Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভারতের রেয়ার আর্থ স্কিম: ইভি শিল্পে কী বদল আনতে চলেছে এই নতুন উদ্যোগ

ভারত সরকার রেয়ার আর্থ মিনারেল বা বিরল ধাতু সংক্রান্ত একটি নতুন জাতীয় স্কিম চালুর পরিকল্পনা করেছে, যা দেশের ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইভি ব্যাটারি, মোটর ও উন্নত প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ উপাদানে ভারত এখনও অনেকটাই বিদেশ নির্ভর। নতুন এই স্কিমের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং চিনের মতো দেশের উপর নির্ভরতা হ্রাস করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ভারতের ইভি উৎপাদন খরচ কমবে, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে সবুজ শক্তির ক্ষেত্রে দেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

ভারতের Rare Earth স্কিম

ইলেকট্রিক ভেহিকল শিল্পে কী বদল আনতে চলেছে এই কৌশলগত উদ্যোগ?

ভারত ধীরে ধীরে এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মোড়ের দিকে এগোচ্ছে। পরিবেশবান্ধব শক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের শিল্পনীতির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি ক্রমশ কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে, তা হল Rare Earth Minerals বা বিরল ধাতু। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকার যে Rare Earth Scheme চালুর পরিকল্পনা করেছে, তা শুধু খনিজ নীতি নয়—বরং দেশের ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) শিল্প, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্কিম বাস্তবায়িত হলে ভারতের ইভি শিল্পের কাঁচামাল সংকট অনেকটাই কমবে, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
 

এই পরিস্থিতিতে রেয়ার আর্থ স্কিমের মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় অনুসন্ধান, খনন ও প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা বাড়িয়ে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সরকার চায় যাতে কাঁচামাল থেকে শুরু করে পরিশোধন ও ব্যবহার পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভ্যালু চেন দেশের মধ্যেই তৈরি হয়। এর ফলে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা কমবে, তেমনই অন্যদিকে ইভি শিল্পে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় রেয়ার আর্থ সহজলভ্য হলে ইভি গাড়ির দাম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে।

ইভি শিল্পে রেয়ার আর্থের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি মোটর প্রযুক্তিতে। আধুনিক ইভি গাড়িতে ব্যবহৃত পার্মানেন্ট ম্যাগনেট মোটরগুলো রেয়ার আর্থ উপাদান ছাড়া কার্যত অসম্ভব। এই মোটরের দক্ষতা বেশি হওয়ায় গাড়ির পারফরম্যান্স উন্নত হয় এবং একবার চার্জে বেশি দূরত্ব যাওয়া সম্ভব হয়। ফলে রেয়ার আর্থের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে ভারতের ইভি লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সরকার তাই এই স্কিমের মাধ্যমে ইভি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা দিতে চাইছে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রেয়ার আর্থ খনন পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং পরিশোধন প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। তাই শিল্প উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা গড়ে তোলাও জরুরি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের রেয়ার আর্থ স্কিম শুধু একটি খনিজ নীতি নয়, বরং ইভি শিল্প ও সবুজ শক্তির ভবিষ্যৎ গঠনের পথে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে ভারত ইভি ও আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করতে পারে।


Rare Earth কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

Rare Earth বলতে মোট ১৭টি ধাতুকে বোঝানো হয়, যেগুলি আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নাম শুনে মনে হতে পারে এগুলি খুবই বিরল, কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এগুলি পাওয়া যায়—তবে সমস্যা হল এগুলি উত্তোলন ও পরিশোধন করা অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়সাপেক্ষ।

এই Rare Earth ধাতুগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল
নিওডিমিয়াম
ডিসপ্রোসিয়াম
টার্বিয়াম
ল্যান্থানাম
সিরিয়াম

এই উপাদানগুলি ছাড়া আধুনিক ইভি মোটর, শক্তিশালী ম্যাগনেট, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, উইন্ড টারবাইন, স্মার্টফোন, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কার্যত অসম্ভব।


ইভি শিল্পে Rare Earth-এর ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্কিম সফল হলে ইভি উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের খরচ কমতে পারে। ফলে ইভি গাড়ির দাম তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে এবং উৎপাদকরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন।ইলেকট্রিক ভেহিকলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির মধ্যে একটি হল Permanent Magnet Motor। এই মোটরেই ব্যবহৃত হয় Rare Earth ম্যাগনেট, বিশেষ করে নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম।

এই ম্যাগনেটের কারণে

  • মোটর ছোট হলেও শক্তিশালী হয়

  • শক্তি ক্ষয় কম হয়

  • গাড়ির রেঞ্জ বাড়ে

  • পারফরম্যান্স উন্নত হয়

ফলে Rare Earth-এর উপর নির্ভরতা ছাড়া আধুনিক, দক্ষ এবং দীর্ঘস্থায়ী ইভি তৈরি করা কঠিন।


বর্তমানে ভারতের অবস্থান

বর্তমানে Rare Earth উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে চিনের আধিপত্য রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ Rare Earth উৎপাদন এবং তার থেকেও বেশি পরিমাণ পরিশোধন ক্ষমতা চিনের হাতে।

ভারতেও Rare Earth-এর সম্ভাব্য ভান্ডার রয়েছে—বিশেষ করে

  • ওডিশা

  • কেরালা

  • তামিলনাড়ু

  • অন্ধ্রপ্রদেশ

কিন্তু খনন ও প্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামো এখনও সীমিত। ফলে ভারতকে বড় অংশে Rare Earth আমদানি করতে হয়, যা ইভি শিল্পের জন্য একটি বড় ঝুঁকি।


Rare Earth Scheme কেন প্রয়োজন হল?

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি বড় কারণ এই স্কিমের পেছনে কাজ করছে।

১. কৌশলগত নিরাপত্তা

Rare Earth সরবরাহ যদি কোনও একটি দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় শিল্প বিপর্যস্ত হতে পারে।

২. ইভি ও সবুজ শক্তির ভবিষ্যৎ

ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে বড় আকারে ইভি গ্রহণের লক্ষ্য নিয়েছে। Rare Earth ছাড়া এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়।

৩. আত্মনির্ভর ভারত

দেশীয় খনিজ সম্পদের ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।


Rare Earth Scheme-এর মূল লক্ষ্য

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই স্কিমের প্রধান লক্ষ্যগুলি হল


ইভি শিল্পে সম্ভাব্য পরিবর্তন

Rare Earth Scheme সফল হলে ইভি শিল্পে একাধিক বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

উৎপাদন খরচ কমবে

দেশীয় Rare Earth পাওয়া গেলে আমদানির খরচ কমবে, ফলে ইভি গাড়ির দাম তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে।

সরবরাহ স্থিতিশীল হবে

বিদেশি সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও দেশীয় শিল্প চলমান থাকবে।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

ভারত নিজস্ব মোটর ও ব্যাটারি প্রযুক্তি উন্নয়নে আরও এগোতে পারবে।


ভারতীয় ইভি নির্মাতাদের জন্য সুফল

Tata Motors
Mahindra Electric
Ola Electric
Ather Energy
TVS Motor

এই সব সংস্থার জন্য Rare Earth-এর দেশীয় উৎস একটি বড় সুবিধা হতে পারে। এতে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে।


পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

Rare Earth খননের সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও জড়িত। খননের ফলে

  • ভূমি দূষণ

  • জল দূষণ

  • স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি

এই কারণেই সরকার পরিবেশবান্ধব খনন প্রযুক্তি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিচ্ছে।


আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বিশ্বের বহু দেশ এখন চিনের উপর Rare Earth নির্ভরতা কমাতে চাইছে। আমেরিকা, জাপান, ইউরোপ ইতিমধ্যেই বিকল্প উৎস তৈরিতে বিনিয়োগ শুরু করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের Rare Earth Scheme দেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে।


কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এই স্কিম বাস্তবায়িত হলে

  • খনন খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে

  • প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত হবে

  • নতুন শিল্পাঞ্চল তৈরি হবে

  • রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়বে

ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

তবে এই উদ্যোগ সহজ নয়।

  • উচ্চ প্রযুক্তির প্রয়োজন

  • বড় অঙ্কের বিনিয়োগ

  • পরিবেশগত ভারসাম্য

  • আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

সব মিলিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংগঠিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।


Rare Earth Scheme কি ইভি বিপ্লবের চাবিকাঠি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, Rare Earth Scheme শুধু একটি খনিজ নীতি নয়—এটি ভারতের ইভি বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সঠিক বাস্তবায়ন হলে ভারত ভবিষ্যতে ইভি ও সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।


উপসংহার

ভারতের Rare Earth Scheme একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ। ইভি শিল্পের কাঁচামাল সংকট কাটিয়ে দেশকে আত্মনির্ভর ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু ইভি শিল্প নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক শিল্পনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই Rare Earth Scheme পরিচালনা করতে পারে।

Preview image