ভারতের সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিত ব্যাঙ্গালুরু আজ এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী থাকল। শহরের দূষণ এবং কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মুক্তি দিতে সরকার ঘোষণা করল ভারতের প্রথম ভার্টিক্যাল ফরেস্ট সিটি বা উলম্ব অরণ্য নগরী প্রকল্পের। ইতালির মিলান শহরের ধাঁচে তৈরি এই প্রকল্পে গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলো ঢেকে থাকবে হাজার হাজার গাছগাছালিতে। এই সবুজ বিপ্লব ব্যাঙ্গালুরুকে আবার তার পুরনো গার্ডেন সিটি বা উদ্যান নগরীর তকমা ফিরিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি রাজধানী এবং একসময়ের অবসর যাপনের স্বর্গ ব্যাঙ্গালুরু আজ এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়। গত কয়েক দশক ধরে লাগামছাড়া নগরায়ন এবং গাছ কাটার ফলে এই শহর তার প্রিয় গার্ডেন সিটি বা উদ্যান নগরীর তকমা প্রায় হারাতে বসেছিল। ট্রাফিক জ্যাম আর ধুলোয় ধূসরিত এই শহরকে বাঁচাতে আজ এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কর্নাটক সরকার এবং কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে আজ ব্যাঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ড এবং ইলেকট্রনিক সিটির মধ্যবর্তী এক বিশাল এলাকায় ভারতের প্রথম ভার্টিক্যাল ফরেস্ট সিটি বা উলম্ব অরণ্য নগরী গড়ে তোলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো।
আজ সকালে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সূচনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন দেশবিদেশের নামী স্থপতি এবং পরিবেশবিদরা। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে অরণ্য বেঙ্গালুরু। ইতালির মিলান শহরের বিখ্যাত বস্কো ভার্টিকালে বা উলম্ব বনের আদলে এই প্রকল্পটি তৈরি করা হবে। তবে এর আয়তন হবে মিলানের চেয়ে অনেক গুণ বড়। প্রায় ৫০০ একর জমি জুড়ে তৈরি হবে এই সবুজ শহর।
ভার্টিক্যাল ফরেস্ট সিটি কী এবং কেন এটি আলাদা
সাধারণত আমরা জানি বন বা জঙ্গল সমতল ভূমিতে থাকে। কিন্তু ভার্টিক্যাল ফরেস্ট বা উলম্ব অরণ্যের ধারণাটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে আকাশচুম্বী বহুতল ভবনগুলোর প্রতিটি বারান্দা ছাদ এবং দেওয়াল এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে সেখানে বড় বড় গাছ এবং লতানো উদ্ভিদ জন্মায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন মাটির ওপর কোনো কংক্রিটের বাড়ি নেই বরং একটি আস্ত পাহাড় বা জঙ্গল আকাশের দিকে উঠে গেছে।
অরণ্য বেঙ্গালুরু প্রকল্পে মোট ৫০টি টাওয়ার বা মিনার তৈরি করা হবে। প্রতিটি টাওয়ারের উচ্চতা হবে ৪০ থেকে ৬০ তলা। এই টাওয়ারগুলোর গায়ে প্রায় ১ লক্ষ বড় গাছ এবং ১০ লক্ষ ছোট ও মাঝারি গাছ লাগানো হবে। এছাড়াও থাকবে অসংখ্য লতানো উদ্ভিদ এবং ফুলের গাছ। সব মিলিয়ে এই ভার্টিক্যাল ফরেস্ট সিটি প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করবে এবং প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন ফিরিয়ে দেবে। এটি শহরের ফুসফুস হিসেবে কাজ করবে।
প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য এবং প্রযুক্তি
এই শহরটি হবে সম্পূর্ণ স্মার্ট এবং পরিবেশবান্ধব। এখানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি হবে বিশ্বের অন্যতম সেরা।
১ স্বয়ংক্রিয় জলসেচ ব্যবস্থা গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাঙ্গালুরুতে জলের সংকট রয়েছে। তাই এখানে ব্যবহার করা হবে রিসাইকেলড ওয়াটার বা পুনর্ব্যবহৃত জল। প্রতিটি ফ্ল্যাট এবং অফিসের ব্যবহৃত জল পরিশোধন করে তা গাছের গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতির মাধ্যমে জলের অপচয় রোধ করা হবে। মাটির আর্দ্রতা মাপার জন্য সেন্সর বসানো থাকবে যা প্রয়োজন মতো জল সরবরাহ করবে।
২ বিশেষ ধরনের মাটি এবং গাছ নির্বাচন এত উঁচুতে সাধারণ মাটি ব্যবহার করলে ভবনের ওজন বেড়ে যাবে। তাই বিজ্ঞানীদের পরামর্শে এক বিশেষ ধরনের হালকা বা লাইটওয়েট মাটি ব্যবহার করা হবে যা জল ধরে রাখতে সক্ষম। গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। ব্যাঙ্গালুরুর আবহাওয়ার সাথে খাপ খায় এমন দেশীয় প্রজাতির গাছ যেমন নিম অশ্বত্থ এবং বিভিন্ন ফলের গাছ নির্বাচন করা হয়েছে। এই গাছগুলো পাখির আশ্রয়স্থল হবে এবং ধুলিকণা শোষণ করতে পারবে।
৩ বায়ু শোধন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানীরা বলছেন এই বিপুল পরিমাণ গাছপালা থাকার কারণে টাওয়ারগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় অন্তত ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি কম থাকবে। ফলে এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। গাছগুলো একটি প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার বা বায়ু শোধক হিসেবে কাজ করবে যা ব্যাঙ্গালুরুর বাতাসের মান বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স উন্নত করবে।
জীবনযাত্রা এবং সুযোগ সুবিধা
অরণ্য বেঙ্গালুরু কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয় এটি একটি সম্পূর্ণ শহর। এখানে থাকবে স্কুল কলেজ হাসপাতাল শপিং মল এবং অফিস। তবে সব কিছুই হবে সবুজে মোড়া। অফিসগুলো হবে গ্রিন অফিস যেখানে কাজ করার সময় মনে হবে আপনি প্রকৃতির কোলে বসে আছেন। স্কুলগুলোতে ক্লাসরুমের চেয়ে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।
বাসিন্দাদের জন্য থাকবে স্কাই ওয়াক বা আকাশ পথ। এক টাওয়ার থেকে অন্য টাওয়ারে যাওয়ার জন্য কাঁচের সেতু থাকবে যার দুপাশে থাকবে ফুলের বাগান। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলা খুললে আপনি দেখতে পাবেন কেবল সবুজ আর সবুজ। পাখির ডাকে আপনার ঘুম ভাঙবে। শহরের কোলাহল এবং দূষণ এখানে প্রবেশ করতে পারবে না।
কেন ব্যাঙ্গালুরুকে বেছে নেওয়া হলো
একসময় ব্যাঙ্গালুরুকে বলা হতো ভারতের পেনশনার্স প্যারাডাইস বা অবসরপ্রাপ্তদের স্বর্গ। এর মনোরম আবহাওয়া এবং অসংখ্য পার্কের জন্য এর নাম ছিল গার্ডেন সিটি। কিন্তু আইটি বুম বা তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের পর ছবিটা বদলে যায়। হাজার হাজার গাছ কেটে তৈরি হয় অফিস এবং ফ্লাইওভার। তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং জলস্তর নিচে নামতে থাকে।
এই হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতেই ব্যাঙ্গালুরুকে বেছে নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন আমরা চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক যে উন্নয়ন এবং প্রকৃতি হাত ধরাধরি করে চলতে পারে। আমরা ব্যাঙ্গালুরুকে আবার সেই শান্ত এবং সবুজ শহরে পরিণত করতে চাই যেখানে মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কর্মসংস্থান
এই বিশাল প্রকল্পটি ব্যাঙ্গালুরুর অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার আনবে। নির্মাণ কাজে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়াও এই ভার্টিক্যাল ফরেস্ট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর মালি কৃষিবিদ এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানীর প্রয়োজন হবে। বোটানি বা উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রদের জন্য এটি এক বড় সুযোগ।
রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পেও এর প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যেই দেশবিদেশের বিনিয়োগকারীরা এই প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। পরিবেশবান্ধব বাড়ি বা গ্রিন হোম এর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। অরণ্য বেঙ্গালুরু সেই চাহিদাই পূরণ করবে। পর্যটন শিল্পেও এর প্রভাব পড়বে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এই আশ্চর্য শহর দেখতে আসবেন।
পরিবেশবিদদের প্রতিক্রিয়া এবং চ্যালেঞ্জ
অধিকাংশ পরিবেশবিদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। আইআইএসসি বা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এর এক অধ্যাপক বলেন এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। যদি এটি সফল হয় তবে ভারতের অন্যান্য শহরের জন্যও এটি একটি মডেল হতে পারে। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রক্ষণাবেক্ষণ। এত উঁচুতে গাছপালা পরিচর্যা করা সহজ কাজ নয়। ঝড়ের সময় গাছ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গাছগুলোকে বিশেষ ভাবে আটকাতে হবে। এছাড়াও পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়তে পারে। তার জন্য জৈব পদ্ধতিতে বা বায়োলজিক্যাল পেস্ট কন্ট্রোল পদ্ধতিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। জলের জোগান ঠিক রাখাটাও এক বড় পরীক্ষা।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
সরকার জানিয়েছে এই প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হবে। প্রথম পর্যায়ে ১০টি টাওয়ার তৈরি করা হবে এবং তা সফল হলে বাকি কাজ এগোবে। অরণ্য বেঙ্গালুরু যদি সফল হয় তবে হায়দ্রাবাদ পুনে এবং চেন্নাইয়েও একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হবে।
সাধারণ মানুষের উল্লাস
ব্যাঙ্গালুরুর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে আইটি কর্মীরা এই খবরে দারুণ খুশি। হোয়াইটফিল্ডের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলেন আমরা সারাদিন এসির মধ্যে বসে কাজ করি। বাড়ি ফিরেও সেই চার দেওয়ালের মধ্যে থাকতে হয়। যদি এমন কোনো জায়গায় থাকতে পারি যেখানে প্রকৃতির স্পর্শ আছে তবে মানসিক চাপ অনেক কমবে। শহরের প্রবীণ নাগরিকরাও খুশি। তারা বলছেন ছোটবেলার সেই সবুজ ব্যাঙ্গালুরুকে আবার ফিরে পাব ভেবেই ভালো লাগছে।
উপসংহার
২০২৬ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের নগর পরিকল্পনার ইতিহাসে এক মাইলফলক। মানুষ এতদিন শহর বানাতে গিয়ে জঙ্গল ধ্বংস করেছে। আজ মানুষ শহরের ভেতরেই জঙ্গল তৈরি করতে চলেছে। অরণ্য বেঙ্গালুরু কেবল ইট পাথরের জঙ্গল নয় এটি একটি দর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা প্রকৃতির মালিক নই আমরা প্রকৃতির অংশ। কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া সবুজকে আবার ফিরিয়ে আনার এই লড়াই আমাদের বাঁচার লড়াই। যদি আমরা আমাদের শহরগুলোকে বাঁচাতে চাই তবে আমাদের মাটির দিকে নয় আকাশের দিকে তাকাতে হবে এবং সেই আকাশকে সবুজে ভরিয়ে দিতে হবে। ব্যাঙ্গালুরু আজ সেই পথ দেখাল। আশা করা যায় আগামী দিনে ভারতের প্রতিটি শহর হয়ে উঠবে এক একটি অরণ্য নগরী। জয় হিন্দ।