Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বয়স হলে ওয়াই ক্রোমোজ়োম কমে পুরুষের দেহকোষে তার জেরে বাসা বাঁধে রোগও বলছে নতুন গবেষণা

পিতার কাছ থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োম পুরুষের লিঙ্গনির্ধারক। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের দেহকোষ থেকে এই ক্রোমোজ়োম উধাও হয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

পিতার কাছ থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োম—মানব শরীরের এক গুরুত্বপূর্ণ জিনগত উপাদান—দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের বিষয়। পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণে এর ভূমিকা সুপরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ক্রোমোজ়োমের গুরুত্ব কেবল লিঙ্গ নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের দেহকোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারিয়ে যাওয়ার (Loss of Y chromosome বা LOY) প্রবণতা নানা জটিল রোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এত দিন পর্যন্ত ধারণা ছিল, ওয়াই ক্রোমোজ়োম তুলনামূলকভাবে ছোট এবং জিনের সংখ্যা কম হওয়ায় এর অনুপস্থিতি শরীরে তেমন বড় প্রভাব ফেলে না। কিন্তু আধুনিক জিনতত্ত্ব ও জিনোম বিশ্লেষণ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই ধারণা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

ওয়াই ক্রোমোজ়োম কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মানবদেহে সাধারণত ২৩ জোড়া ক্রোমোজ়োম থাকে। এর মধ্যে একটি জোড়া লিঙ্গ নির্ধারণ করে—মহিলাদের ক্ষেত্রে XX এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে XY। অর্থাৎ, পিতার কাছ থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োমই পুরুষ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে মূল ভূমিকা নেয়। ওয়াই ক্রোমোজ়োমে থাকা SRY (Sex-determining Region Y) জিন ভ্রূণের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে পুরুষ বৈশিষ্ট্য গঠনে সক্রিয় হয়।

তবে ওয়াই ক্রোমোজ়োম শুধু লিঙ্গ নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, কোষের স্থিতিশীলতা এবং বয়সজনিত পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে রক্তকোষে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতি শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বয়সের সঙ্গে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের হারিয়ে যাওয়া

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে লক্ষ্য করেছেন যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের দেহকোষে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “মোজাইক লস অব ওয়াই ক্রোমোজ়োম”। অর্থাৎ, শরীরের সব কোষ থেকে নয়, কিছু কোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারিয়ে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, ৬০ বছর বয়সি প্রায় ৪০ শতাংশ পুরুষের রক্তকোষে আংশিকভাবে ওয়াই ক্রোমোজ়োম অনুপস্থিত। ৯০ বছর বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এই প্রবণতা বয়সের সঙ্গে আরও বাড়তে পারে। আগে মনে করা হত, এটি কেবল বার্ধক্যের একটি স্বাভাবিক জিনগত পরিবর্তন, যার উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত করছে, এই ক্ষতি একাধিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কোন কোন রোগের সঙ্গে যুক্ত?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব পুরুষের রক্তকোষে ওয়াই ক্রোমোজ়োম অনুপস্থিত, তাঁদের মধ্যে কিছু রোগের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

  1. হৃদরোগ: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারানো রক্তকোষ শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদরোগের অন্যতম কারণ।

  2. ক্যানসার: বিশেষ করে রক্তজনিত ক্যানসার বা লিউকেমিয়ার সঙ্গে LOY-এর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে।

  3. আলঝাইমারস ও ডিমেনশিয়া: কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যেসব পুরুষের রক্তকোষে ওয়াই ক্রোমোজ়োম অনুপস্থিত, তাঁদের মধ্যে স্নায়বিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি।

  4. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অবনতি: ওয়াই ক্রোমোজ়োমে থাকা কিছু জিন প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতায় ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তা হারালে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এই গবেষণাগুলির একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত হয়েছে, যেমন Stanford University এবং Harvard Medical School-এর গবেষকরা এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। যদিও গবেষণা এখনও চলমান, তবুও ফলাফলগুলি বৈজ্ঞানিক মহলে নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে।

ধূমপান ও রাসায়নিকের প্রভাব

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ধূমপান ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীদের মধ্যে LOY-এর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক ডিএনএ-র ক্ষতি করে এবং কোষ বিভাজনের সময় ত্রুটি তৈরি করতে পারে। এর ফলে ক্রোমোজ়োম হারানোর সম্ভাবনা বাড়ে।

শুধু ধূমপান নয়, শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শেও এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। পরিবেশ দূষণ, কীটনাশক, ভারী ধাতু ইত্যাদির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও জিনগত স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন এত দিন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি?

ওয়াই ক্রোমোজ়োম আকারে ছোট এবং এক্স ক্রোমোজ়োমের তুলনায় অনেক কম জিন বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এক্স ক্রোমোজ়োমের তুলনায় এর জৈবিক ভূমিকা সীমিত। কিন্তু আধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি আবিষ্কারের পর বোঝা যাচ্ছে, সংখ্যায় কম হলেও ওয়াই ক্রোমোজ়োমের জিনগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

news image
আরও খবর

এছাড়া, আগে বড় আকারে জনসংখ্যা-ভিত্তিক জিন বিশ্লেষণ করা কঠিন ছিল। এখন উন্নত বায়োইনফরমেটিক্স ও ডেটা অ্যানালিসিস প্রযুক্তির কারণে হাজার হাজার মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে, যা নতুন তথ্য সামনে আনছে।

ভবিষ্যৎ গবেষণার দিক

বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারানোর প্রক্রিয়া কি প্রতিরোধ করা সম্ভব? জীবনযাপনের পরিবর্তন, যেমন ধূমপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম—এসব কি জিনগত ক্ষয় কমাতে সাহায্য করতে পারে? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে।

এছাড়া, ভবিষ্যতে হয়তো রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অবস্থা নির্ণয় করে আগাম রোগঝুঁকি বোঝা সম্ভব হবে। যদি তা হয়, তবে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক

এই গবেষণা নিয়ে জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। “ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিলুপ্তির পথে” শিরোনাম অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বাস্তবে, এটি মানবজাতির বিলুপ্তি নয়, বরং বয়সজনিত কোষীয় পরিবর্তনের একটি দিক। অধিকাংশ পুরুষের ক্ষেত্রেই এটি ধীরে ধীরে ঘটে এবং সব ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করে না।

তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস পরিহার—এই বিষয়গুলিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার (বিস্তারিত)

ওয়াই ক্রোমোজ়োমকে এত দিন অনেকটাই অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে—এটি ছোট, জিনের সংখ্যা কম, আর লিঙ্গ নির্ধারণ ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই—এমন ধারণাই ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের দেহকোষ, বিশেষত রক্তকোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিছক একটি নিরীহ জিনগত পরিবর্তন নয়—বরং এটি পুরুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হতে পারে।

৬০ বছরের পর প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ৯০ বছরের পর প্রায় ৫৭ শতাংশ পুরুষের শরীরে আংশিকভাবে ওয়াই ক্রোমোজ়োম অনুপস্থিত থাকার পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—এই পরিবর্তন কি বার্ধক্যের স্বাভাবিক লক্ষণ, নাকি এটি ভবিষ্যৎ অসুস্থতার পূর্বাভাস? গবেষণা বলছে, হৃদরোগ, ক্যানসার, স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত সমস্যা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতার সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, ওয়াই ক্রোমোজ়োম কেবল একটি লিঙ্গ নির্ধারক উপাদান নয়; এটি পুরুষ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ও কোষীয় স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হতে পারে।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হল, ধূমপান ও পরিবেশগত দূষণের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য কারণগুলি এই ক্রোমোজ়োম হারানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এর অর্থ, জীবনযাত্রার পছন্দ ও পরিবেশগত ঝুঁকি পুরুষদের জিনগত স্থিতিশীলতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল জৈবিক কৌতূহলের নয়, বরং জনস্বাস্থ্য নীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। “ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিলুপ্তির পথে” ধরনের শিরোনাম শুনলে মনে হতে পারে মানবজাতির অস্তিত্বই সংকটে, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। এটি প্রজাতিগত বিলুপ্তি নয়, বরং ব্যক্তিগত স্তরে কোষীয় পরিবর্তনের একটি ধারা। সব পুরুষের ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন সমান মাত্রায় ঘটে না, এবং সকলের ক্ষেত্রেই তা গুরুতর অসুস্থতায় পরিণত হয় না। বরং এটি আমাদের শরীরের বয়সজনিত জিনগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত, যা বিজ্ঞানীরা এখন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন।

ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অবস্থা নির্ণয় করা যায় এবং তার ভিত্তিতে রোগের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগাম চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, তবে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। তখন হয়তো চিকিৎসকরা বয়স, জীবনযাপন ও জিনগত অবস্থার ভিত্তিতে পুরুষদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যপরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন।

এছাড়া, এই গবেষণা আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়—মানবদেহের প্রতিটি জিনগত উপাদান, যত ছোটই হোক না কেন, তার নিজস্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি, শরীরের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ওয়াই ক্রোমোজ়োম নিয়ে নতুন আবিষ্কার শুধু একটি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়; এটি পুরুষস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ বোঝার একটি চাবিকাঠি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান পরিহার, পরিবেশগত দূষণ থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা—এই সচেতন পদক্ষেপগুলিই হতে পারে জিনগত ক্ষয় ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিজ্ঞান এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, গবেষণা চলছে। তবে এতটুকু স্পষ্ট—ওয়াই ক্রোমোজ়োমকে আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি পুরুষের শরীর, রোগপ্রতিরোধ এবং দীর্ঘায়ুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ জিনগত উপাদান, যার গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Preview image