Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কেটে যাওয়া দুধ কি শুধু ছানা বানাতেই সীমাবদ্ধ জেনে নিন বাড়ির আরও উপকারী ব্যবহার

কেটে যাওয়া দুধ মানেই ফেলে দেওয়া এমন ভাবনা ভুল। ছানা বানানোর বাইরে এই নষ্ট দুধ ব্যবহার করা যায় ঘর পরিষ্কার, বাসন মাজার মতো একাধিক গৃহস্থালি কাজে। জেনে নিন দুধের এই অজানা উপকারিতা

গরমকাল হোক বা শীতের মরসুম দুধ কেটে যাওয়া একেবারেই অচেনা ঘটনা নয়। রান্নাঘরে দুধ গরম করতে গিয়ে একটু অসতর্ক হলেই অনেক সময় দেখা যায় দুধ ফেটে যাচ্ছে। কখনও টাটকা দুধ, কখনও আবার এক দু’দিনের পুরনো দুধ দুটো ক্ষেত্রেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ মানুষই ধরে নেন, এই দুধ আর কোনও কাজে লাগবে না। ফলে বাধ্য হয়েই ফেলে দিতে হয় দুধ। তবে আদৌ কি সেটাই একমাত্র উপায়? আদতে বিষয়টি তা নয়।

অনেক গৃহিণী জানেন, কেটে যাওয়া দুধ থেকে ছানা বানানো যায়। সেই ছানা দিয়েই ঘরে তৈরি হয় সুস্বাদু কোফতা কারি, রসগোল্লা, সন্দেশ, পনিরের নানা পদ। কিন্তু ছানা বানানোর বাইরে এই নষ্ট দুধ যে গৃহস্থালির বহু কাজে ব্যবহার করা যায়, সে কথা অনেকেই জানেন না। রান্নাঘর থেকে শুরু করে বাগান, এমনকি ত্বকের যত্নেও কেটে যাওয়া দুধ হতে পারে দারুণ কাজে লাগার মতো উপাদান। চলুন, এক এক করে জেনে নেওয়া যাক দুধ কেটে গেলে কী কী ভাবে কাজে লাগাতে পারেন আপনি।

কেটে যাওয়া দুধ দিয়ে ঘরেই বানান চিজ়

অনেকের ধারণা, চিজ় বানাতে গেলে বাজার থেকে আলাদা করে বিশেষ দুধ কিনতে হয়। কিন্তু বাস্তবে কেটে যাওয়া দুধ দিয়েই ঘরে তৈরি করা সম্ভব মোৎজারেলা চিজ়ের মতো জনপ্রিয় চিজ়। পদ্ধতিটিও খুব জটিল নয়।

দুধ যখন ফাটতে শুরু করবে, তখন তাতে সামান্য ভিনিগার মিশিয়ে অনবরত নাড়তে থাকুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন দুধের জল এবং চিজ় আলাদা হয়ে গিয়েছে। এরপর একটি ছাঁকনি বা পরিষ্কার কাপড়ের সাহায্যে চিজ় আলাদা করে নিন এবং ভাল করে জল ঝরিয়ে নিন।
এরপর সেই গরম জলেই সামান্য নুন মিশিয়ে আবার সেই জল ঝরানো চিজ়টি দিয়ে দিন। মিনিট দুয়েক নাড়াচাড়া করলেই চিজ়ের টেক্সচার বদলাতে শুরু করবে। এবার চিজ়টি তুলে নিয়ে আবার জল ঝরিয়ে সেলোফেন র‌্যাপে মুড়ে তিন ঘণ্টার জন্য ফ্রিজে রেখে দিন। এই সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাবে ঘরে বানানো মোৎজারেলা চিজ়। পিৎজা, পাস্তা কিংবা স্যান্ডউইচ সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে এই চিজ়।

স্যালাড ড্রেসিংয়েও কাজে লাগে কেটে যাওয়া দুধ

স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের ঘরে আজকাল স্যালাডের চল বেড়েছে। কিন্তু স্যালাড ড্রেসিংয়ের জন্য বাজারের বিভিন্ন বোতলজাত সস বা ড্রেসিং অনেক সময়েই অতিরিক্ত কেমিক্যাল বা সংরক্ষণকারীতে ভরা থাকে। এই জায়গায় কেটে যাওয়া দুধ হতে পারে স্বাস্থ্যকর বিকল্প।

তবে এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে এই কাজে প্যাকেটজাত দুধ ব্যবহার করা যাবে না। খোলা দুধ বা স্থানীয় দুধই সবচেয়ে ভাল। নষ্ট দুধের সঙ্গে অলিভ অয়েল, নুন, গোলমরিচ, সামান্য সরষে বা লেবুর রস মিশিয়ে তৈরি করা যায় সহজ ও সুস্বাদু স্যালাড ড্রেসিং। এতে স্যালাডের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনই শরীরের পক্ষেও তা স্বাস্থ্যকর।

বেকিংয়ের কাজে নষ্ট দুধের জুড়ি মেলা ভার

শীতের মরসুম এলেই অনেক বাড়িতেই কেক, বিস্কুট, মাফিন বানানোর চল শুরু হয়। কিন্তু জানেন কি, কেটে যাওয়া দুধ বেকিংয়ের ক্ষেত্রে আরও ভাল ফল দেয়? আসলে নষ্ট দুধে থাকা অ্যাসিডিক উপাদান বেকিং সোডা বা বেকিং পাউডারের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কেক বা মাফিনকে আরও নরম ও ফোলানো করে তোলে।

কেটে যাওয়া দুধ ব্যবহার করে বানানো যায় কেক, মাফিন, কাপকেক, এমনকি প্যানকেকও। এতে খাবারের স্বাদে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে টেক্সচার আরও উন্নত হয়। ফলে পরের বার দুধ কেটে গেলে আর চিন্তা নয় সোজা কাজে লাগিয়ে ফেলুন বেকিংয়ের রেসিপিতে।

গাছের পরিচর্যায় দারুণ কার্যকর কেটে যাওয়া দুধ

শুধু রান্নাঘরেই নয়, বাগান পরিচর্যাতেও নষ্ট দুধ অত্যন্ত উপকারী। কেটে যাওয়া দুধ প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান গাছের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

এই দুধ সরাসরি গাছের গোড়ায় ঢেলে দিলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে টবের গাছ বা ফুলের গাছে এই দুধ ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার না করাই ভাল মাঝে মধ্যে অল্প পরিমাণেই যথেষ্ট।

ত্বকের যত্নেও ভরসাযোগ্য নষ্ট দুধ

রূপচর্চার ক্ষেত্রেও কেটে যাওয়া দুধের ব্যবহার বহু পুরনো। দুধে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বক পরিষ্কার করতে এবং মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে। নষ্ট দুধ ফেসপ্যাকের মতো মুখে লাগিয়ে নিতে পারেন।

মুখে লাগিয়ে ১০ ১৫ মিনিট শুকোতে দিন। এরপর সাধারণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বক হবে মসৃণ, উজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত। তবে যাঁদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাঁদের আগে হাতের ছোট অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।

news image
আরও খবর

দুধ যাতে না কাটে, রইল সহজ টোটকা

দুধ কেটে গেলে কী কী করা যায়, সে বিষয়ে অনেকেই আজকাল সচেতন হচ্ছেন। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল দুধ যেন বারবার না কাটে, তার জন্য কী কী সতর্কতা নেওয়া দরকার? কারণ দুধ কেটে যাওয়া শুধু খাবারের অপচয়ই নয়, অনেক সময় রান্নার পরিকল্পনাও ভেস্তে দেয়। একটু অসতর্কতা, ভুল পাত্র বা ভুল সংরক্ষণের কারণেই দুধ কেটে যেতে পারে। তবে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

রন্ধনশিল্পী পঙ্কজ ভাদুরিয়ার মতে, দুধ কেটে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন ও অম্লত্ব বৃদ্ধি। এই সমস্যার সহজ সমাধানও রয়েছে। তিনি বলেন, দুধ জ্বাল দেওয়ার পর তা সম্পূর্ণ ঠান্ডা করে এক চিমটে বেকিং সোডা মিশিয়ে রাখলে দুধের অম্লতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে দুধ দ্রুত কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে। তবে বেকিং সোডা খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহার করাই জরুরি, কারণ বেশি দিলে দুধের স্বাদ নষ্ট হতে পারে।

দুধ গরম করার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিত নাড়াচাড়া করা। দুধ চুলায় বসিয়ে রেখে দিলে নীচে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা দুধ ফাটার একটি বড় কারণ। মাঝেমধ্যে দুধ নাড়তে থাকলে তাপ সমান ভাবে ছড়ায় এবং দুধ কেটে যাওয়ার আশঙ্কা কমে। বিশেষ করে গরমকালে এই অভ্যাস খুবই জরুরি।

দুধ রাখার পাত্রও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক সময় ঠিকমতো পরিষ্কার না হওয়া পাত্রে দুধ রাখলে সেখানে থাকা অল্প অম্ল বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে দুধ দ্রুত কেটে যায়। তাই দুধ সংরক্ষণের জন্য সবসময় পরিষ্কার, শুকনো এবং সম্ভব হলে স্টিল বা কাচের পাত্র ব্যবহার করা উচিত। প্লাস্টিকের পাত্রে দীর্ঘ সময় দুধ রাখা এড়িয়ে চলাই ভাল।

দুধ বেশি সময় খোলা রেখে দেওয়া থেকেও বিরত থাকা দরকার। দুধ খোলা অবস্থায় থাকলে বাতাসের সংস্পর্শে এসে তাতে থাকা ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই সমস্যা আরও বেশি হয়। তাই দুধ ফুটিয়ে নেওয়ার পর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা এবং দ্রুত ফ্রিজে সংরক্ষণ করা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

ফ্রিজে দুধ রাখার সময়েও কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। দুধ কখনও ফ্রিজের দরজার পাশে রাখা উচিত নয়, কারণ দরজা খোলা বন্ধ করার ফলে সেখানে তাপমাত্রার তারতম্য বেশি হয়। বরং ফ্রিজের ভিতরের দিকে, যেখানে তাপমাত্রা তুলনামূলক ভাবে স্থির থাকে, সেখানে দুধ রাখা ভাল।

আরও একটি কার্যকর টোটকা হল দুধ গরম করার সময় তাতে এক চামচ ঠান্ডা জল মিশিয়ে নেওয়া। এতে দুধের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে এবং দুধ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে। অনেক গৃহিণী এই পদ্ধতি নিয়মিত ব্যবহার করে সুফল পেয়েছেন।

স্থানীয় বা খোলা দুধ ব্যবহার করলে তা দ্রুত ফুটিয়ে নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি। কারণ এই ধরনের দুধে প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। দুধ কেনার পর যত দ্রুত সম্ভব ফুটিয়ে নিলে দুধ দীর্ঘ সময় ভালো থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দুধ কেটে যাওয়া নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত না হওয়া। কারণ সামান্য সচেতনতা ও কয়েকটি সহজ অভ্যাসই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

উপসংহার

কেটে যাওয়া দুধ মানেই আর ফেলে দেওয়া নয় এই ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। একটু সচেতন হলেই এই নষ্ট দুধ থেকেই তৈরি করা যায় চিজ়, সুস্বাদু বেকিং আইটেম, স্বাস্থ্যকর স্যালাড ড্রেসিং। পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে ত্বকের যত্ন বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে।

অতএব, পরের বার দুধ কেটে গেলে হতাশ না হয়ে ভাবুন এই দুধকে কী ভাবে কাজে লাগানো যায়। সামান্য বুদ্ধি, সচেতনতা ও সৃজনশীলতায় নষ্ট দুধই হয়ে উঠতে পারে গৃহস্থালির এক অমূল্য সম্পদ। একই সঙ্গে কিছু সহজ টোটকা মেনে চললে দুধ কেটে যাওয়ার ঝামেলাও অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Preview image