প্রায় সাত দশক ধরে জাদুঘরে রাখা জীবাশ্মটি ম্যামথের জীবাশ্ম বলে মনে করা হত, তবে এখন জানা গেছে এটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রাণীর জীবাশ্ম, যা ম্যামথ বা হাতি গোত্রের নয়
প্রায় সাত দশক ধরে আলাস্কার একটি জাদুঘরে রাখা জীবাশ্মটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ম্যামথের জীবাশ্ম বলে মনে করা হত। ১৯৫১ সালে জীবাশ্মটির সন্ধান মেলে আলাস্কার এক সোনার খনি থেকে, এবং তারপর থেকে তা আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে শোভা পাচ্ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই জীবাশ্মকে ম্যামথের জীবাশ্ম বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ৭০ বছরেরও বেশি সময় পর একটি নতুন গবেষণায় জানা গেল, এটি আসলে ম্যামথের নয়, বরং দুটি ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম।
এই জীবাশ্মটি দীর্ঘ সময় ধরে অনেককে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। প্রথম দিকে, জীবাশ্মটির আকার ও বৈশিষ্ট্য দেখে একে ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ম্যামথ, যা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ছিল এক ধরনের বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং তার বিশাল দাঁত ও লোমশ শরীরের জন্য বিখ্যাত। তাই জীবাশ্মটি ম্যামথের হতে পারে এমন ধারণা তৈরি হয় এবং বহু বছর ধরে সেটি ওইভাবে পরিচিত ছিল।
কিন্তু নতুন গবেষণা এই ধারণাটিকে ভেঙে দিয়েছে। আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিউজিয়াম অফ দ্য নর্থ’ সম্প্রতি জীবাশ্মটির রেডিয়োকার্বন ডেটিং করে এবং এতে পাওয়া ফলাফল গবেষকদের অবাক করে দিয়েছে। দেখা গেছে জীবাশ্মটি তিন হাজার বছরেরও পুরোনো নয়। এর বয়স আনুমানিক ১৮৫৪ থেকে ২৭৩১ বছর পুরানো এবং এটি দুটি ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম, একটি মিঙ্কে হোয়েল এবং অন্যটি নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েল।
গবেষকরা আরও জানাচ্ছেন যে এই জীবাশ্মটি প্রায় ৭৫ বছর ধরে ভুলভাবে ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এই জীবাশ্মের স্থান এবং এটি কোথায় পাওয়া গিয়েছিল, তা বেশ রহস্যজনক। আলাস্কার উপকূলরেখা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে, এক সোনার খনি থেকে এটি পাওয়া গিয়েছিল। এটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই তিমির জীবাশ্ম এত দূরে প্রবাহিত হয়ে এল।
বিভিন্ন গবেষকরা কয়েকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। কেউ মনে করেন, তিমিগুলি ইউকন এবং তানানা নদী দিয়ে স্থলভাগে প্রবাহিত হতে পারে। তবে, নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের মতো বিশাল তিমির জন্য এটি অসম্ভব হতে পারে, কারণ তার আকার অনেক বড়। অন্য একটি তত্ত্ব হল, মানুষ প্রাচীন কালে এই তিমির হাড়গুলি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য স্থলভাগে নিয়ে আসতে পারে। তবে এই তত্ত্বগুলির কোনোটি প্রমাণিত হয়নি।
এই গবেষণার মাধ্যমে একটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ভুল ধারণা শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেছে। এটি বিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ভুল ব্যাখ্যা এবং ধারণা শেষ পর্যন্ত সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিকোণ খুলে দিয়েছে, যেখানে গবেষণা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভুল ধারণা সংশোধন করা সম্ভব হয়।
এখন জীবাশ্মবিদেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে ম্যামথের জীবাশ্ম বলে যা এত দিন ধরে পরিচিত ছিল তা আসলে দুটি ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম ছিল। এটি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রাপ্তি এবং এটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কোনো ভুল ধারণা সংশোধন করতে সক্ষম হন, যা ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায় যোগ করে।
আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিউজিয়াম অফ দ্য নর্থ’ সম্প্রতি একটি গবেষণা কার্যক্রম চালু করে যার উদ্দেশ্য ছিল ম্যামথ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ। এই প্রকল্পের আওতায় জীবাশ্মটির রেডিয়োকার্বন ডেটিং করা হয়। এতে দেখা যায়, জীবাশ্মটি মোটেও ম্যামথের নয়। এটি ছিল প্রায় ১৮৫৪ থেকে ২৭৩১ বছরের পুরানো এবং সঠিকভাবে দুটি ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম ছিল, যার মধ্যে একটি মিঙ্কে হোয়েল এবং অন্যটি নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েল।
প্রাথমিকভাবে, যেহেতু জীবাশ্মটির আকার বিশাল ছিল এবং দাঁতগুলো খুবই বড়, তাই প্রত্নতাত্ত্বিকরা এটিকে ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে ধরেছিলেন। কিন্তু গবেষণার পরে তারা নিশ্চিত হন যে এটি সামুদ্রিক প্রাণীর, বিশেষত তিমির জীবাশ্ম। এই জীবাশ্মে পাওয়া গিয়েছিল এমন আইসোটোপ, যেমন নাইট্রোজন-১৫ এবং কার্বন-১৩, যা স্থলচর প্রাণীর মধ্যে পাওয়া গেলেও সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া, জীবাশ্ম থেকে পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষায় আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি ম্যামথের নয়।
এই জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছিল আলাস্কার উপকূলরেখা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে, একটি সোনার খনি থেকে। এমন একটি জায়গা যেখানে তিমির জীবাশ্ম পাওয়া একধরনের রহস্য সৃষ্টি করেছে। সাধারণত, তিমিরা সমুদ্রপথে চলাচল করে, কিন্তু ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে কীভাবে তাদের জীবাশ্ম পাওয়া গেল তা একটি অস্বাভাবিক এবং আকর্ষণীয় প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে কয়েকটি সম্ভাবনা উত্থাপন করেছেন, তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
কিছু জীবাশ্মবিদ মনে করেন যে তিমিরা সম্ভবত ইউকন এবং তানানা নদী দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করেছিল। এই তত্ত্বটি মিঙ্কে হোয়েলের জন্য বেশ সম্ভাব্য মনে হয়, কারণ মিঙ্কে হোয়েল ছোট আকারের এবং এটি নদীপথে চলাচল করতে সক্ষম হতে পারে। তবে নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এই প্রজাতির তিমির আকার অনেক বড়, এবং তার জন্য নদীপথে প্রবাহিত হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের বিশাল আকার এবং শারীরিক গঠন এটিকে নদীর মতো সংকীর্ণ জলস্রোতে চলাচল করা থেকে বিরত রাখে।
অন্য একটি তত্ত্ব হলো, প্রাচীন সময়ে মানব সমাজ সম্ভবত এই তিমিরা হত্যা করে তাদের হাড়গুলি স্থলভাগে নিয়ে এসেছে, বিশেষভাবে এটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কিছু গবেষক মনে করেন যে মানুষ তিমির এই জীবাশ্মগুলিকে একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে স্থলভাগে নিয়ে এসেছিল। তবে এই তত্ত্বটিও এখনো প্রমাণিত নয় এবং এটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এছাড়া, কিছু জীবাশ্মবিদ আরও দাবি করেন যে সম্ভবত তিমিরা আলাস্কা উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় থাকত এবং প্রবল স্রোত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের জীবাশ্ম এক সময় মাটির নিচে চলে গিয়েছিল, যার কারণে সেগুলি সোনার খনির মতো স্থানে অবস্থিত হয়ে পড়ে। তবে এই ধারণাটিও নিশ্চিত নয়, কারণ এর জন্য আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।
এই রহস্যপূর্ণ জীবাশ্মগুলি নিয়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা হয়তো একদিন এর সঠিক কারণ জানাতে সক্ষম হবেন। তবে এই ঘটনা আমাদের দেখায় যে, জীবাশ্মবিদ্যা শুধুমাত্র অতীতের জীবন্ত প্রাণীদের সম্পর্কে নয়, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন, মানুষের ভূমিকা এবং পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। এটি এমন একটি বিষয় যা শুধুমাত্র বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও একটি বৃহৎ আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন পর্যন্ত, এই জীবাশ্মগুলির আসল উৎস এবং তাদের এই ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে আসার কারণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি একটি নতুন গবেষণার দিক নির্দেশনা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
এই নতুন গবেষণার মাধ্যমে একটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে গেছে। এত দিন ধরে যে জীবাশ্মটি ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে ধরা হচ্ছিল সেটি আসলে দুটি তিমির জীবাশ্ম ছিল। এর মাধ্যমে আমরা আরও জানতে পারি যে তিমি এবং ম্যামথের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে এবং তাদের বিলুপ্ত হওয়ার সময়কালও আলাদা।
তবে এখনও এই জীবাশ্মগুলির জায়গায় অনেক রহস্য রয়ে গেছে। জীবাশ্মবিদেরা নিশ্চিত হতে পারেননি কীভাবে এরা এত দূরে পৌঁছাল। আলাস্কার যে অঞ্চল থেকে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছিল তা সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে ছিল। তিমির এই জীবাশ্ম সেখানে কীভাবে পৌঁছল তা নিয়ে অনেক তত্ত্ব রয়েছে তবে সেগুলির কোনোটিই এখনও প্রমাণিত হয়নি।
জীবাশ্মবিদেরা কিছু সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন যেমন কিছু জীবাশ্মবিদ মনে করেন ইউকন এবং তানানা নদী দিয়ে তিমিরা স্থলভাগের ভিতরে প্রবেশ করেছিল। তবে এই তত্ত্বটি মিঙ্কে হোয়েলের জন্য সম্ভব হলেও নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের জন্য তা সম্ভব নয়, কারণ নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের আকার অনেক বড় এবং নদীপথে প্রবেশ করা একপ্রকার অসম্ভব। তবে একটি তত্ত্ব হল প্রাচীন কালে মানুষ এই হাড়গুলিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য স্থলভাগে নিয়ে এসেছিল। যদিও এই তত্ত্বও প্রমাণিত হয়নি।
এই গবেষণার পর আমরা জানি যে এত দিন ধরে যে ধারণা ছিল সেটি ভুল ছিল এবং এই ভুল ধারণার অবসান ঘটেছে। এত দিন ধরে ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে যে জীবাশ্মটি পরিচিত ছিল সেটি আসলে দুটি ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম ছিল। জীবাশ্মের রেডিয়োকার্বন ডেটিং এবং ডিএনএ পরীক্ষা করে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে এটি ম্যামথের জীবাশ্ম নয়। তবে এই জীবাশ্মের স্থলভাগে উপস্থিতি নিয়ে অনেক তত্ত্ব এখনও রয়ে গেছে।
এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ভুল ধারণা এবং ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। তাতে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে তাদের আগের বিশ্লেষণ ভুল ছিল এবং এই গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে ম্যামথের জীবাশ্ম ভেবে যে জিনিসটি সংরক্ষিত ছিল তা আসলে একটি সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম ছিল।
এই গবেষণার পর থেকে বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত যে এটি দুটি তিমির জীবাশ্ম ছিল যা ৭৫ বছর ধরে ভুলভাবে ম্যামথের জীবাশ্ম হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি আরও একটি উদাহরণ যেখানে বিজ্ঞান কেবল প্রশ্ন করার মাধ্যমেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।