রাজ্যে আবারও এসআইআর সংক্রান্ত আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল। একদিকে হুগলির রিষড়ায় শুনানির নোটিস পেয়ে অসুস্থ হয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানে একই আতঙ্কে এক ব্যক্তির আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও তার মানসিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। রিষড়ার ঘটনায় জানা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধ সম্প্রতি এসআইআর সংক্রান্ত একটি শুনানির নোটিস পান। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, নোটিস পাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যার মধ্যেই হঠাৎ এই প্রশাসনিক চিঠি তাঁর মধ্যে প্রবল উদ্বেগ তৈরি করে। নোটিসে কী বলা হয়েছে, কীভাবে শুনানিতে হাজির হতে হবে এই সব বিষয় নিয়ে তিনি বারবার দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, ওই আতঙ্ক থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। যদিও প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত এই মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি নোটিসের যোগসূত্র নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও মর্মান্তিক। অভিযোগ, এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির নোটিস পাওয়ার পর মানসিক চাপে পড়ে এক ব্যক্তি আত্মঘাতী হন। পরিবার ও প্রতিবেশীদের দাবি, ওই ব্যক্তি অত্যন্ত ভীত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, শুনানির প্রক্রিয়ায় তিনি হয়তো বড় কোনও সমস্যায় পড়তে পারেন বা অযথা হয়রানির শিকার হতে পারেন। এই ভয় ও মানসিক চাপই শেষ পর্যন্ত তাঁকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
রাজ্যে আবারও এসআইআর সংক্রান্ত আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ উঠে এল, যা ঘিরে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক একটি প্রক্রিয়া কীভাবে সাধারণ মানুষের মনে ভয়, উদ্বেগ এবং চরম মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, তারই যেন ভয়াবহ উদাহরণ সামনে এল এই দুই ঘটনায়। একদিকে হুগলির রিষড়ায় শুনানির নোটিস পাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগ, অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানে একই আতঙ্কে এক ব্যক্তির আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা দুটো মিলিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে।
রিষড়ার ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। জানা গিয়েছে, ওই বৃদ্ধ দীর্ঘদিন ধরেই বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবার সূত্রে দাবি, হঠাৎ করেই তিনি এসআইআর সংক্রান্ত একটি শুনানির নোটিস পান। নোটিসে কী লেখা রয়েছে, কেন তাঁকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে, সেখানে হাজির না হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এই সব বিষয় তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছিলেন না। প্রশাসনিক ভাষা, আইনি শব্দ এবং আনুষ্ঠানিক কাঠামো তাঁর কাছে ছিল দুর্বোধ্য। ফলে নোটিস হাতে পাওয়ার পর থেকেই তিনি গভীর মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নোটিস পাওয়ার পর তিনি প্রায়ই উৎকণ্ঠায় থাকতেন, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতেন না, ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয়। বারবার তিনি বলতেন, আমাকে যদি কোথাও যেতে হয়, আমি যাব কীভাবে? আমি তো এসব বুঝি না। এই মানসিক চাপের মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, নোটিসের আতঙ্কই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ। যদিও প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি এসআইআর নোটিসের যোগসূত্র নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও স্থানীয় মানুষ এবং পরিবার এই ঘটনাকে নিছক কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ। তাঁদের প্রশ্ন, যদি নোটিস না আসত, তবে কি ওই বৃদ্ধ এতটা মানসিক চাপে ভেঙে পড়তেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।
রিষড়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পূর্ব বর্ধমান থেকে আরও এক মর্মান্তিক খবর আসে। সেখানে এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির নোটিস পাওয়ার পর এক ব্যক্তি আত্মঘাতী হন বলে অভিযোগ ওঠে। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য, ওই ব্যক্তি নোটিস পাওয়ার পর থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। তিনি বারবার বলতেন, তাঁকে হয়তো বড় কোনও ঝামেলায় ফেলা হচ্ছে, তাঁকে হয়রানি করা হতে পারে। শুনানিতে কী হবে, সেখানে কী প্রশ্ন করা হবে, নিজের কাগজপত্র ঠিক না থাকলে কী বিপদ হতে পারে এই সব আশঙ্কা তাঁকে গ্রাস করে ফেলেছিল। ধীরে ধীরে এই ভয় এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনি চরম সিদ্ধান্ত নেন, যা গোটা পরিবারকে গভীর শোকে ডুবিয়ে দেয়।
এই দুই ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, প্রশাসনিক দিক থেকে এসআইআর একটি নিয়মতান্ত্রিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া হলেও, তার বাস্তব প্রয়োগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ মানুষ, কম শিক্ষিত নাগরিক এবং আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির কাছে এই ধরনের নোটিস মানে এক অজানা আতঙ্ক। তাঁরা জানেন না, এটি ঠিক কীসের জন্য, কেন তাঁদের ডাকা হচ্ছে, এবং এর পরিণতি কী হতে পারে। ফলে নোটিস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের মনে ভয় বাসা বাঁধে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফে এই ঘটনাগুলিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, মানুষের মনে ভয় না ঢুকিয়ে আরও মানবিক ও স্পষ্ট ভাষায় এই ধরনের প্রক্রিয়া চালানো উচিত ছিল। প্রশাসনের তরফে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, এসআইআর একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং কাউকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়। তবে এই দুই মৃত্যুর অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের কাছে মানুষের একটাই প্রশ্ন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টি কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? রাজ্যে ফের এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করে তুলেছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নোটিসের ভাষা অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক এবং জটিল। সেখানে আইনি শব্দ, প্রশাসনিক পরিভাষা এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। বিশেষ করে যাঁরা বয়সের কারণে দুর্বল, বা যাঁদের আইনি বিষয়ে কোনও ধারণা নেই, তাঁদের কাছে এই ধরনের চিঠি মানে এক অজানা বিপদের সংকেত। এই মানসিক চাপ কখনও কখনও শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আবার কখনও চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দেয় যেমনটি অভিযোগ উঠেছে এই দুই ঘটনায়।
এই ঘটনার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও সরব হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের উচিত ছিল আরও সংবেদনশীল ও মানবিক পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং তাঁদের বোঝানোর মাধ্যমে কাজ করা দরকার ছিল। নোটিস পাঠানোর পাশাপাশি যদি স্পষ্টভাবে জানানো হতো যে এটি একটি রুটিন প্রক্রিয়া, এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, এবং প্রয়োজন হলে কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে তাহলে হয়তো এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যেত। বিরোধীদের আরও অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নামে মানুষের মনে অযথা ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে বারবার বলা হচ্ছে, এসআইআর একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং এর উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু তথ্য যাচাই এবং আপডেট করার জন্যই এই শুনানির ব্যবস্থা। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যখন পরপর দুটি মৃত্যুর অভিযোগ উঠে আসে, তখন বিষয়টি আর শুধু নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানবিক সংকটের চেহারা নেয়।
এই প্রেক্ষিতে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রশ্ন উঠছে আইন ও প্রশাসনের কাজ কি শুধু নিয়ম মেনে চলাই, নাকি মানুষের মানসিক অবস্থার দিকটিও দেখা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? একজন প্রবীণ মানুষ বা সাধারণ নাগরিক যখন একটি নোটিস পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তখন প্রশাসনের কি কোনও দায়িত্ব নেই তাঁকে আশ্বস্ত করার? এই প্রশ্নগুলিই আজ রাজ্যের নানা প্রান্তে আলোচনার কেন্দ্রে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। নোটিসের ভাষা আরও সহজ ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন এটি কীসের জন্য। পাশাপাশি, নোটিসের সঙ্গে যদি একটি সহায়ক নির্দেশিকা দেওয়া হয়, যেখানে বলা থাকবে যে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, কোথায় যোগাযোগ করলে সাহায্য পাওয়া যাবে, তাহলে অনেকটাই ভয় কমতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি আরও মানবিক হতে পারে।
রিষড়া ও পূর্ব বর্ধমানের এই দুই ঘটনা শুধু দুটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের গল্প নয়, বরং তা গোটা সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া যখন মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তার প্রতিটি ধাপে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। নইলে একটি কাগজের চিঠিই কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে অজানা আতঙ্কের উৎস, যার পরিণতি হতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি।
এই মুহূর্তে রাজ্যের মানুষের একটাই প্রত্যাশাএই মৃত্যুর অভিযোগগুলির সঠিক তদন্ত হোক, সত্যিটা সামনে আসুক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন আর কোনও মানুষ প্রশাসনিক নোটিসের আতঙ্কে প্রাণ না হারান, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। কারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যতই নিয়মতান্ত্রিক হোক না কেন, মানুষের জীবন ও মানসিক নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে তার কোনও স্থান নেই। রাজ্যে ফের এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ সেই কঠিন সত্যটিকেই আরও একবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।