ভারতের প্রাক্তন কিংবদন্তি ক্রিকেটার সুনীল গাভাসকর মনে করছেন চলতি টি ২০ বিশ্বকাপে তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মা প্রবল প্রত্যাশার মানসিক চাপে রয়েছেন, যার প্রভাব তাঁর ব্যাটিং শুরুর উপর পড়ছে।
ভারতের প্রাক্তন কিংবদন্তি ব্যাটার সুনীল গাভাসকর মনে করেন, চলতি টি২০ বিশ্বকাপে তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মা প্রবল প্রত্যাশার চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুত সাফল্য পাওয়া একজন ব্যাটারের কাছ থেকে সমর্থকরা যেমন বড় ইনিংস আশা করেন, তেমনই দলও চায় শুরুতেই আক্রমণাত্মক সুর। কিন্তু কখনও কখনও এই অতিরিক্ত প্রত্যাশাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা। গাভাসকরের মতে, অভিষেকের ক্ষেত্রেও এখন ঠিক সেটাই ঘটছে। প্রতিভা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু শুরুর কয়েকটি ম্যাচে দ্রুত রান করার তাড়নায় তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারছেন না।
এই টুর্নামেন্টে অভিষেক এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ খেলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র,পাকিস্তান এবং নেদারল্যান্ডস এর বিরুদ্ধে তিনি দ্রুত আউট হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে তিনি এখনও বড় কোনও ইনিংস খেলতে পারেননি। কিন্তু গাভাসকর মনে করেন সংখ্যার চেয়ে মানসিক অবস্থাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বল থেকেই বড় শট খেলতে যাওয়ার প্রবণতা টি২০ ফরম্যাটে নতুন নয়, তবে সব পরিস্থিতিতে তা কার্যকর হয় না। বিশেষ করে যখন পিচে সামান্য নড়াচড়া থাকে বা নতুন বল সুইং করে, তখন ধৈর্য ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ।
গাভাসকর স্পষ্ট করে বলেছেন, ইনিংসের শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাক্রস দ্য লাইন শট এড়িয়ে চলাই অভিষেকের জন্য ভালো হবে। এই ধরনের শটে টাইমিং একটু এদিক ওদিক হলেই উইকেট চলে যেতে পারে। তার বদলে সোজা ব্যাটে খেলা, মাটিতে বল রাখা এবং ছোট ছোট রান নিয়ে খাতা খোলা অনেক বেশি কার্যকর কৌশল। একবার চোখ সেট হয়ে গেলে এবং বোলারদের গতি ও লাইন বোঝা হয়ে গেলে তখন স্বাভাবিকভাবেই বড় শট আসবে। টি২০ ক্রিকেটে ছন্দ পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রথম দশ বল টিকে থাকলে পরের কুড়ি বলেই ম্যাচের রং বদলে দেওয়া যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি দলের বোলিং বিভাগ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী কে তিনি টি২০ ফরম্যাটে হার্দিক পান্ডিয়া দলের অন্যতম ভরসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গাভাসকরের মতে, নতুন বলে যদি জসপ্রীত বুমরাহ এবং হার্দিক পান্ডিয়া দ্রুত উইকেট এনে দিতে পারেন, তাহলে মাঝের ওভারে চক্রবর্তীর স্পিন অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠবে। প্রতিপক্ষ তখন রান তোলার চাপে ঝুঁকি নিতে বাধ্য হবে এবং সেখানেই স্পিনাররা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। টি২০ ক্রিকেটে চার ওভারই একজন বোলারের সবকিছু। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যাটারকে আউট করতে পারলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে নিজের হাতে।
ভারতের শেষ ম্যাচে জয়ে বড় অবদান রেখেছেন শিবম দুবে। তিনি একত্রিশ বলে ছেষট্টি রান করে ম্যাচের গতি বদলে দেন। তাঁর ইনিংসে ছিল শক্তিশালী ড্রাইভ, পুল এবং লফটেড শটের দুর্দান্ত মিশেল। গাভাসকর বলেছেন, দুবের শটের বৈচিত্র্য এত বেশি যে তাঁকে বল করা বোলারদের জন্য কাজটা সহজ নয়। একদিকে পাওয়ার হিটিং, অন্যদিকে স্পিনের বিরুদ্ধে পা ব্যবহার করে খেলতে পারার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। টি২০ ক্রিকেটে এমন ব্যাটার অত্যন্ত মূল্যবান, যিনি অল্প বলেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
এবার সামনে সুপার এইটে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। এই ম্যাচকে সামনে রেখে দল নির্বাচন নিয়েও মত দিয়েছেন গাভাসকর। তাঁর মতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় অক্ষর প্যাটেল দলে ফিরতে পারেন। স্পিন এবং ব্যাট দুই দিকেই অবদান রাখার ক্ষমতা তাঁকে বাড়তি সুবিধা দেয়। প্রয়োজনে তিনি অর্শদীপ সিং এর জায়গা নিতে পারেন যদি পিচ স্পিন সহায়ক হয়। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন সুন্দর এর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। আট নম্বরে তাঁর ব্যাটিং ক্ষমতা দলকে গভীরতা দেয়, যা বড় টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে গাভাসকরের বার্তা খুব স্পষ্ট। প্রতিভা যথেষ্ট, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের জন্য মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতাই আসল চাবিকাঠি। অভিষেকের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করার। কয়েকটি ডট বল বা সিঙ্গেল নিয়ে শুরু করলেও সমস্যা নেই, বরং সেটাই হতে পারে বড় ইনিংসের ভিত্তি। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভালো পারফরম্যান্স আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে এবং টুর্নামেন্টের বাকি অংশে তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।
টি২০ বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচই পরীক্ষা। অভিজ্ঞদের পরামর্শ, তরুণদের উদ্যম এবং দলের সঠিক কৌশল একসঙ্গে মিললে তবেই সাফল্য আসে। অভিষেক শর্মার ব্যাট যদি আবার গর্জে ওঠে এবং বোলিং ইউনিট পরিকল্পনা অনুযায়ী পারফর্ম করে, তাহলে ভারত আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। এখন অপেক্ষা মাঠের লড়াইয়ের, যেখানে কথার চেয়ে বেশি জোরে কথা বলবে পারফরম্যান্স।
অভিজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গিতে টি২০ ক্রিকেটে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল পরিস্থিতি বোঝা এবং নিজের শক্তিকে সঠিক সময়ে কাজে লাগানো। গাভাসকরের বক্তব্যের মধ্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট। তরুণ ব্যাটাররা অনেক সময় দর্শকের প্রত্যাশা এবং সামাজিক মাধ্যমের আলোচনার চাপে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা ভুলে যান। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ইনিংসকে আলাদা করে ভাবতে হয়। শুরুটা সব সময় ঝড়ো না হলেও চলে। গুরুত্বপূর্ণ হল উইকেটে সময় কাটানো এবং নিজের ছন্দ খুঁজে নেওয়া।
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের বড় শক্তি তাঁর হাতের গতি এবং টাইমিং। এই দুটি গুণ কাজে লাগাতে হলে প্রথম কয়েক ওভারে বোলারদের পরিকল্পনা বুঝে নেওয়া দরকার। নতুন বলে বোলাররা সাধারণত শর্ট বল বা বাইরে সুইং করানো ডেলিভারিতে পরীক্ষা নেন। এই সময় ঝুঁকিপূর্ণ শট এড়িয়ে গেলে পরের দিকে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া অনেক সহজ হয়। একবার সেট হয়ে গেলে অভিষেকের মতো ব্যাটারের জন্য বাউন্ডারি খোঁজা কঠিন নয়। তাই ধৈর্য আর আত্মবিশ্বাস এই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে।
গাভাসকর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তা হল দলের সামগ্রিক ভারসাম্য। টি২০ ফরম্যাটে শুধু ওপেনার নয় মাঝের ওভারের ব্যাটার এবং বোলারদের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওপেনিংয়ে একটু ধীরগতির শুরু হয় তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই যদি মিডল অর্ডারে পাওয়ার হিটাররা থাকে। শেষ ম্যাচে দুবের ইনিংস সেটাই প্রমাণ করেছে। তাঁর ব্যাটিং দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক সময়ে আক্রমণ করলে ম্যাচের মোড় কয়েক ওভারের মধ্যেই ঘুরে যেতে পারে।
বোলিং বিভাগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও এই ফরম্যাটে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বলে দ্রুত উইকেট তুলে নিতে পারলে প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। তখন ব্যাটাররা ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয় এবং সেখানেই স্পিনারদের সুযোগ আসে। চক্রবর্তীর মতো বোলাররা তখন তাঁদের বৈচিত্র্য ব্যবহার করে ব্যাটারদের ভুল করাতে পারেন। মাঝের ওভারে রান আটকে রাখতে পারলে শেষের দিকে লক্ষ্য তাড়া করা বা রান ডিফেন্ড করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
সুপার এইটের ম্যাচগুলোতে মাঠ এবং পিচের চরিত্রও বড় ভূমিকা নেবে। কিছু পিচে স্পিন সাহায্য পেতে পারে আবার কিছু জায়গায় পেসাররা বাড়তি সুবিধা পাবেন। তাই দল নির্বাচন ম্যাচ অনুযায়ী বদলানো হতে পারে। গাভাসকরের মতামত থেকে বোঝা যায় যে তিনি ফ্লেক্সিবল কম্বিনেশনের পক্ষে। আধুনিক টি২০ ক্রিকেটে একাদশের মধ্যে বিকল্প থাকা খুব জরুরি। একজন অলরাউন্ডার বা অতিরিক্ত স্পিনার ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা। তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য বড় টুর্নামেন্ট মানেই শেখার সুযোগ। ব্যর্থতা আসবেই কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই আসল। অভিষেক যদি নিজের খেলায় বিশ্বাস রাখেন এবং অযথা তাড়াহুড়ো না করেন তাহলে তাঁর ব্যাট থেকে বড় ইনিংস আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। অভিজ্ঞদের পরামর্শ সেই পথটাই দেখাচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিরুদ্ধে ম্যাচ মানেই বাড়তি চাপ। শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ এবং ফিল্ডিং মানসিক পরীক্ষায় ফেলে দেয় ব্যাটারদের। কিন্তু এমন ম্যাচেই নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি ভালো শট বা একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনারশিপ পুরো টুর্নামেন্টের গল্প বদলে দিতে পারে। অভিষেকের সামনে সেই সুযোগই এখন অপেক্ষা করছে।
ভারতীয় দলের জন্য এই পর্যায়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপ পর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুপার এইটে আরও ধারালো ক্রিকেট খেলতে হবে। ব্যাটিং বোলিং ফিল্ডিং সব বিভাগে সমন্বয় দরকার। গাভাসকরের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে দল সঠিক পথেই রয়েছে শুধু মাঠে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দরকার। যদি অভিষেক নিজের স্বাভাবিক খেলায় ফিরে আসে এবং বোলাররা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে তাহলে ভারতের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। প্রতিটি ম্যাচ নতুন গল্প লেখে। আজ যে ব্যাটার ব্যর্থ হয়েছে কাল সেই ম্যাচের নায়ক হতে পারে। অভিষেক শর্মার ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা অটুট। অভিজ্ঞদের গুরুমন্ত্র মাথায় রেখে যদি তিনি শান্ত মাথায় খেলেন তাহলে ব্যাটিং তাণ্ডব দেখার অপেক্ষা খুব বেশি দীর্ঘ হবে না। মাঠেই মিলবে সব প্রশ্নের উত্তর।