Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পেটের ক্যানসার বাড়ছে দ্রুত চিকিৎসকরা জানালেন চমকে দেওয়া কারণ

পেটের ক্যানসার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার হলো পেটের ভেতরের আস্তরণে অস্বাভাবিক কোষ দ্রুত বেড়ে টিউমার তৈরি করার প্রক্রিয়া। শুরুতে সাধারণত তেমন লক্ষণ দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে হজমে সমস্যা, অরুচি, ওজন কমে যাওয়া, বমিভাব ইত্যাদি উপসর্গ ধরা পড়ে। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে

জীবনযাত্রা যত উন্নত হচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানান জটিল রোগের প্রকোপ। ক্যানসার তার মধ্যেই অন্যতম ভীতিকর নাম। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন ক্যানসারের অনেক প্রকারই নিরাময়যোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও, এখনও এই রোগটি মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে—বিশেষ করে পেটের ক্যানসারের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছে। জীবনযাত্রার অবাধ পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পশ্চিমীকরণ, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, স্থূলতা বৃদ্ধি, সংক্রমণ—সব মিলেই পেটের ক্যানসার এখন একটা বড় স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

কিন্তু আসলে কী এই পেটের ক্যানসার? কেনই বা এর প্রকোপ এত দ্রুত বেড়ে চলেছে? কোন কোন অঙ্গে এই ক্যানসার হতে পারে? রোগ নির্ণয়ের পরে কোন চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে—কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন নাকি অস্ত্রোপচার—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়মই বা কী?

এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলল সম্প্রতি ঢাকুরিয়ার ‘মণিপাল হাসপাতাল’-এ চিকিৎসক শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায় ও চিকিৎসক আশুতোষ দাগার আলোচনায়। দুই বিশেষজ্ঞই পেটের ক্যানসার নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন। কারণ ক্যানসার মানেই জীবন শেষ—এই ধারণা ভুল। যথাসময়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনও সম্ভব। কিন্তু এজন্য প্রথম শর্ত হলো—উপসর্গকে অবহেলা না করা।


পেটের ক্যানসার কী?

পেটের ক্যানসার বলতে সাধারণত আমরা পাকস্থলির ক্যানসারকে বুঝি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় বিষয়টি আরও বিস্তৃত। চিকিৎসক আশুতোষ দাগা খুব স্পষ্ট করে বলেন— “পেটের মধ্যে যে যে অঙ্গ রয়েছে, সেখানে যে ক্যানসারে হয় তাকে পেটের ক্যানসার বলে।”

অর্থাৎ, ‘অ্যাবডোমিনাল ক্যানসার’ বলতে পাকস্থলির পাশাপাশি থাকে—

  • লিভারের ক্যানসার

  • গলব্লাডারের ক্যানসার

  • অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াস) ক্যানসার

  • ছোট বা বড় অন্ত্রের ক্যানসার

  • পেরিটোনিয়াল সারকমা বা টিউমার

  • অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যানসার

  • এমনকি কিডনি বা প্লীহা সম্পর্কিত কিছু ক্যানসারও পেটের ক্যানসারের আওতায় ধরা পড়ে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরা হয় অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে। কারণ এই ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রথমদিকে কোনও লক্ষণ ধরা পড়ে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে দেরিতে হাসপাতালে আসতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, অন্ত্র পেটের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে থাকে। তাই ছোট অন্ত্র ও বড় অন্ত্র—দু’ধরনের ক্যানসারই এখন দ্রুত বাড়ছে। পশ্চিমা দেশে বড় অন্ত্রের ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ হলেও, ভারতে গত কয়েক বছরে বড় অন্ত্রের ক্যানসারের গ্রাফও উঠতি।


পেটের ক্যানসার বাড়ার মূল কারণগুলো

দুই চিকিৎসকের বক্তব্যেই উঠে এসেছে—জীবনযাত্রার পরিবর্তন পেটের ক্যানসারের প্রধান কারণ।
নিচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশদে ব্যাখ্যা করা হলো—

১. স্থূলতা (Obesity)

অতিরিক্ত ওজন শরীরে হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট করে। পেটে জমা চর্বি বিশেষভাবে ঝুঁকি বাড়ায়।
স্থূলতার ফলে—

  • পাকস্থলিতে অ্যাসিডিটি বাড়ে

  • ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স হয়

  • প্রদাহজনিত সমস্যা (inflammation) দীর্ঘস্থায়ী হয়
    এই তিন মিলেই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

২. ধূমপান এবং তামাক সেবন

চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
ধোঁয়ার রাসায়নিক পদার্থ পাকস্থলির আস্তরণে ক্ষত তৈরি করে এবং ক্রমে কোষের ডিএনএ নষ্ট করে। ফলে ক্যানসার হওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়।

৩. অ্যালকোহল গ্রহণ বৃদ্ধি

মদ্যপান লিভার ও প্যানক্রিয়াস—দুই অঙ্গের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল—

  • লিভার সিরোসিস তৈরি করে

  • প্যানক্রিয়াসে জ্বালা বাড়ায়

  • পাকস্থলির কোষে মিউটেশন ঘটাতে পারে

চিকিৎসকদের মতে—“মদ্যপান যত বাড়ছে, তত বাড়ছে ক্যানসারের গ্রাফ।”

৪. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

ড. শুভায়ু বলেন— “জাঙ্ক ফুড বেশি খাচ্ছে, রিফাইন্ড ওয়েস্টার্ন ডায়েটে ঝুঁকছে—এটাই বড় সমস্যা।”

পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাসে—

  • বেশি ফ্যাট

  • বেশি চিনি

  • অতিরিক্ত প্রসেসড ফুড

  • ভাজাপোড়া

  • লাল মাংস
    —সবই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৫. সংক্রমণ: H. pylori, Hepatitis B ও C

হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) নামের ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলির ক্যানসারের প্রধান কারণ।

অন্যদিকে—

  • হেপাটাইটিস বি

  • হেপাটাইটিস সি

লিভার ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
অসংক্রমিত লিভারের উপর দীর্ঘদিনের প্রদাহ ক্যানসারের পথ তৈরি করে।

৬. শরীরচর্চার অভাব

আধুনিক মানুষ ডেস্কে বসে কাজ করে, হাঁটার বা নড়াচড়া করার সময় নেই। ফলে শরীরে চর্বি জমে, বিপাকক্রিয়া নষ্ট হয়—যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।


ভারতে রোগী দেরিতে চিকিৎসকের কাছে কেন আসেন?

চিকিৎসক শুভায়ুর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— “ভারতবর্ষে সাধারণত স্টেজ ৩ কিংবা স্টেজ ৪-এ পৌঁছে রোগীরা আমাদের কাছে আসেন।”

কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. সাধারণ উপসর্গকে অবহেলা করা

প্রথম দিকে পেটের ক্যানসারের লক্ষণগুলো খুব সাধারণ—

  • গ্যাস

  • অম্বল

  • বমিভাব

  • পেট ব্যথা

  • খিদে কমে যাওয়া

  • হালকা রক্তক্ষরণ

মানুষ এগুলোকে স্রেফ অ্যাসিডিটি বা বদহজম ভেবে ওষুধ কিনে খেয়ে নেন।
ফলে আসল রোগ লুকিয়ে থাকে।

২. সচেতনতার অভাব

অনেকেই ভাবেন—“কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই উপসর্গ বারবার দেখা দিলে তা উপেক্ষা করা বিপজ্জনক।

৩. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে না যাওয়া

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা অনকোলজিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন না অনেকেই।

৪. নিয়মিত হেলথ চেকআপের অভাব

পশ্চিমা দেশে ৪০-এর পরে নিয়মিত কোলনোস্কোপি করা হয়।
ভারতে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের সংস্কৃতি নেই।


কখন কোন চিকিৎসা দেওয়া হবে?—চিকিৎসার পথনির্দেশ

ক্যানসারের চিকিৎসা একাধিক স্তর, বিভিন্ন পদ্ধতি এবং রোগীভেদে আলাদা পরিকল্পনার সমন্বয়।
অতএব, একক কোনও চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন না।
চিকিৎসক দাগার ভাষায়— “সেরা পদ্ধতি হল মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড মিটিং।”

news image
আরও খবর

এখানে যারা থাকেন—

  • অনকোলজিস্ট

  • সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট

  • রেডিয়েশন বিশেষজ্ঞ

  • প্যাথলজিস্ট

  • গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট

  • রেডিয়োলজিস্ট

  • ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট

সব চিকিৎসক রোগীর—

  • সিটি স্ক্যান

  • এমআরআই

  • বায়োপসি রিপোর্ট

  • রক্তের রিপোর্ট

  • আল্ট্রাসাউন্ড
    —সব দেখে আলোচনা করে ঠিক করেন কোন পথে চিকিৎসা হবে।

চিকিৎসার ধাপ হতে পারে—

১. অস্ত্রোপচার (Surgery)

যখন টিউমার লোকালাইজড থাকে।

2. কেমোথেরাপি

টিউমার ছোট করতে বা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে।

3. রেডিয়েশন থেরাপি

যেখানে প্রয়োজন।

4. টার্গেটেড থেরাপি / ইমিউনোথেরাপি

নতুন প্রজন্মের অত্যাধুনিক চিকিৎসা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম।

চিকিৎসকরা বলেন—“সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে ৮০% ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া যায়।”


পেটের ক্যানসারের প্রথম দিকের লক্ষণ—যা কখনও অবহেলা করা উচিত নয়

  • হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া

  • খুব কম খাওয়াতেই পেট ভর্তি লাগা

  • বমি বমি ভাব

  • অম্বল

  • নিয়মিত গ্যাস

  • খাবার হজমে সমস্যা

  • পেট ব্যথা (বিশেষত নিয়মিত)

  • মল থেকে রক্ত আসা

  • কালচে বা কয়লার মতো মল

এই উপসর্গগুলোর যে কোনটি একাধিক সপ্তাহ ধরে থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।


“ক্যানসার মানেই জীবন শেষ নয়”—দুই চিকিৎসকেরই বার্তা

এই আলোচনা জুড়ে দুই চিকিৎসকই পরিষ্কার করে দিয়েছেন—
ক্যানসার এখন আর ‘অদম্য’ রোগ নয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে—

  • সময়মতো রোগ ধরা পড়লে

  • সঠিক চিকিৎসা নেওয়া হলে

  • লাইফস্টাইল পরিবর্তন করলে

এই রোগ মোকাবিলা করে দীর্ঘ, স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব।

তাদের একত্র বার্তা—

“উপসর্গকে অবহেলা করবেন না। সচেতন হোন, নিয়মিত পরীক্ষা করুন।”


ক্যানসার প্রতিরোধে যে জীবনযাত্রা মেনে চলা প্রয়োজন

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

  • তাজা ফল

  • সবজি

  • ফাইবার

  • কম ফ্যাট

  • কম চিনি

  • কম লাল মাংস
    —এসবই উপকারী।

ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা

নিয়মিত ব্যায়াম

৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম—ঝুঁকি কমায়।

 ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

 সংক্রমণের চিকিৎসা

H. pylori হলে দ্রুত ওষুধ সেবন প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস বি’র টিকা নেওয়া জরুরি।

 নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

বিশেষ করে ৪০-এর পরে কোলনোস্কোপি বা এন্ডোস্কোপি।


শেষ কথা

পেটের ক্যানসার এখন খুব সাধারণ হয়ে উঠছে। কিন্তু এটিকে ভয় পাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—জ্ঞান এবং সচেতনতা।
ড. শুভায়ু ও ড. দাগার কথায় স্পষ্ট—

  • জীবনযাত্রায় ভারসাম্য রাখা

  • অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বাদ দেওয়া

  • উপসর্গকে অবহেলা না করা

  • এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া

—এগুলো করলেই পেটের ক্যানসারকে হারানো সম্পূর্ণ সম্ভব।

ক্যানসার মানেই ‘শেষ’ নয়। বরং সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসা নিলে জীবনকে আবার নতুন করে ফিরে পাওয়া যায়।

Preview image