অপরাধ করে রেলস্টেশন ব্যবহার করে পালানোর ঘটনা রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। সর্বাধুনিক ফেস রেকগনিশন ও নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধী চিহ্নিত ও গ্রেফতারের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করা হচ্ছে।
অপরাধ করে রেলস্টেশন ব্যবহার করে পালানোর প্রবণতা রুখতে এবার বড়সড় প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিল সরকার। ডাকাতি, খুন, ছিনতাই কিংবা সিরিয়াল অপরাধ—এই সমস্ত ঘটনার পর অপরাধীরা যাতে আর ভিড়ের আড়ালে রেলস্টেশনে গা ঢাকা দিতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনগুলিতে বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক এআই (Artificial Intelligence) নির্ভর ফেস রেকগনিশন ক্যামেরা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অপরাধীকে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে কন্ট্রোল রুমে।
রাজ্যের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে হাওড়া রেলস্টেশন এবং শিয়ালদহ রেলস্টেশন-সহ একাধিক বড় স্টেশনে এই ক্যামেরা বসানোর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। রেল পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের মধ্যেই রাজ্যের সমস্ত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন এই এআই নজরদারির আওতায় চলে আসবে।
দেশজুড়ে বহু আলোচিত অপরাধের তদন্তে উঠে এসেছে একটি সাধারণ বিষয়—অপরাধের পর পালানোর জন্য দুষ্কৃতীরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে রেলস্টেশন ও ট্রেন। কম খরচে, দ্রুত এবং পরিচয় গোপন রেখে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেন অপরাধীদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
হাওড়ার তবলাবাদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় খুনের ঘটনায় গুজরাত থেকে ধরা পড়া রাহুল ওরফে ভোলুর ঘটনা এই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে। তদন্তে জানা গিয়েছিল, সে একের পর এক রাজ্যে ট্রেনে ঘুরে বেড়িয়ে অপরাধ করত এবং প্ল্যাটফর্মকেই অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করত।
একইভাবে, ১৮টি সিরিয়াল কিলিংয়ে অভিযুক্ত চন্দ্রকান্ত ঝা-র ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল, খুনের পর সে ট্রেনেই রাজ্য বদল করত।
এই ধরনের একাধিক ঘটনার পর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে পুলিশি বৈঠকে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে—রেলস্টেশনের বিপুল ভিড়ে কীভাবে অপরাধীরা অনায়াসে মিশে যাচ্ছে এবং চোখের সামনে দিয়েই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
রেলপুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো অপরাধী গ্রেপ্তার বা পলাতক হলে তার সমস্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টালে আপলোড করা হয়। সেখানে অপরাধীর ছবি, মামলার বিবরণ, কোন থানায় মামলা রয়েছে—সব তথ্যই সংরক্ষিত থাকে। এই পোর্টালটি সব রাজ্যের পুলিশ বাহিনী ব্যবহার করতে পারে।
নতুন এই ব্যবস্থায়, রেলস্টেশনে বসানো এআই ক্যামেরাগুলিকে ওই কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি প্ল্যাটফর্ম বা স্টেশনের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করলেই তার মুখ ক্যামেরায় ধরা পড়বে
সঙ্গে সঙ্গে এআই সফটওয়্যার ওই মুখের ছবি ডেটাবেসে থাকা লক্ষ লক্ষ ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে
মিল পাওয়া গেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কন্ট্রোল রুমে অ্যালার্ট পাঠানো হবে
অ্যালার্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে—
অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন মামলায় পলাতক
তিনি বর্তমানে কোন প্ল্যাটফর্ম বা স্টেশনের কোন অংশে অবস্থান করছেন
এই তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট স্টেশনের জিআরপি অফিসাররা তৎক্ষণাৎ তল্লাশি চালিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন।
এই গোটা ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে রেল ও রেলপুলিশ একসঙ্গে কাজ করছে। রেল কর্তৃপক্ষ স্টেশনগুলিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা বসানোর দায়িত্ব নিয়েছে, আর রেলপুলিশ সেই ক্যামেরার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ ও অভিযানের কাজ করবে।
শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশনেই প্রথম ধাপে ১০০টিরও বেশি এআই-সক্ষম ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে দুর্গাপুর, আসানসোল, মালদা টাউন, নিউ জলপাইগুড়ি-সহ রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিও এই নজরদারির আওতায় আসবে।
রেলপুলিশের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু অপরাধী ধরতেই নয়, সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াতেও বড় ভূমিকা নেবে। ছিনতাই, মহিলা নির্যাতন, শিশু পাচারের মতো অপরাধ আগেভাগেই ঠেকানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্টেশনে ভিনরাজ্যের পলাতক অপরাধীদের আনাগোনা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেলপুলিশ সূত্রের খবর, ভবিষ্যতে এই ফেস রেকগনিশন ব্যবস্থার সঙ্গে
নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য
শিশু উদ্ধার সংক্রান্ত ডেটাবেস
সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত নজরদারি তালিকাও
সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, রেলস্টেশনকে আর অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় হতে দেওয়া হবে না—এই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল সরকার ও রেলপুলিশের এই সর্বাধুনিক উদ্যোগ।
রেলপুলিশ সূত্রের খবর, ভবিষ্যতে এই ফেস রেকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বহুমুখী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র পলাতক অপরাধী শনাক্ত করাই নয়, বরং সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সমস্যা সমাধানেও এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে চায় প্রশাসন। তারই অংশ হিসেবে এই এআই-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে ধাপে ধাপে সংযুক্ত করা হবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভাণ্ডার, শিশু উদ্ধার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস এবং সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত নজরদারি তালিকা।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতি বছর রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত রেলস্টেশন বা ট্রেনের আশপাশে ঘোরাফেরা করেন বলে তদন্তে উঠে আসে। এতদিন এইসব নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে পুলিশকে নির্ভর করতে হতো পোস্টার, ম্যানুয়াল অনুসন্ধান কিংবা সাধারণ মানুষের তথ্যের উপর। কিন্তু ফেস রেকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি কোনো নিখোঁজ ব্যক্তি স্টেশনে প্রবেশ করেন, তবে ক্যামেরায় ধরা পড়া মুখের সঙ্গে ডেটাবেসে থাকা ছবির মিল ঘটিয়ে দ্রুতই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে বহু পরিবার তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে ফেরত পাওয়ার আশা দেখতে পাচ্ছেন।
শিশু উদ্ধার সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। শিশু পাচার একটি বড় সামাজিক সমস্যা, যেখানে রেলস্টেশন ও ট্রেন বহু সময়েই পাচারকারীদের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। নিখোঁজ বা পাচার হওয়া শিশুদের ছবি যদি কেন্দ্রীয় শিশু উদ্ধার ডেটাবেসে সংরক্ষিত থাকে এবং তা এই এআই ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে কোনো শিশুকে স্টেশনে দেখা মাত্রই সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে কন্ট্রোল রুমে। এতে করে রেলপুলিশ ও সংশ্লিষ্ট শিশু কল্যাণ সংস্থাগুলি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে এবং বড়সড় মানব পাচার চক্র ভাঙার পথও সহজ হবে।
সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত নজরদারির ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে নিরাপত্তা মহল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন বা সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সদস্যরা প্রায়শই পরিচয় গোপন রেখে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাতায়াত করে। রেলপথ তাদের কাছে বরাবরই সহজ ও নিরাপদ মাধ্যম। এআই-নির্ভর ফেস রেকগনিশন ব্যবস্থার সঙ্গে যদি সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত নজরদারি তালিকা যুক্ত থাকে, তবে সন্দেহভাজন কেউ স্টেশনে পা রাখলেই তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক হয়ে যাবে নিরাপত্তা বাহিনী। এতে বড়সড় নাশকতার আগেই বিপদ ঠেকানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রেলপুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, “এই প্রযুক্তি আসলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। অপরাধী জানবে যে, রেলস্টেশন আর আগের মতো নিরাপদ আশ্রয় নয়। ফলে অপরাধ করার আগে দু’বার ভাবতে বাধ্য হবে।” তাঁর মতে, প্রযুক্তির এই উপস্থিতি অপরাধ দমনে মানসিক চাপ তৈরি করবে, যা অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা রুখে দিতে সাহায্য করবে।
এদিকে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও এই উদ্যোগকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত বোধ করছেন, তেমনই অন্যদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসছে। তবে রেল ও রেলপুলিশ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে আইনগত কাঠামোর মধ্যেই করা হবে এবং শুধুমাত্র অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তার স্বার্থেই ডেটা ব্যবহার করা হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এআই-ভিত্তিক ফেস রেকগনিশন ক্যামেরা বসানোর মাধ্যমে রেলস্টেশনগুলিকে নতুন করে নিরাপত্তার ছাতার নিচে আনতে চলেছে সরকার ও রেলপুলিশ। অপরাধী ধরা, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, শিশু উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী ভূমিকা নিতে পারে। রেলস্টেশনকে আর অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় হতে দেওয়া হবে না—এই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল এই সর্বাধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী উদ্যোগ।