Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বয়স আর বাধা নয়: শিশুদের কোলেস্টেরল টেস্ট নিয়ে এল নতুন গাইডলাইন

নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, বয়স কুড়ি পেরোলে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হত, কিন্তু এখন চিকিৎসকেরা আরও ছোট বয়সেই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।

রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ানো আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এটি এমন একটি বিষয় যা অনেকেই জানে না বা গুরুত্ব দেয় না। আজকালকার জীবনের দিকপাল খাদ্যাভ্যাস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং শারীরিক কার্যকলাপের অভাবে, অনেকেই উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের দেহে কোলেস্টেরল দুটি প্রকারে থাকে: ‘ভালো’ এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল। যদিও সঠিক মাত্রায় কোলেস্টেরল রক্তে থাকা প্রাকৃতিকভাবে শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে যখন কোলেস্টেরলের পরিমাণ অত্যধিক বাড়ে, তখন তা বিভিন্ন হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

এই দীর্ঘ অভ্যাসের কারণে, আমাদের ধমনীতে যেগুলি গুরুত্বপূর্ণ রক্ত প্রবাহের জন্য একটি পথ হিসেবে কাজ করে, সেখানে চর্বির স্তর জমে গিয়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। যেটি ‘অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস’ হিসেবে পরিচিত। সুতরাং, এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা, এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোলেস্টেরল পরীক্ষা: নতুন নির্দেশিকা

প্রচলিত ধারণা ছিল যে, বয়স ২০ বা ৩০ পার না হলে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা উচিত নয়। তবে, সম্প্রতি আমেরিকান কলেজ অফ কার্ডিয়োলজি এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (AHA) নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বয়স ৯ থেকে ১১ বছর পর্যন্ত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত। এর মূল কারণ হলো, বর্তমান সময়ে ছোট বয়সের শিশুরাও উচ্চ কোলেস্টেরল সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছে, যা খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের প্রভাবের কারণে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (CDC) নির্দেশিকা অনুসারে, শারীরিকভাবে সক্রিয় না থাকা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অত্যধিক চিনি ও ফ্যাটযুক্ত খাবারের প্রবণতা, এবং জাঙ্ক ফুড খাওয়ার কারণে ছোটদের রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। এর ফলস্বরূপ, বয়স কম হলে, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি হতে পারে এবং সঠিক সময়ে যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা: স্বাভাবিক ও বিপজ্জনক সীমা

রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে, সাধারণভাবে প্রতি ডেসিলিটারে কোলেস্টেরলের মাত্রা ১৫০ থেকে ১৭০ মিলিগ্রাম হওয়া উচিত। তবে, ২০০ মিলিগ্রাম বা তার বেশি কোলেস্টেরল থাকলে এটি বিপদের সঙ্কেত। এর মধ্যে, ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল (এলডিএল) ১১০ মিলিগ্রামের নিচে থাকা উচিত এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ৯০ মিলিগ্রাম থেকে কম থাকা উচিত। এর চেয়ে বেশি হলে ধমনীর দেয়ালে চর্বির স্তর জমা হতে শুরু করবে, যা রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রক্রিয়া ৯ থেকে ১১ বছর বয়সে শুরু হতে পারে।

কোলেস্টেরলের ক্ষতিকর প্রভাব

যখন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়, এটি ধমনীর দেয়ালে জমে গিয়ে ‘অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস’ সৃষ্টি করতে পারে, যা রক্ত চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। এই পরিস্থিতি হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অন্যান্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

কোলেস্টেরল কমানোর উপায়

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ। ফলমূল, শাকসবজি, সম্পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যুক্ত খাবারগুলো খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি এবং তেলযুক্ত খাবার কম খাওয়া উচিত।

নিয়মিত ব্যায়াম এবং শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমানোও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিটের মৃদু শারীরিক কার্যকলাপ বা ৭৫ মিনিটের তীব্র ব্যায়াম প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, ধূমপান থেকে দূরে থাকা এবং মদ্যপান নিয়ন্ত্রণও কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সঠিক বয়সে কোলেস্টেরল পরীক্ষা

বয়স ৯ বছর পার হলেই কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত। এর মাধ্যমে শিশুদের কোলেস্টেরল সমস্যার আগাম চিহ্নিত করা সম্ভব। যদি কারও পরিবারের ইতিহাসে উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগ থাকে, তবে তাদের দ্রুত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে, যদি কোনো শিশুর ওজন বৃদ্ধি পায় বা শারীরিকভাবে অতি কম সক্রিয় থাকে, তাহলে এই পরীক্ষা আরও জরুরি হয়ে ওঠে।

উপসংহার

কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এই জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ। কোলেস্টেরল পরীক্ষা এখন ছোটদের জন্যও অপরিহার্য, কারণ তারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন হৃদরোগের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সঠিক সময় এবং নিয়মিত পরীক্ষা করে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

news image
আরও খবর

কোলেস্টেরল আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, তবে এর মাত্রা বাড়লে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সাধারণত কোলেস্টেরল রক্তের মধ্যে দুটি প্রকারে পাওয়া যায়: "ভালো" কোলেস্টেরল (এইচডিএল) এবং "খারাপ" কোলেস্টেরল (এলডিএল)। ভালো কোলেস্টেরল রক্তের মধ্যে থেকে অতিরিক্ত চর্বি এবং অন্যান্য দূষণ সরিয়ে শরীরের জন্য উপকারী হতে সাহায্য করে, তবে খারাপ কোলেস্টেরল রক্তনালীর দেয়ালে জমা হতে থাকে, যা ধমনীর কুঁচকানো এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যদি এলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ে, তাহলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

হৃদরোগ এবং কোলেস্টেরলের সম্পর্ক

হৃদরোগ, যেমন হৃদপিণ্ডের আক্রমণ, স্ট্রোক, এবং অন্যান্য সেরিব্রোভাসকুলার রোগগুলো সাধারণত রক্তনালীর ব্লকেজের কারণে হয়। যখন এলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি হয়, তখন তা ধমনীর দেওয়ালে জমে গিয়ে আর্ক তৈরি করে, যা রক্তের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে রক্ত চলাচল ঠিক মতো হতে পারে না, এবং অপ্রত্যাশিত হৃদরোগের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। একে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা হার্ট ব্লকেজ বলা হয়, যা পরবর্তীতে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং অন্যান্য গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়

কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমাদের জীবনযাপনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় দেওয়া হলো:

  1. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
    খাদ্যাভ্যাস হলো কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের খাদ্য তালিকায় বেশি করে ফল, শাকসবজি, এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখলে কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করবে। বিশেষত, সয়াবিন, মটরশুটি, বাদাম, এবং শস্য জাতীয় খাবার কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি এবং উচ্চ পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কম খাওয়া উচিত।

  2. ব্যায়াম:
    নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, এবং সুইমিং বা যোগব্যায়াম করার মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেহেতু ব্যায়াম এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং এইচডিএল কোলেস্টেরল বাড়ায়, তাই এটি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম বা ৭৫ মিনিট উচ্চ তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত।

  3. ওজন নিয়ন্ত্রণ:
    অতিরিক্ত ওজন কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি সাধারণত কোলেস্টেরল বৃদ্ধির কারণ হয়। তাই নিয়মিত ব্যায়াম এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

  4. ধূমপান এবং মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ:
    ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ধূমপান রক্তনালীর দেয়ালে জমে থাকা চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা ধমনীর ব্লকেজ তৈরি করতে সাহায্য করে। মদ্যপানও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, তাই ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে দূরে থাকা উচিত।

  5. মেডিক্যাল চেকআপ:
    নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিরীক্ষণ করা উচিত। কোলেস্টেরল পরীক্ষা, বিশেষত বয়স ২০ এর পর, প্রতি পাঁচ বছরে একবার করা উচিত। যদি উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের কোনও পরিবারের ইতিহাস থাকে, তবে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি আরও ঘনঘন করা উচিত। এ ছাড়া, যদি কোনও ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বা অন্যান্য হৃদরোগ সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত হন, তবে তাদের কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সূচকগুলো নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা উচিত।

  6. দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া:
    কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু সময় লাগে, তবে যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

ছোটদের কোলেস্টেরল পরীক্ষা: একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

বর্তমানে কোলেস্টেরল পরীক্ষা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়, ছোটদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক সক্রিয়তার অভাবে এখন ছোটরা বেশি মাত্রায় উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত হচ্ছে। আমেরিকান কলেজ অফ কার্ডিয়োলজি এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন নতুন নির্দেশিকায় বলছে, বয়স ৯ থেকে ১১ বছরেই কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা উচিত। এটি আগে কখনও এমনটি পরামর্শ দেওয়া হয়নি, তবে এখন পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে যাদের পরিবারে হার্টের রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরল রয়েছে, তাদের ছোটবেলা থেকেই কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা, এই সমস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা আমাদের জীবনযাপনের অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করি এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতন হই, তবে আমরা দীর্ঘস্থায়ী এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারব।

Preview image