ইসলামাবাদের জেলা আদালতের সামনে বিস্ফোরণের পর পাকিস্তানে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে সেই আতঙ্কে শ্রীলঙ্কা দলের আট জন ক্রিকেটার দেশে ফিরতে চান ফলে পাকিস্তানশ্রীলঙ্কা এক দিনের সিরিজ় বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে দলীয় সূত্রের খবর
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বহুদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। একের পর এক বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসী হামলা, রেলওয়ে ও আদালত চত্বরে অস্থিরতা সব মিলিয়ে বিদেশি দলগুলির সফরের সময় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে। এর মধ্যেই পাকিস্তান সফরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা এবং জ়িম্বাবোয়ে। দু’দলের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে টানা কয়েক দিন নানা সতর্কতা গ্রহণ করতে হয়েছে।
ঠিক এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে গত সপ্তাহে ইসলামাবাদের জেলা আদালতের সামনে ঘটে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ। ঘটনাটি এতটাই উদ্বেগজনক ছিল যে শ্রীলঙ্কা দলের আটজন ক্রিকেটার সরাসরি দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, পাকিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক এবং অনিশ্চিত। এই আতঙ্কের কারণে পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা এক দিনের সিরিজ় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রশাসন, নিরাপত্তা দফতর ও সরকারি কর্তারা দ্রুত নড়েচড়ে বসেন। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে একাধিক দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয় তারপরই সিদ্ধান্ত হয় যে বিদেশি ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হবে এবং তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে এর পরেই শ্রীলঙ্কা দল পাকিস্তানে খেলা চালিয়ে যেতে রাজি হয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মধ্যে আতঙ্ক কতটা গভীর ছিল।
এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝেই শনিবার রাতে এক অন্য দৃশ্য দেখা গেল ইসলামাবাদে। পাকিস্তানের ওয়ানডে দলের অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি আয়োজন করলেন এক বিশেষ নৈশভোজের। শ্রীলঙ্কা ও জ়িম্বাবোয়ে দলের ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানিয়ে রুফটপ রেস্তরাঁয় আয়োজন করা হল একটি সৌহার্দ্যমূলক ডিনার।
এমন আতঙ্কজনক সময়ের মধ্যেও সফরকারী দুই দলের ক্রিকেটাররা সেই আমন্ত্রণ রাখলেন এটাই দেখিয়ে দেয় যে ক্রিকেটের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করতে এই খেলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসলামাবাদের একটি রুফটপ রেস্তরাঁয় আয়োজন হলেও সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে জানানো হয় শনিবার বিকেলের পর থেকেই রেস্তরাঁটির চারপাশ পুরোপুরি নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে ফেলা হয় রেস্তরাঁর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় পাকিস্তান সেনা এবং ইসলামাবাদ পুলিশ।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে
রেস্তরাঁ প্রবেশদ্বার বন্ধ
আশেপাশের পথ ব্লক
ক্রিকেটারদের গাড়ির জন্য আলাদা কনভয়
সেনাবাহিনীর নজরদারি
হোটেল থেকে রেস্তরাঁ পর্যন্ত পথকে ‘ভার্চুয়াল রেড জোন’ ঘোষণা
রুফটপ এলাকায় মোতায়েন স্নাইপার
এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় যাতে কোনও সম্ভাব্য আক্রমণ বা অঘটন না ঘটে
জ়িম্বাবোয়ের পাক উৎপত্তি ক্রিকেটার সিকন্দর রাজা অনুষ্ঠানের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেন। ভিডিওতে দেখা যায় শ্রীলঙ্কা, জ়িম্বাবোয়ে এবং পাকিস্তান তিন দেশের ক্রিকেটাররা একত্রে বসে হাসি-আড্ডায় মেতে রয়েছেন। এই দৃশ্য প্রমাণ করে, মাঠে যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাইরে ততটাই বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্য।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পাকিস্তানি সমর্থকরা মন্তব্য করেন
“নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাই হোক, ক্রিকেটই আমাদের একত্র করে।
শ্রীলঙ্কান ভক্তরাও লেখেন
“এমন আতিথেয়তা ভুলে যাওয়ার নয়।
রবিবারই পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে তৃতীয় এক দিনের ম্যাচ। তার পর রয়েছে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ় যেখানে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং জ়িম্বাবোয়ে অংশ নেবে। এই ম্যাচগুলোর আগে তিন দলের ক্রিকেটারদের একত্রে নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ ডিনারের আয়োজন শুধু সামাজিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খেলোয়াড়দের আতঙ্ক কমানো, সফরের চাপ হালকা করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করা এইসব কারণেই এমন ডিনার আয়োজন অনেক সময় করা হয়।
আফ্রিদির এই উদ্যোগকে পাকিস্তান ক্রিকেটের এক বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা
গত সোমবার ইসলামাবাদে জেলা আদালতের সামনে বিস্ফোরণ হয়। তখনই নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কতা জারি হয়। ঘটনার পরপরই শ্রীলঙ্কা দলের আটজন ক্রিকেটার নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চান।
তাদের যুক্তি ছিল
“নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েই আর থাকতে চাই না
“সিরিজ় চালিয়ে গেলে বিপদের আশঙ্কা আছে
শ্রীলঙ্কা বোর্ড এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং পাকিস্তানকে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানায়। এরপর পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়
স্টেডিয়াম এলাকায় প্রতি মুহূর্তে সেনা পাহারা
হোটেল স্টেডিয়াম প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড রুটে ৪ স্তরের নিরাপত্তা
আগের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ নিরাপত্তাকর্মী
বোমা স্কোয়াড, স্নাইপার এবং মিলিটারি কনটিনজেন্ট
এই প্রতিশ্রুতির পর শ্রীলঙ্কা দল সিরিজ় চালিয়ে যেতে রাজি হয়। ফলে সিরিজ় বাতিলের সংকট কেটে যায়।
খেলায় যেমন চ্যালেঞ্জ, নিরাপত্তায় তেমনই চ্যালেঞ্জ। গত মাসখানেক ধরে পাকিস্তানে বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটছে। আদালত এলাকায় বিস্ফোরণ, রেল পথ অবরোধ, সরকারি এলাকায় হামলা সব মিলিয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের আতঙ্ক অস্বাভাবিক নয়।
এমন পরিস্থিতে আফ্রিদির মতো সিনিয়র ক্রিকেটারের সৌহার্দ্যমূলক ডিনার আয়োজন সফরকারী দলকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে বলে মনে করছেন অনেকে
যদিও পাকিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয় তবুও শনিবারের ডিনার দেখিয়ে দিল
ক্রিকেট শুধু প্রতিযোগিতা নয় এটি বন্ধুত্ব বিশ্বাস এবং ঐক্যের প্রতীক।
শ্রীলঙ্কা ও জ়িম্বাবোয়ের ক্রিকেটাররা আফ্রিদির নৈশভোজে যোগ দেওয়ায় স্পষ্ট পরিস্থিতি যতই নজরদারি দাবি করুক, খেলাটির সৌহার্দ্য এখনো অটুট।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে পাকিস্তান গত কয়েক বছর ধরে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন, উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বলয় সেনা মোতায়েন সবই বিদেশি ক্রিকেট বোর্ডকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে
অতীতে শ্রীলঙ্কা দলের উপর লাহোরে হামলার ঘটনা পাকিস্তানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। সেই ক্ষত এখনো একেবারে ভরাট হয়নি। তাই এ ধরনের আতিথেয়তা দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। বিদেশি ক্রিকেটাররা দেশে ফিরে এমন অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে ভবিষ্যতে আরও দল পাকিস্তান সফরে রাজি হতে পারে
আফ্রিদির নৈশভোজ সেই প্রচেষ্টারই এক প্রতিচ্ছবি।
ক্রিকেটকে অনেক সময় ‘স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি’ বলা হয়। কারণ খেলাকে কেন্দ্র করে দুই দেশ, দুই বোর্ড বা দুই দলের মধ্যে যেসব সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভাঁজ পড়ে, সেগুলো মসৃণ করে এমন সামাজিক জমায়েত।
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক টলমল হয়েছিল। ক্রিকেটারদের দেশে ফেরার ইচ্ছা তিক্ততা সৃষ্টি করেছিল দুই বোর্ডে। কিন্তু নৈশভোজে সব ক্রিকেটারকে এক ছাদের নিচে এনে আফ্রিদি যেন সেই সম্পর্কের উপর নতুন করে সেতুবন্ধন গড়ে তুললেন
শুধু তাই নয় জ়িম্বাবোয়ে দলের উপস্থিতিও পাকিস্তানের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়িয়েছে।
সিকন্দর রাজার শেয়ার করা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
“ক্রীড়া সবসময় সন্ত্রাসের উপরে জয়ী হয়।”
“ক্রিকেটারদের হাসিমুখ আমাদের ভরসা দেয়।”
“এমন মুহূর্তই ক্রিকেটকে সুন্দর করে।”
যেকোনও দেশে যখন নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে, সেখানকার সাধারণ মানুষের মনও ভেঙে যায়। কিন্তু নৈশভোজে বিদেশি ক্রিকেটারদের উপস্থিতি পাকিস্তানিদের মনে আবারও একটু ভরসা ফিরিয়ে এনেছে
যখন মাঠের বাইরে উত্তেজনা থাকে, তখন মাঠে নেমে খেলা কঠিন হয়ে যায়। নিরাপত্তা চাপ, মিডিয়ার প্রশ্ন, প্রশাসনিক তৎপরতা সব মিলিয়ে রীতিমতো মানসিক চাপের পরিবেশ।
কিন্তু আফ্রিদির এই ছোট উদ্যোগ প্রমাণ করেছে
ক্রিকেটের সৌন্দর্য তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, বরং বন্ধুত্বে।
শ্রীলঙ্কা ও জ়িম্বাবোয়ের ক্রিকেটাররা তার আমন্ত্রণে যোগ দেওয়ায় স্পষ্ট
বিশ্বাস এখনো অটুট। ভয় আছে, সতর্কতা আছে তবু ক্রিকেটের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের জায়গা আরও বড়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যে আবারও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেটা সত্যি। কিন্তু তবুও ছোট ছোট মুহূর্ত যেমন এই নৈশভোজ দেখিয়ে দেয়, বিপদের মাঝেও আলো আছে, আশা আছে, আর আছে ক্রিকেটের অদম্য ঐক্যবোধ।