১৬ জুন আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে আর্জেন্তিনা, গ্রুপে মেসিদের অন্য প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডন।
আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে চলেছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্তিনা। গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচে লায়োনেল মেসিদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডন। তার আগেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য আমেরিকার কানসাস সিটিতে বেস ক্যাম্প গড়তে চলেছে লায়োনেল স্কালোনির দল। সূত্রের খবর, বিশ্বকাপ শুরুর অন্তত দেড় সপ্তাহ আগে মার্কিন মুলুকে পা রাখবে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ কানসাস সিটিতেই খেলবে আর্জেন্তিনা। সেই কারণেই টুর্নামেন্ট চলাকালীন সেখানেই ঘাঁটি গাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্জেন্তাইন ফুটবল সংস্থা। কানসাস সিটির কম্পাস মিনেরালস ন্যাশনালস পারফরম্যান্স সেন্টারকে বেছে নেওয়া হয়েছে অনুশীলনের জন্য। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্রেনিং সেন্টার আমেরিকার অন্যতম সেরা ফুটবল প্রস্তুতি পরিকাঠামো হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং পিচ, হাই পারফরম্যান্স স্পোর্টস ল্যাবরেটরি, হাইপারবেরিক চেম্বার এবং আধুনিক রিকভারি ইউনিট, যা ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু অনুশীলনই নয়, আর্জেন্তিনার ফুটবলার এবং গোটা কোচিং স্টাফের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে কানসাস সিটির হোটেল অরিজিনে। স্টেডিয়াম থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার এবং ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ফলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যায় পড়তে হবে না স্কালোনি ব্রিগেডকে। প্রস্তুতির সময় যাতে খেলোয়াড়দের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
তবে গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচ খেলতে মেসিদের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। অস্ট্রিয়া ও জর্ডনের বিরুদ্ধে ম্যাচ দুটি আয়োজিত হবে ডালাসের বিখ্যাত এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে। টুর্নামেন্টের মাঝেই এই দীর্ঘ যাত্রা দলের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্কালোনির অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফ এই বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রস্তুতির পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বলে খবর।
বিশ্বকাপ অভিযানের আগে আর্জেন্তিনার এই প্রস্তুতি ঘিরে ফুটবল মহলে বাড়ছে উত্তেজনা। বিশেষ করে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবারও অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে মেসিদের দল। স্কালোনির নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে আর্জেন্তিনা। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে কোপা আমেরিকা সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে তারা।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার নজর থাকবে টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি জয়ের দিকে। যদিও তা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক শক্তিশালী দল এবারও শিরোপার দৌড়ে রয়েছে। তবুও মেসি, ডি মারিয়া, লাউতারো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজদের নিয়ে গড়া স্কোয়াড যে কোনও দলের জন্যই ভয়ঙ্কর, তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং লিওনেল মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি আর্জেন্তাইন মহাতারকা। গোটা বিশ্ব যখন মার্কিন মুলুকে আয়োজিত ফুটবল মহাযজ্ঞে শেষবারের মতো তাঁকে মাঠে দেখার অপেক্ষায়, তখন মেসি নিজে জানিয়েছেন — তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং ফিটনেসের উপরই সবকিছু নির্ভর করছে। তিনি মনে করছেন, এত বড় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগে নিজের শরীরের সাড়া বুঝে নেওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।
তবে মেসির প্রাক্তন সতীর্থ এবং বর্তমানে ইন্টার মায়ামির কোচ হাভিয়ের মাসচেরানো এই বিষয়ে আশাবাদী। তাঁর মতে, যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তা হলে ২০২৬ বিশ্বকাপে লিও মেসিকে দেখা যেতে পারে। মাসচেরানোর কথায়, “মেসি এখনও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। যদি ও ফিট থাকে এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে, তা হলে ওর খেলার সম্ভাবনা যথেষ্ট।”
এই মন্তব্য নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে আর্জেন্তিনা সমর্থকদের মধ্যে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে নাটকীয় জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন সেটাই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু এরপর কোপা আমেরিকায় দেশের হয়ে ফের নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জেতানোয় আবারও আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁকে আবার আর্জেন্তিনার জার্সিতে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই।
এদিকে কানসাস সিটিতে বেস ক্যাম্প গড়ার সিদ্ধান্তকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। কারণ, উত্তর আমেরিকার আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে আর্জেন্তিনার ফুটবলারদের। বিশেষ করে গ্রীষ্মের গরম ও আর্দ্রতা সামাল দেওয়ার জন্য আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্কালোনি নিজেও চাইছেন, ম্যাচের আগেই দল যেন সম্পূর্ণ মানিয়ে নিতে পারে।
কম্পাস মিনেরালস ন্যাশনালস পারফরম্যান্স সেন্টারে অনুশীলনের সুবিধা নিয়ে আশাবাদী কোচিং স্টাফ। এখানে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স সুবিধার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ফিটনেস, ইনজুরি প্রিভেনশন এবং রিকভারি প্রসেসে বিশেষ নজর দেওয়া যাবে। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে যেখানে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে খেলোয়াড়দের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা যে কতটা জরুরি, তা ভালো করেই জানেন স্কালোনি ও তাঁর দল।
আর্জেন্তিনার এই প্রস্তুতি পরিকল্পনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তারা এবারের বিশ্বকাপকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। শুধুমাত্র মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বরং মাঠের বাইরের পরিকল্পনাতেও কোনও খামতি রাখতে চাইছে না তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আবাসন থেকে শুরু করে ট্রেনিং সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা — সবকিছুই সাজানো হয়েছে সুচিন্তিতভাবে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আর্জেন্তিনার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ আলজেরিয়া। আফ্রিকার এই দলটি গত কয়েক বছরে দ্রুত উন্নতি করেছে এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী ফুটবলের জন্য পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ম্যাচ দিয়েই আর্জেন্তিনার টুর্নামেন্টের গতিপথ অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে। ভালো শুরু করতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে, যা পরবর্তী ম্যাচগুলিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এরপর অস্ট্রিয়া ও জর্ডনের বিরুদ্ধে ম্যাচ দুটি খেলবে মেসির দল। অস্ট্রিয়া ইউরোপীয় ফুটবলের শক্তিশালী দলগুলোর মধ্যে একটি এবং কৌশলগত ফুটবলের জন্য পরিচিত। অন্যদিকে জর্ডন গত কয়েক বছরে এশিয়ান ফুটবলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ফলে গ্রুপ পর্বে কোনও ম্যাচকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই আর্জেন্তিনার সামনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্রুপে আর্জেন্তিনা ফেভারিট হলেও ফুটবল মানেই অনিশ্চয়তা। তাই স্কালোনি ও তাঁর দল শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি ম্যাচ খেলতে চাইছেন। কানসাস সিটিতে বেস ক্যাম্প গড়ার সিদ্ধান্ত সেই প্রস্তুতিরই অংশ।
মেসির ভূমিকা নিয়েও আলাদা করে আলোচনা চলছে। বয়স বাড়লেও তাঁর ফুটবল মস্তিষ্ক, পাসিং ভিশন এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম। স্কালোনির কৌশলে মেসি যে শুধু গোলস্কোরার নন, বরং দলের আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি — তা বলাই বাহুল্য। তাঁর উপস্থিতি তরুণ ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং দলের সামগ্রিক মান উন্নত করে।
বিশ্বকাপের আগে মেসির ফিটনেস ও ফর্ম তাই আর্জেন্তিনার জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। যদিও তিনি নিজে এখনও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি, তবে তাঁর বর্তমান পারফরম্যান্স দেখে অনেকেই আশাবাদী। ইন্টার মায়ামিতে তাঁর ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স প্রমাণ করছে, বয়স তাঁর ফুটবলের ধার কমাতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে হাভিয়ের মাসচেরানোর মন্তব্য আর্জেন্তিনা সমর্থকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাক্তন সতীর্থ হিসেবে মেসির মানসিকতা ও শারীরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই জানেন। তাঁর আশাবাদী বক্তব্য নতুন করে আশা জাগিয়েছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপে হয়তো আবারও লিওনেল মেসিকে বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে, কানসাস সিটিতে বেস ক্যাম্প গড়া থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচের সূচি, আধুনিক ট্রেনিং সুবিধা এবং মেসির ভবিষ্যৎ — সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্তিনার বিশ্বকাপ অভিযান ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবারও ট্রফির অন্যতম দাবিদার হিসেবে মাঠে নামছে, আর সেই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে আমেরিকার মাটিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কালোনির নেতৃত্বে আর্জেন্তিনা এখন এমন এক দল, যারা শুধু প্রতিভার জোরে নয়, বরং পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তার মাধ্যমেও সাফল্যের পথে এগোচ্ছে। কানসাস সিটির বেস ক্যাম্প সেই পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে অনুশীলন করে দল নিজেদের সেরা ফর্মে তুলে আনতে চাইছে বিশ্বকাপের আগে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্তিনার এই যাত্রা যে কতটা রোমাঞ্চকর হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে মেসির ভবিষ্যৎ ঘিরে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে, তা এই বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। যদি তিনি খেলেন, তবে সেটি হতে পারে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ — আর সেই কারণে গোটা বিশ্বই মুখিয়ে রয়েছে তাঁকে আবার একবার ফুটবল মহাযজ্ঞে দেখার জন্য।
কানসাস সিটিতে শুরু হতে চলা এই প্রস্তুতি শিবির তাই শুধু আর্জেন্তিনার নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়েছে। বিশ্বকাপের আগে স্কালোনির দল কীভাবে নিজেদের গড়ে তোলে এবং মাঠে কীভাবে পারফর্ম করে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।