Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পর পর হামলার নেপথ্যে দুই তরুণী! কী ঘটেছে বালোচিস্তানে? কেন ভারতের দিকে আঙুল তোলা হল

বালোচিস্তানে সমস্ত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের দায় স্বীকার করেছে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি। তারা দু’জন তরুণী আত্মঘাতী হামলাকারীর (সুইসাইড বম্বার) ছবিও প্রকাশ করেছে।শনিবার থেকে পর পর বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশ। তার কোনওটি আত্মঘাতী, কোনওটি নয়। এই সমস্ত হামলার অধিকাংশের নেপথ্যেই ছিলেন দুই তরুণী হামলাকারী। রবিবার তাঁদের ছবি প্রকাশ্যে এনেছে বালোচ বিদ্রোহীরা। হামলার পর পাকিস্তানি সেনার ৪০ ঘণ্টার অভিযানে বালোচিস্তানে ১৪৩ জন জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি। প্রাণ গিয়েছে অনেক সেনা জওয়ান এবং সাধারণ নাগরিকেরও।

বালোচিস্তানে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই নাজেহাল পাক সরকার। রবিবার তারা একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, বালোচিস্তানের কোয়েটা, নুশকি, মাসটাং, ডালবান্দিন, খারান, পাঞ্জগুর, গদর এবং পাসনিতে একাধিক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার নেপথ্যে ‘বিদেশি শক্তি’কে দায়ী করা হয়। এমনকি, ভারতের দিকেও আঙুল তোলে ইসলামাবাদ। দাবি ছিল, ভারতের মদতপুষ্ট জঙ্গিরাই নাকি বালোচিস্তানে এমন প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। এর পরেই বালোচিস্তানের বিস্তীর্ণ অংশে অভিযানে নামে পাক সেনা। নিকেশ করা হয় জঙ্গিদের। তবে স্থানীয় সূত্রে সাধারণ নাগিরকদের উপর সেনার অকারণ অত্যাচারের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।

বালোচিস্তানে সমস্ত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের দায় স্বীকার করেছে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। তারা দু’জন তরুণী আত্মঘাতী হামলাকারীর (সুইসাইড বম্বার) ছবি প্রকাশ করেছে। তাঁদের মধ্যে এক জন ২৪ বছরের আসিফা মেঙ্গল। দ্বিতীয় জনের ছবি থাকলেও নাম জানা যায়নি। হামলাকারীদের মধ্যে যে দু’জন তরুণী ছিলেন, মেনে নিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফও।

বিএলএ বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলাকারী আসিফা নিজের ২১তম জন্মদিনে তাদের মজিদ ব্রিগেডে যোগ দেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শনিবার নুশকিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সদর দফতরে হামলা চালিয়েছেন এই আসিফাই। হামলাকারী দ্বিতীয় তরুণীর একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেছে বালোচ বিদ্রোহীরা। আত্মঘাতী হামলার ঠিক আগে সেই ভিডিয়ো রেকর্ড করা হয়েছে। সেখানে অন্য এক জনের সঙ্গে তরুণীকে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। হাতে বন্দুক নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেছেন, ‘‘ওরা (পাক সরকার) আমাদের মা-বোনেদের দমিয়ে রাখতে শুধু গায়ের জোর দেখায়। সরাসরি আমাদের মুখোমুখি হতে পারে না। সেই ক্ষমতা নেই। আমাদের জাগতে হবে।’’

পাক সেনা দাবি করেছিল, দেশের বাইরে থেকে বালোচ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে। ভারত থেকে এই সমস্ত জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছিল তারা। রবিবারই ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সেই দাবি উড়িয়ে দেয়। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, পাকিস্তানের দাবি ভিত্তিহীন। তাদের উচিত, বালোচিস্তানের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের দিকে মনোযোগ দেওয়া

বালোচিস্তানে সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলাগুলি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। একের পর এক হামলার দায় স্বীকার করে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) যে বিবৃতি প্রকাশ করেছে, তা শুধু নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলকেও নতুন করে সতর্ক করেছে। বিশেষ করে এই হামলাগুলিতে দু’জন তরুণী আত্মঘাতী হামলাকারীর উপস্থিতি এবং তাঁদের ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ করা—এই ঘটনা পাকিস্তানে সশস্ত্র বিদ্রোহের চরিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।

হামলার দায় স্বীকার ও প্রকাশিত ছবি

বিএলএ-র বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বালোচিস্তানে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলির দায় তারা নিজেরাই নিচ্ছে। সংগঠনের তরফে দু’জন তরুণী আত্মঘাতী হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ২৪ বছরের আসিফা মেঙ্গল। দ্বিতীয় তরুণীর ছবি প্রকাশিত হলেও এখনও পর্যন্ত তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি। এই তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে বিএলএ একদিকে যেমন নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শিক অনুগতদের দেখাতে চাইছে, তেমনই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করাও তাদের লক্ষ্য বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর স্বীকারোক্তি

এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের বক্তব্যের কারণে। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে সাম্প্রতিক হামলাকারীদের মধ্যে দু’জন তরুণী ছিলেন। পাকিস্তানের মতো রক্ষণশীল সমাজে নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর উপস্থিতি শুধু সামাজিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা দিক থেকেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি কার্যত বিএলএ-র দাবিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।

আসিফা মেঙ্গল: বয়স, পটভূমি ও ‘মজিদ ব্রিগেড’

বিএলএ জানিয়েছে, আসিফা মেঙ্গল নিজের ২১তম জন্মদিনে তাদের আত্মঘাতী শাখা ‘মজিদ ব্রিগেড’-এ যোগ দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মজিদ ব্রিগেড বিএলএ-র সবচেয়ে চরমপন্থী ও ভয়ঙ্কর ইউনিট হিসেবে পরিচিত, যারা মূলত আত্মঘাতী হামলার দায়িত্বে থাকে। সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসেই আসিফা আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্ত ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল, কোনও হঠাৎ আবেগপ্রবণ পদক্ষেপ নয়।

নুশকিতে আইএসআই সদর দফতরে হামলা

শনিবার বালোচিস্তানের নুশকি এলাকায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সদর দফতরে যে হামলা চালানো হয়, সেটির মূল হামলাকারী ছিলেন এই আসিফা মেঙ্গল—এমনটাই দাবি বিএলএ-র। আইএসআই পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের ঘাঁটিতে সরাসরি আত্মঘাতী হামলা চালানো মানে শুধু প্রতীকী আঘাত নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রে আঘাত হানার চেষ্টা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে বিএলএ বার্তা দিতে চেয়েছে যে তারা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীরে ঢুকে আঘাত হানতে সক্ষম। একই সঙ্গে আইএসআই-কে লক্ষ্যবস্তু করা রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

দ্বিতীয় তরুণীর ভিডিয়ো ও বক্তব্য

বালোচ বিদ্রোহীরা দ্বিতীয় তরুণীর একটি ভিডিয়োও প্রকাশ করেছে, যা আত্মঘাতী হামলার ঠিক আগে রেকর্ড করা বলে দাবি করা হয়েছে। সেই ভিডিয়োতে দেখা যায়, হাতে বন্দুক নিয়ে হাসতে হাসতে ওই তরুণী অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ—

“ওরা (পাক সরকার) আমাদের মা-বোনেদের দমিয়ে রাখতে শুধু গায়ের জোর দেখায়। সরাসরি আমাদের মুখোমুখি হতে পারে না। সেই ক্ষমতা নেই। আমাদের জাগতে হবে।”

এই বক্তব্যে বালোচ বিদ্রোহের মূল অভিযোগগুলিই প্রতিফলিত হয়েছে—রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সামরিক দমননীতি, এবং বালোচ জনগণের প্রতি বৈষম্য।

নারী আত্মঘাতী হামলাকারী: কৌশলগত পরিবর্তন?

বিএলএ-র মতো সংগঠনের ক্ষেত্রে নারী আত্মঘাতী হামলাকারী ব্যবহার নতুন নয়, তবে সংখ্যায় এখনও বিরল। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে—

news image
আরও খবর
  1. নিরাপত্তা এড়ানোর সুবিধা: অনেক ক্ষেত্রেই নারী হামলাকারীরা তুলনামূলক কম সন্দেহের মুখে পড়ে।

  2. মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: নারী আত্মঘাতী হামলা সমাজে আরও বেশি আতঙ্ক ও আলোড়ন সৃষ্টি করে।

  3. আদর্শিক বার্তা: সংগঠন দেখাতে চায় যে তাদের সংগ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যুক্ত।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলি একে ‘চরমপন্থার সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ’ বলেই বর্ণনা করেছে, যেখানে তরুণীদের জীবনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের সেনার অভিযোগ ও ভারতের ভূমিকা

এই হামলার পর পাকিস্তানের সেনা দাবি করে যে দেশের বাইরে থেকে বালোচ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং ভারত থেকেই এই সমস্ত জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বালোচ বিদ্রোহের জন্য ভারতের দিকে আঙুল তোলা হয়।

তবে রবিবারই ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দেয়। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় জানান, পাকিস্তানের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দায় অন্য দেশের ঘাড়ে চাপানো পাকিস্তানের পুরনো অভ্যাস।

ভারতের পাল্টা বার্তা

রণধীর জয়সওয়াল আরও বলেন, পাকিস্তানের উচিত বালোচিস্তানের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ও অভিযোগগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়া। রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন—এই বিষয়গুলির সমাধান না করে শুধু নিরাপত্তা অভিযান চালালে সমস্যার মূল কখনওই মিটবে না।

ভারতের কূটনৈতিক মহলের মতে, বালোচিস্তান ইস্যু পাকিস্তানের একেবারে অভ্যন্তরীণ সমস্যা, এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে জড়ানোর চেষ্টা কেবলমাত্র দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল।

বালোচিস্তান: দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বিদ্রোহের ইতিহাস

বালোচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলক কম। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও স্থানীয় বালোচ জনগণের অভিযোগ—এই সম্পদের সুফল তারা পায় না। গ্যাস, খনিজ, বন্দর—সবকিছু থেকেই কেন্দ্র লাভবান হলেও বালোচিস্তান থেকে যায় অনুন্নত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুম, বেআইনি গ্রেফতার, সামরিক অভিযান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। এই পরিস্থিতিই বহু তরুণকে সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।

সন্ত্রাস বনাম রাজনৈতিক সমাধান

তবে আন্তর্জাতিক স্তরে স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আত্মঘাতী হামলা, বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আঘাত, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

একই সঙ্গে অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, কেবল সামরিক দমননীতি দিয়ে বালোচিস্তান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

উপসংহার

বালোচিস্তানে বিএলএ-র দায় স্বীকার, নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর উপস্থিতি, আইএসআই ঘাঁটিতে হামলা এবং ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বড় প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে বালোচ জনগণের ক্ষোভ ও হতাশাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই সংকটের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে পাকিস্তান রাষ্ট্র কীভাবে এই সমস্যাকে দেখে—শুধু ‘আইনশৃঙ্খলা সমস্যা’ হিসেবে, না কি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট হিসেবে। যতদিন দ্বিতীয় পথটি গুরুত্ব না পায়, ততদিন বালোচিস্তান ইস্যু শুধু পাকিস্তানের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে।

Preview image