"কোভিড পরবর্তী সময়ে হার্টের অসুখ বাড়ছে, এবং সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেড়েছে। তাই আপনার হার্টের স্বাস্থ্য কেমন, তা জানার জন্য এই পরীক্ষা করুন এবং নিজের সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিত করুন।"
আজকের যুগে হৃদ্রোগ একটি অন্যতম স্বাস্থ্যের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে হার্টের অসুখ দ্রুত বাড়ছে, বিশেষত হার্ট অ্যাটাক, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্র্যাকশন’ নামে পরিচিত। এটি মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি সময়মতো হার্টের সমস্যার লক্ষণগুলো বুঝতে না পারে বা চিকিৎসা শুরু না হয়, তবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। অনেক ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সময় সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া গেলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
হার্টের অবস্থা বুঝতে সাধারণত চিকিৎসকেরা ইসিজি, ইকোকার্ডিয়োগ্রামসহ নানা পরীক্ষা করতে বলেন। তবে, এই সব পরীক্ষা করার জন্য ক্লিনিক বা হাসপাতালে যেতে হয়, যা কখনও কখনও অস্বস্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু যদি আপনি নিজেই জানতে চান, আপনার হার্টের স্বাস্থ্য কেমন, তবে কিছু সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে আপনি বাড়িতেই তার অবস্থা নির্ণয় করতে পারেন। এসব পরীক্ষা সাধারণত দ্রুত, সহজ এবং যেকেউ করতে পারেন। আজকাল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা কিছু পরীক্ষার পদ্ধতি শিখিয়েছেন, যা বাড়িতে সহজেই করা সম্ভব।
হার্টের সুস্থতা পরীক্ষার একটি সহজ উপায় হল সিঁড়ি পরীক্ষা বা ‘স্টেয়ার ক্লাইম্ব টেস্ট’। এটি একটি খুব সহজ পরীক্ষা, যেখানে আপনাকে মোট ৪০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে সিঁড়ির ৪টি ধাপ ভাঙতে হবে। তবে এই পরীক্ষায় যা করতে হবে তা হলো ৬০টি সিঁড়ি ভাঙা। গবেষণা অনুসারে, যদি আপনি এটি ৪০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে করতে সক্ষম হন, তাহলে বুঝে নেবেন আপনার হার্টের কোনও সমস্যা নেই।
প্রতিটি পরীক্ষার পর আপনাকে অবশ্যই কিছু পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ৪০ সেকেন্ডে সিঁড়ির ধাপগুলি ভাঙতে পারলে আপনার হৃদপিণ্ডে কোন অস্বাভাবিকতা নেই। তবে, সিঁড়ি ভাঙার পরে যদি বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, বুকে ভারী পাথরের মতো অনুভূতি হয়, তাহলে তা হতে পারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির লক্ষণ। ৬০টি সিঁড়ি ভাঙতে যদি ১ মিনিটের বেশি সময় লাগে, তখন এই পরীক্ষা হার্টের অসুস্থতার পূর্বসুরী হতে পারে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আরেকটি সহজ পরীক্ষা হলো ‘সিট টু স্ট্যান্ড টেস্ট’। এটি হার্টের সুস্থতা পরীক্ষার জন্য অনেক চিকিৎসকের প্রস্তাবিত। এই পরীক্ষা করতে হলে আপনাকে একটি চেয়ার থেকে উঠতে বসতে হবে। পরীক্ষাটি ৪০ সেকেন্ড ধরে করতে হবে। আপনি যদি চেয়ার থেকে উঠতে বা বসতে গিয়ে অস্বস্তি বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন, তখন এটি হতে পারে হৃদরোগের লক্ষণ।
এটি করার সময় হাত দু’টি বুকের উপর রেখে, চেয়ারে বসতে হবে এবং চেয়ারের হাতল ধরতে পারবেন না। যদি পরীক্ষা করতে গিয়ে হাঁপিয়ে যান বা বুক ধড়ফড় করতে থাকে, তাহলে এটি হার্টের দুর্বলতার লক্ষণ হতে পারে। ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কমপক্ষে ১৫ বার এটি করা উচিত।
হার্ট অ্যাটাক সাধারণত ধীরে ধীরে আসে, তাই কিছু লক্ষণ অল্প সময়ে ধরা পড়লে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, সিঁড়ি উঠতে বা বসতে গিয়ে হাঁপিয়ে যাওয়া এগুলো সাধারণত হার্টের অসুস্থতার লক্ষণ। বিশেষ করে তরুণ বয়সে হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা অনেক বেড়ে গেছে। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যেও হার্টের সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সমস্যা জিনগত বা জন্মগত হতে পারে, তবে স্ট্রেস, জীবনযাত্রার অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার অভাবও এর জন্য দায়ী।
এই পরীক্ষাগুলি বাড়িতে করে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, আপনার হার্টের স্বাস্থ্য কেমন। তবে যদি কোনো একটির পরও আপনাকে কিছু অস্বস্তি বা শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়, তাহলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। তবেই আপনি সুস্থ থাকতে পারবেন।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয়, তবে কিছু লক্ষণ আগেই ধরা পড়লে আপনার হার্টের স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। হার্টের সমস্যাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই শরীরে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, যা প্রথমে তেমন তীব্র লক্ষণ তৈরি করে না। তাই লক্ষণগুলির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, সিঁড়ি ওঠা বা বসা সময় হাঁপিয়ে যাওয়া, বা একটানা কাজ করার পর অস্বস্তি—এই সমস্তই সাধারণভাবে হার্টের অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি যেভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়, তেমন কিছু রোগীরা প্রথমে বুঝতে পারেন না। একসময় হঠাৎ করেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্র্যাকশন বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ শুরু হওয়ার আগে আপনার শরীরে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। মেঘলা বা অস্বস্তিকর বুকে চাপ বা বুক ধড়ফড়, হালকা শ্বাসকষ্ট, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এগুলোকে মোটেই অবহেলা করা উচিত নয়।
এগুলি যেন একধরনের সতর্কবার্তা। বিশেষ করে তরুণ বয়সে হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও হার্টের সমস্যাগুলি বেড়েছে, যা বেশ উদ্বেগজনক। এর মধ্যে কিছু সমস্যা জিনগত বা জন্মগত হতে পারে, তবে এটি একমাত্র কারণ নয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ (স্ট্রেস), জীবনযাত্রার অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এবং শরীরচর্চার অভাবও হার্টের সমস্যাগুলির মূল কারণ হতে পারে।
আজকাল, একেবারে তরুণ বয়সী মানুষদেরও হৃদরোগের সমস্যাগুলি দেখা যাচ্ছে, যাদের শারীরিক অবস্থা বা জীবনযাত্রার জন্য প্রচুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেকেই সকাল-সন্ধ্যা দীর্ঘ সময় অফিসের কাজ, বা বসে কাজ করার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছেন। এর ফলে, শারীরিক এবং মানসিক চাপ বাড়ছে। এছাড়া, ভাজাপোড়া, তেলে ভরা খাবার, এবং অতিরিক্ত চিনি ও স্ন্যাক্সের গ্রহণ হার্টের অসুস্থতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার জীবনযাত্রার অভ্যাস হার্টের স্বাস্থ্যকে ভাল রাখতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের আগে শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা আমাদের সঠিক সময়ে বুঝতে হলে মনোযোগী হওয়া জরুরি।
বুকের মধ্যে ভারী অনুভূতি: বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করা বা ভারী পাথরের মতো অনুভূতি হওয়া একটি সাধারণ লক্ষণ।
শ্বাসকষ্ট: কোনো শারীরিক কাজ করার পর অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট বা দুর্বল অনুভূতি হতে পারে।
হাঁপিয়ে যাওয়া: বিশেষ করে সিঁড়ি উঠতে গিয়ে, চলতে গিয়ে বা অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া।
বুকের ধড়ফড়ানি: একটানা বুকের ধড়ফড়ানি, কখনও কখনও ব্যথা বা টান অনুভূতি হওয়া।
ঘাম: বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করার পাশাপাশি অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া।
গা ভারী লাগা বা অবসন্নতা: খুব অল্প কাজেও শরীর দুর্বল লাগা বা ক্লান্তি অনুভূতি।
এছাড়া, যদি আপনার হাত বা পায়ে অবশ অবশ লাগা বা তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, তবে তা হার্টের অসুস্থতার একটি গুরুত্ব পূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এই ধরনের লক্ষণগুলি অবহেলা করা উচিত নয়।
আজকের সময়ে হার্টের স্বাস্থ্য বুঝতে এবং সঠিক সময়ে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে কিছু পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমনঃ
সিঁড়ি পরীক্ষা: ৪০ সেকেন্ডে সিঁড়ি ওঠা, বা ৬০টি সিঁড়ি ভাঙার পরীক্ষা করে হার্টের অবস্থা পরীক্ষা করা যায়। যদি ৪০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে আপনি সিঁড়ি ভাঙতে সক্ষম হন, তবে এটি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে যে আপনার হার্টের সমস্যা নেই।
চেয়ার টেস্ট: চেয়ার থেকে উঠতে বসতে গিয়ে যদি হাঁপিয়ে যান, বুক ধড়ফড় করে, তবে এটি হার্টের দুর্বলতা হতে পারে।
এই সহজ পরীক্ষা দুটি বাড়িতে করেই আপনি আপনার হার্টের অবস্থা বুঝতে পারেন এবং যখন কোনো অস্বস্তি অনুভব করবেন, তখন চিকিৎসকের কাছে দ্রুত পৌঁছানো জরুরি।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বর্তমানে তরুণ বয়সীদের মধ্যেও বেড়েছে। এর মধ্যে কিছু সমস্যা জিনগত বা জন্মগত হলেও, বেশিরভাগ সমস্যা জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে হতে পারে। একদিকে যেমন তরুণ-তরুণীরা স্ট্রেস এবং অতিরিক্ত কাজের চাপে নিজেদের শরীরের যত্ন নেন না, অন্যদিকে অনেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা, ভালো খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবের কারণে হার্টের সমস্যা পরিলক্ষিত করছে। তরুণ বয়সে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, এবং ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেগুলি হার্টের অসুস্থতার মূল কারণ।
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া: তেল, মিষ্টি এবং উচ্চ কোলেস্টেরল জাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকা উচিত।
নিয়মিত শরীরচর্চা করা: দৈনন্দিন হালকা ব্যায়াম যেমন হাঁটা, সাইক্লিং বা যোগব্যায়াম হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে।
স্ট্রেস কমানো: মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে ধ্যান, শ্বাসের ব্যায়াম এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা উচিত।
বেশি পানি পান করা: শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখাও হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা: এগুলি হার্টের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর জন্য নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে আপনি অল্প বয়সে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করতে পারেন এবং হার্টের সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।