বিজ্ঞানীরা এমন এক অভিনব যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ও ঘূর্ণনের সমন্বয় ব্যবহার করে অল্প হলেও ধারাবাহিক বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। শক্তি গবেষণায় এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে শক্তির উৎস নিয়ে অনুসন্ধান কখনও থেমে থাকেনি। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে কয়লা, তেল, বিদ্যুৎ, পরমাণু শক্তি—প্রতিটি ধাপে মানুষ প্রকৃতির নতুন নতুন শক্তিকে নিজের কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট এবং পরিবেশ দূষণ বিশ্বজুড়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বিজ্ঞানীরা আরও বিকল্প ও পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎসের খোঁজে নেমেছেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে—পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা। কিন্তু পৃথিবীর নিজের ঘূর্ণনশক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর ধারণা দীর্ঘদিন ধরে শুধুই তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল। সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকে বাস্তবতার মাটিতে নামিয়ে এনেছে।
গবেষকদের দাবি, তাঁরা এমন এক যন্ত্র তৈরি করেছেন যা পৃথিবীর ঘূর্ণন ও চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাকৃতিক মিথস্ক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। এই আবিষ্কার শক্তি গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। যদিও এই বিদ্যুতের পরিমাণ এখনও খুবই সামান্য, তবুও এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে শক্তি আহরণের ধারণা আর কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়।
পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪৬০ মিটার বেগে নিজের অক্ষের উপর ঘোরে। এই গতিবেগ সরাসরি অনুভূত না হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল পরিমাণ গতিশক্তি। পাশাপাশি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র একটি অদৃশ্য ঢালের মতো গ্রহটিকে ঘিরে রাখে। বিজ্ঞানীরা এই দুই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সংযোগস্থলেই নতুন শক্তির সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, গবেষকদের দাবি, পৃথিবী যে নিজ অক্ষের উপর নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুরছে, সেই গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি পরীক্ষামূলক যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা পৃথিবীর ঘূর্ণন ও চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যবহার করে সামান্য হলেও ধারাবাহিক বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এই আবিষ্কারকে শক্তি গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার নিজ অক্ষের উপর সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। এই ঘূর্ণনের ফলে শুধু দিন-রাতের পরিবর্তনই নয়, তৈরি হয় এক বিশাল গতিশক্তি। পাশাপাশি পৃথিবীর রয়েছে নিজস্ব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, যা মহাকাশ থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে গ্রহটিকে রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই এই দুই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। তবে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা এতদিন মূলত তাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ ধাতব ও বৈদ্যুতিক গঠনের যন্ত্র তৈরি করেন, যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে স্থাপন করা হয়। পৃথিবী যখন ঘোরে, তখন ওই যন্ত্রের ভেতরে থাকা ইলেকট্রনগুলির উপর একটি ক্ষুদ্র বল কাজ করে। এই বলের ফলেই খুব অল্প মাত্রায় হলেও বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হয়। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষাগারে এই যন্ত্র দিয়ে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যন্ত্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার অত্যন্ত কম হলেও, এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। এতদিন ধারণা ছিল, পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে শক্তি আহরণ করলে তা গ্রহের গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু গবেষকদের মতে, এই যন্ত্র যে পরিমাণ শক্তি আহরণ করে, তা পৃথিবীর মোট শক্তির তুলনায় নগণ্য।
এই গবেষণা প্রকাশ্যে আসতেই বিজ্ঞান মহলে ব্যাপক আলোচনার সূচনা হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী একে অত্যন্ত সাহসী ও সৃজনশীল চিন্তার ফল বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, প্রকৃতির এমন সব শক্তিকে কাজে লাগানোর ভাবনা ভবিষ্যতের শক্তি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এখনও খুবই কম—সাধারণ কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গবেষণার গুরুত্ব বিদ্যুতের পরিমাণে নয়, বরং ধারণার বাস্তব প্রমাণে। এতদিন অনেকেই মনে করতেন, পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাস্তবে সম্ভব নয়। এই পরীক্ষামূলক যন্ত্র সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করল।
গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন। সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কুণ্ডলী ও চৌম্বকের আপেক্ষিক গতি ব্যবহার করা হয়। এখানে কুণ্ডলী বা যন্ত্র স্থির অবস্থায় থাকলেও পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণনই আপেক্ষিক গতির কাজ করছে। ফলে কোনও অতিরিক্ত জ্বালানি বা বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন হচ্ছে না।
এই আবিষ্কারকে ঘিরে বিজ্ঞান মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে অনেক গবেষক একে যুগান্তকারী ধারণার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছেন। অন্যদিকে কিছু বিজ্ঞানীর মতে, বাস্তব জীবনে এই প্রযুক্তিকে বড় আকারে ব্যবহারযোগ্য করতে এখনও বহু বাধা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় এটিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে বলে তাঁদের মত।
তবে সমালোচনার দিকও কম নয়। কিছু গবেষকের মতে, এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা এতটাই কম যে এটিকে বাস্তব জীবনে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা প্রায় অসম্ভব। তাঁরা বলছেন, সৌর বা বায়ুশক্তির তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক বেশি জটিল এবং কম কার্যকর।
এই সমালোচনার জবাবে গবেষক দল জানিয়েছে, তাঁদের লক্ষ্য এখনই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। বরং তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে এই যন্ত্রের ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।
শক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যতে বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প হবে না, কিন্তু এটি ছোট আকারের সেন্সর, মহাকাশযান বা দূরবর্তী গবেষণা কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। যেখানে সৌর বা ব্যাটারি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে উৎপন্ন ক্ষুদ্র কিন্তু স্থায়ী বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই আবিষ্কারের আরেকটি বড় দিক হল এর পরিবেশবান্ধব চরিত্র। কোনও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো নেই, কোনও কার্বন নির্গমন নেই, কোনও শব্দ বা দূষণ নেই। পৃথিবীর স্বাভাবিক গতিকেই কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন—এই ধারণা পরিবেশ রক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে যখন বিশ্বজুড়ে টেকসই শক্তির উৎসের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, তখন এই ধরনের গবেষণা নতুন দিকনির্দেশ দিতে পারে। যদিও এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, তবুও ভবিষ্যতের শক্তি গবেষণায় এটি একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি অঞ্চলভেদে আলাদা। তাই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এই যন্ত্র বসালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণেও পার্থক্য দেখা যেতে পারে। আগামী দিনে এই যন্ত্রকে বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই গবেষণা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম ও গতিশক্তির মধ্যে সম্পর্ককে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করছে। অনেক গবেষক মনে করছেন, এই কাজ ভবিষ্যতে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথ খুলে দেবে।
সাধারণ মানুষের কাছেও এই খবর কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—তবে কি একদিন পৃথিবী নিজেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হবে? বিজ্ঞানীরা অবশ্যই বলছেন, সেই দিন এখনও অনেক দূরে। তবে এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
তবে গবেষক দল আশাবাদী। তাঁদের মতে, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই যন্ত্রের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভবিষ্যতে বড় আকারের বা আরও সংবেদনশীল উপকরণ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কোনও জীবাশ্ম জ্বালানি, জলপ্রবাহ বা আবহাওয়ার উপর নির্ভর করতে হয় না, যা একে পরিবেশবান্ধব শক্তির সম্ভাব্য উৎস করে তুলেছে।
শক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি উন্নত করা যায়, তবে তা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। সৌর বা বায়ুশক্তির মতো এই পদ্ধতিও নিরবচ্ছিন্ন শক্তির উৎস হতে পারে, কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণন কখনও থামে না।
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য। এটি দেখিয়ে দিল, প্রকৃতির এমন অনেক শক্তি রয়েছে, যেগুলি আমরা প্রতিদিন অনুভব করলেও ব্যবহার করার কথা ভাবিনি। পৃথিবীর ঘূর্ণন এতটাই স্বাভাবিক একটি ঘটনা যে আমরা সেটিকে শক্তির উৎস হিসেবে কল্পনাও করিনি। এই গবেষণা সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে টেকসই শক্তি ব্যবস্থার পথে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। যদিও এটি এখনই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প শক্তির ভাণ্ডারে একটি নতুন সংযোজন হতে পারে।
গবেষক দল জানিয়েছে, তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য হল এই যন্ত্রের নকশা আরও উন্নত করা এবং বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে পরীক্ষা চালানো। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সব জায়গায় সমান নয়, তাই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণেও পার্থক্য হতে পারে। এই বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী ধাপের গবেষণা এগোবে।
সব মিলিয়ে, পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় এক নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করল, প্রকৃতির শক্তির উৎস এখনও পুরোপুরি আবিষ্কৃত হয়নি। ভবিষ্যতের শক্তি সংকট মোকাবিলায় হয়তো এমনই কোনও অপ্রত্যাশিত ধারণা একদিন বড় ভূমিকা নেবে। পৃথিবীর নিরবচ্ছিন্ন ঘূর্ণন যে একদিন মানবসভ্যতার বিদ্যুৎ জোগাতে পারে—এই ভাবনাই আজ আর কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং বাস্তব গবেষণার বিষয়।