Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

তৃষ্ণার্ত কৃত্রিম মেধা তৃষ্ণা মেটাতে ডেটা সেন্টারগুলিতে কোটি কোটি গ্যালন বিশুদ্ধ জলের ব্যবহার এআই নিয়ে নয়া উদ্বেগ

বিগত কয়েক বছর যাবৎ চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। তবে এআই নিয়ে এ বার প্রকাশ্যে এল এক অন্য উদ্বেগের কথা। মানবজীবন তো বটেই, পরিবেশের উপরও কৃত্রিম মেধার রয়েছে এক ভয়ঙ্কর কুপ্রভাব! উঠে এসেছে তেমনই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিয়ে বিশ্ব জুড়ে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা নিছক প্রযুক্তিগত কৌতূহল নয়—বরং অর্থনীতি, সমাজ ও চাকরির বাজারকে ঘিরে এক গভীর অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। গত এক দশকে প্রযুক্তির উন্নতি অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়েছে। অটোমেশন, মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, জেনারেটিভ এআই—এসব শব্দ এখন শুধু প্রযুক্তিবিদদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; সাধারণ মানুষের জীবন ও কর্মজগতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এআই কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে? নাকি এটি কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে?

প্রথমেই বুঝতে হবে, প্রযুক্তির আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। শিল্পবিপ্লবের সময়ও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। যখন মেশিন মানুষের হাতের কাজ দখল করতে শুরু করল, তখনও বহু মানুষ মনে করেছিলেন, কর্মসংস্থানের অবসান ঘটবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি যেমন কিছু কাজ বিলুপ্ত করেছে, তেমনই নতুন ধরনের কাজেরও সৃষ্টি করেছে। আজকের পরিস্থিতিও অনেকটা তেমনই—তবে পার্থক্য হল, এআই শুধু শারীরিক শ্রম নয়, মেধাভিত্তিক কাজেও প্রবেশ করছে। ফলে উদ্বেগের মাত্রা অনেক বেশি।

বিশ্বের বিভিন্ন বড় সংস্থা ইতিমধ্যেই এআই নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। গ্রাহক পরিষেবা থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ, কনটেন্ট তৈরি, হিসাবরক্ষণ, এমনকি আইনগত নথিপত্র প্রস্তুত—সব ক্ষেত্রেই অটোমেশনের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে সংস্থাগুলির খরচ কমছে, কাজের গতি বাড়ছে, এবং নির্ভুলতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এরই সঙ্গে কমছে মানবসম্পদের চাহিদা। বহু সংস্থা কর্মীসংকোচনের পথে হাঁটছে, যা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।

বিশেষ করে যেসব কাজ পুনরাবৃত্তিমূলক বা নিয়মমাফিক—যেমন ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক হিসাবনিকাশ, বেসিক কাস্টমার সাপোর্ট—সেগুলি এআই সহজেই সামলাতে পারছে। ফলে এই ধরনের চাকরি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আগামী দশকে বহু প্রচলিত চাকরি হারিয়ে যেতে পারে বা তার রূপ পাল্টে যেতে পারে। উন্নত দেশগুলির পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলিও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।

ভারতের মতো দেশে, যেখানে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, সেখানে এই পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগজনক। উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কারণ, শুধুমাত্র ডিগ্রি থাকলেই আর কাজ মিলবে—এই ধারণা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। এখন প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অভিযোজন ক্ষমতা, এবং ক্রমাগত শেখার মানসিকতা।

তবে বিষয়টি একপাক্ষিক নয়। এআই যেমন কিছু কাজ কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনই নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করছে। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ারিং, এআই এথিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিক্স—এসব ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি, এআই পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্যও মানবসম্পদের প্রয়োজন। অর্থাৎ, কাজের ধরন বদলাচ্ছে, কিন্তু কাজের প্রয়োজন একেবারে শূন্য হয়ে যাচ্ছে না।

এখানে মূল প্রশ্ন হল—সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা কত দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে? যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি সময়োপযোগী পাঠক্রম চালু না করে, যদি দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না বাড়ে, তাহলে তরুণ প্রজন্ম পিছিয়ে পড়বে। শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা—এসব গুণ আগামী দিনের কর্মবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানবিক দক্ষতা বা ‘সফট স্কিল’। সহানুভূতি, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা—এসব ক্ষেত্রে এআই এখনো মানুষের সমকক্ষ নয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সৃজনশীল শিল্প, সামাজিক কাজ—এই ক্ষেত্রগুলিতে মানবিক স্পর্শ অপরিহার্য। ফলে সব কাজ এআই পুরোপুরি দখল করে নেবে—এই আশঙ্কা অতিরঞ্জিত হতে পারে।

তবে স্বীকার করতেই হবে, পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো সহজ নয়। কর্মীসংকোচন, অস্থায়ী বেকারত্ব, দক্ষতার অমিল—এসব সমস্যা বাস্তব। তাই প্রয়োজন সরকার, শিল্পসংস্থা ও শিক্ষাক্ষেত্রের যৌথ উদ্যোগ। রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রাম চালু করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে সাহায্য করা, এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা—এই সব পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। ‘একবার পড়াশোনা শেষ, তারপর সারাজীবন একই কাজ’—এই ধারণা এখন আর প্রযোজ্য নয়। কর্মজীবনে একাধিকবার নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, তাকে কাজে লাগানোর পথ খুঁজতে হবে। যাঁরা দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তাঁরাই এগিয়ে থাকবেন।

বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোও এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে। স্টার্টআপ সংস্কৃতি, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সিং—এসব নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। অনেকেই নিজস্ব দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। ফলে প্রচলিত চাকরির ধারণাও বদলে যাচ্ছে।

news image
আরও খবর

সবশেষে বলা যায়, কৃত্রিম মেধা একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই সুযোগ। এটি চাকরির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটি উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, নতুন শিল্প তৈরি করছে, এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিচ্ছে। ভয়কে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে, প্রস্তুতিই হতে পারে একমাত্র সমাধান।

তরুণ প্রজন্মের জন্য বার্তা স্পষ্ট—শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা অর্জন করুন। প্রযুক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন। শেখার প্রক্রিয়া থামাবেন না। কারণ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে অভিযোজন ক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। কৃত্রিম মেধার যুগে মানুষ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে—এমন ভাবনা হয়তো অতিরঞ্জিত। বরং বলা যায়, মানুষ ও প্রযুক্তির সমন্বয়েই তৈরি হবে আগামী দিনের কর্মজগৎ।

উপসংহার

সব দিক বিচার করলে স্পষ্ট—কৃত্রিম মেধার উত্থান শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। চাকরির বাজারে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তা একেবারেই অমূলক নয়। কারণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন এক প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, যা কেবল শারীরিক শ্রম নয়, মানসিক ও বিশ্লেষণধর্মী কাজও দ্রুত, কম খরচে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম। ফলে কর্মক্ষেত্রের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে শুধুই বিপদ হিসেবে দেখলে চলবে না—এটিকে বুঝতে হবে পরিবর্তনের অনিবার্য ধাপ হিসেবে।

চাকরি হারানোর আশঙ্কা যেমন সত্য, তেমনই সত্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও। প্রযুক্তি কখনও সম্পূর্ণভাবে মানুষকে সরিয়ে দেয় না; বরং কাজের ধরন বদলে দেয়। আজ যেসব কাজ বিলুপ্ত হচ্ছে, তার জায়গায় তৈরি হচ্ছে নতুন দক্ষতা-নির্ভর ক্ষেত্র। তবে সমস্যা হল, এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সবসময় সমান গতিতে ঘটে না। পুরনো দক্ষতা দ্রুত অচল হয়ে যায়, কিন্তু নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্য সময়, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ প্রয়োজন। এই ব্যবধানই তৈরি করছে অনিশ্চয়তা, হতাশা এবং ভয়।

তাই এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হল প্রস্তুতি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে। শুধু বইভিত্তিক জ্ঞান নয়, বাস্তব প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা, প্রযুক্তি-সচেতনতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজ স্তর থেকেই ডিজিটাল সাক্ষরতা, ডেটা বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং সমালোচনামূলক চিন্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মজীবনে থাকা মানুষদের জন্য রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা উচিত। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব নয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানবিক গুণাবলির মূল্যায়ন। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, সহমর্মিতা, নৈতিক বিচারবোধ, নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা এবং আবেগগত বুদ্ধিমত্তা এখনো মানুষের বিশেষ শক্তি। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। যেসব কাজের জন্য মানবিক সংযোগ প্রয়োজন—স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কাউন্সেলিং, সৃজনশীল শিল্প, সামাজিক উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন কখনও ফুরাবে না। বরং প্রযুক্তি সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এছাড়াও, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, অনলাইন ব্যবসা—এসব ক্ষেত্র এআই-এর যুগেও সমান প্রাসঙ্গিক। বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্ভাবনই হতে পারে ভবিষ্যতের সাফল্যের চাবিকাঠি। কর্মসংস্থানের ধারণা এখন বদলাচ্ছে; একটি স্থায়ী চাকরির বদলে বহু দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে উঠছে বহুমাত্রিক কর্মজীবন।

অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, পরিবর্তনের এই সময়টা সহজ নয়। অনেকের চাকরি যাবে, অনেককে নতুন করে শুরু করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, বেকার ভাতা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি—এসবের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দেওয়া প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে মানবিক ভারসাম্য রক্ষা করা, যাতে উন্নয়ন কেবল লাভের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।

সবশেষে বলা যায়, কৃত্রিম মেধা আমাদের ভবিষ্যৎকে ভয়াবহ করে তুলবে—এমন ধারণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনই এটিকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও ঝুঁকিহীন ভাবাও ভুল। বাস্তবতা হল, আমরা এক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করলে পিছিয়ে পড়তে হবে, আর অন্ধভাবে গ্রহণ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক শিক্ষার মনোভাব।

চাকরির বাজারে টিকে থাকার মূলমন্ত্র হবে—অভিযোজন ক্ষমতা। যে যত দ্রুত নতুন দক্ষতা শিখতে পারবে, যে প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ নয় বরং সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে, সে-ই আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। কৃত্রিম মেধার যুগে মানুষ অপ্রাসঙ্গিক নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ ও দূরদর্শিতাই প্রযুক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। ভয় নয়, প্রস্তুতি—এই হোক আগামী দিনের মূল মন্ত্র।

Preview image