Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দূরের ভূমিকম্প, তবু শহরে তীব্র কম্পন — বিশেষজ্ঞদের মতে কারণ কলকাতার ভূগর্ভস্থ গঠন

মায়ানমারের ইয়াঙ্গন থেকে ৯৫ কিমি পশ্চিমে ভূ-পৃষ্ঠের ২৭ কিমি গভীরে ছিল ভূমিকম্পের উৎস। প্রায় ৬২০ কিমি দূরে থাকা সত্ত্বেও কলকাতায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় উদ্বেগ ছড়ায়।

দূরের ভূমিকম্প, তবু শহরে তীব্র কম্পন — বিশেষজ্ঞদের মতে কারণ কলকাতার ভূগর্ভস্থ গঠন
Environment & Geoscience

মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪ মিনিট। কলকাতা শহরের বহু বাসিন্দা আচমকা টের পান অদ্ভুত এক দোলুনি। ঘরের ঝুলন্ত ফ্যান দুলছে, জানালার কাচ কাঁপছে, কেউ কেউ বারান্দায় এসে পড়ছেন আতঙ্কে। অনেকেই ভেবেছিলেন, বুঝি কাছাকাছি কোথাও বড় ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু পরে জানা গেল, ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল মায়ানমারের ইয়াঙ্গন শহর থেকে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, ভূ-পৃষ্ঠের ২৭ কিলোমিটার গভীরে। অর্থাৎ কলকাতা থেকে প্রায় ৬২০ কিলোমিটার দূরে।

প্রশ্ন উঠছে — এত দূরের ভূমিকম্প হলেও কেন কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় এতটা স্পষ্ট ও জোরালো কম্পন অনুভূত হল? কেন আবার কাছাকাছি কিছু জায়গায় তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে কলকাতা শহরের ভূগর্ভস্থ গঠন, নরম পলিমাটি, বহুতল ভবনের চরিত্র, এবং বিশেষ করে ভূমিকম্পের সময় সৃষ্টি হওয়া কম ফ্রিকোয়েন্সির সারফেস ওয়েভ-এর মধ্যে।

এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—

  • মায়ানমারের ভূমিকম্পের প্রকৃতি ও সময়রেখা

  • কেন কলকাতায় কম্পন বেশি অনুভূত হল

  • পিজিএ (Peak Ground Acceleration) কী এবং এর গুরুত্ব

  • নরম পলিমাটি ও ইন্দো-গাঙ্গেয় অববাহিকার ভূমিকা

  • বহুতল ভবনের সঙ্গে ভূমিকম্প তরঙ্গের সম্পর্ক

  • কলকাতার মতো শহরের জন্য ভবিষ্যৎ সতর্কতা ও প্রস্তুতি

চলুন ধাপে ধাপে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক।

ভূমিকম্পের সময়রেখা: কী ঘটেছিল মায়ানমারে?

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটি হয় মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪ মিনিটে। এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.০। উৎসস্থল ছিল মায়ানমারের ইয়াঙ্গন শহর থেকে ৯৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, ভূ-পৃষ্ঠের ২৭ কিলোমিটার গভীরে। এই গভীরতা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রার বলে ধরা হয়।

এর ঠিক ১৭ মিনিট পরে, অর্থাৎ ৯টা ২১ মিনিটে, একই অঞ্চলে আরও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। দ্বিতীয় কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৩। যদিও এটি প্রথমটির তুলনায় কিছুটা দুর্বল ছিল, তবুও তা পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে কলকাতার দূরত্ব প্রায় ৬২০ কিলোমিটার। সাধারণভাবে এত দূরের ভূমিকম্পে শহরের ভিতরে খুব জোরালো কম্পন অনুভূত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, কলকাতার বহু বহুতল ও আবাসিক এলাকায় দোলুনি স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেছে। এই অস্বাভাবিক অনুভূতির কারণ খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা শুরু করেন বিশ্লেষণ।

পিজিএ কী? কেন এই সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ?

ভূমিকম্প বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ হল পিজিএ (Peak Ground Acceleration) বা সর্বোচ্চ ভূ-পৃষ্ঠ ত্বরণ। সহজ ভাষায়, এটি বোঝায়—ভূমিকম্পের সময় একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাটি সর্বোচ্চ কতটা দ্রুততায় কেঁপেছে। পিজিএ যত বেশি হবে, ভবন ও অবকাঠামোর ক্ষতির সম্ভাবনাও তত বেশি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী—

  • কলকাতায় ভূমিকম্পের পিজিএ ছিল ০.০০৩৪

  • মিজোরামের সাইহা শহরে, যা উৎসস্থলের তুলনায় অনেক কাছাকাছি (২৪০ কিমি), সেখানে পিজিএ ছিল মাত্র ০.০০১৩

  • চম্পাই শহর ইয়াঙ্গন থেকে ৩৪৭ কিমি দূরে হলেও সেখানে পিজিএ ছিল ০.০০৬৪

  • ইম্ফল ও আগরতলায় (৫০০ কিমির মধ্যে) পিজিএ ছিল যথাক্রমে ০.০০০০৮ ও ০.০০০৫

এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, দূরত্বের সঙ্গে পিজিএ সরাসরি সমানুপাতিক নয়। অর্থাৎ উৎসস্থলের কাছাকাছি থাকলেই যে কম্পন বেশি অনুভূত হবে, এমনটা সবসময় হয় না। তাহলে কলকাতার ক্ষেত্রে কী বিশেষ ঘটল?

বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা: কেন কলকাতায় কম্পন বেশি অনুভূত হল?

ভূতত্ত্ববিদ শিখেন্দ্র দে সহ একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, কলকাতার ক্ষেত্রে মূলত তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে—

  1. কম ফ্রিকোয়েন্সির সারফেস ওয়েভের প্রভাব

  2. ইন্দো-গাঙ্গেয় অববাহিকার নরম পলিমাটি

  3. বহুতল ভবনের প্রাকৃতিক কম্পন সময়কাল (Natural Frequency)

এই তিনটির সম্মিলিত প্রভাবেই দূরের ভূমিকম্প হলেও কলকাতা শহরে দোলুনি তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়েছে।

চলুন এই তিনটি বিষয় আলাদা করে বিস্তারিতভাবে বুঝে নেওয়া যাক।

১) সারফেস ওয়েভ: দূরে গিয়েও শক্তি ধরে রাখে কেন?

ভূমিকম্পের সময় মূলত তিন ধরনের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়—

  • P-wave (Primary wave)

  • S-wave (Secondary wave)

  • Surface wave (Surface seismic wave)

P ও S তরঙ্গ সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠের ভেতর দিয়ে ছড়ায় এবং দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের শক্তি দ্রুত কমে যায়। কিন্তু সারফেস ওয়েভ, বিশেষ করে Love wave ও Rayleigh wave, ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি দিয়ে ছড়ায় এবং অনেক সময় অনেক দূর পর্যন্ত শক্তি ধরে রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ানমারের ভূমিকম্পে উৎপন্ন কম ফ্রিকোয়েন্সির সারফেস ওয়েভ কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই ধরনের তরঙ্গের একটি বৈশিষ্ট্য হল—

  • এগুলি ধীর গতির হলেও দীর্ঘ সময় ধরে দোলুনি তৈরি করে

  • বহুতল ভবনগুলির স্বাভাবিক কম্পন সময়ের সঙ্গে এদের ফ্রিকোয়েন্সি মিললে রেজোন্যান্স তৈরি হয়

  • ফলে ভবনগুলো প্রকৃত কম্পনের তুলনায় আরও বেশি দুলতে থাকে

এই কারণেই বহু মানুষ জানিয়েছেন, ছোট একতলা বা দোতলা বাড়িতে তেমন কিছু বোঝা যায়নি, কিন্তু উঁচু ফ্ল্যাট বা অফিস ভবনে বসবাসকারীরা স্পষ্ট দোলুনি অনুভব করেছেন।

২) নরম পলিমাটি ও ইন্দো-গাঙ্গেয় অববাহিকার ভূমিকা

কলকাতা শহর অবস্থিত ইন্দো-গাঙ্গেয় অববাহিকায়, যা মূলত নদীবাহিত নরম পলি মাটি দিয়ে গঠিত। এই ধরনের মাটির একটি বৈশিষ্ট্য হল—এগুলি ভূমিকম্পের তরঙ্গকে শোষণ না করে বরং বাড়িয়ে তোলে (Amplification effect)।

পাথুরে অঞ্চলে ভূমিকম্প তরঙ্গ তুলনামূলক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শক্তি হারায়। কিন্তু নরম পলিমাটিতে তরঙ্গের গতি কমে যায়, ফলে তরঙ্গের শক্তি একটি জায়গায় বেশি সময় ধরে আটকে থাকে এবং কম্পন বেশি অনুভূত হয়।

এই কারণেই বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন—

অর্থাৎ কলকাতার ভূগর্ভস্থ চরিত্রই মূলত এই অভিজ্ঞতার জন্য দায়ী।

৩) বহুতল ভবন ও রেজোন্যান্স: কেন উঁচু বিল্ডিং বেশি দুলল?

ভূমিকম্পের সময় একটি ভবনের দোলার ধরন অনেকটাই নির্ভর করে তার উচ্চতা, গঠনশৈলী, এবং প্রাকৃতিক কম্পন সময়কাল (Natural Period)-এর উপর।

কম ফ্রিকোয়েন্সির সারফেস ওয়েভ সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে দোল তৈরি করে। এই দোলের সময়কাল যদি কোনও বহুতল ভবনের প্রাকৃতিক কম্পন সময়ের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সেখানে রেজোন্যান্স তৈরি হয়। এর ফলে ভবন প্রকৃত কম্পনের তুলনায় অনেক বেশি দুলতে শুরু করে।

এই কারণেই দেখা গেছে—

  • ৮–১২ তলা বা তার বেশি উঁচু ভবনগুলিতে বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি দোলুনি অনুভব করেছেন

  • ছোট বাড়ি বা নিচু ভবনে থাকা অনেকেই তেমন কিছু টের পাননি

বিজ্ঞানীদের মতে, কলকাতার মতো শহরে যেখানে বহুতলের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, সেখানে দূরবর্তী ভূমিকম্পের প্রভাবও তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে।

কলকাতার পিজিএ কম হলেও অনুভূতি বেশি কেন?

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলকাতার পিজিএ ছিল মাত্র ০.০০৩৪, যা প্রকৌশলগত দিক থেকে খুব বেশি ক্ষতিকর নয়। কিন্তু তবুও সাধারণ মানুষ দোলুনি স্পষ্টভাবে অনুভব করেছেন। এর কারণ হল—

  • পিজিএ মূলত মাটির সর্বোচ্চ ত্বরণ পরিমাপ করে, কিন্তু দোলের স্থায়িত্ব (duration) বা ফ্রিকোয়েন্সি পরিমাপ করে না

  • কলকাতায় আসা সারফেস ওয়েভ ছিল কম ফ্রিকোয়েন্সির এবং দীর্ঘস্থায়ী, যা মানুষের অনুভূতিতে বেশি প্রভাব ফেলেছে

  • বহুতল ভবনের রেজোন্যান্স এই অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে

অর্থাৎ পিজিএ কম হলেও মানবিক অভিজ্ঞতা বেশি হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব, এবং এই ঘটনাটি তারই বাস্তব উদাহরণ।

কলকাতা বনাম অন্য শহর: কেন চম্পাইয়ে পিজিএ বেশি, কিন্তু ইম্ফলে কম?

চম্পাই শহরে পিজিএ ছিল ০.০০৬৪, যা কলকাতার থেকেও বেশি। এর কারণ হতে পারে—

  • স্থানীয় ভূগর্ভস্থ স্তরের গঠন

  • ভূমিকম্প তরঙ্গের দিকনির্দেশ ও প্রতিফলন

  • ভূ-পৃষ্ঠের নিচে শক্ত ও নরম স্তরের বিন্যাস

অন্যদিকে ইম্ফল ও আগরতলায় পিজিএ অনেক কম ছিল, কারণ সেখানে ভূগর্ভস্থ স্তর তুলনামূলকভাবে শক্ত এবং তরঙ্গ দ্রুত শক্তি হারিয়েছে।

এ থেকেই বোঝা যায়, ভূমিকম্পের প্রভাব নির্ধারণে কেবল দূরত্ব নয়, বরং স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে “দূরত্ব” কেন সবকিছু নয়?

সাধারণ মানুষের ধারণা — ভূমিকম্প যত কাছাকাছি হবে, কম্পন তত বেশি হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ভূমিকম্পের প্রভাব নির্ভর করে—

  • ভূমিকম্পের গভীরতা

  • উৎপন্ন তরঙ্গের ধরন

  • তরঙ্গের যাত্রাপথে ভূস্তরের প্রকৃতি

  • স্থানীয় মাটি ও ভূগর্ভস্থ গঠন

  • ভবনের ধরন ও নির্মাণশৈলী

এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, উৎসস্থল ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে হলেও সঠিক পরিস্থিতিতে বড় শহরে স্পষ্ট কম্পন অনুভূত হতে পারে।

শহুরে অবকাঠামো ও ভূমিকম্প ঝুঁকি: কলকাতা কতটা প্রস্তুত?

কলকাতা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে ভারতের Zone III-এর মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ এখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অতীতে শহরে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়নি, কিন্তু ভবিষ্যতে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই ঘটনায় আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—

  • কলকাতার বহুতল ভবনগুলো কি ভূমিকম্প প্রতিরোধী মানদণ্ড মেনে তৈরি হচ্ছে?

  • পুরনো ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা?

  • জরুরি অবস্থায় উদ্ধার ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নরম পলিমাটির উপর গড়ে ওঠা শহরগুলিতে ভূমিকম্প ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাই কলকাতার মতো শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে Earthquake-resistant design, foundation strengthening, এবং নিয়মিত কাঠামোগত মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?

এই ভূমিকম্পে কলকাতায় কোনও বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও, ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—

  • ভূমিকম্প হলে আতঙ্কিত না হয়ে খোলা জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত

  • লিফট ব্যবহার করা উচিত নয়

  • জানালার কাচ, ভারী আলমারি বা ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকা উচিত

  • স্কুল, অফিস ও আবাসনে নিয়মিত মক ড্রিল চালু করা প্রয়োজন

দূরের ভূমিকম্পেও যদি এমন অভিজ্ঞতা হয়, তবে কাছাকাছি কোনও বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

Preview image