Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রোহিতকে হত্যাই ছিল মূল লক্ষ্য বহু দিন ধরেই চলছিল পরিকল্পনা জানাল পুলিশ

পুলিশের দাবি, ধৃত সমর্থ শিবসরণ ও পলাতক শুভম লোঙ্কারই রোহিতকে হত্যার ষড়যন্ত্রের মূল মাথা ছিলেন এবং তাঁদের পরিকল্পনাতেই হামলার চেষ্টা চালানো হয়।

রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনাটি শুধু একজন জনপ্রিয় বলিউড পরিচালকের উপর হামলার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে না। এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে দেশের বিনোদন জগতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সংগঠিত অপরাধ চক্রের প্রভাব এবং সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে ভয় ছড়ানোর কৌশল নিয়ে। পুলিশের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের চিত্র, যা বহু দিন ধরেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রোহিত শেট্টীকে প্রাণে মারাই ছিল অভিযুক্তদের মূল উদ্দেশ্য। আচমকা উত্তেজনার বশে বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই হামলার চেষ্টা হয়নি। বরং দীর্ঘ দিন ধরে নজরদারি চালিয়ে, চলাফেরার রুট খতিয়ে দেখে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বোঝার পরই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। এই কারণেই ঘটনাটিকে নিছক গুলিবর্ষণ নয়, বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার মামলা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ।

এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে পাঁচ অভিযুক্তকে আগামী পাঁচ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। ধৃতদের নাম আদিত্য জ্ঞানেশ্বর গায়কি, আনন্দ মারোতে, সিদ্ধার্থ দীপক যেনপুরে, সমর্থ শিবশরণ পোমাজি এবং স্বপ্নীল সকত। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন আরও একজন মূল চক্রী যিনি এখনও পলাতক। তাঁর নাম শুভম লোঙ্কার। পুলিশ বহু দিন ধরেই তাঁকে খুঁজছে এবং তাঁর গ্রেফতারিই এখন তদন্তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত সমর্থ শিবশরণ এবং পলাতক শুভম লোঙ্কার একসঙ্গে বসেই রোহিত শেট্টীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। পুরো পরিকল্পনার নকশা তৈরি হয়েছিল শুভম লোঙ্কারের নির্দেশে। তিনি সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত নির্দেশ দিচ্ছিলেন বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিক তথ্য রয়েছে। কারা যাবে, কখন যাবে, কোন পথে যাবে এবং কীভাবে ফিরে আসবে—এই সব কিছুই আগে থেকে ঠিক করা ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার দিন অভিযুক্তেরা একটি স্কুটারে করে রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে পৌঁছান। তবে তার আগে তাঁরা অন্য একটি জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন। সেখানেই স্কুটারটি নিয়ে আসেন অন্য এক অভিযুক্ত। অর্থাৎ একাধিক ধাপে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে কোনও একটি জায়গায় ধরা পড়লেও পুরো চক্র একসঙ্গে ফাঁস না হয়ে যায়। প্রধান বন্দুকবাজকে সহায়তা করছিলেন সমর্থ শিবশরণ। তাঁর দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি নজরে রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত সরে পড়ার ব্যবস্থা করা।

এই ঘটনার সময় রোহিত শেট্টীর নিরাপত্তারক্ষী বিষয়টি প্রথম লক্ষ্য করেন এবং তিনিই খুনের চেষ্টার অভিযোগ করেন। তাঁর তৎপরতাতেই বড়সড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ আধিকারিকেরা। নিরাপত্তারক্ষীর বয়ান অনুযায়ী, গুলিবর্ষণের ধরন এবং লক্ষ্যবস্তু দেখেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে উদ্দেশ্য ছিল কাউকে ভয় দেখানো নয়, বরং প্রাণঘাতী হামলা চালানো।

তদন্তে আরও একটি গুরুতর দিক উঠে এসেছে। এই ঘটনার সঙ্গে কুখ্যাত অপরাধচক্র লরেন্স বিশ্নোই গোষ্ঠীর যোগ থাকতে পারে বলে পুলিশের ধারণা। যদিও এখনও পর্যন্ত এই যোগসূত্র পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি, তবে একাধিক তথ্য এবং সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্ট এই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। ওই পোস্টে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলা হয়, প্রথম গুলি ছিল শুধু একটি ঝলক। পরের বার সরাসরি শোয়ার ঘরে ঢুকে গুলি চালানো হবে এবং তা রোহিতের বুকে গিয়ে বিঁধবে। পাশাপাশি গোটা বলিউডকে উদ্দেশ করে ভয় দেখানো হয় এবং বলা হয়, নির্দেশ না মানলে আরও ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

এই ধরনের হুমকি নতুন নয়। এর আগেও বলিউডের একাধিক তারকা একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। অভিনেতা সলমন খানকে বহু বার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর বাড়ির সামনেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কপিল শর্মার রেস্তরাঁর সামনে এবং অভিনেত্রী দিশা পটানীর বাড়ির সামনেও গুলি চলেছিল বলে জানা যায়। দুই হাজার চব্বিশ সালে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল রাজনীতিক বাবা সিদ্দীকীকে। সেই ঘটনার পর থেকেই বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে গুলিবর্ষণের খবর ছড়াতেই তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রাথমিক সন্দেহের তির ঘুরে যায় একই অপরাধচক্রের দিকে। পুলিশও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কারণ আগের ঘটনাগুলির সঙ্গে এই ঘটনার মিল রয়েছে। হুমকির ভাষা, সমাজমাধ্যম ব্যবহারের ধরন এবং ভয় ছড়ানোর কৌশল সব কিছুর মধ্যেই একটি ছক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পুলিশের মতে, এই ধরনের সংগঠিত অপরাধচক্র শুধু ব্যক্তিগত শত্রুতা বা আর্থিক লেনদেনের জন্য কাজ করে না। এদের মূল উদ্দেশ্য হল আতঙ্ক তৈরি করা এবং নিজেদের প্রভাব জাহির করা। বিনোদন জগতের পরিচিত মুখদের নিশানা করলে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই আতঙ্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সমাজমাধ্যম সেই আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

news image
আরও খবর

এই ঘটনার পর রোহিত শেট্টী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যাতায়াতের রুটেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, যত দিন না পর্যন্ত পুরো চক্রকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে, তত দিন এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকবে।

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও কীভাবে এই ধরনের হামলার চেষ্টা সম্ভব হল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বড় শহরগুলিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে সব জায়গায় সমান নজরদারি রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধচক্র এই সুযোগটাই নেয়।

তদন্তকারীরা এখন মূলত দু’টি দিকে নজর দিচ্ছেন। এক দিকে পলাতক শুভম লোঙ্কারের অবস্থান চিহ্নিত করা এবং তাঁকে গ্রেফতার করা। অন্য দিকে এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা যুক্ত থাকতে পারে তা খুঁজে বের করা। কারণ পুলিশের ধারণা, এত বড় পরিকল্পনা এক বা দু’জনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর পিছনে আরও লোক থাকতে পারে যারা এখনও আড়ালে রয়েছে।

এই ঘটনার প্রভাব শুধু রোহিত শেট্টী বা তাঁর পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা বলিউডেই এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক তারকা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও ব্যক্তিগত ভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনা একটি বড় সতর্ক সংকেত। এটি দেখিয়ে দিল যে সংগঠিত অপরাধচক্র এখনও কতটা সক্রিয় এবং তারা কতটা নির্দ্বিধায় সমাজের প্রভাবশালী মানুষদের নিশানা করতে পারে। পুলিশের তদন্ত এই ঘটনার পূর্ণ সত্য কত দ্রুত সামনে আনতে পারে এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।

এই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও নড়েচড়ে বসেছে। শুধুমাত্র স্থানীয় পুলিশ নয়, অপরাধচক্রের আন্তর্জাতিক যোগ বা আর্থিক লেনদেনের দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এমন বড়সড় হামলার পরিকল্পনার পিছনে অর্থ জোগানের একটি নির্দিষ্ট পথ রয়েছে। সেই টাকা কোথা থেকে এসেছে এবং কারা সেই অর্থের জোগান দিয়েছে, তা জানাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে অভিযুক্তদের অতীত অপরাধের ইতিহাস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধৃতদের মধ্যে কেউ কেউ এর আগেও ছোটখাটো অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। তবে এত বড় পরিসরের ষড়যন্ত্রে তাঁদের যুক্ত হওয়া পুলিশকে ভাবাচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা একাই সব কিছু করেছে। বরং কোনও বড় শক্তির ছত্রছায়ায় থেকে তাঁরা কাজ করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সমাজমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অপরাধচক্র কীভাবে সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে আতঙ্ক ছড়ায় এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে, এই ঘটনা তার একটি বড় উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পোস্ট শুধু ভয়ই ছড়ায় না, তদন্তকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের হুমকি পোস্টের ক্ষেত্রে আরও কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি একজন খ্যাতনামা পরিচালকের বাড়ির সামনে এভাবে গুলি চালানো সম্ভব হয়, তা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে।

সব দিক মিলিয়ে রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি সংগঠিত অপরাধ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার একটি সম্মিলিত ছবি তুলে ধরেছে। তদন্ত যত এগোবে, ততই এই ঘটনার নতুন নতুন দিক সামনে আসবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Preview image