Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অফিস হোক বা বাড়ি ল্যাপটপেই বিপদ শরীরে বাসা বাঁধছে স্পাইন সমস্যা

কম বয়সেই বাড়ছে কুঁজো পিঠ ও হাতের ব্যথা। ল্যাপটপ আর মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে দেখা দিচ্ছে নতুন সমস্যা ল্যাপটপ স্পাইন ও টেক্সটিং থাম্ব যা নীরবে ক্ষতি করছে শরীরকে।

বর্তমান যুগ ডিজিটালের যুগ। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট ছাড়া যেন এক মুহূর্তও কাটানো কঠিন। বাসে ট্রেনে অফিসে বাড়িতে এমনকি আড্ডার মাঝেও মানুষ মাথা নিচু করে মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে টাইপ করে চলেছে বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করছে। এই অভ্যাস এখন শুধুমাত্র প্রয়োজন নয়, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে শরীরের উপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে, যার ফলাফল হিসেবে জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন লাইফস্টাইল ডিজিজ। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল টেক্সটিং থাম্ব এবং ল্যাপটপ স্পাইন।

টেক্সটিং থাম্ব বলতে বোঝায় মোবাইল ব্যবহারের ফলে বুড়ো আঙুলে ব্যথা, অসাড়তা এবং শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা। অনেক সময় এটি কব্জি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে একই ভঙ্গিতে মোবাইল ধরে রাখা এবং বারবার টাইপ করার ফলে পেশিতে চাপ পড়ে এবং স্নায়ুর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে আঙুলের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হয় এবং ব্যথা শুরু হয়।

মানবদেহের কব্জির অংশে একটি বিশেষ নালি রয়েছে যাকে কারপাল টানেল বলা হয়। এই নালির ভিতর দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু যায় যার নাম মিডিয়ান নার্ভ। এই স্নায়ুটি হাতের বেশ কয়েকটি আঙুলের অনুভূতি ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। যখন মোবাইল ব্যবহারের কারণে এই স্নায়ুর উপর চাপ পড়ে, তখন কারপাল টানেল সিনড্রোমের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে হাত অবশ হয়ে যাওয়া, ঝিনঝিন করা, ব্যথা এবং জিনিসপত্র ধরতে অসুবিধা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।

অন্যদিকে ল্যাপটপ স্পাইন এমন একটি সমস্যা যা দীর্ঘ সময় ধরে ভুল ভঙ্গিতে বসে কাজ করার ফলে তৈরি হয়। যখন কেউ ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের সামনে কুঁজো হয়ে বসে থাকে বা মাথা নিচু করে মোবাইল দেখে, তখন মেরুদণ্ডের উপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের মাথার ওজন মেরুদণ্ড সহজেই বহন করতে পারে। কিন্তু যখন ঘাড় ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি বা তার বেশি কোণে ঝুঁকে যায়, তখন সেই ওজন অনেক গুণ বেড়ে যায়।

এই অতিরিক্ত চাপ ধীরে ধীরে ঘাড়ের পেশি, স্নায়ু এবং মেরুদণ্ডের গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে টান, পিঠে যন্ত্রণা এবং দীর্ঘমেয়াদে মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে চলাফেরায় অসুবিধা হয় এবং পঙ্গুত্বের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, আগে যেসব সমস্যা বয়স্কদের মধ্যে দেখা যেত, এখন সেগুলো অল্পবয়সীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। কুড়ি থেকে তিরিশ বছর বয়সী তরুণ তরুণীরাও এখন এই সমস্যায় ভুগছেন। কারণ তারা দিনের অধিকাংশ সময়ই মোবাইল বা ল্যাপটপের সামনে কাটাচ্ছেন।

এই সমস্যাগুলির প্রধান কারণ হল দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা এবং শরীরের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় না রাখা। অনেকেই বিছানায় শুয়ে মোবাইল ব্যবহার করেন বা সোফায় কুঁজো হয়ে বসে ল্যাপটপে কাজ করেন। এর ফলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক কাঠামো নষ্ট হয় এবং পেশিগুলিতে অস্বাভাবিক চাপ পড়ে।

এছাড়াও মোবাইল ব্যবহারের সময় অনেকেই এক হাতে ডিভাইস ধরে অন্য হাতে টাইপ করেন, যা হাতের পেশির উপর অসমান চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অভ্যাস বজায় থাকলে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই সমস্যাগুলির লক্ষণ প্রথমে খুব সাধারণ মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা গুরুতর হয়ে ওঠে। যেমন আঙুলে ব্যথা, কব্জিতে টান, ঘাড়ে শক্তভাব, পিঠে ব্যথা ইত্যাদি। অনেকেই এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেন না এবং কাজ চালিয়ে যান। ফলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সচেতনতা। প্রথমত, মোবাইল ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজের সময় ছাড়া মোবাইল ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সঠিক ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে কাজ করার সময় চেয়ারে সোজা হয়ে বসতে হবে এবং স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় রাখতে হবে। এতে ঘাড় এবং মেরুদণ্ডের উপর চাপ কম পড়বে।

তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিরতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটানা কাজ না করে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পরপর কয়েক মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়ানো বা হাঁটা উচিত। এতে পেশিগুলির উপর চাপ কমে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।

news image
আরও খবর

চতুর্থত, নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। বিশেষ করে ঘাড়, কাঁধ এবং হাতের জন্য কিছু সহজ ব্যায়াম করলে এই সমস্যাগুলি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। যোগব্যায়াম এবং স্ট্রেচিং শরীরকে নমনীয় রাখে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

পঞ্চমত, মোবাইল ব্যবহারের সময় ফোনটি চোখের সমান উচ্চতায় ধরে রাখা উচিত। এতে ঘাড় নিচু করার প্রয়োজন পড়ে না এবং মেরুদণ্ডের উপর চাপ কম পড়ে।

এছাড়াও, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা বা অসাড়তা অনুভব করা যায়, তাহলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার আমাদের শরীরের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে সচেতনভাবে এবং সীমিতভাবে।

সবশেষে বলা যায়, টেক্সটিং থাম্ব এবং ল্যাপটপ স্পাইন শুধুমাত্র একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একটি জীবনধারার সমস্যা। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তন না করলে এই সমস্যাগুলি আরও বাড়তে থাকবে। তাই এখনই সচেতন হয়ে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

নিজের অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আনলেই এই বড় সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

ডিজিটাল নির্ভরতার এই যুগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মানসিক প্রভাব। দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের ফলে শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক চাপও বাড়ছে। ক্রমাগত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘুমের সমস্যা, কারণ রাতে শোয়ার আগে মোবাইল ব্যবহার করলে ব্লু লাইট মেলাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুমের মান খারাপ হয় এবং শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না।

এই সমস্ত সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব শরীরের উপর দীর্ঘমেয়াদে ভয়ঙ্কর হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলেও কাজের চাপে তা উপেক্ষা করে। কিন্তু এই উপেক্ষাই এক সময় বড় সমস্যার রূপ নেয়। তাই শরীরের ছোট ছোট সংকেতগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় এবং তা প্রয়োজনও নেই। কিন্তু ব্যবহার যেন নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন কাজের সময় নির্দিষ্ট রাখা, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমানো এবং দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ডিজিটাল ডিটক্স করা যেতে পারে।

এছাড়া কর্মক্ষেত্রে এরগোনমিক সেটআপ খুবই জরুরি। সঠিক উচ্চতার চেয়ার, টেবিল এবং স্ক্রিন ব্যবহার করলে শরীরের উপর চাপ অনেকটাই কমে। অনেক সংস্থা এখন কর্মীদের জন্য এই ধরনের সুবিধা দিচ্ছে, কারণ তারা বুঝতে পারছে যে সুস্থ কর্মী মানেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।

পরিবারের মধ্যেও এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। ছোটদের মধ্যে এই অভ্যাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তাই শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা এবং বাইরে খেলাধুলা বা শারীরিক কার্যকলাপে উৎসাহিত করা দরকার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, টেক্সটিং থাম্ব এবং ল্যাপটপ স্পাইন আধুনিক জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। তবে সচেতনতা, সঠিক অভ্যাস এবং নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুন, কিন্তু তার দাস হয়ে নয়—এই বার্তাটিই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

Preview image