Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ম্যান ইউয়ের বিরুদ্ধে চমক, রজার্সের জোড়া গোলে জয় ছিনিয়ে নিল অ্যাস্টন ভিলা

অ্যাস্টন ভিলা বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ম্যাচটি ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন অ্যাস্টন ভিলার তরুণ তারকা মরগ্যান রজার্স। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ভিলা। প্রথমার্ধে বল দখলের লড়াই চললেও ভিলার আক্রমণ ছিল বেশি ধারালো। তারই ফল হিসেবে মরগ্যান রজার্স প্রথম গোলটি করেন নিখুঁত ফিনিশে, যা ইউনাইটেডের রক্ষণকে হতচকিত করে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং একটি গোল শোধও দেয়, তবে সমতা ফেরাতে ব্যর্থ হয়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আবারও সামনে আসেন মরগ্যান রজার্স। দ্রুত গতির আক্রমণ ও ঠান্ডা মাথার শটে তিনি নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন, যা কার্যত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। এই জয়ের মাধ্যমে অ্যাস্টন ভিলা প্রমাণ করে দেয় যে তারা বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জন্য এই হার নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। মরগ্যান রজার্সের এই জোড়া গোল তাঁকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে এবং ভিলার সমর্থকদের জন্য এনে দিয়েছে স্মরণীয় এক সন্ধ্যা।

মরগ্যান রজার্সের মহাকাব্য: ভিলা পার্কে ইউনাইটেড বধের নেপথ্য কাহিনী

ক্রীড়া প্রতিবেদক | বার্মিংহাম, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে এখন এক অবিস্মরণীয় নাম—অ্যাস্টন ভিলা। রবিবার সন্ধ্যায় ঘরের মাঠ ভিলা পার্কে উনাই এমেরির শিষ্যরা যেভাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ২-১ গোলে ধরাশায়ী করল, তা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল আলোচিত হবে। আর এই রাজকীয় জয়ের মুকুটে একমাত্র উজ্জ্বল পালকটি ছিলেন মরগ্যান রজার্স। তার অবিশ্বাস্য জোড়া গোল কেবল ইউনাইটেডকে স্তব্ধ করেনি, বরং ২৩ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ তরুণকে রাতারাতি বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

ম্যাচের প্রেক্ষাপট: দুই মেরুর লড়াই

ম্যাচ শুরুর আগে পরিসংখ্যান ও ইতিহাস ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পক্ষে। নতুন কোচ রুবেন আমোরিমের অধীনে ইউনাইটেড যখন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া, তখন অ্যাস্টন ভিলা ছিল তাদের অদম্য জয়ের ধারায় অবিচল। ভিলা এই ম্যাচে মাঠে নেমেছিল টানা ৯টি জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে। অন্যদিকে, রেড ডেভিলদের জন্য এটি ছিল শীর্ষ চারে ওঠার মরণপণ লড়াই। কিন্তু ভিলা পার্কের উত্তাল গ্যালারি আর মরগ্যান রজার্সের ফর্ম যে সব হিসেব ওলটপালট করে দেবে, তা হয়তো আমোরিম কল্পনাও করেননি।

প্রথমার্ধ: দাবার চাল ও রজার্সের প্রথম আঘাত

খেলার শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে কৌশলের লড়াই দেখা যায়। ইউনাইটেড বল দখলে রেখে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করলেও ভিলার রক্ষণে ফাটল ধরাতে পারছিল না। ব্রুনো ফার্নান্দেস এবং ম্যাথিউস কুনিয়া বেশ কয়েকবার চেষ্টা চালালেও ভিলার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ছিলেন দেয়াল হয়ে।

ম্যাচের ৪৪ মিনিট পর্যন্ত স্কোরলাইন গোলশূন্য থাকলেও নাটকীয়তা জমে ওঠে বিরতির ঠিক আগে। ৪৫তম মিনিটে জন ম্যাকগিনের একটি নিখুঁত পাস থেকে বল পান মরগ্যান রজার্স। বাম প্রান্ত দিয়ে চিতার গতিতে ভেতরে ঢুকে ইউনাইটেডের লেনি ইয়োরোকে পরাস্ত করে এক দর্শনীয় কোণাকুণি শটে বল জালে জড়ান তিনি। গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্স ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। গ্যালারিতে তখন গগনবিদারী চিৎকার।

তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের ৩ মিনিটে (৪৫+৩) ম্যাটি ক্যাশের এক মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে প্যাটরিক ডরগু বল বাড়িয়ে দেন ম্যাথিউস কুনিয়ার দিকে। ঠান্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করে ইউনাইটেডকে ১-১ সমতায় ফেরান কুনিয়া। বিরতির বাঁশি যখন বাজে, তখন দুই দলের স্কোর সমানে সমান।

দ্বিতীয়ার্ধ: নাটকীয়তা ও ব্রুনোর বিদায়

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। চোটের কারণে অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। তার জায়গায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে মাঠে নামিয়ে রক্ষণ মজবুত করার চেষ্টা করেন আমোরিম। কিন্তু ভিলার আক্রমণভাগ তখন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছিল।

৫৭তম মিনিটে আবারও মঞ্চে আসেন মরগ্যান রজার্স। প্রায় প্রথম গোলের কার্বন কপি হিসেবে দেখা গেল এই গোলটিও। ওলি ওয়াটকিন্সের দুর্দান্ত হোল্ড-আপ প্লে থেকে বল পেয়ে রজার্স আবারও তার ড্রিবলিং জাদু দেখান। লেনি ইয়োরোকে ছিটকে ফেলে বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া তার দ্বিতীয় শটটি আবারও জালে জড়ায়। এই গোলটি কেবল ভিলাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়নি, বরং রজার্সকে ১৯৯৮ সালে ডিওন ডাবলিনের পর প্রথম ভিলা খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুই ম্যাচে জোড়া গোল করার কৃতিত্ব এনে দেয়।

রণকৌশল বিশ্লেষণ: এমেরি বনাম আমোরিম

উনাই এমেরি এই ম্যাচে তার সুশৃঙ্খল ৪-৪-২ ফরমেশনে অটল ছিলেন। তার প্রধান অস্ত্র ছিল দ্রুত প্রতি-আক্রমণ (Counter-attack)। রজার্সকে বাম উইংয়ে একটু বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, যা ইউনাইটেডের তরুণ ডিফেন্ডার ইয়োরোর জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, রুবেন আমোরিমের ৩-৪-২-১ ফরমেশন প্রথমার্ধে কার্যকর মনে হলেও বিরতির পর ব্রুনোর অনুপস্থিতিতে খেই হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বল হারানোর প্রবণতা এবং রক্ষণে গতিশীল রজার্সকে আটকানোর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ইউনাইটেডের ছিল না।

পরিসংখ্যানের আয়নায় ম্যাচ

পরিসংখ্যান অ্যাস্টন ভিলা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
গোল
বল দখল ৪৩% ৫৭%
মোট শট ১২ ১৫
লক্ষ্যে শট
কর্নার

পরিসংখ্যান বলছে ইউনাইটেড বল দখলে এগিয়ে থাকলেও 'ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং'-এর অভাবে তারা হেরেছে। মরগ্যান রজার্স একাই ৭টি শট নিয়েছিলেন, যা ইউনাইটেডের পুরো আক্রমণভাগের জন্য ছিল একটি বড় সতর্কবার্তা।

মরগ্যান রজার্স: নতুন এক তারকার উদয়

ম্যাচ শেষে রজার্সকে নিয়ে বন্দনায় মেতেছেন ফুটবল বোদ্ধারা। এই মৌসুমে ১৭ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচিং স্টাফদের নজর এখন নিশ্চিতভাবেই এই তরুণের ওপর। তার গতি, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সবচেয়ে বড় কথা—বড় ম্যাচে স্নায়ু ধরে রাখার ক্ষমতা তাকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

লিগ টেবিলের সমীকরণ

এই জয়ের ফলে অ্যাস্টন ভিলা ১৭ ম্যাচে ৩৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে উঠে এল। তারা এখন লিগ লিডার আর্সেনাল (৩৯) এবং ম্যানচেস্টার সিটি (৩৭)-এর ঠিক পেছনেই অবস্থান করছে। বড়দিনের আগে এই জয় ভিলা সমর্থকদের শিরোপার স্বপ্নকে আরও বাড়িয়ে দিল। অন্যদিকে, হারলেও ইউনাইটেড ১৮ পয়েন্ট নিয়ে সপ্তম স্থানেই রইল, তবে শীর্ষ চারে যাওয়ার রাস্তা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে গেল।

উপসংহার

ভিলা পার্কের এই জয় কেবল ৩ পয়েন্টের জয় নয়, এটি ছিল সামর্থ্যের আস্ফালন। মরগ্যান রজার্সের জোড়া গোল প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক ফুটবলে কেবল নামী দামি তারকা নয়, সঠিক কৌশল ও একাগ্রতা থাকলে যেকোনো বড় শক্তিকে ধুলিসাৎ করা সম্ভব। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে বিধ্বস্ত করে অ্যাস্টন ভিলা এখন প্রিমিয়ার লিগের সত্যিকারের 'টাইটেল কন্টেন্ডার'।

news image
আরও খবর

ম্যান অফ দ্য ম্যাচ: মরগ্যান রজার্স (রেটিং: ৯/১০)

মরগ্যান রজার্স এই ম্যাচে কেবল গোলই করেননি, বরং পুরো ইউনাইটেড রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রেখেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত কিছু অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান:

  • গোল: ২ (৪৫' এবং ৫৭' মিনিটে)।

  • মোট শট: ৭টি (দলের ১২টি শটের মধ্যে অর্ধেকের বেশি তাঁর)।

  • ড্রিবলিং সাফল্য: ৫ বার সফলভাবে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করেছেন।

  • রেকর্ড: ১৯৯৮ সালে ডিওন ডাবলিনের পর প্রথম ভিলা খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুই লিগ ম্যাচে জোড়া গোল করার কীর্তি গড়লেন।


লিগ টেবিলের চিত্র (২১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত)

এই জয়ের পর লিগ টেবিলের শীর্ষ চারের লড়াই আরও জমে উঠেছে। ভিলা এখন শিরোপার খুব কাছে:

অবস্থান দল ম্যাচ জয় ড্র হার পয়েন্ট
আর্সেনাল ১৭ ১২ ৩৯
ম্যানচেস্টার সিটি ১৭ ১২ ৩৭
অ্যাস্টন ভিলা ১৭ ১১ ৩৬
চেলসি ১৭ ২৯

দ্রষ্টব্য: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ২৬ পয়েন্ট নিয়ে বর্তমানে টেবিলের সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে।


অ্যাস্টন ভিলার পরবর্তী কঠিন চ্যালেঞ্জ

বড়দিন এবং নতুন বছরের উৎসবের মৌসুমে অ্যাস্টন ভিলার সামনে বড় দুটি ম্যাচ অপেক্ষা করছে, যা তাদের শিরোপা স্বপ্নের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে:

  1. বনাম চেলসি (অ্যাওয়ে): ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, রাত ১১:৩০ (বাংলাদেশ সময়)।

  2. বনাম আর্সেনাল (অ্যাওয়ে): ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, রাত ২:১৫ (বাংলাদেশ সময়)।

  3. বনাম নটিংহ্যাম ফরেস্ট (হোম): ৩ জানুয়ারি ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩০ (বাংলাদেশ সময়)।

  4. এফএ কাপ (বনাম টটেনহ্যাম): ১০ জানুয়ারি ২০২৬।


ইউনাইটেড শিবিরের ইনজুরি সংবাদ

ম্যাচ হারের পাশাপাশি ইউনাইটেডের জন্য বড় দুঃসংবাদ হলো অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেসের হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি। তিনি বিরতির পর আর মাঠে নামতে পারেননি। কাসেমিরো (নিষিদ্ধ) এবং মাইনুর (আহত) অনুপস্থিতিতে ইউনাইটেডের মাঝমাঠ এখন বেশ নড়বড়ে অবস্থায়।সব মিলিয়ে, অ্যাস্টন ভিলা বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে মরগ্যান রজার্সের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য। তাঁর জোড়া গোল শুধু একটি জয় এনে দেয়নি, বরং প্রিমিয়ার লিগে নতুন এক তারকার আগমনের বার্তাও দিয়ে গেল। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই ম্যাচ আরও একবার প্রমাণ করল—ফুটবল শুধু খেলাই নয়, এটি আবেগ, নাটক এবং অনিশ্চয়তার এক অনন্য মিশেল।

Preview image