Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মানব শরীর ছাড়াই ওষুধ পরীক্ষা রক্তমাংসের কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র তৈরি করলেন গবেষকরা

ধাতব যন্ত্র নয় সম্পূর্ণ রক্তমাংসের মতো গঠনবিশিষ্ট একটি কৃত্রিম হৃদয় তৈরি করেছেন গবেষকেরা যা আসল হৃদয়ের মতোই স্বাভাবিক ছন্দে ধুকপুক করছে। শুধু স্পন্দনই নয় এতে পেশির সঙ্কোচন ও প্রসারণও হচ্ছে বাস্তব হৃদয়ের মতো। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ওষুধ পরীক্ষা ও হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করলেন কানাডার বিজ্ঞানীরা। ধাতব যন্ত্র নয়, বরং রক্তমাংসের মতো গঠনবিশিষ্ট একেবারে বাস্তব হৃদ্‌যন্ত্রের অনুকরণে তৈরি কৃত্রিম হার্টে এবার ওষুধপত্রের যাবতীয় পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে। এই হৃদ্‌যন্ত্র দেখতে অবিকল আসল মানুষের হৃদয়ের মতো, তা ধুকপুক করে, পেশির সঙ্কোচন ও প্রসারণ হয়, এমনকি শিরা উপশিরার জালিকাও রয়েছে। ফলে ওষুধের প্রতিক্রিয়া সরাসরি হৃদ্‌পেশিতে কী প্রভাব ফেলছে, তা নিখুঁতভাবে বোঝা যাবে।

এই ঐতিহাসিক সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন কানাডার Université de Montréal-এর একদল গবেষক। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি হার্ট তৈরি করা, যা শুধুমাত্র প্রতিস্থাপনের জন্য নয়, বরং পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হবে।

কোষ কলা স্নায়ুর সমন্বয়ে ত্রিমাত্রিক হৃদ্‌যন্ত্র

গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইঁদুরের কোষ, কলা ও স্নায়ুর সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে এই নকল হৃদ্‌যন্ত্র। এটি সম্পূর্ণ ত্রিমাত্রিক গঠনের এবং এতে রয়েছে হৃদ্‌পেশি, কোষীয় স্তর, শিরা ও উপশিরার নেটওয়ার্ক। সব মিলিয়ে এটি দেখতে এবং আচরণে অবিকল একটি জীবন্ত হৃদ্‌পিণ্ডের মতো।

এই কৃত্রিম হার্টের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল এর কার্যক্ষমতা। এটি নিয়মিত স্পন্দন করছে, পেশির সঙ্কোচন ও প্রসারণ হচ্ছে স্বাভাবিক ছন্দে। অর্থাৎ, ওষুধ প্রয়োগ করলে ঠিক যেমন প্রতিক্রিয়া আসল হৃদয়ে দেখা যেত, তেমনই প্রতিক্রিয়া এখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ধাতব হার্টের সীমাবদ্ধতা কাটাল বিজ্ঞান

এতদিন পর্যন্ত কৃত্রিম হার্ট বলতে মূলত ধাতব বা যান্ত্রিক হৃদ্‌যন্ত্রকেই বোঝানো হত। সেগুলি রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলেও, গবেষণার ক্ষেত্রে তা ছিল সীমিত উপযোগী। কারণ ধাতব হার্টে কোষ নেই, কলা নেই, ফলে কোনও ওষুধ কোষে কোষে পৌঁছোচ্ছে কি না বা হৃদ্‌পেশির কার্যক্ষমতায় উন্নতি হচ্ছে কি না—তা নির্ভুলভাবে বোঝা যেত না।

এই কারণেই নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রথমে ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানো হত। সেখান থেকে সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেলে তবেই মানুষের উপর পরীক্ষার ঝুঁকি নেওয়া হত। কিন্তু এই পদ্ধতিতে যেমন সময় বেশি লাগে, তেমনই থাকে প্রাণী নির্যাতন ও মানবদেহে ঝুঁকির আশঙ্কা।

রক্তমাংসের কৃত্রিম হার্ট সেই সমস্যার সমাধান করে দিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে আর প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে।

চিপ সেন্সর ও স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার

এই নকল হৃদ্‌যন্ত্রের ভিতরে বসানো হয়েছে বিশেষ সিলিকন চিপ ও জেল, যা হৃদ্‌পেশির সঠিক সঙ্কোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি রয়েছে দুই ধরনের উন্নত সেন্সর, যা হৃদ্‌যন্ত্রের ভিতরের প্রতিটি পরিবর্তন রিয়েল টাইমে জানিয়ে দেয়।

এই সেন্সরগুলির সাহায্যে গবেষকেরা জানতে পারছেন—

  • ওষুধ প্রয়োগের পর হৃৎস্পন্দনের গতি

  • হৃদ্‌পেশির শক্তি বৃদ্ধি বা হ্রাস

  • অনিয়মিত স্পন্দনের পরিবর্তন

  • আচমকা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমছে কি না

এর ফলে গবেষণার গতি যেমন বাড়ছে, তেমনই নির্ভুলতাও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ওষুধ পরীক্ষায় ইতিমধ্যেই সাফল্য

গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্রে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, হার্টটি ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় ঠিক সেইভাবেই সাড়া দিচ্ছে, যেমনটা একটি জীবন্ত হৃদয় দিত। কোথাও স্পন্দন ধীর হচ্ছে, কোথাও নিয়মিত হচ্ছে, আবার কোথাও হৃদ্‌পেশির কর্মক্ষমতা বাড়ছে।

বর্তমানে তাঁদের মূল গবেষণার লক্ষ্য—

news image
আরও খবর
  • আচমকা হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ

  • অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক করা

  • নতুন কার্ডিয়াক ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই

  • আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে এই আবিষ্কার

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিপ্লব আনতে চলেছে। ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগ সংক্রান্ত ওষুধ বাজারে আসার আগে তার কার্যকারিতা ও ঝুঁকি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে যেমন রোগীদের ঝুঁকি কমবে, তেমনই চিকিৎসা আরও কার্যকর ও নিরাপদ হয়ে উঠবে।

শুধু হৃদ্‌রোগ নয়, আগামী দিনে এই প্রযুক্তির সাহায্যে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কৃত্রিম মডেল তৈরির পথও খুলে যেতে পারে। ফলে মানবদেহে পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমে আসবে—এমনটাই আশা বিজ্ঞানীদের।

এই রক্তমাংসের কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র প্রমাণ করে দিল, বিজ্ঞান কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কতটা এগিয়ে এসেছে। মানুষ ও প্রাণীর ঝুঁকি কমিয়ে, আরও মানবিক ও নিরাপদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথে এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে চলেছে। এতদিন হৃদ্‌রোগ সংক্রান্ত কোনও নতুন ওষুধ বাজারে আনার আগে একাধিক ধাপে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হত। প্রথমে পরীক্ষাগারে কোষের উপর পরীক্ষা, তার পরে প্রাণীর উপর প্রয়োগ, এবং সবশেষে মানুষের উপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনই থাকত অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি। কিন্তু রক্তমাংসের কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র তৈরির ফলে এই পুরো প্রক্রিয়াটিই আরও বিজ্ঞানসম্মত ও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

এই কৃত্রিম হৃদয়ে সরাসরি ওষুধ প্রয়োগ করে গবেষকেরা জানতে পারবেন, কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ হৃদ্‌পেশির উপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলছে। ওষুধের ফলে হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, হৃদ্‌পেশির শক্তি বাড়ছে না কমছে, কিংবা কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে কি না—এই সমস্ত বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ওষুধ বাজারে আসার আগেই তার কার্যকারিতা ও ঝুঁকি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে যাচাই করা যাবে।

চিকিৎসকদের মতে, এর সবচেয়ে বড় লাভ হবে রোগীদের ক্ষেত্রেই। নতুন কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে রোগীর শরীরে অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। কারণ মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগেই কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্রে সেই ওষুধের প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসা আরও কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ হয়ে উঠবে।

এই প্রযুক্তির প্রভাব শুধুমাত্র হৃদ্‌রোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। আগামী দিনে একই পদ্ধতিতে কিডনি, লিভার, ফুসফুস কিংবা মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গেরও কৃত্রিম মডেল তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা ত্রিমাত্রিক কোষ-কলা সমন্বিত মডেল তৈরি হলে ওষুধ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তখন আর মানবদেহে সরাসরি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকবে না বা অনেকটাই কমে যাবে।

এতে একদিকে যেমন প্রাণী নির্যাতন কমবে, তেমনই অন্যদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাও আরও মানবিক রূপ পাবে। এতদিন ইঁদুর বা অন্যান্য পরীক্ষাগার প্রাণীর উপর অসংখ্য ওষুধ ও রাসায়নিক প্রয়োগ করা হত, যা নিয়ে নৈতিক প্রশ্নও উঠেছে বারবার। রক্তমাংসের কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহারের ফলে সেই বিতর্ক অনেকটাই মিটে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকেরা আরও বলছেন, এই কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। জটিল হৃদ্‌অস্ত্রোপচারের আগে এই নকল হৃদয়ের উপরেই অস্ত্রোপচারের নতুন কৌশল অনুশীলন করা সম্ভব হবে। এতে রোগীর শরীরে সরাসরি পরীক্ষার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে এবং অস্ত্রোপচারের সাফল্যের হার বাড়বে।

সব মিলিয়ে, রক্তমাংসের কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র প্রমাণ করে দিয়েছে যে আধুনিক বিজ্ঞান আজ আর কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যা একসময় কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলে মনে হত, আজ তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে গবেষণাগারের ভিতরেই। 

মানুষ ও প্রাণীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে না ঠেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে এক নতুন পথের সূচনা করছে। রক্তমাংসের কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র ব্যবহার করে ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করা গেলে, গবেষণার প্রতিটি ধাপ আরও স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠবে। এতে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনই চিকিৎসার উপর মানুষের আস্থাও আরও দৃঢ় হবে।

এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ধরণকেও বদলে দিতে পারে। রোগীর শরীরে প্রয়োগের আগেই যদি কৃত্রিম অঙ্গে চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়, তবে চিকিৎসকেরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এর ফলে চিকিৎসা হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পরিকল্পিত এবং অনেক বেশি নিরাপদ। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই কৃত্রিম হৃদ্‌যন্ত্র শুধু একটি আবিষ্কার নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে ওঠা ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থার একটি শক্ত ভিত রচনা করবে।

Preview image