বড়দিনে তেলমশলার খাবার এড়ানো মুশকিল। তবে সকালে একটি বিশেষ যোগাসন অভ্যাস করলে গ্যাস-অম্বল কমবে, হজমশক্তি বাড়বে।
গ্যাস-অম্বলের সমস্যা যেন বাঙালির নিত্যসঙ্গী। সকালে উঠে চা, দুপুরে ঝাল-তেলমশলা, সন্ধ্যায় টুকটাক ভাজাভুজি—সব মিলিয়ে পেটের উপর চাপ পড়বেই। ফলস্বরূপ শুরু হয় চোঁয়া ঢেকুর, বুক-গলা জ্বালা, পেটে ভারী ভাব, কখনও আবার অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যাও। তাই অনেক বাঙালি পরিবারের আলমারিতে নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে অ্যান্টাসিড। কিন্তু ওষুধ খেয়েও কি সব সময় মিলছে স্থায়ী স্বস্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অ্যান্টাসিডের উপর নির্ভরতা শরীরের পক্ষে মোটেই ভাল নয়। বরং হজমশক্তি স্বাভাবিক রাখতে চাইলে জীবনযাপনের পাশাপাশি নিয়মিত যোগাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। আর এই যোগাভ্যাস যদি হয় সহজ, নিরাপদ এবং ঘরে বসেই করা যায়, তা হলে উপকার মিলবে বহু গুণে।
সামনেই বড়দিন। মানেই কেক, পেস্ট্রি, বিরিয়ানি, চাইনিজ, রেস্তরাঁয় খাওয়াদাওয়া—সব মিলিয়ে ভূরিভোজের পরিকল্পনা প্রায় নিশ্চিত। এই সময় গ্যাস-অম্বলের সমস্যা বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবে বড়দিনে পেটের সমস্যা এড়াতে সকাল সকাল একটি বিশেষ যোগাসন অভ্যাস করলেই অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সেই আসনের নাম উপবিষ্ট পবনমুক্তাসন।
পবনমুক্তাসন যোগশাস্ত্রে অত্যন্ত পরিচিত একটি আসন। ‘পবন’ অর্থ বাতাস এবং ‘মুক্ত’ অর্থ মুক্তি। অর্থাৎ শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত গ্যাস বের করে দেওয়াই এই আসনের মূল উদ্দেশ্য। সাধারণত মাটিতে শুয়ে পবনমুক্তাসন করা হয়। তবে যাঁরা মেঝেতে বসে বা শুয়ে যোগাসন করতে অসুবিধা বোধ করেন—বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা ব্যক্তি কিংবা হাঁটু-কোমরের হালকা সমস্যা রয়েছে এমন মানুষ—তাঁদের জন্য রয়েছে এর সহজ সংস্করণ, অর্থাৎ উপবিষ্ট পবনমুক্তাসন।
এই আসনটি চেয়ারে বসেই করা যায়। পদ্ধতি সহজ, সময় লাগে কম, আর নিয়মিত অভ্যাস করলে গ্যাস-অম্বল থেকে শুরু করে অ্যাসিড রিফ্লাক্স পর্যন্ত বহু সমস্যায় মিলতে পারে স্বস্তি।
বড়দিনে খাবার নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তেল, মশলা, ময়দা, চিনি—সব মিলিয়ে হজমযন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে
পেটে অতিরিক্ত গ্যাস জমে
বুক জ্বালা ও ঢেকুরের সমস্যা বাড়ে
অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গ তীব্র হয়
কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে
উপবিষ্ট পবনমুক্তাসন নিয়মিত অভ্যাস করলে পেটের অন্ত্র সক্রিয় হয়, হজম রস নিঃসরণে সাহায্য করে এবং জমে থাকা বাতাস বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। ফলে বড়দিনে খাওয়াদাওয়ার আনন্দ বজায় রেখেও অম্বলের সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
এই আসন করার জন্য কোনও বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। একটি শক্ত, সোজা চেয়ার থাকলেই যথেষ্ট। খালি পেটে বা হালকা খাবার খাওয়ার অন্তত ৩–৪ ঘণ্টা পরে এই আসন করা সবচেয়ে ভাল।
১) চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন
চেয়ারের উপর সোজা হয়ে বসুন। দুই পায়ের পাতা মাটিতে সমান ভাবে রাখুন। হাঁটু থাকবে স্বাভাবিক অবস্থায়। দুই হাত রাখুন কোলের উপর।
২) শরীরের ভঙ্গি ঠিক রাখুন
ঘাড়, পিঠ ও মাথা থাকবে সম্পূর্ণ সোজা। চেয়ারে হেলান দেবেন না। মেরুদণ্ড যেন লম্বা রেখায় থাকে, সে দিকে বিশেষ নজর দিন।
৩) ডান হাঁটু ভাঁজ করুন
এ বার ধীরে ধীরে ডান পায়ের হাঁটু ভাঁজ করে ঊরু বুকের দিকে আনার চেষ্টা করুন। দুই হাত দিয়ে হাঁটুর ঠিক নীচে পা চেপে ধরুন।
৪) হাঁটু বুকের কাছে আনুন
যতটা সম্ভব হাঁটু বুকে ঠেকানোর চেষ্টা করুন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন। শ্বাস আটকে রাখবেন না।
৫) মাথা হাঁটুর দিকে ঝোঁকান
ধীরে ধীরে মাথা হাঁটুর দিকে নামান। এতে পেটের উপর হালকা চাপ পড়বে, যা হজমের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই অবস্থায় ২০–৩০ সেকেন্ড থাকার চেষ্টা করুন।
৬) আসন ছাড়ুন
শ্বাস নিতে নিতে দুই হাত ছেড়ে দিন। ধীরে ধীরে মাথা ও পিঠ সোজা করুন। ডান পা নীচে নামিয়ে রাখুন।
৭) বাম পায়ে একই ভাবে করুন
একই পদ্ধতিতে বাম হাঁটু ভাঁজ করে বুকের কাছে আনুন। দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে মাথা হাঁটুর দিকে নামান।
৮) কত বার করবেন?
প্রতিটি পায়ে ২০ সেকেন্ড করে মোট ৫ সেট আসনটি অভ্যাস করতে হবে। ধীরে ধীরে অভ্যাস বাড়াতে পারেন।
এই আসনটি নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের একাধিক সমস্যায় উপকার পাওয়া যায়। শুধু গ্যাস-অম্বল নয়, সামগ্রিক হজমস্বাস্থ্য বজায় রাখতেও এই আসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই আসনের প্রধান উপকারিতা হল পেটের মধ্যে জমে থাকা গ্যাস বের করে দেওয়া। ফলে ঢেকুর, পেট ফাঁপা ভাব ও বুক জ্বালার সমস্যা কমে।
পেটের অন্ত্রের উপর মৃদু চাপ পড়ায় হজম প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। খাবার দ্রুত ও সহজে হজম হয়।
যাঁদের নিয়মিত অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা GERD-এর সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আসন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিয়মিত অভ্যাসে পেটের পেশি সক্রিয় হয়, ফলে মেদ কমতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত ওজন ঝরার পথ প্রশস্ত হয়।
এই আসনে মেরুদণ্ড ও কোমরের পেশিতে রক্তসঞ্চালন ভাল হয়, ফলে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার কারণে হওয়া ব্যথা অনেকটাই কমে।
মহিলাদের ক্ষেত্রে এই আসন অভ্যাসে তলপেটের পেশি সক্রিয় হয়, যা ঋতুস্রাব অনিয়মের সমস্যায় কিছুটা সুফল দিতে পারে।
যদিও উপবিষ্ট পবনমুক্তাসন তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ, তবুও কিছু ক্ষেত্রে এই আসন এড়িয়ে চলাই ভাল।
হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
গুরুতর হাঁটুর ব্যথা বা ইনজুরি থাকলে
হার্নিয়ার সমস্যা থাকলে
পেটে সাম্প্রতিক কোনও অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
এই ধরনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা যোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তবেই আসন অভ্যাস করা উচিত।
গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় বারবার অ্যান্টাসিড খাওয়ার বদলে যদি দৈনন্দিন জীবনে এই ধরনের সহজ যোগাসন অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা হলে শরীর নিজে থেকেই সুস্থ থাকার পথ খুঁজে নেয়। বিশেষ করে বড়দিনের মতো উৎসবের সময়ে, যখন খাবার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, তখন সকাল সকাল উপবিষ্ট পবনমুক্তাসন অভ্যাস করলে সারাদিন অনেকটাই হালকা অনুভব করবেন।
বড়দিনের ভূরিভোজ হোক নিশ্চিন্তে—পেটের অস্বস্তি নয়, থাকুক শুধু উৎসবের আনন্দ। নিয়মিত যোগাভ্যাসই হতে পারে তার সহজ সমাধান।
উৎসব মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দের বড় অংশ জুড়ে থাকে পছন্দের খাবার। বড়দিনে বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তরাঁয় খাওয়া, বাড়িতে কেক–পেস্ট্রির আয়োজন, ভাজাভুজি কিংবা মশলাদার পদ—সব কিছু উপভোগ করতেই মন চায়। কিন্তু পেটের গোলমাল শুরু হলেই উৎসবের রং অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। অম্বল, গ্যাস, বুকজ্বালা বা ভারী ভাব নিয়ে তখন আর খাওয়ার আনন্দ থাকে না।
এই জায়গাতেই নিয়মিত যোগাভ্যাসের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। যোগাসন শুধু শরীরচর্চা নয়, বরং হজমযন্ত্রকে স্বাভাবিক রাখতে একটি প্রাকৃতিক ও নিরাপদ পদ্ধতি। প্রতিদিন সকালে মাত্র কয়েক মিনিট সময় বের করে উপবিষ্ট পবনমুক্তাসনের মতো সহজ আসন অভ্যাস করলে পেটের ভিতরের কার্যকলাপ সক্রিয় হয়। এতে খাবার দ্রুত হজম হয়, অন্ত্রে গ্যাস জমে থাকার প্রবণতা কমে এবং অ্যান্টাসিডের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত যোগাভ্যাস করলে শরীর খাবার সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়। অর্থাৎ মাঝেমধ্যে তেলমশলা বা বাইরের খাবার খেলেও হজমের সমস্যা তুলনামূলক কম হয়। এর সঙ্গে যদি পর্যাপ্ত জলপান, ধীরে খাওয়া এবং অতিরিক্ত রাত জাগা এড়ানোর মতো অভ্যাস যোগ করা যায়, তা হলে উৎসবের দিনগুলিতেও শরীর থাকবে অনেকটাই চনমনে।
সবচেয়ে বড় কথা, যোগাসনের জন্য আলাদা কোনও যন্ত্রপাতি বা বড় জায়গার প্রয়োজন নেই। চেয়ারে বসেই করা যায় এমন আসন বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে ব্যস্ত কর্মজীবী সবার পক্ষেই সহজ। নিয়মিত অভ্যাস করলে শুধু গ্যাস-অম্বল নয়, সার্বিক ভাবে শরীর ও মন থাকবে ভাল।
তাই বড়দিনের আনন্দ উপভোগ করতে চাইলে খাবারের পাশাপাশি শরীরের যত্নেও নজর দিন। সকালে কয়েক মিনিট যোগাভ্যাসই হতে পারে উৎসবের দিনগুলো সুস্থ ও নিশ্চিন্তে কাটানোর সবচেয়ে সহজ চাবিকাঠি।