Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোটি কোটি বছর ধরে হিমবাহে বন্দি ছিল ক্ষতিকর জিন উষ্ণায়নে বরফ গলতেই নদী সমুদ্রে মিশছে বিষ গবেষণায় ভয়াবহ সতর্কতা

শুধু বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি নয়  গবেষণার স্বার্থে আন্টার্কটিকা, আর্কটিক এবং তিব্বতীয় মালভূমির হিমবাহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, দূষিত এলাকার হিমবাহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিনগুলির পরিমাণ তুলনায় কম। জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখলে বিপদের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়। হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদের জলে এই ধরনের প্রতিরোধকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তা পশুপাখি এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জল। এ প্রসঙ্গে গুয়ান্নান বলেন, ‘‘হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদ বহু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জলের উৎস। প্রতিরোধক জিনগুলি এই জলে মিশলে তা আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে এবং তার মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে।’’ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জীবাণু-জগতে জিনের স্থানান্তরের জন্য আদৌ প্রজননের প্রয়োজন পড়ে না। সেই কারণেই অনুকূল পরিস্থিতিতে এত ব্যাপক ভাবে ছড়়িয়ে পড়তে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক। এখানেই শেষ নয়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রয়েছে ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিরোধক জিনগুলি ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার রোগসৃষ্টি আরও সহজ হয়। এদের সহাবস্থান যে কোনও সংক্রমণের চিকিৎসাকেও কঠিন করে তোলে। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের গলনকে আর সাধারণ পরিবেশগত সমস্যা হিসাবে দেখতে চাইছেন না বিজ্ঞানীদের একাংশ। নতুন গবেষণা এর বৃহত্তর ঝুঁকির দিকটিও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। গবেষণার স্বার্থে আন্টার্কটিকা, আর্কটিক এবং তিব্বতীয় মালভূমির হিমবাহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, দূষিত এলাকার হিমবাহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিনগুলির পরিমাণ তুলনায় কম। জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখলে বিপদের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়। হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদের জলে এই ধরনের প্রতিরোধকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তা পশুপাখি এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জল। এ প্রসঙ্গে গুয়ান্নান বলেন, ‘‘হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদ বহু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জলের উৎস। প্রতিরোধক জিনগুলি এই জলে মিশলে তা আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে এবং তার মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে।’’ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জীবাণু-জগতে জিনের স্থানান্তরের জন্য আদৌ প্রজননের প্রয়োজন পড়ে না। সেই কারণেই অনুকূল পরিস্থিতিতে এত ব্যাপক ভাবে ছড়়িয়ে পড়তে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক। এখানেই শেষ নয়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রয়েছে ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিরোধক জিনগুলি ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার রোগসৃষ্টি আরও সহজ হয়। এদের সহাবস্থান যে কোনও সংক্রমণের চিকিৎসাকেও কঠিন করে তোলে। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের গলনকে আর সাধারণ পরিবেশগত সমস্যা হিসাবে দেখতে চাইছেন না বিজ্ঞানীদের একাংশ। নতুন গবেষণা এর বৃহত্তর ঝুঁকির দিকটিও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তার চেয়েও বড় বিপদের ইঙ্গিত মিলছে গবেষণায়। চিনের একদল বিজ্ঞানীর দাবি কোটি কোটি বছর ধরে হিমবাহের গভীরে জমে রয়েছে ক্ষতিকর জিন ও অজানা জীবাণু। উষ্ণায়নের প্রভাবে বরফ গলতেই সেই ভয়ংকর উপাদান নদী ও সমুদ্রে মিশে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

দূষণের অভিঘাতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বন উজাড়, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ—সব মিলিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য আজ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত। তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে। গত কয়েক দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই উষ্ণায়নের ফলে যে শুধু আবহাওয়ার চরিত্র বদলে যাচ্ছে তা নয়, ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে পৃথিবীর ভূগোল, জলবায়ু এবং জীবজগতের ভিতরকার সম্পর্কও।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা উঠলেই প্রথমে যে ছবিটি আমাদের চোখে ভাসে, তা হল গলতে থাকা হিমবাহ। মেরু অঞ্চল, আন্টার্কটিকা, আর্কটিক কিংবা হিমালয়ের বরফঢাকা পাহাড়—সব জায়গাতেই দ্রুত গলছে বরফ। তার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে চলেছে। উপকূলবর্তী বহু শহর ও দ্বীপ রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন—এই হারে বরফ গলতে থাকলে ভবিষ্যতে বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যেতে পারে।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হিমবাহ গলার বিপদ শুধু জলস্তর বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরফের নিচে লুকিয়ে রয়েছে আরও এক অজানা আতঙ্ক—যার কথা এতদিন বিজ্ঞানও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।

চিনের একদল বিজ্ঞানীর সাম্প্রতিক গবেষণা নতুন করে এই বিপদের দিকে আলোকপাত করেছে। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, কোটি কোটি বছর ধরে হিমবাহের গভীরে জমে রয়েছে ক্ষতিকর জিন, বিশেষত এমন জিন যা অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণুনাশক প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যখন হিমবাহ গলছে, তখন এই জিনগুলি বরফের সঙ্গে গলে নদী, হ্রদ এবং সমুদ্রের জলে মিশে যাচ্ছে। এর ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ।

এই গবেষণা বিজ্ঞানীমহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত হিমবাহকে দেখা হত একটি বিচ্ছিন্ন, জমাট বাঁধা জলভাণ্ডার হিসেবে—যেখানে তেমন কোনও সক্রিয় জীববৈচিত্র্য নেই। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, হিমবাহ আসলে শুধু বরফের স্তূপ নয়, বরং কোটি বছরের জীবতাত্ত্বিক ইতিহাস বহনকারী এক বিশাল জিনগত সংরক্ষণাগার।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এই ক্ষতিকর জিনগুলির মধ্যে অনেকই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিন। অর্থাৎ, যে জিনগুলি ব্যাকটেরিয়াকে অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই ধরনের জিনকে সবচেয়ে বড় হুমকিগুলির একটি হিসেবে ধরা হয়। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া হলে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

এই জিনগুলি কীভাবে হিমবাহে এল? বিজ্ঞানীদের মতে, এর জন্য দায়ী আধুনিক দূষণ নয়। অনেকেই মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দূষণের ফল। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বহু প্রতিরোধক জিন আসলে প্রাচীন। কোটি কোটি বছর ধরে প্রাকৃতিক পরিবেশে অণুজীবদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলেই এই ধরনের জিন তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক যৌগের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের ফলে ব্যাকটেরিয়ারা ধীরে ধীরে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে।

হিমবাহের বিশেষত্ব হল, এটি অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে অণুজীব এবং তাদের ডিএনএ-কে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। বরফের নিচে জীবাণু কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আটকে থাকে। ফলে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেগুলি সেখানেই বন্দি থেকে যায়, বাইরে কোনও প্রভাব না ফেলে।

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই বরফ গলতে শুরু করে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যখন হিমবাহের বরফ গলে জল হয়ে যায়, তখন সেই জল বহন করে নিয়ে আসে ওই ক্ষতিকর জিনগুলিকেও। নদী, হ্রদ এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের জলে মিশে যায় সেগুলি। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই জিনগুলি আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এলে জিনগত আদানপ্রদান ঘটতে পারে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণার জন্য চিনা বিজ্ঞানীরা আন্টার্কটিকা, আর্কটিক অঞ্চল এবং তিব্বতীয় মালভূমির বিভিন্ন হিমবাহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সেই নমুনা বিশ্লেষণ করেই তাঁরা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। দেখা গিয়েছে, দূষিত এলাকার তুলনায় অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন এবং বিচ্ছিন্ন হিমবাহেও এই প্রতিরোধক জিনের অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ, আধুনিক শিল্প দূষণ না থাকলেও এই জিনগুলি সেখানে বহু দিন ধরে জমে ছিল।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, হিমবাহপুষ্ট নদী ও হ্রদের জলের নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা সেখানে এই প্রতিরোধক জিনের উপস্থিতি পেয়েছেন। এই জল অনেক ক্ষেত্রেই পশুপাখি ও মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জল। পানীয় জল, চাষের জল, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত জল—সবখানেই এই জিন প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চিনা গবেষকদলের অন্যতম সদস্য গুয়ান্নান মাও এই প্রসঙ্গে বলেন, “দীর্ঘ দিন ধরে হিমবাহগুলিকে বিচ্ছিন্ন ও নিষ্ক্রিয় হিসেবে দেখা হয়েছে। আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে, হিমবাহ আসলে জিনগত সংরক্ষণাগারও বটে। এগুলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিন সঞ্চয় করে রেখেছে, যা গলনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।”

বিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, জীবাণু জগতে জিনের বিস্তারের জন্য প্রজননের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যাকটেরিয়া একে অপরের মধ্যে সরাসরি জিন স্থানান্তর করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার। অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রতিরোধক জিন খুব দ্রুত বহু প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখানেই বিপদের শেষ নয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই প্রতিরোধক জিনগুলি ভাইরাসের সঙ্গেও সহাবস্থান করতে পারে। ভাইরাসের মাধ্যমে জিন পরিবহণ হলে সংক্রমণের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ শুধু যে বাড়বে তা নয়, সেগুলির চিকিৎসাও আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলনকে আর শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখতে চাইছেন না। এটি ধীরে ধীরে একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের রূপ নিতে পারে। জলবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে সেই সব অঞ্চলে যেখানে হিমবাহপুষ্ট নদী ও হ্রদ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ সেখানে বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব রয়েছে এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এই গবেষণা আমাদের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে। হিমবাহ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, আবার শুধু জলভাণ্ডারও নয়। এগুলি আসলে কোটি বছরের জীবতাত্ত্বিক ইতিহাস বহনকারী এক জীবন্ত সংরক্ষণাগার। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সেই সংরক্ষণাগার খুলে যাচ্ছে—আর তার সঙ্গে মুক্ত হচ্ছে এমন সব উপাদান, যেগুলির প্রভাব আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।


বিজ্ঞানীদের মতে, এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি, হিমবাহ গলনের ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও নতুন করে গবেষণা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। নচেৎ, গলতে থাকা বরফের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জন্য এক অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক বিপদও ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসবে।

news image
আরও খবর

বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশেই তার প্রভাব স্পষ্ট। কখনও তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, কখনও ভয়াবহ বন্যা বা খরা—প্রকৃতি যেন প্রতিনিয়ত সতর্ক সংকেত পাঠাচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান বিপদের আড়ালেও লুকিয়ে রয়েছে এমন কিছু অদৃশ্য ঝুঁকি, যেগুলির ভয়াবহতা হয়তো আরও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।

হিমবাহ গলন এতদিন মূলত সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ছিল। উপকূলবর্তী শহর, দ্বীপ রাষ্ট্র, নদীবিধৌত অঞ্চল—সব জায়গাতেই এই আশঙ্কা প্রকট। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, হিমবাহ গলনের আসল বিপদ হয়তো এখানেই শেষ নয়। বরফের গভীরে বন্দি থাকা কোটি কোটি বছরের জীবতাত্ত্বিক উপাদান এখন ধীরে ধীরে মুক্ত হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

হিমবাহকে দীর্ঘ দিন ধরে মানুষ নিষ্প্রাণ, নিস্তব্ধ এক বরফভাণ্ডার হিসেবেই কল্পনা করেছে। মনে করা হত, সেখানে শুধু জমাট বাঁধা জল ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞান এবং জিনতত্ত্ব বলছে অন্য কথা। হিমবাহ আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক টাইম ক্যাপসুল। লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর পরিবেশ যেমন ছিল, সেই সময়কার অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং তাদের জিনগত উপাদান বরফের মধ্যে সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে।

বিশেষ করে চিনা বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। তাঁরা দেখিয়েছেন, হিমবাহের বরফে জমে থাকা বহু জিন অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রকৃতির। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন। এই জিনগুলিই ব্যাকটেরিয়াকে আধুনিক ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা দেয়।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সংকটগুলির একটি। একসময় যে সংক্রমণ সহজেই সেরে যেত, আজ তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। কারণ বহু ব্যাকটেরিয়া সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবেই নষ্ট হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে “নীরব মহামারি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে হিমবাহ থেকে প্রতিরোধী জিন মুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। কারণ এই জিনগুলি যদি আধুনিক জীবাণুর সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, এই জিনগুলির উৎপত্তি আধুনিক দূষণের ফল নয়। বহু মানুষ মনে করেন, মানুষের অবিবেচক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলেই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্ম। কিন্তু বাস্তবে এই জিনগুলির অনেকটাই প্রাকৃতিক এবং প্রাচীন। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অণুজীবদের মধ্যে এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াই চলেছে। প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক যৌগের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে গিয়েই ধীরে ধীরে এই প্রতিরোধী জিনগুলির বিবর্তন ঘটেছে।

হিমবাহের বিশেষ পরিবেশ এই জিনগুলিকে দীর্ঘ সময় ধরে অক্ষত রাখতে সাহায্য করেছে। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও তাদের ডিএনএ কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। ফলে সময়ের প্রবাহে সেগুলি নষ্ট হয় না। হাজার হাজার বছর ধরে তারা বরফের চাঁইয়ের মধ্যে বন্দি অবস্থায় থেকে যায়।

কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সেই বন্দিদশার অবসান ঘটছে। বরফ গলতেই এই জিনগুলি জলধারার সঙ্গে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। হিমবাহ থেকে উৎপন্ন নদী, হ্রদ ও জলাশয়ের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই জিনগুলি আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে জিনগত আদানপ্রদানের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধী জীবাণুর জন্ম দিতে পারে।

বিশেষ করে হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার নামের একটি প্রক্রিয়া এখানে বড় ভূমিকা নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া নিজেদের মধ্যে সরাসরি জিন আদানপ্রদান করতে পারে। এর জন্য প্রজননের প্রয়োজন হয় না। ফলে পরিবেশে একবার প্রতিরোধী জিন ঢুকে পড়লে, তা খুব দ্রুত বহু ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখানেই শেষ নয়। গবেষণায় আরও একটি ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে। প্রতিরোধী জিনগুলি অনেক সময় ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। ভাইরাস যখন ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে, তখন সেই জিন বহন করে অন্য ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে সংক্রমণের ক্ষমতা এবং চিকিৎসার জটিলতা দুটোই বহুগুণে বেড়ে যায়।

এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে সেই সব অঞ্চলে, যেখানে হিমবাহপুষ্ট নদী মানুষের নিত্যজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পানীয় জল, সেচের জল, পশুপাখির জল—সব ক্ষেত্রেই এই জল ব্যবহৃত হয়। যদি এই জলে প্রতিরোধী জিন মিশে যায়, তবে তা খাদ্য শৃঙ্খলের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে।

চিন, ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান—হিমালয়ঘেঁষা বহু দেশ এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। একইভাবে ইউরোপের আল্পস, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ কিংবা উত্তর আমেরিকার বরফঢাকা অঞ্চলগুলিও এই সমস্যার বাইরে নয়। হিমবাহপুষ্ট নদীগুলি বহু কোটি মানুষের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত। সেই জলেই যদি অদৃশ্য বিপদ মিশে যায়, তবে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঝুঁকি শুধু ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানেরও। ইতিমধ্যেই কিছু হিমবাহপুষ্ট নদী ও হ্রদের জলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিনের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। যদিও এখনই এর সরাসরি প্রভাব চোখে পড়ছে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল মারাত্মক হতে পারে।

এই কারণে গবেষকরা জোর দিচ্ছেন দুটি বিষয়ের উপর। একদিকে যেমন বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, তেমনই হিমবাহ গলনের ফলে সৃষ্ট নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও গভীর গবেষণা দরকার। শুধুমাত্র কার্বন নিঃসরণ কমানো যথেষ্ট নয়। বরং গলতে থাকা বরফের সঙ্গে কী কী উপাদান মুক্ত হচ্ছে, সেগুলি কীভাবে পরিবেশ ও মানবদেহে প্রভাব ফেলতে পারে—তা বোঝাও সমান জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানীয় জলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত জলের নমুনা পরীক্ষা, জিনগত বিশ্লেষণ এবং জীবাণু পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আরও নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা দরকার, যাতে নতুন করে প্রতিরোধী জীবাণুর জন্ম না হয়।

এই গবেষণা মানবসভ্যতাকে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি প্রকৃতিকে শুধুই সম্পদ হিসেবে দেখব, নাকি তার জটিল ও সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে বোঝার চেষ্টা করব? হিমবাহের গলন আমাদের শেখাচ্ছে, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি পরিবর্তন অন্য অনেক পরিবর্তনের জন্ম দেয়—যার সবটাই আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই না।

আজ যে বরফ গলছে, তার প্রভাব হয়তো কয়েক দশক পরে মানুষের শরীরে রোগ হিসেবে প্রকাশ পাবে। এই অদৃশ্য বিপদই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কারণ যা চোখে দেখা যায় না, তার বিরুদ্ধে প্রস্তুতিও থাকে কম।

বিজ্ঞানীরা তাই সতর্ক করছেন—এখনই সময়। এখনই যদি আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা না করি, যদি গলতে থাকা হিমবাহের জীবতাত্ত্বিক বিপদকে অবহেলা করি, তবে ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হবে মানবজাতিকেই। গলতে থাকা বরফের সঙ্গে সঙ্গে শুধু জল নয়, মুক্ত হচ্ছে অতীতের এক ভয়ঙ্কর উত্তরাধিকার—যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

Preview image