Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার রীতিও আধুনিক মানুষের প্রথম নয় আগুনের পর ভাঙল আরেকটি প্রচলিত ধারণা বিজ্ঞানীদের গবেষণায়

আধুনিক মানুষের তুলনায় এদের মস্তিষ্ক ছিল অনেক ছোট প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমলালেবুর মতো আকারের। তবু উচ্চতা ছিল প্রায় পাঁচ ফুট বিজ্ঞানীদের মতে অন্তত দুলক্ষ বছর আগে এই মানবপ্রজাতিই মৃতদের জন্য সমাধিস্থল তৈরি করেছিল, যা মানবসভ্যতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে নাড়া দিল।

মস্তিষ্কের আকার যত বড়, বুদ্ধিমত্তা তত বেশি এই ধারণাটি বহু দিন ধরে প্রাণীজগৎ এবং মানব বিবর্তনের আলোচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখালিখি পর্যন্ত প্রায় সর্বত্রই এক ধরনের সরল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, বড় মস্তিষ্ক মানেই উন্নত বুদ্ধি, উন্নত সিদ্ধান্ত, উন্নত প্রযুক্তি, আর ছোট মস্তিষ্ক মানেই সীমিত ক্ষমতা। কিন্তু বাস্তবে বুদ্ধিমত্তা এমন এক জটিল গুণ, যা শুধু মস্তিষ্কের মোট আয়তন বা ওজন দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের ইতিহাসে প্রতীক তৈরি, ভাষা গঠন, সামাজিক বন্ধন, পরিকল্পনা, আগাম ভাবনা, মৃতকে ঘিরে আচরণ, শোক, স্মৃতি ও আচার এই সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিন্তার বহু স্তর। সেই স্তরগুলির বিকাশের পিছনে মস্তিষ্কের আকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই একমাত্র ব্যাখ্যা কি না, সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের নতুন খোঁজ। দক্ষিণ আফ্রিকার রাইজ়িং স্টার গুহা থেকে পাওয়া প্রাচীন সমাধিস্থলের সম্ভাব্য নিদর্শন আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানুষের মতো আচরণ বলতে আমরা যা বুঝি, তা হয়তো শুধু আধুনিক মানুষের একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্‌সবার্গ শহরের কাছাকাছি, প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে রাইজ়িং স্টার নামে যে গুহা অঞ্চল রয়েছে, সেটি বহুদিন ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এক আকর্ষণের জায়গা। এই গুহা শুধু একটি গর্ত বা ছোট চেম্বার নয়, বরং বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুড়ঙ্গ, চেম্বার, সংকীর্ণ পথ ও ভূগর্ভস্থ কাঠামোর জটিল এক জাল। এমন জায়গায় কাজ করা মানেই ধৈর্য, দক্ষতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে অনুসন্ধান চালানো। ২০১৩ সালে জোহান্‌সবার্গের উইটওয়াটারস্ট্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক লি বার্জারের নেতৃত্বে একটি দল এই গুহায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। সেই কাজের লক্ষ্য ছিল গুহার বিভিন্ন অংশে জমে থাকা স্তর, শিলা, মাটি এবং সম্ভাব্য জীবাশ্মের সূত্র ধরে অতীতের মানবপ্রজাতিদের উপস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া। এই খননকার্য চলাকালীন যে আবিষ্কার সামনে আসে, তা মানব বিবর্তনের আলোচনায় নতুন একটি নাম যোগ করে, হোমো নালেদি।

গুহা থেকে দেড় হাজারেরও বেশি হাড়গোড়ের জীবাশ্ম পাওয়া যায়, যেগুলি ছিল মানুষের মতো অন্তত ১৫টি প্রাণীর। গবেষকেরা বিশ্লেষণ করে জানান, এগুলি একটি পৃথক মানবপ্রজাতির, যার নাম তাঁরা দেন হোমো নালেদি। আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নও ওঠে, এই প্রজাতির জীবনযাপন কেমন ছিল, তাদের শারীরিক গঠন কী বলছে, তারা কী ধরনের পরিবেশে বেঁচে ছিল, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মানসিক ও সামাজিক ক্ষমতার সীমা কোথায় ছিল। কারণ হোমো নালেদির শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য আধুনিক মানুষের মতো, আবার কিছু বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক আদিম প্রকৃতির। তাদের উচ্চতা ছিল প্রায় পাঁচ ফুটের কাছাকাছি। হাত ও পায়ের আঙুল ছিল কিছুটা বাঁকানো, যা ইঙ্গিত করতে পারে তাদের চলাফেরা বা বস্তু ধরার ধরন ভিন্ন ছিল। হাতের গঠন এমন ছিল যে তারা কোনও বস্তুকে ধরতে এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতে সক্ষম ছিল বলে গবেষকেরা মনে করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তাদের মস্তিষ্কের আকার, যা আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট, প্রায় এক তৃতীয়াংশ, অনেকটা কমলালেবুর মাপের মতো। এই তথ্য সামনে আসতেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে এক ধরনের সংঘাত তৈরি হয়, ছোট মস্তিষ্ক হলে তারা কি সত্যিই জটিল আচরণ করতে পারত, পরিকল্পনা করতে পারত, সামাজিক আচার বা প্রতীক তৈরি করতে পারত, এমনকি মৃতকে ঘিরে কোনও বিশেষ আচরণ গড়ে তুলতে পারত কি না।

এখানে আগুনকে ঘিরে আগে থেকেই যে ধারণা বদলাচ্ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে। বহু বছর ধরে মনে করা হত আগুন জ্বালানো এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আধুনিক মানুষের উন্নত বুদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ, এবং এই ক্ষমতা আধুনিক মানুষের অনেক আগেই অন্য মানবপ্রজাতির হাতে ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাগুলি ইঙ্গিত দিয়েছে, আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগেই মানুষ জাতির কোনও আদিম প্রজাতি আগুন জ্বালাতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণ করতে জানত। আনুমানিক চার লক্ষ বছর আগে এমন ক্ষমতা থাকা এক আদিম মানবপ্রজাতির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, যেখানে অনুমান করা হয় নিয়ানডারথালদের মতো প্রজাতিও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। আগুন জ্বালানো মানেই শুধু উষ্ণতা নেওয়া নয়, রান্না, নিরাপত্তা, আলো, সামাজিক জমায়েত, পরিকল্পিত সময় কাটানো, শিকার বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এই সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্ক। ফলে আগুনের ধারণা বদলে যাওয়ার পরই মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন জেগে ওঠে, সত্যিই কি সমাধি দেওয়া আধুনিক মানুষেরই প্রথম কাজ, নাকি আধুনিক মানুষের আগেই অন্য কেউ এই আচরণ শিখেছিল।

রাইজ়িং স্টার গুহায় সম্প্রতি যে প্রাচীন সমাধিস্থলের সম্ভাব্য নিদর্শনের কথা বলা হচ্ছে, তার বয়স অন্তত দুই লক্ষ বছরের পুরনো বলে গবেষকেরা দাবি করেছেন। এই সময়ের হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়ে গিয়েছিল বলে সাধারণভাবে বলা হয়, আজ থেকে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকাতেই আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু সেই সময় পৃথিবীতে আধুনিক মানুষ একমাত্র মানবপ্রজাতি ছিল না। হোমো গণের অন্য মানবপ্রজাতিরাও তখন নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত, বাস করত, নিজেদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। এই সহাবস্থানই মানব ইতিহাসকে জটিল করে তোলে, কারণ একাধিক মানবপ্রজাতি একই সময়ে বেঁচে থাকলে আচরণ, প্রযুক্তি, খাদ্যাভ্যাস, শিকার, সমাজ গঠন, এমনকি প্রতীক বা আচার বিনিময়ও ঘটতে পারে। তাই কোনও একটি গুহায় পাওয়া সমাধি কার তৈরি, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়, এবং গবেষকদের যুক্তি প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তর, প্রতিটি নমুনা এবং প্রতিটি ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, গুহার কিছু চেম্বারের মধ্যে পাললিক শিলাস্তরের নিচে পাওয়া গিয়েছে হাড়গুলি। এই অবস্থানটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পাললিক স্তর মানে সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া মাটি ও শিলার স্তর, যা জলের তোড়, ধস, বা প্রাকৃতিক সঞ্চালনের মাধ্যমে জমতে পারে। কিন্তু গবেষকেরা ওই মাটি ও শিলার স্তর বিশ্লেষণ করে বলেছেন, এমন কোনও লক্ষণ তারা পাননি যাতে মনে হয় জলস্রোত বা কোনও জায়গা থেকে পিছলে এসে দেহের উপর মাটি পড়েছে। অর্থাৎ দেহগুলো কোনও দুর্ঘটনায় সেখানে গিয়ে পড়েছিল, বা কোনও বন্যায় ভেসে এসে আটকে গিয়েছিল, এমন ব্যাখ্যার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং তাদের ধারণা, দেহগুলোকে জেনেবুঝেই গুহার ওই অংশে রাখা হয়েছিল এবং তার পরে মাটি দিয়ে চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে আরও একটি পর্যবেক্ষণ যোগ হয়, গুহার ওই অংশে কেউ নিয়মিত বাস করত এমন প্রমাণও নাকি মেলেনি। যদি সেখানে বসবাসের চিহ্ন না থাকে, তবে সেই অংশটিকে আলাদা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হত, এমন ধারণা জোরালো হয়। গবেষকেরা তাই মনে করছেন, ওই অংশটি সম্ভবত একটি সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সমাধি দেওয়া মানে শুধু দেহ সরিয়ে রাখা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে জায়গা নির্বাচন, দেহ বহন করা, গুহার জটিল পথ পেরিয়ে নির্দিষ্ট চেম্বার পর্যন্ত পৌঁছনো, তারপর মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া। এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পনা, শ্রম, সমন্বয় এবং এক ধরনের সামাজিক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়।

এখানেই হোমো নালেদির প্রসঙ্গ আবারও সামনে আসে। নতুন পাওয়া জীবাশ্মগুলিও একই আদিম প্রজাতির বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা থেকে গবেষকেরা আরও নিশ্চিত হয়েছেন যে হোমো নালেদিদের মধ্যে সমাধি দেওয়ার চল ছিল। যদিও এই মানবপ্রজাতির কোন সময়ে আবির্ভাব হয় এবং কোন সময়ে তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবু অনুমান করা হয় সাড়ে তিন থেকে আড়াই লক্ষ বছর আগে তারা পৃথিবীতে বাস করত। এই সময়সীমা যদি সত্যি হয়, তাহলে দুই লক্ষ বছরের পুরনো সমাধি এবং হোমো নালেদির উপস্থিতি একই ধারায় যুক্ত হতে পারে। তবে এ ধরনের সংযোগের ক্ষেত্রে গবেষকেরা সাধারণত নানা ধরনের প্রমাণ মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান। স্তরের বয়স নির্ধারণ, জীবাশ্মের অবস্থান, গুহার ভূগঠন, মাটির স্তর, সম্ভাব্য ক্ষয়, এবং একই স্তরে পাওয়া অন্য নমুনা সব কিছু মিলিয়ে একটি তুলনামূলক শক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। এই কাজ সময়সাপেক্ষ এবং বিতর্কেরও জন্ম দেয়, কারণ মানব ইতিহাসে সমাধি দেওয়া এত বড় একটি আচরণগত দিক যে তার দাবির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কঠোর যাচাই জড়িয়ে থাকে।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য বুদ্ধিমত্তার ধারণা নিয়ে। যদি সত্যিই হোমো নালেদিরা সমাধি দিয়ে থাকে, তাহলে ছোট মস্তিষ্ক মানেই সীমিত বুদ্ধি এমন সরল ধারণা টলে যায়। কারণ সমাধি দেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে মৃত্যু সম্পর্কে কিছু ধারণা, দেহকে নিয়ে কী করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একাধিক ব্যক্তির সমন্বিত প্রয়াস। কেউ কেউ বলবেন, সমাধি দেওয়া শুধুই স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, গন্ধ বা শিকারি প্রাণীর ঝুঁকি এড়াতে দেহ লুকোনো। সেটাও হতে পারে। কিন্তু তবু দেহকে বহন করে দুর্গম গুহার গভীরে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে আসা, তারপর মাটি দিয়ে চাপা দেওয়ার মতো কাজ কেবল আকস্মিক আচরণ নয়, উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণের দিকেই ইঙ্গিত করে। উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণ মানেই পরিকল্পনা। পরিকল্পনা মানেই কিছুটা ভবিষ্যৎ ভাবনা। ভবিষ্যৎ ভাবনা মানেই মস্তিষ্কের এমন ক্ষমতা, যা কেবল আকারের উপর নির্ভর করে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণায় অনেক দিন ধরেই বলা হয়, কেবল মস্তিষ্কের মোট আয়তন নয়, মস্তিষ্কের গঠন, নিউরনের সংখ্যা, বিভিন্ন অংশের সংযোগ, বিশেষ করে সামনের অংশের কার্যক্ষমতা, স্মৃতি ও শেখার প্রক্রিয়া, এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে সামাজিক জীবনও বুদ্ধিমত্তাকে উসকে দেয়। দলবদ্ধভাবে থাকা, কাজ ভাগ করে নেওয়া, শিকার বা খাদ্য সংগ্রহে সহযোগিতা, শিশু লালন, আঘাতপ্রাপ্ত সদস্যকে সহায়তা, এবং সংকেত বা প্রতীক ব্যবহার করা এই সবকিছু বুদ্ধিমত্তাকে এক ধরনের সামাজিক প্রযুক্তিতে পরিণত করে। তাই ছোট মস্তিষ্কের কোনও প্রজাতির মধ্যেও যদি শক্ত সামাজিক কাঠামো থাকে, শেখার ধারাবাহিকতা থাকে, এবং পরিবেশগত চাপ থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে কিছু জটিল আচরণ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। রাইজ়িং স্টার গুহার দাবি করা সমাধি এই সম্ভাবনাকেই জোরালো করে।

এই গুহায় সমাধির পাশাপাশি আরেকটি দিক গবেষকদের ভাবাচ্ছে, গুহার দেওয়ালে খোদাই করা কিছু জ্যামিতিক নকশার উল্লেখ। উদ্দেশ্যপূর্ণ ভাবে মসৃণ করা পাথরের উপর এই ধরনের নকশা যদি সত্যিই একই প্রজাতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে প্রতীক তৈরির ক্ষমতার সম্ভাবনাও সামনে আসে। প্রতীক মানে কেবল ছবি আঁকা নয়, প্রতীক মানে কোনও ধারণাকে কোনও চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা, যা অন্য কেউ বুঝতে পারে বা পরে মনে রাখতে পারে। এই ক্ষমতা মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত বলে মনে করা হয়। গবেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই বিষয়ে আরও বিশদ গবেষণা দরকার, কারণ প্রতীক বা নকশা প্রাকৃতিকভাবেও তৈরি হতে পারে, বা পরবর্তী কালের কেউও রেখে যেতে পারে। কিন্তু যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে নকশাগুলি উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং হোমো নালেদির সময়কালেরই, তাহলে তা মানব ইতিহাসে সৃজনশীলতা ও প্রতীকী ভাবনার এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক অগাস্টিন ফুয়েন্তেসের মতো গবেষকেরা তাই ইঙ্গিত দিয়েছেন, আরও প্রমাণ মিললে এই খোঁজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ প্রতীক আঁকা ও শৈল্পিক অভিব্যক্তির মতো ক্ষমতা যে শুধু আধুনিক মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বুঝতে সাহায্য করবে।

সমাধি দেওয়ার ধারণাটির সঙ্গে শোক বা আত্মীয়তার অনুভূতি জড়িয়ে আছে কি না, সেটিও গবেষণার একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন। সমাধি মানেই যে শোক, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু দেহকে সম্মানের সঙ্গে আলাদা জায়গায় রেখে আসা, দেহের অবস্থানকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় স্থাপন করা, এবং সেই জায়গাকে বারবার ব্যবহার করা এমন ইঙ্গিতও দিতে পারে যে এই আচরণের পেছনে কোনও সামাজিক নিয়ম ছিল। নিয়ম তৈরি হয় সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে, এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা টিকে থাকে দলগত স্মৃতিতে। অর্থাৎ এক ধরনের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে। ছোট মস্তিষ্কের প্রজাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থাকাটা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু বিজ্ঞান বারবার দেখিয়েছে যে প্রকৃতি ও বিবর্তন কোনও এক লাইনে চলে না। নানা শাখায় নানা পথে ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। একটি প্রজাতি হয়তো প্রযুক্তিতে পিছিয়ে, কিন্তু সামাজিক কাঠামোয় শক্তিশালী। আরেকটি প্রজাতি হয়তো শারীরিকভাবে বেশি সক্ষম, কিন্তু প্রতীকী আচরণে সীমিত। মানব বিবর্তনের জগতে একাধিক প্রজাতি সহাবস্থান করায় ক্ষমতার এই বিন্যাস আরও জটিল হয়ে ওঠে।

news image
আরও খবর

রাইজ়িং স্টার গুহার মতো জায়গা গবেষকদের কাছে তাই শুধু জীবাশ্মের ভাণ্ডার নয়, মানব আচরণের সম্ভাব্য প্রমাণের ক্ষেত্র। গুহার গভীরে দেহ রেখে আসা সহজ কাজ নয়। সেখানে আলো কম, পথ সংকীর্ণ, পরিবেশ অস্বস্তিকর। কেউ যদি কেবল দুর্ঘটনাবশত সেখানে গিয়ে মরত, তাহলে একাধিক দেহ একই ধাঁচে একই ধরনের চেম্বারে পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। আবার যদি শিকারি প্রাণী দেহ টেনে নিয়ে যেত, তাহলে হাড়ের অবস্থান, ছড়ানো ছিটানো, ক্ষয় বা দাঁতের দাগের মতো চিহ্ন থাকতে পারে। গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেসব ব্যাখ্যার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ মেলেনি। ফলে উদ্দেশ্যপূর্ণ সমাধি দেওয়ার ব্যাখ্যা শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলেই তারা মনে করছেন। তবে বিজ্ঞানী সমাজে এমন দাবিকে ঘিরে তর্ক থাকা স্বাভাবিক, কারণ একে প্রমাণ করতে হলে অত্যন্ত শক্ত ডেটা, নির্ভুল ডেটিং পদ্ধতি এবং বিকল্প ব্যাখ্যাগুলি একে একে বাতিল করার মতো বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়। এই গবেষণার ক্ষেত্রেও পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণা, আরও নমুনা, আরও পরীক্ষা এবং বিভিন্ন দলের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন হবে, যাতে সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

এই আবিষ্কারের প্রভাব কেবল ইতিহাসের পাতায় নতুন তথ্য যোগ করা নয়, বরং মানুষ হওয়া বলতে আমরা যা বুঝি, তার সংজ্ঞা বদলানোর সম্ভাবনা। এতদিন মনে করা হত, আধুনিক মানুষের মধ্যে বড় মস্তিষ্ক, উন্নত ভাষা, প্রতীক, শিল্প, ধর্মীয় বা আচারগত আচরণ এই সবকিছু একসঙ্গে বিকশিত হয়েছে এবং অন্য প্রজাতিরা তুলনায় পিছিয়ে ছিল। কিন্তু আগুন জ্বালানো নিয়ে ধারণা বদলেছে, এখন সমাধি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধারণা বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হল। এর মানে এই নয় যে সব আদিমানব আধুনিক মানুষের মতোই চিন্তা করত, বা তাদের সংস্কৃতি আধুনিক মানুষের সমান ছিল। এর মানে হল, মানুষের মতো আচরণের কিছু উপাদান আধুনিক মানুষের আগেই পৃথিবীতে ছিল, এবং হয়তো একাধিক প্রজাতি তাদের নিজেদের সীমার মধ্যে সেই আচরণ তৈরি করেছিল। ফলে বিবর্তনের চিত্রটা আরও বহুস্তরীয় হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষিতে মস্তিষ্কের আকার নিয়ে পুরনো ধারণা ভাঙার অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্কের আকার একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। বরং মস্তিষ্কের আকার, গঠন এবং দক্ষতা, সব মিলিয়ে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে। ছোট মস্তিষ্কের প্রজাতির মধ্যে বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কাজ করত, তা বুঝতে হলে আমাদের বুদ্ধিমত্তার ধারণাকেও আরও সূক্ষ্ম করতে হবে। বুদ্ধিমত্তা শুধু গণিত বা ভাষার মতো এক ধরনের ক্ষমতা নয়, বুদ্ধিমত্তা পরিবেশ বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সামাজিকভাবে মানিয়ে নেওয়া, শেখা, শেখানো, এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও। একটি প্রজাতি হয়তো জটিল অস্ত্র বানাতে পারেনি, কিন্তু পথ চিনে গুহার গভীরে দেহ নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করতে পেরেছে, এটাও এক ধরনের সক্ষমতা। একদিকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, অন্যদিকে সামাজিক ও আচরণগত দক্ষতা, এই দুইয়ের ভারসাম্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে ভিন্নভাবে গড়ে উঠতে পারে।

শেষ পর্যন্ত রাইজ়িং স্টার গুহার এই খোঁজ মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, মানুষ হওয়া বলতে আমরা কী বুঝি। যদি সমাধি দেওয়া, প্রতীক তৈরি করা, উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণ, পরিকল্পনা, এবং দলগত সিদ্ধান্ত আধুনিক মানুষের আগেই অন্য প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়, তাহলে মানব সভ্যতার বীজ হয়তো অনেক বেশি পুরনো, এবং অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। এই আবিষ্কার কলকাতার কোনও স্টেডিয়াম কাণ্ডের মতো এক দিনের ঘটনা নয়, বরং মানুষের উৎপত্তি ও মানসিক বিকাশের দীর্ঘ ইতিহাসে এক গভীর আলোড়ন। গবেষণা আরও এগোলে, নতুন প্রমাণ মিললে, হয়তো আরও ধারণা ভাঙবে, আরও প্রশ্ন উঠবে, এবং মানব বিবর্তনের গল্প আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠবে। বিজ্ঞান ঠিক এইভাবেই এগোয়, প্রশ্নের উপর প্রশ্ন তুলে, এক নিশ্চিত ধারণার ভিত নড়িয়ে দিয়ে, নতুন তথ্যের আলোয় পুরোনো ব্যাখ্যাকে নতুন করে সাজিয়ে। রাইজ়িং স্টার গুহার প্রাচীন সমাধির সম্ভাব্য খবর তাই শুধু একটি খোঁজ নয়, এটি এক ধরনের আহ্বান, বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের সহজ ধারণাকে আরও গভীরভাবে ভাবার আহ্বান, এবং মানুষের ইতিহাসকে আরও বড় পরিসরে দেখার আহ্বান।

 

 

 

 

 

 

Preview image