Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এল বিদ্যুৎ ভারতের তৈরি বিশ্বের প্রথম স্পেস সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট আদিত্যশক্তি এবং জ্বালানি সংকটের চিরস্থায়ী সমাধান

 মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন ইসরো সফলভাবে মহাকাশে স্থাপন করল বিশ্বের প্রথম সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র আদিত্যশক্তি যা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পৃথিবী ছাড়া মহাকাশ থেকে বিদ্যুৎ পাঠাবে তারবিহীন প্রযুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লার দিন শেষ ভারত এখন বিশ্বের শক্তির উৎস এবং দূষণমুক্ত পৃথিবীর কান্ডারি  

মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এল বিদ্যুৎ ভারতের তৈরি বিশ্বের প্রথম স্পেস সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট আদিত্যশক্তি এবং জ্বালানি সংকটের চিরস্থায়ী সমাধান
Planetary Science

মানুষের শক্তির চাহিদা মেটাতে আমরা এতদিন মাটির নিচের কয়লা বা তেল পুড়িয়েছি যার ফলে পৃথিবী গরম হয়েছে এবং পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে কিন্তু আজ ভারত সেই ধ্বংসের পথ থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর এক নতুন রাস্তা দেখাল ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা বা ইসরো আজ সকালে অন্ধ্রপ্রদেশর শ্রীহরিকোটা থেকে জিএসএলভি মার্ক ৪ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠাল বিশ্বের প্রথম স্পেস বেসড সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা মহাকাশ ভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র যার নাম দেওয়া হয়েছে আদিত্যশক্তি আজ দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী এবং ইসরোর চেয়ারম্যান যৌথভাবে এই প্রকল্পের সাফল্য ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে এক নতুন যুগের সূচনায় স্বাগত জানান

আজকের এই ঐতিহাসিক উৎক্ষেপণ দেখার জন্য শ্রীহরিকোটায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করেছিলেন যখন বিশাল রকেটটি আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে আকাশের দিকে উড়ে যায় তখন সমবেত জনতার জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে কিন্তু আসল চমক ছিল তার কিছুক্ষণ পরেই যখন মহাকাশ থেকে প্রথম বিদ্যুতের সংকেত বা সিগন্যাল পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় এবং রাজস্থানের থর মরুভূমিতে তৈরি করা এক বিশাল রিসিভার বা গ্রাহক স্টেশনের মাধ্যমে তা গ্রিডে যুক্ত হয় তখন প্রমাণিত হলো যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে ভারত আজ এমন এক শক্তি অর্জন করল যা আমেরিকা চিন বা রাশিয়া কারোর কাছে নেই

আদিত্যশক্তি প্রকল্পের নেপথ্য কাহিনী

এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে যখন ইসরো এবং ডিআরডিও যৌথভাবে ঠিক করে যে তারা ভারতের শক্তির চাহিদা মেটাতে মহাকাশকে ব্যবহার করবে পৃথিবীতে সৌর বিদ্যুৎ তৈরির প্রধান সমস্যা হলো রাত হলে বা আকাশ মেঘলা থাকলে বিদ্যুৎ তৈরি হয় না কিন্তু মহাকাশে বা পৃথিবীর কক্ষপথে সূর্য কখনোই ডোবে না সেখানে ২৪ ঘণ্টাই প্রখর রোদ থাকে এবং কোনো মেঘ বা বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে বাধা দেয় না তাই মহাকাশে সৌর প্যানেল বসালে তা পৃথিবীর চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে

বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মহাকাশে তৈরি হওয়া এই বিদ্যুৎকে তার ছাড়া পৃথিবীতে নামিয়ে আনা এর জন্য তারা ব্যবহার করেছেন মাইক্রোওয়েভ পাওয়ার ট্রান্সমিশন বা এমপিটি প্রযুক্তি মহাকাশের পাওয়ার প্ল্যান্টটি সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে এবং তারপর সেই বিদ্যুৎকে মাইক্রোওয়েভ বা বেতার তরঙ্গে পরিণত করে একটি বিম বা রশ্মির মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীর মাটিতে থাকা রেকটেনা বা বিশেষ ধরনের অ্যান্টেনা সেই তরঙ্গ গ্রহণ করে এবং তাকে আবার সাধারণ বিদ্যুতে পরিণত করে

প্রযুক্তির খুঁটিনাটি এবং নিরাপত্তা

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে আকাশ থেকে আসা এই শক্তিশালী রশ্মি কি পাখি বা বিমানের ক্ষতি করবে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন যে এই মাইক্রোওয়েভ বিম অত্যন্ত ফোকাসড বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী এবং এর তীব্রতা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যে তা কোনো প্রাণীর ক্ষতি করবে না যদি কোনো পাখি বা বিমান ভুল করে এই বিমের মধ্যে চলে আসে তবে সেন্সর তৎক্ষণাৎ বিমটি বন্ধ করে দেবে বা তার পথ ঘুরিয়ে দেবে এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব

আদিত্যশক্তি উপগ্রহটি দেখতে অনেকটা বিশাল ঘুড়ির মতো যার ডানাগুলো সৌর প্যানেল দিয়ে ঢাকা এর ওজন প্রায় ১০ টন এবং এটি পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার উঁচুতে জিওস্টেশনারি অরবিট বা ভূসমলয় কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে অর্থাৎ এটি পৃথিবীর গতির সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরবে এবং সবসময় ভারতের ওপর স্থির থাকবে এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে

ভারতের শক্তি স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক লাভ

ভারত তার বিদ্যুতের জন্য মূলত কয়লার ওপর নির্ভরশীল যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ এছাড়াও তেলের জন্য আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয় আদিত্যশক্তি সফল হওয়ার ফলে ভারত এখন শক্তির দিক থেকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর বা এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্ট দেশে পরিণত হলো এই একটি প্ল্যান্ট থেকে এখন ৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে যা দিল্লি বা মুম্বাইয়ের মতো একটি বড় শহরের পুরো চাহিদা মেটাতে পারে সরকার জানিয়েছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে মহাকাশে আরও ১০টি এমন প্ল্যান্ট পাঠানো হবে যার ফলে ভারতের আর কোনো কয়লা বা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজন হবে না

অর্থনৈতিক লাভ হবে অকল্পনীয় সস্তা বিদ্যুতের ফলে ভারতের শিল্প কারখানার উৎপাদন খরচ কমবে এবং বিশ্ববাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম কমবে এর ফলে রপ্তানি বাড়বে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে সাধারণ মানুষের ইলেকট্রিক বিল প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে গ্রামে গঞ্জে যেখানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি সেখানে এই তারবিহীন প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই আলো জ্বালানো যাবে

জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্লাইমেট চেঞ্জ রোধে ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ মেরু প্রদেশের বরফ গলছে এবং সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে এর প্রধান কারণ হলো কার্বন নিঃসরণ আদিত্যশক্তি প্রকল্পটি সম্পূর্ণ কার্বন মুক্ত বা জিরো কার্বন এনার্জি এটি চালু হওয়ার ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে মেশা বন্ধ হবে ভারত বিশ্বকে কথা দিয়েছিল যে ২০৭০ সালের মধ্যে তারা নেট জিরো দেশ হবে কিন্তু এই প্রযুক্তির ফলে ভারত হয়তো ২০৪০ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে আজ রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশনস ভারতের এই উদ্যোগকে গেম চেঞ্জার বা যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছে এবং অন্য দেশগুলোকে ভারত থেকে এই প্রযুক্তি শেখার পরামর্শ দিয়েছে

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মহাকাশ কূটনীতি

news image
আরও খবর

ভারতের এই সাফল্য দেখে বিশ্বের তাবড় শক্তিধর দেশগুলো অবাক হয়ে গেছে আমেরিকা এবং নাসা জানিয়েছে তারা ভারতের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে চায় এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস এ বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ইসরোর সাহায্য নেবে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি বা ইএসএ বলেছে ভারত আজ স্পেস সুপারপাওয়ার বা মহাকাশ পরাশক্তিতে পরিণত হলো চিন এবং জাপানের বিজ্ঞানীরাও ভারতের এই প্রযুক্তিকে কুর্নিশ জানিয়েছেন

তবে এর কিছু কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক দিকও আছে মহাকাশ থেকে বিদ্যুৎ পাঠানোর ক্ষমতা থাকা মানে ভারত চাইলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বিদ্যুৎ পাঠাতে পারে এটি ভারতের কূটনৈতিক শক্তি অনেক বাড়িয়ে দেবে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যেই ভারত থেকে এই মহাকাশ বিদ্যুৎ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত এখন এশিয়ার পাওয়ার হাব বা শক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠবে

কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় বিপ্লব

ভারতের কৃষকরা বিদ্যুতের অভাবে অনেক সময় সেচ পাম্প চালাতে পারেন না ডিজেল পাম্প চালানো ব্যয়সাপেক্ষ আদিত্যশক্তির বিদ্যুৎ গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেলে কৃষকরা দিনরাত পাম্প চালাতে পারবেন এবং ফসলের উৎপাদন বাড়বে সরকার কৃষকদের জন্য বিশেষ সোলার রিসিভার বা ছোট অ্যান্টেনা তৈরি করছে যা তারা নিজেদের জমিতে বসাতে পারবেন এবং সরাসরি মহাকাশ থেকে বিদ্যুৎ পাবেন এর ফলে কৃষির খরচ কমবে এবং কৃষকদের আয় বাড়বে

দুর্যোগ মোকাবিলায় আদিত্যশক্তি

বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় যখন বাত্যাহত এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে যায় এবং আলো থাকে না তখন আদিত্যশক্তি এক বড় ভূমিকা পালন করবে মহাকাশ থেকে সরাসরি দুর্গত এলাকায় বিদ্যুৎ পাঠানো সম্ভব হবে এর ফলে উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ বন্টন অনেক সহজ হবে মোবাইল টাওয়ারগুলো সচল থাকবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হবে না এটি ভারতের দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাকে বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টকে অনেক শক্তিশালী করবে

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

অবশ্যই এত বড় প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ মহাকাশে অনেক সময় উল্কাপাত বা স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশ আবর্জনা থাকে যা উপগ্রহের ক্ষতি করতে পারে ইসরো জানিয়েছে আদিত্যশক্তির সুরক্ষার জন্য তারা বিশেষ শিল্ড বা বর্ম ব্যবহার করেছে এবং রোবোটিক আর্ম বা যান্ত্রিক হাত রাখা হয়েছে যা ছোটখাটো মেরামত করতে পারবে ভবিষ্যতে যদি বড় কোনো সমস্যা হয় তবে ব্যোম মিত্র বা রোবট মহাকাশচারী পাঠিয়ে তা ঠিক করা হবে

খরচের দিক থেকেও এটি একটি বড় বিনিয়োগ আদিত্যশক্তি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি একবার চালু হলে অন্তত ৩০ বছর ধরে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেবে তাই দীর্ঘমেয়াদে এটি কয়লা বা তেলের চেয়ে অনেক সস্তা সরকার বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং টাটা ও আদানি গ্রুপ ইতিমধ্যেই আগ্রহ দেখিয়েছে

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ও উচ্ছ্বাস

ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে আজকের দিনটি উৎসবের মতো টিভির পর্দায় যখন উৎক্ষেপণ দেখানো হয় তখন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত মানুষ হাততালি দিয়ে ওঠেন কলকাতার এক স্কুল ছাত্র বলে আমি বড় হয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে চাই এবং দেশের জন্য কাজ করতে চাই মুম্বাইয়ের এক গৃহবধূ বলেন লোডশেডিং এর জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম এবার আশা করছি সেই দিন শেষ হবে বেঙ্গালুরুর এক আইটি কর্মী বলেন ভারত যে প্রযুক্তিতে এত এগিয়ে গেছে তা দেখে গর্ব হচ্ছে

উপসংহার

২০২৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল আগুন আবিষ্কারের পর মানুষ যেমন গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছিল তেমনি মহাকাশ বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ এক নতুন সভ্যতায় পা রাখল যেখানে শক্তির কোনো অভাব নেই আদিত্যশক্তি কেবল একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নয় এটি হলো ভারতের দেড়শো কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রতীক এটি আমাদের শেখায় যে আকাশের কোনো সীমা নেই বা স্কাই ইজ নট দ্য লিমিট আমরা যদি সাহস করে স্বপ্ন দেখি তবে সূর্যকেও আমরা আমাদের হাতের মুঠোয় আনতে পারি ভারত আজ বিশ্বকে দেখাল যে বিজ্ঞান কেবল ধ্বংসের জন্য নয় বিজ্ঞান সৃষ্টির জন্য এবং মানবতার কল্যাণের জন্য জয় বিজ্ঞান জয় ভারত

Preview image