দলের ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে জয় পাওয়া যে কোনও সময়ই কঠিন, কিন্তু ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম ম্যাচেই পরাজয় ভারতের ভবিষ্যৎ সমীকরণ জটিল করে দিয়েছে।
তবে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের সামনে এখনও সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। WTC পয়েন্ট সিস্টেম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে একটি ম্যাচ হারলেও পুরো চক্রের ফল নির্ধারিত হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও ভারতের সামনে আরও দশটি ম্যাচ রয়েছে, যার প্রতিটিই সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এই ম্যাচগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই হোম সিরিজ, যেখানে ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত। ঘরের মাটিতে স্পিন-বান্ধব পিচ, পরিচিত পরিবেশ, দর্শকদের সমর্থন—সবই ভারতের পক্ষে যায়। তাই বিশেষজ্ঞদের আশা, ভারত হোম সিরিজে ভালো খেলতে পারলে সহজেই পয়েন্ট শতাংশ বাড়িয়ে পুনরায় শীর্ষের দৌড়ে ফিরে আসতে পারবে।
ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে। বিরাট কোহলি ছাড়া কেউই দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংয়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় ইনিংস খেলতে পারেনি। রোহিত শর্মা এখনও সেই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি যা বড় ম্যাচে তাকে তুলে ধরতে পারত। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দলে কোনও আতঙ্ক নেই, কারণ এখনও প্রচুর ম্যাচ বাকি। শুভমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল, শ্রেয়স আইয়ারদের মতো তরুণ ব্যাটসম্যানদের ওপরও আস্থা রাখছে ভারত। কোচ রাহুল দ্রাবিড় বলেছেন, ব্যাটসম্যানদের টেকনিক ঠিকঠাক থাকলে যে কোনও চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করা সম্ভব।
বোলিং বিভাগ নিয়ে ভারতের বিশেষ উদ্বেগ নেই। জসপ্রীত বুমরাহ এবং মোহাম্মদ শামির মতো অভিজ্ঞ বোলাররা যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় ঘোরাতে সক্ষম। বিদেশের মাটিতে পেস বোলারদের প্রভাব বেশি থাকলেও ভারতীয় স্পিনার জাদেজা এবং অশ্বিন নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত WTC ফাইনালে পৌঁছতে হলে ভারতকে প্রতিটি সিরিজে সেরাটা দিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হারের পর চাপ অবশ্যই বেড়েছে, কিন্তু ক্রিকেট অঙ্ক দেখাচ্ছে—বাকি ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ফাইনালের স্বপ্ন মোটেও দূরের নয়। ভারতীয় দলের অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য, এবং শক্তি বিবেচনা করলে আশা করা যায় যে রোহিত শর্মার দল লড়াই করে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিস্থিতি পাল্টাতে সক্ষম হবে।