Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুম্বাইয়ের বুকে মাথা তুলল বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য মিনার মিটবে শহরের অর্ধেক মানুষের সবজির চাহিদা এবং কৃষি বিপ্লবে ভারতের নতুন অধ্যায়

ভারতের বাণিজ্য নগরী মুম্বাই আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল। শহরের আকাশচুম্বী অট্টালিকার ভিড়ে মাথা তুলে দাঁড়াল এক নতুন ধরনের বহুতল যা অফিস বা আবাসনের জন্য নয় বরং ফসল ফলানোর জন্য তৈরি। বিশ্বের বৃহত্তম এই ভার্টিক্যাল ফার্ম বা উলম্ব খামারটির নাম দেওয়া হয়েছে অন্নপূর্ণা টাওয়ার। ১০০ তলা বিশিষ্ট এই কাঁচের মিনার থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন টাটকা শাকসবজি ও ফল উৎপাদিত হবে যা মুম্বাইয়ের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

ভারতের বাণিজ্য রাজধানী মুম্বাই মানেই গগনচুম্বী অট্টালিকা জনসমুদ্র এবং তীব্র গতিময় জীবন। এই শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জায়গার অভাব এবং বিপুল জনসংখ্যার জন্য টাটকা ও নিরাপদ খাদ্যের জোগান। কিন্তু আজ থেকে সেই সমস্যার এক বৈপ্লবিক সমাধান শুরু হলো। মুম্বাইয়ের স্কাইলাইন বা আকাশের রূপরেখায় আজ যুক্ত হলো এক নতুন বিস্ময়। মধ্য মুম্বাইয়ের দাদর এলাকায় পুরনো কাপড়ের মিলের জমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ১০০ তলা বিশিষ্ট এক বিশাল কাঁচের টাওয়ার। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি কোনো সাধারণ করপোরেট অফিস বা বিলাসবহুল হোটেল। কিন্তু এর ভেতরে পা রাখলেই বোঝা যাবে এটি আসলে এক অত্যাধুনিক কৃষি ক্ষেত্র। বিশ্বের বৃহত্তম ভার্টিক্যাল ফার্ম বা উলম্ব খামার অন্নপূর্ণা টাওয়ার আজ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল।

সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী যৌথভাবে এই টাওয়ারের উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পটি কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক এবং ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন ভারত আজ বিশ্বের দরবারে প্রমাণ করল যে প্রযুক্তি এবং কৃষির মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। এই অন্নপূর্ণা টাওয়ার কেবল মুম্বাইয়ের নয় সমগ্র ভারতের খাদ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। জমিতে চাষ করার দিন শেষ হচ্ছে না বরং জমির ওপর চাপ কমিয়ে আমরা এবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছি।

অন্নপূর্ণা টাওয়ারের গঠন ও প্রযুক্তি

এই টাওয়ারটির উচ্চতা প্রায় ৪৫০ মিটার যা ভারতের অন্যতম উচ্চতম ভবন। এর বাইরের দেওয়াল সম্পূর্ণ বিশেষ ধরনের কাঁচ দিয়ে তৈরি যা সূর্যের আলোকে ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে কিন্তু ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মিকে আটকে দেয়। ১০০টি তলার প্রতিটিতে রয়েছে বিশাল বিশাল তাক বা র্যাক যেখানে থরে থরে সাজানো আছে বিভিন্ন ধরনের ফসল।

এখানে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তার নাম হাইড্রোপনিক্স এবং অ্যারোপনিক্স। অর্থাৎ এখানে চাষের জন্য কোনো মাটি ব্যবহার করা হয় না। গাছের শিকড়গুলো পুষ্টিকর জলে ডোবানো থাকে অথবা সেই শিকড়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুষ্টিকর জলীয় বাষ্প স্প্রে করা হয়। এর ফলে মাটির তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম জল লাগে। মুম্বাইয়ের মতো শহরে যেখানে জলের সংকট রয়েছে সেখানে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরী।

সূর্যের আলোর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ধরনের এলইডি গ্রো লাইট। এই আলোগুলো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা জ্বলতে থাকে এবং গাছের সালোকসংশ্লেষ বা ফটোসিন্থেসিসের জন্য ঠিক যেটুকু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রয়োজন ঠিক সেটুকুই সরবরাহ করে। এর ফলে ফসল অনেক দ্রুত বাড়ে। সাধারণ জমিতে যে ফসল ফলতে ৬০ দিন লাগে এখানে তা ৩০ থেকে ৩৫ দিনেই তৈরি হয়ে যায়।

সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা

এই পুরো টাওয়ারটি নিয়ন্ত্রণ করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রতিটি তলায় হাজার হাজার সেন্সর বসানো আছে যা প্রতি মুহূর্তে তাপমাত্রা আর্দ্রতা কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা এবং গাছের পুষ্টির চাহিদা মাপছে। সেই তথ্য চলে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে। সেখানে থাকা সুপারকম্পিউটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কখন কোন গাছে জল দিতে হবে বা কখন আলো কমাতে বাড়াতে হবে। ফসল তোলার কাজও করে রোবট। ছোট ছোট রোবোটিক আর্ম পাকা ফল বা সবজিগুলো নিখুঁতভাবে তুলে কনভেয়ার বেল্টে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যাকেটজাত হয়ে নিচে চলে আসে। এই পুরো ব্যবস্থায় মানুষের স্পর্শ প্রায় নেই বললেই চলে তাই ফসলে জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা শূন্য।

কী কী ফসল ফলবে

অন্নপূর্ণা টাওয়ারে মূলত দ্রুত পচনশীল এবং উচ্চ মূল্যের ফসল ফলানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের লেটুস পাতা পালং শাক ধনে পাতা পুদিনা পাতা টমেটো ক্যাপসিকাম শসা স্ট্রবেরি এবং ব্লুবেরি। এছাড়াও কিছু তলায় মাশরুম এবং দামি ভেষজ উদ্ভিদ যেমন জাফরান চাষের পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু হয়েছে।

টাওয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন টাটকা শাকসবজি এবং ফল উৎপাদিত হবে। এই পরিমাণ ফসল দিয়ে দক্ষিণ এবং মধ্য মুম্বাইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবারের দৈনিক সবজির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

অর্থনৈতিক মডেল এবং সাধারণের লাভ

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এত আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি সবজির দাম কি সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকবে। প্রকল্পের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিটি ব্যয়বহুল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি লাভজনক। এর প্রধান কারণ হলো পরিবহন খরচের সাশ্রয়। বর্তমানে মুম্বাইয়ের বাজারে সবজি আসে নাসিক পুনে বা আরও দূরবর্তী গ্রাম থেকে। ট্রাকে করে এই সবজি আনতে প্রচুর সময় লাগে এবং জ্বালানি খরচ হয়। তাছাড়া পথে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে যায়।

অন্নপূর্ণা টাওয়ার শহরের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে ফসল তোলার মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে তা সরাসরি খুচরা বাজারে বা গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে যাবে। ফার্ম টু ফর্ক বা খামার থেকে পাতে এই ধারণাকে এটি বাস্তবে রূপ দেবে। মধ্যসত্ত্বভোগী বা দালালদের কোনো ভূমিকা না থাকায় চাষের খরচ বেশি হলেও শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে দাম খুব একটা বেশি হবে না। কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে যে বাজারের সাধারণ সবজির দামের তুলনায় এখানকার সবজির দাম মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি হতে পারে কিন্তু এর গুণমান হবে অনেক উন্নত।

পরিবেশগত প্রভাব এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা

news image
আরও খবর

এই ভার্টিক্যাল ফার্মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সম্পূর্ণ কীটনাশক মুক্ত। বদ্ধ পরিবেশে চাষ হওয়ায় এখানে পোকামাকড় বা রোগের আক্রমণ হয় না তাই কোনো রাসায়নিক স্প্রে করার প্রয়োজন নেই। মুম্বাইবাসী এবার বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি খেতে পারবেন যা জনস্বাস্থ্যের ওপর বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিবেশের দিক থেকেও এই টাওয়ার এক আশীর্বাদ। শহরের বুকে এত বিপুল পরিমাণ গাছপালা থাকায় এটি একটি বিশাল এয়ার পিউরিফায়ার বা বাতাস শোধন যন্ত্রের কাজ করবে। টাওয়ারের ভেতরে থাকা গাছগুলো সারাদিন প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন তৈরি করবে এবং শহরের বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করবে। এছাড়াও দূর থেকে সবজি আনার জন্য যে হাজার হাজার ট্রাক প্রতিদিন শহরে ঢোকে তার সংখ্যা কমবে ফলে যানজট এবং বায়ুদূষণ উভয়ই হ্রাস পাবে।

চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান

অবশ্য এই বিশাল প্রকল্পের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা। দিনরাত এলইডি লাইট এবং এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম চালানোর জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য টাওয়ারের বাইরের দেওয়ালে এবং ছাদে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। দিনের বেলার বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ এই সৌরশক্তি থেকে আসবে। বাকিটা গ্রিড থেকে নেওয়া হবে। এছাড়াও টাওয়ারের নিচে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে যেখানে পচে যাওয়া ফসল বা গাছের অংশ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রাথমিক বিনিয়োগ। এই টাওয়ার তৈরিতে প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তবে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থার যৌথ বিনিয়োগের ফলে এই মূলধন জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে এই বিনিয়োগ উঠে আসবে।

কর্মসংস্থান এবং নতুন দক্ষতা

অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে রোবট ব্যবহারের ফলে মানুষের কাজ চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এই টাওয়ার নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এখানে চিরাচরিত কৃষকের বদলে প্রয়োজন হচ্ছে কৃষি বিজ্ঞানী আইটি বিশেষজ্ঞ ডেটা অ্যানালিস্ট এবং রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ারদের। প্রায় ২০০০ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে এই টাওয়ারে। এছাড়াও লজিস্টিকস বা সরবরাহ চেইনে আরও হাজার হাজার মানুষের কাজ জুটেছে।

জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া

মুম্বাইবাসীর মধ্যে এই টাওয়ার নিয়ে প্রবল উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। উদ্বোধনের দিনেই টাওয়ারের নিচে তৈরি করা আউটলেটে সবজি কেনার জন্য লম্বা লাইন পড়ে যায়। দাদরের এক গৃহবধূ বলেন আমরা এতদিন জানি না কী বিষাক্ত সবজি খেয়েছি। এখন চোখের সামনে তৈরি হওয়া টাটকা সবজি কিনতে পারব ভেবেই ভালো লাগছে। দাম একটু বেশি হলেও স্বাস্থ্যের চেয়ে তো আর কিছু বড় নয়।

শহরের নামী রেস্তোরাঁ এবং হোটেলগুলো ইতিমধ্যেই অন্নপূর্ণা টাওয়ারের সাথে চুক্তি করেছে। তারা তাদের মেনুতে ভার্টিক্যাল ফার্মের সবজি ব্যবহার করার কথা গর্বের সাথে প্রচার করছে।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে মুম্বাইয়ের এই মডেল সফল হলে আগামী দিনে দিল্লি বেঙ্গালুরু কলকাতা এবং চেন্নাইয়ের মতো মেট্রো শহরগুলোতেও এই ধরনের ভার্টিক্যাল ফার্ম তৈরি করা হবে। জমির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির দিকে এগোনোই ভবিষ্যতের লক্ষ্য। এমনকি মরুভূমি বা অত্যন্ত ঠান্ডা এলাকাতেও এই প্রযুক্তিতে চাষ করা সম্ভব।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। অন্নপূর্ণা টাওয়ার কেবল একটি কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো নয় এটি একটি বার্তা। বার্তাটি হলো নগরায়ন এবং কৃষি একে অপরের শত্রু নয় বরং তারা হাত ধরাধরি করে চলতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের প্রচলিত ধারণার বাইরে বেরিয়ে এসে ভাবতে হবে। মুম্বাইয়ের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ানো এই সবুজ মিনার সেই নতুন ভাবনারই প্রতীক। এটি আমাদের আশা দেখায় যে আগামী দিনে কোনো মানুষকে আর ক্ষুধার্ত থাকতে হবে না এবং আমরা প্রকৃতির ক্ষতি না করেও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারব। কৃষি এখন আর গ্রামের ধুলোমাখা পথ নয় তা এখন স্মার্ট সিটির ঝকঝকে স্কাইলাইনের অংশ।

Preview image