Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গ্রামীণ হাওড়ায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিটের সাফল্য প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

স্বাস্থ্যবন্ধু প্রকল্পের আওতায় চালু মোবাইল মেডিকেল ইউনিট গ্রামীণ হাওড়ায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে নিয়মিত চিকিৎসা প্রসূতি ও শিশু সেবায় মিলেছে অভাবনীয় সাড়া। দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবার নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে এই উদ্যোগ।

স্বাস্থ্য পরিষেবা যে শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক হতে পারে না, বরং তা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব—এই দর্শন থেকেই পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক স্বাস্থ্য প্রকল্পের সূচনা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল স্বাস্থ্যবন্ধু প্রকল্পের আওতায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা। বিশেষ করে গ্রামীণ হাওড়ার বিস্তীর্ণ হাওড়, নদীঘেরা ও দুর্গম অঞ্চলে এই পরিষেবা যে কীভাবে কার্যত ‘দুয়ারে হাসপাতাল’-এর ভূমিকা নিচ্ছে, তা এখন জেলার স্বাস্থ্যচিত্রে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–এর উদ্যোগে চালু এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ছিল এমন মানুষদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, যাঁরা ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক দুর্বলতা কিংবা সামাজিক অনীহার কারণে দীর্ঘদিন নিয়মিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। গ্রামীণ হাওড়ার শ্যামপুর, আমতা, বাগনান, উলুবেড়িয়া, ডোমজুড় বা জগৎবল্লভপুর—এই সব এলাকায় নদীনালা, হাওড় ও কাঁচা রাস্তার জন্য বহু ক্ষেত্রেই হাসপাতালে পৌঁছনো ছিল সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে প্রসূতি মহিলা ও সদ্যোজাত শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গুরুতর আকার নিয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতেই মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা এক নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে জেলার ব্লকভিত্তিক ১০টি মোবাইল মেডিকেল ইউনিট প্রতিদিন নির্দিষ্ট সূচি মেনে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে পরিষেবা দিচ্ছে। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে, খুব শীঘ্রই বাকি চারটি ব্লকেও একটি করে ভ্যান চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হাওড়া জেলার প্রতিটি ব্লকই এই পরিষেবার আওতায় চলে আসবে।

জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক কিশলয় দত্তের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিষেবার প্রতি মানুষের সাড়া অভাবনীয়। প্রতিদিন একাধিক ব্লকে শত শত মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। আমতা ২, বাগনান ১, শ্যামপুর ১, ডোমজুড় ও জগৎবল্লভপুর ব্লকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ জন রোগী মোবাইল মেডিকেল ইউনিট থেকে চিকিৎসা পাচ্ছেন। এই সংখ্যাটি ক্রমশ বাড়ছে, যা গ্রামীণ মানুষের আস্থারই প্রতিফলন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল—এই ইউনিটগুলিতে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসাই নয়, বরং অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি মোবাইল মেডিকেল ইউনিটে রয়েছে আধুনিক এক্স-রে মেশিন এবং একসঙ্গে ৩৯ ধরনের রক্তপরীক্ষার সুবিধা। এর ফলে রোগ নির্ণয় অনেক দ্রুত ও নির্ভুল হচ্ছে, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতি।

চিকিৎসক দলেও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়। শিশু ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, নিউরোলজিস্ট এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট রোস্টার অনুযায়ী এই ভ্যানগুলিতে পরিষেবা দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে থাকছেন প্রশিক্ষিত এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও আশাকর্মীরা। এই সমন্বিত প্রয়াসই মোবাইল মেডিকেল ইউনিটগুলিকে কার্যত একটি চলমান হাসপাতালের রূপ দিয়েছে।

বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই প্রকল্প যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে, তা স্বাস্থ্য আধিকারিকরাও স্বীকার করছেন। দীর্ঘদিন ধরেই শ্যামপুর, আমতা, বাগনান ও উলুবেড়িয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় গর্ভবতী মহিলা ও নবজাতকের চিকিৎসায় নানা সমস্যা ছিল। সামাজিক কুসংস্কার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে অনীহা, দূরত্ব এবং যাতায়াতের অসুবিধার কারণে বহু ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা মিলত না। এর ফলেই ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা চিহ্নিত করা দেরি হত এবং মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ত।

মোবাইল মেডিকেল ইউনিট সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বাড়ির কাছেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা পাওয়ায় এখন অনেক বেশি গর্ভবতী মহিলা নিয়মিত চেকআপ করাচ্ছেন। ফলে উচ্চ ঝুঁকির গর্ভাবস্থা দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা বা মহকুমা হাসপাতালে রেফার করা সম্ভব হচ্ছে। এটি মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

শুধু প্রসবকালীন চিকিৎসাই নয়, ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারির গুরুত্ব বোঝাতেও এই ইউনিটগুলির বড় ভূমিকা রয়েছে। আশাকর্মীরা নিয়মিত কাউন্সেলিং করছেন—হাসপাতালে প্রসবের প্রয়োজনীয়তা, প্রসবের পর মা ও শিশুর পরিচর্যা, টিকাকরণ এবং পুষ্টির বিষয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন। এর ফলে ধীরে ধীরে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও মোবাইল মেডিকেল ইউনিট এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। নবজাতকের ওজন, পুষ্টিগত অবস্থা, জন্মগত সমস্যা, চোখ ও স্নায়ুর অসুখ—সব কিছুরই প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বড় কোনও জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশু মৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

news image
আরও খবর

আরও একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে চলেছে আলট্রাসোনোগ্রাফি পরিষেবা। শীঘ্রই এই সুবিধা মোবাইল মেডিকেল ইউনিটে যুক্ত হলে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী হবে। গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি, প্ল্যাসেন্টার অবস্থা কিংবা জটিলতা আগেভাগেই ধরা পড়বে, যা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বাস্থ্যবন্ধু প্রকল্পের আওতায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা গ্রামীণ হাওড়ার স্বাস্থ্যচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এটি কেবল একটি চিকিৎসা পরিষেবা নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের কাছে আস্থা, ভরসা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মাতৃ ও শিশু মৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ যে একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তা পরিসংখ্যান ও মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করছে।

ভবিষ্যতে সমস্ত ব্লক এই পরিষেবার আওতায় এলে গ্রামীণ হাওড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মান যে আরও উন্নত হবে, তা নিয়ে আশাবাদী প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ—দু’পক্ষই। এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিল, সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে স্বাস্থ্য পরিষেবা সত্যিই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বাস্থ্যবন্ধু প্রকল্পের আওতায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা গ্রামীণ হাওড়ার স্বাস্থ্যচিত্রে যে পরিবর্তন এনেছে, তা শুধু বর্তমান সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করছে। দীর্ঘদিন ধরে যে সব এলাকা চিকিৎসা পরিষেবার মূল স্রোত থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল, সেখানে আজ নিয়মিত চিকিৎসক পৌঁছচ্ছেন, আধুনিক পরীক্ষা হচ্ছে এবং রোগ নির্ণয় থেকে রেফারাল পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এর ফলে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা যেমন বাড়ছে, তেমনই চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসও দৃঢ় হচ্ছে।

বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এই প্রকল্পের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আগে যেখানে গর্ভবতী মহিলারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পেতেন বা অনীহা দেখাতেন, এখন সেখানে নিয়মিত চেকআপ করানো একটি স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা আগেভাগেই চিহ্নিত হওয়ায় জটিলতা কমছে, সময়মতো রেফারাল সম্ভব হচ্ছে এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। একই ভাবে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি, সংক্রমণ বা জন্মগত সমস্যার মতো বিষয়গুলিও প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ছে, যা ভবিষ্যতে একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিষেবার আর একটি বড় দিক হল সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। আশাকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারের ফলে অনেক গ্রামেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার অনীহা কাটতে শুরু করেছে। বাড়ির কাছেই যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও পরীক্ষার সুবিধা মিলছে, তখন মানুষ নিজের সমস্যাকে আর অবহেলা করছেন না। ফলে ছোট অসুখ বড় আকার নেওয়ার আগেই চিকিৎসার আওতায় আসছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ সমাজের উৎপাদনশীলতা ও জীবনমান উন্নত করতেও সহায়ক হবে।

প্রশাসনিক দিক থেকেও এই প্রকল্প একটি সফল মডেল হিসেবে উঠে আসছে। সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও কীভাবে চলমান ইউনিটের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া যায়, তার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি আলট্রাসোনোগ্রাফি ও আরও উন্নত পরীক্ষার সুবিধা যুক্ত হয়, তবে মোবাইল মেডিকেল ইউনিট কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের রূপ নিতে পারে। এর ফলে জেলা ও মহকুমা হাসপাতালের উপর চাপও অনেকটাই কমবে এবং জরুরি রোগীদের জন্য সেখানে আরও ভালো পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগ গ্রামীণ মানুষের মনে একটি বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে—রাষ্ট্র তাঁদের কথা ভাবছে, তাঁদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। স্বাস্থ্য যে বিলাসিতা নয়, বরং একটি মৌলিক অধিকার, তা বাস্তবে প্রমাণ করছে এই মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যৌথ অংশগ্রহণে যদি এই প্রকল্প আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়, তবে গ্রামীণ হাওড়া শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা দেশের কাছে একটি অনুসরণযোগ্য স্বাস্থ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণেই বলা যায়, স্বাস্থ্যবন্ধু প্রকল্পের আওতায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট শুধু বর্তমানের একটি সফল উদ্যোগ নয়, বরং ভবিষ্যতের সুস্থ সমাজ গঠনের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

Preview image