এমসিএ (মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন) ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়ামের লিজ নবীকরণ এবং আজাদ ময়দান ভূমি ফেরত চাওয়ার জন্য মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে আবেদন করেছে, যাতে ক্রিকেটের উন্নয়নে সহায়তা পাওয়া যায়।
ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়ামের লিজ নবীকরণ এবং আজাদ ময়দানের ঐতিহাসিক ভূমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে মহারাষ্ট্র সরকারের দ্বারস্থ এমসিএ। এই দাবিগুলি কি নিছক প্রশাসনিক, নাকি মুম্বাইয়ের ক্রিকেটীয় পরিচয়েরক্ষার শেষ প্রচেষ্টা?
ভারতীয় ক্রিকেটের কথা উঠলে, মুম্বাই শহরের নাম উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। এই শহরকে ভারতীয় ক্রিকেটের 'তীর্থক্ষেত্র' বলা হয়। যেখান থেকে উঠে এসেছেন শচীন তেন্ডুলকর, সুনীল গাভাস্কার, দিলীপ বেঙ্গসরকারের মতো অগণিত কিংবদন্তি। এই শহরের দুটি প্রাণকেন্দ্র হলো—একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতির শিখরে থাকা 'ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়াম', অন্যটি হলো মুম্বাই ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর 'আজাদ ময়দান'।
সম্প্রতি, মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (MCA) মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পেশ করেছে, যা মুম্বাইয়ের ক্রিকেটীয় ভবিষ্যতের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, এমসিএ চায় ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়ামের লিজের মেয়াদ নবীকরণ করা হোক। দ্বিতীয়ত, মুম্বাই মেট্রো নির্মাণের জন্য নেওয়া আজাদ ময়দানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবিলম্বে ফেরত দেওয়া হোক।
এই দাবিগুলি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ প্রশাসনিক আবেদন মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে মুম্বাইয়ের ক্রিকেট সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের এক জটিল সমীকরণ।
ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়াম নিছক একটি ইট-কাঠের কাঠামো নয়; এটি ভারতীয় ক্রিকেটের অগণিত ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। ১৯৭১ সালে মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার (সিসিআই) মধ্যে বিবাদের জেরে এই স্টেডিয়ামটির জন্ম। তৎকালীন এমসিএ সচিব এস. কে. ওয়াঙ্কহেডের উদ্যোগে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি খুব দ্রুতই ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামকে ছাপিয়ে মুম্বাইয়ের প্রধান ক্রিকেট ভেন্যু হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য: ওয়াঙ্কহেডের পিচ ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। এই মাঠেই রবি শাস্ত্রী এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। এই মাঠেই সুনীল গাভাস্কার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তাঁর অন্যতম সেরা ইনিংস খেলেছিলেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ২০১১ সালে এই মাঠেই মহেন্দ্র সিং ধোনির সেই ঐতিহাসিক ছক্কায় ভারত দ্বিতীয়বারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছিল। শচীন তেন্ডুলকর এই মাঠেই তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনকে বিদায় জানিয়েছিলেন।
লিজের প্রেক্ষাপট: ওয়াঙ্কহেডে স্টেডিয়ামটি মহারাষ্ট্র সরকারের মালিকানাধীন জমির ওপর নির্মিত। এমসিএ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই জমি লিজ নিয়েছিল। সেই লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় বা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ায়, এমসিএ এখন এটি নবীকরণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
এমসিএর যুক্তি: এমসিএর দাবি, ওয়াঙ্কহেডে শুধুমাত্র মুম্বাই নয়, সমগ্র ভারতীয় ক্রিকেটের একটি প্রতীক। আন্তর্জাতিক ম্যাচ, আইপিএলের মতো হাই-প্রোফাইল টুর্নামেন্ট এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের (বিশেষত রঞ্জি ট্রফির ফাইনাল) সফল আয়োজনের জন্য এই স্টেডিয়ামের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। লিজ নবীকরণ না হলে, এই স্টেডিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকীকরণ এবং ভবিষ্যতের বড় ইভেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। এমসিএ যুক্তি দেখিয়েছে যে, ক্রিকেটের উন্নয়নের স্বার্থে এবং মুম্বাইয়ের আন্তর্জাতিক সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারের উচিত অবিলম্বে এই লিজ নবীকরণ করা।
সরকারের দ্বিধা: তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। সরকারী জমি লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সরকার হয়তো লিজের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে অথবা নতুন কোনো শর্ত আরোপ করতে পারে। অতীতে, বিভিন্ন স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনকে নামমাত্র মূল্যে জমি লিজ দেওয়ার প্রথা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের রাজস্ব বিভাগ চাইবে, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী লিজের মূল্য নির্ধারিত হোক, যা এমসিএর ওপর বড় আর্থিক বোঝা চাপাতে পারে।
যদি ওয়াঙ্কহেডে হয় ভারতীয় ক্রিকেটের 'মঞ্চ', তবে আজাদ ময়দান হলো সেই 'নেপথ্য', যেখানে আগামী দিনের তারকারা তৈরি হয়। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত 'ময়দান সংস্কৃতি'র কেন্দ্রবিন্দু এই আজাদ ময়দান। এখানকার ধুলোমাখা পিচেই শচীন তেন্ডুলকর এবং বিনোদ কাম্বলির সেই ঐতিহাসিক পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছিল।
সংঘাতের সূত্রপাত: মেট্রো বনাম ময়দান বিগত কয়েক বছর ধরে, মুম্বাই শহরের ভোল বদলে দেওয়ার জন্য একাধিক মেগা পরিকাঠামো প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মুম্বাই মেট্রো লাইন-৩ (কোলাবা-বন্দ্রা-সিপজ)। এই আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো লাইনের একটি বড় অংশ আজাদ ময়দানের নিচ দিয়ে গেছে এবং স্টেশন নির্মাণের জন্য ময়দানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অস্থায়ীভাবে এমসিএর কাছ থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল।
এমসিএর বর্তমান দাবি: এমসিএর অভিযোগ, মেট্রো নির্মাণের মূল কাজ শেষ হয়ে গেলেও, মুম্বাই মেট্রো রেল কর্পোরেশন (MMRC) এখনও সেই জমি ফেরত দেয়নি। এই জমিটি এমসিএর ক্রিকেট পিচ এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জমি ফেরত না পাওয়ায়, আজাদ ময়দানে ক্রিকেটীয় কার্যকলাপ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কেন এই জমি এত মূল্যবান? মুম্বাইয়ের 'স্কুল ক্রিকেট' এবং 'ক্লাব ক্রিকেট' হলো ভারতীয় ক্রিকেটের সাপ্লাই লাইন। আজাদ ময়দান, ক্রস ময়দান এবং শিবাজি পার্ক—এই ময়দানগুলোতেই সারা বছর ধরে শত শত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই তরুণ প্রতিভারা সিনিয়র ক্রিকেটারদের চোখে পড়ে।
মেট্রো প্রকল্পের কারণে আজাদ ময়দানের প্রায় ২২টি পিচ ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমসিএর দাবি, এই জমি ফেরত পেলে তারা দ্রুত পিচগুলি পুনর্নির্মাণ করতে পারবে এবং পুরোদমে ক্রিকেট অ্যাকাডেমি ও টুর্নামেন্ট চালু করতে পারবে। এটি না হলে, মুম্বাইয়ের তৃণমূল স্তরের (grassroots) ক্রিকেট পরিকাঠামো ভেঙে পড়বে।
শহুরে উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য: এই দাবিটি মুম্বাইয়ের এক চিরন্তন বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসে—উন্নয়নের চাহিদা বনাম ঐতিহ্য ও খোলা মাঠের সংরক্ষণ। মেট্রো রেল মুম্বাইয়ের লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন যাত্রাপথের যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়ন কি শহরের আত্মাকে—তার খেলার মাঠগুলিকে—বলি দিয়ে হবে?
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ময়দান সংকুচিত হয়ে যাওয়া মুম্বাই ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অবনমনের অন্যতম প্রধান কারণ। যেখানে তরুণরা খেলার জায়গাই পাবে না, সেখানে নতুন 'তেন্ডুলকর' বা 'গাভাস্কার' তৈরি হবে কীভাবে?
এমসিএর এই দুটি দাবি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১. শীর্ষস্তর বনাম তৃণমূল (Elite vs. Grassroots): ওয়াঙ্কহেডে হলো ক্রিকেটের সর্বোচ্চ বা 'এলিট' স্তর। এখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়, যা থেকে বিপুল রাজস্ব আসে। অন্যদিকে, আজাদ ময়দান হলো 'তৃণমূল' বা ভিত্তি স্তর। যদি আজাদ ময়দানে প্রতিভা তৈরি না হয়, তবে ভবিষ্যতে ওয়াঙ্কহেডেতে খেলবে কারা? এমসিএ সরকারকে বোঝাতে চাইছে যে, ভারতীয় ক্রিকেটকে সচল রাখতে হলে এই দুটি পাইপলাইনকেই সচল রাখতে হবে।
২. আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: ওয়াঙ্কহেডের লিজ নবীকরণ এমসিএর আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। এই রাজস্বই তাদের আজাদ ময়দানের মতো জায়গায় তৃণমূল স্তরের ক্রিকেটে বিনিয়োগ করতে সাহায্য করে। তাই ওয়াঙ্কহেডের স্থায়িত্ব পরোক্ষভাবে ময়দান ক্রিকেটের স্থায়িত্বের সাথেও যুক্ত।
৩. প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ: মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে এই দুটি সিদ্ধান্তই সহজ নয়। ওয়াঙ্কহেডের ক্ষেত্রে এটি একটি উচ্চ-মূল্যের রিয়েল এস্টেট সংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত। আজাদ ময়দানের ক্ষেত্রে এটি দুটি সরকারী সংস্থার (এমসিএ এবং এমএমআরসি) মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়। মেট্রো কর্তৃপক্ষ হয়তো নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বা আনুষঙ্গিক কাজ বাকি থাকার অজুহাতে জমি ধরে রাখতে চাইতে পারে।
মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে, তাদের ওয়াঙ্কহেডের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম পরিচালনার মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেটে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে, আজাদ ময়দানের মতো ঐতিহাসিক ভূমি রক্ষা করে মুম্বাইয়ের ক্রিকেট সংস্কৃতির শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইও চালাতে হবে।
সরকারের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত যেমন মুম্বাইয়ের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তেমনই একটি ভুল বা বিলম্বিত সিদ্ধান্ত মুম্বাইকে তার 'ক্রিকেটের মক্কা' তকমা থেকে বিচ্যুত করতে পারে। এই বল এখন সম্পূর্ণরূপেই মহারাষ্ট্র সরকারের কোর্টে। ওয়াঙ্কহেডের আলো এবং আজাদ ময়দানের ধুলো—উভয়ের ভবিষ্যৎই এখন নির্ভর করছে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।