Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রতিদিন খাওয়া খাবারগুলি আপনার লিভারের ক্ষতি করতে পারে

প্রতিদিন খাওয়া খাবারগুলি আপনার লিভারের ক্ষতি করতে পারে আমাদের শরীরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার (যকৃত)। এটি শুধু এক সাধারণ অঙ্গ নয় — লিভার হলো আমাদের দেহের “কেমিক্যাল প্ল্যান্ট”, যার মাধ্যমে নানা ধরনের টক্সিন থেকে রক্ষা, পুষ্টি রূপান্তর, রক্ত পরিশোধন, ইত্যাদি কাজ হয়। যদিও অনেক সময় আমরা যকৃতকে খুব একটু ভাবি, কিন্তু আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল খাদ্যাভ্যাসের যুগে ‘নষ্ট’ বা ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ লিভার—এমন অবস্থা একখানেই ভয়াবহ হতে পারে। আজকের আলোচনায় আমরা দেখব—কোন খাবারগুলো প্রায় প্রতিদিন খাওয়া হয় কিন্তু আসলে আমাদের লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে; কেন এগুলো লিভারকে হুমকিতে ফেলে; এবং এই ঝুঁকি কমানোর জন্য কী করতে পারবেন আপনি।

আমাদের শরীরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার (যকৃত)। এটি শুধু এক সাধারণ অঙ্গ নয় — লিভার হলো আমাদের দেহের “কেমিক্যাল প্ল্যান্ট”, যার মাধ্যমে নানা ধরনের টক্সিন থেকে রক্ষা, পুষ্টি রূপান্তর, রক্ত পরিশোধন, ইত্যাদি কাজ হয়। যদিও অনেক সময় আমরা যকৃতকে খুব একটু ভাবি, কিন্তু আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল খাদ্যাভ্যাসের যুগে ‘নষ্ট’ বা ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ লিভার—এমন অবস্থা একখানেই ভয়াবহ হতে পারে।

আজকের আলোচনায় আমরা দেখব—কোন খাবারগুলো প্রায় প্রতিদিন খাওয়া হয় কিন্তু আসলে আমাদের লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে; কেন এগুলো লিভারকে হুমকিতে ফেলে; এবং এই ঝুঁকি কমানোর জন্য কী করতে পারবেন আপনি।

 

লিভারের ভূমিকা ঝুঁকির কারণ

প্রথমে একটু সংক্ষেপে—লিভার কী কাজ করে?

  • লিভার রক্ত থেকে উপাদান সংগ্রহ করে, সেগুলো বিশ্লেষণ ও পরিপাকযোগ্য রূপে রূপান্তর করে।
  • বিপাকীয় কার্যক্রম যেমন—চর্বি ভাঙা, গ্লুকোজ সঞ্চালন, ভিটামিন ও খনিজ সংরক্ষণ, জৈব রাসায়নিক পদার্থ নির্মাণ ইত্যাদি এখানে হয়।
  • এছাড়া, যেসব বিপজ্জনক বা টক্সিক পদার্থ আমরা গ্রহণ করি (যেমন মদ, ওষুধ, উদ্ভিদভিত্তিক রাসায়নিক) — লিভার এগুলোকে নিষ্ক্রিয় বা বাদ দিতে সাহায্য করে।
  • অর্থাৎ লিভারকে এক ধরনের “দ্বারপাল” ভাবা যায়—এটি দেহের অভ্যন্তরের পরিবেশকে সুষম রাখে।

তবে, যদি নিয়মিতভাবে এমন খাবার নেওয়া হয় যা লিভারকে অতিরিক্ত কাজ করায় বা টক্সিনের বোঝা বাড়ায়—তবে লিভারের কোষগুলোর ক্ষয়, সুষম বিপাকপ্রক্রিয়ার বিঘ্ন, জটিল অবস্থা যেমন লিভার সিরোসিস, ফ্যাটি লিভার, লিভার ইনফ্ল্যামেশন ইত্যাদি দেখা দিতে পারে

 

ক্ষতিকর খাবারগুলোআপনার লিভারের ঘনঘনশত্রু

নিচে‑নিচে কিছু খাবার ও খাদ্যশৈলী দেওয়া হলো যা খুব সাধারণ হয় — প্রায় প্রতিদিন আমরা খাই — কিন্তু এগুলো লিভারকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

. অতিরিক্ত চিনি সিরাপযুক্ত পানীয়

শ্বেতচিনি, গ্লুকোজ–ফ্রুকটোজ সিরাপ (High Fructose Corn Syrup) ইত্যাদি বর্তমানে অনেক খাবারে ও পানীয়তে থাকে। যখন আমরা অতিরিক্ত চিনি খাই, লিভারকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়—শরীরে অবপ্রয়োগযোগ্য ফ্রুকটোজ বা গ্লুকোজকে পরিপাকযোগ্য পদার্থে রূপান্তর করতে হয়।
এই প্রসঙ্গে গবেষণা দেখিয়েছে—যখন লিভারকে অতিরিক্ত ফ্রুকটোজ মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে সেখানকার চর্বিপদার্থ (lipids) বাড়ে, “নন‌আলকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ” (NAFLD) প্রসারিত হতে পারে।

পানীয়ের মধ্যে এমন পানীয় যেমন সফট ড্রিংকস, গ্যাসযুক্ত সোডা, ক্যান্ডি–জুস্স, রেডি–মেড সিরাপযুক্ত পানীয় এমনকি “শর্করাহীন” লেবেলযুক্ত পানীয়েও প্রচুর চিনি হতে পারে। নিয়মিত এসব পানীয় পানের ফলে লিভারে অপ্রয়োজনীয় বোঝা বাড়ে।

. ট্রান্সচর্বি প্রক্রিয়াজাত খাবার

প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে যেমন ফাস্ট ফুড, প্যাকেট স্ন্যাকস, রেডি–মেড মীলস, হ্যামবার্গার, ফ্রায়েড খাবার ইত্যাদিতে ট্রান্স চর্বি (trans fats) ও উচ্চমাত্রার স্যাচুরেটেড চর্বি থাকতে পারে।
লিভার যখন চর্বি ভাঙার বা সঞ্চয়ের কাজ করে, তখন অতিরিক্ত চর্বি ও ট্রান্স চর্বির উপস্থিতি লিভারকে অতিরিক্ত কাজ করায় এবং চর্বি সঞ্চয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে লিভারে ফ্যাটি বদল (fat accumulation) হয়, যা ভবিষ্যতে লিভার ইনফ্ল্যামেশন বা সিরোসিসের পথ খুলে দিতে পারে।

. অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম)  বৃদ্ধি

যদিও লবণ আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয়, তবে অত্যধিক লবণযুক্ত খাবার লিভারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যদি লিভার ইতিমধ্যে কমজোর হয়ে থাকে বা আপনি হাইপারটেনশন, কিডনি সমস্যায় ভুগছেন।
উচ্চ লবণযুক্ত খাদ্য লিভারে রক্ত চলাচল ও শোধন ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে, এবং ওয়াটার রিটেনশন বা এডিমার (পরিস্থিতি অনুযায়ী শরীরে জল জমা) ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাছাড়া, জাপানে ও ইউরোপে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, লিভার রোগীদের মধ্যে লবণের অতিরিক্ত গ্রহণ সংক্রান্ততা থাকতে পারে।

. অতিরিক্ত মদ্যপান (এখন মূল আলোচনা নয়, তবে উল্লেখযোগ্য)

যদিও এই বিষয়টি একান্তই অ্যালকোহল–সংশ্লিষ্ট, এটা গুরুত্বপূর্ণ যে লিভারকে অতিরিক্ত কাজ করাতে এমন যেকোনো উপাদানই ক্ষতিকর হতে পারে।
মদ্যপান লিভারের কোষগুলোর বিপাকীয় ভার বদলিয়ে দিতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে সিরোসিস বা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যদিও এই লেখায় মূলত খাবার‑ভিত্তিক উপাদানগুলো নিয়ে আলোচনা করছি, মদ্যপান এড়িয়ে চালিয়ে দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

news image
আরও খবর

. অফিশিয়াল উল্লেখযোগ্য: প্রক্রিয়াজাত মাংস অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড চর্বি

প্রক্রিয়াজাত মাংস (যেমন সসেজ, হটডগ, কনসার্ভড মাংস) ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড চর্বি যুক্ত খাবার লিভারে চর্বি সঞ্চয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। লিভারকে এসব চর্বি ভাঙা ও নিষ্ক্রিয় করতে অত্যধিক কাজ করতে হয়।
এই প্রসঙ্গে দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে গরুর মাংস বা স্যাচুরেটেড চর্বি বেশি খায়—তাদের মধ্যে NAFLD‑এর প্রবণতা একটু বেশি থাকতে পারে।

. অতিরিক্ত রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট

ভালভাবে বললে—ময়দা (refined flour) ভিত্তিক খাবার, সাদা রুটি, পেস্ট্রি, কেক, বিস্কুট, সাদা চিনি দিয়ে মিষ্টি — এসব “হাই গ্লাইসেমিক” খাবার যা দ্রুত শর্করা রক্তে ঊর্ধ্বমুখী করে।
এই ধরণের খাবার লিভারকে দ্রুত গ্লুকোজ–চিনির ঘাটতি পূরণ বা রূপান্তর করতে হয়। অতিরিক্ত গ্লুকোজ (যদি দেহ প্রয়োজনের বেশি হয়) লিভারে চর্বিতে পরিণত হতে পারে (de novo lipogenesis) — ফলস্বরূপ লিভারে চর্বি জমা হতে পারে।


আপনার লিভার সুস্থ রাখতে কি করবেন?

যা‑খাবার এড়িয়ে বা কমিয়ে, এবং কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তুলে আপনি আপনার লিভারকে ভালো রাখার দিকে যেতে পারেন। নিচে কিছু কার্যকর সুপারিশ দেওয়া হলো।

সুপারিশ : চিনি সিরাপযুক্ত পানীয় কম খাওয়া

  • প্রতিদিন গ্যাসযুক্ত কোমল পানীয় বা জুসস শীর্ষে খাওয়ার বদলে সাধারণ বা লো‑চিনি অথবা সুগার‑ফ্রি বিকল্প বিবেচনা করুন।
  • মিষ্টি খাবার বা ডেজার্টের সময় চিনির পরিমাণ সচেতনভাবে কমিয়ে আনুন।
  • খাবার মধ্যে ফ্রুকটোজ লোড কম রাখুন—যদি সম্ভব হয়, ঘরে তৈরি জুসজ বা ফলমূলই ব্যবহার করুন।
  • র‍্যাপলেসমেন্ট হিসেবে—ফলমূল বা দুধ ভিত্তিক স্বাভাবিক মিষ্টি খাবার বেছে নিন।

সুপারিশ : প্রক্রিয়াজাত ফাস্ট ফুড কম নির্বাচন করুন

  • ফাস্ট ফুড যেমন ফ্রায়েড আলু, হ্যামবার্গার, প্যাকেট স্ন্যাকস, সস–সহতো প্যাকেট খাবার—সেগুলো যত সম্ভব পরিহার করুন।
  • ঘরে রান্না করা খাবার—বিশেষ করে কম তেল–চর্বি ব্যবহার করে—সুন্দর বিকল্প।
  • খাবারে ট্রান্স চর্বি বা স্যাচুরেটেড চর্বি (লাল মাংস, কিডনি মাংস, হাই ফ্যাট দুধ) কম ব্যবহার করুন।
  • বরং সাউথ অ্যাজিয়ান বা ওয়েস্টার্ন মতো ভাজাভুজি কম, স্টিমিং, গ্রিলিং, বেকিং ধারায় খাবার তৈরির দিকে মন দিন।

সুপারিশ : লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন

  • খাবারে অতিরিক্ত লবণ না দেওয়া—বিশেষ করে প্রস্তুত খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি হয়।
  • খাবারে লবণ সাথে যদি খাঁচা বা প্যাকেট সস, চাটনি, প্রস্তুত মশলা থাকে—তাদের লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণ জেনে খাওয়ার চেষ্টা করুন।
  • ঘরে রান্নার সময় লবণের বিকল্প হিসেবে লেমন জুস, হালকা মশলা, জিরা, ধনে পাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে স্বাদ বাড়িয়ে নিতে পারেন।

সুপারিশ : রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট কম ব্যবহার করুন

  • সাদা রুটি, পাস্তা, কেক, মিষ্টি বিস্কুট-এর বদলে—হোল গ্রেইন রুটি, ব্রাউন রাইস, ওটস, এমনকি বিকল্প হিসেবে পঙ্করা বা লাল চাল ব্যবহার করুন।
  • খাবারে দ্রুত শর্করা ঊর্ধ্বগতিসহ কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে—স্লো রিলিজ কার্বোহাইড্রেট বেছে নিন, যাতে লিভারের উপর গ্লুকোজ লোড কম হয়।
  • খাবারের সাথে প্রচুর সবজি ও শাকসবজি ব্যবহার করুন — ফাইবারযুক্ত খাবার লিভারের জন্য ভালো কাজ করে।

সুপারিশ : নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

  • শারীরিক কার্যক্রম (ব্যায়াম, হাঁটা, সাইক্লিং, ইয়োগা) লিভারের উপর চর্বি জমা কমাতে ও বিপাকীয় গতিশীলতা বাড়াতে কার্যকর।
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা হলে, লিভারে চর্বি সঞ্চয়ের ঝুঁকি বেশি। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
  • ধূমপান, মদ্যপান, ওষুধ–অনিয়মিত প্রয়োগ এসব উপাদান লিভারকে অতিরিক্ত কাজ করাতে পারে—এগুলো এড়িয়ে চলা ভালো।
  • পর্যাপ্ত ঘুম, মানসম্পন্ন জীবনযাপন, মানসিক চাপ কম রাখা—এসবও লিভার সুস্থ রাখতে অবদান রাখে।

 

বিশেষ ক্ষেত্রে সতর্কতা

  • যদি আপনার ইতিমধ্যে লিভার সংক্রান্ত সমস্যা (যেমন হেপাটাইটিস, সিরোসিস, চ্রনিক লিভার ডিজিজ) থাকে—তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • কিছু ওষুধ বা হেরবাল সাপ্লিমেন্ট লিভারের উপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করতে পারে — তাই যেকোনো নতুন ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
  • গর্ভবতী মহিলা বা যাঁদের রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা রয়েছে—তাঁদের ক্ষেত্রে লিভার রক্ষার হিসাবে খাবার‑ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত।

 

আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই—সেই খাবারগুলো কখনও কখনও আমাদের দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর (যেমন লিভার) প্রতি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স চর্বি, লবণ, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের অতিরিক্ত ব্যবহার—এসব লিভারের উপর ধীরে ধীরে বোঝা বাড়িয়ে দেয়। তবে বিষয়টি হোমিওপ্যাথিক বা ভয়ের বস্তু নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত চলাফেরা, সচেতন জীবনযাপন আর সময়মতো চিকিৎসক‑পরামর্শের মাধ্যমে আমরা আমাদের লিভারকে সুস্থ রাখতে পারি।

আপনি যদি এই বিষয়ে আরও জানতে চান—যেমন “লিভারের জন্য ভাল খাবারগুলো কি কি?”, “লিভার সুস্থ রাখার জন্য সপ্তাহিক মেনু পরিকল্পনা”, বা “ভিতরে লিভারে সমস্যা হলে রুক রহিত লক্ষণগুলি কি কি?”—তাহলে আমি সেসবেও সহায়তা করতে পারি।

 

Preview image