Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মানুষের রক্তেই বেশি আকর্ষণ! মশা কেন মানুষকেই টার্গেট করে—জানাল গবেষণা

ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্যে ১,৭১৪টি মশার উপর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, স্ত্রী মশাদের রক্ত বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে—তারা কাদের কামড়েছে এবং কেন মানুষ তাদের বেশি আকর্ষণ করে।

মানুষের রক্তেই বাড়তি লোভ মশার! জঙ্গল ধ্বংসে বদলেছে তাদের খাদ্যাভ্যাস, জানাল গবেষণা

শান্তিতে কোথাও বসার উপায় নেই। পার্কে বেঞ্চে দু’মিনিট বসতেই কানে ভনভন শব্দ—তার পরেই কুট করে কামড়। কখনও হাতে, কখনও পায়ে, কখনও ঘাড়ে। চুলকানি, ফোলা, অস্বস্তি—এই দৃশ্য আজ প্রায় সবার জীবনের অংশ। শহর হোক বা গ্রাম, ঘরের ভেতর হোক বা বাইরে, মশার দাপট থেকে মুক্তি পাওয়া যেন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কীটনাশক, কয়েল, রিপেলেন্ট—সব ব্যবস্থাই যেন সাময়িক স্বস্তি দেয় মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—মশারা কেন মানুষকেই এত বেশি কামড়ায়?

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় জানা গিয়েছিল, মানুষের শরীরের তাপমাত্রা, ঘাম, কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ, এমনকি রক্তের গ্রুপ পর্যন্ত মশাদের আকর্ষণের কারণ হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও গভীর ও উদ্বেগজনক তথ্য—মশাদের মানুষের প্রতি এই অতিরিক্ত ঝোঁকের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মানুষেরই তৈরি পরিবেশগত পরিবর্তনের। অর্থাৎ, আমরা যত জঙ্গল ধ্বংস করেছি, যত প্রাণী বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছি, ততই মশারা বাধ্য হয়েছে মানুষের দিকে ঝুঁকতে।

এই চাঞ্চল্যকর গবেষণা হয়েছে ব্রাজ়িলের বিখ্যাত আটলান্টিক অরণ্যে, যা শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নয়, গোটা বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বনাঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন—এই অরণ্যের মশারা এখন আর আগের মতো নানা প্রাণীর রক্ত পান করে না। বরং তারা বেছে বেছে মানুষকেই নিশানা করছে। শুধু তাই নয়, এর ফলেই বাড়ছে ডেঙ্গি, জিকা, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি।

এই প্রতিবেদনে আমরা জানব—
? কেন মশাদের খাদ্যাভ্যাস বদলে যাচ্ছে
? কীভাবে জঙ্গল ধ্বংস মানুষের স্বাস্থ্যকেই বিপন্ন করছে
? গবেষণায় কী উঠে এসেছে
? ভবিষ্যতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে
? আর কীভাবে এই তথ্য ব্যবহার করে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ সম্ভব

জঙ্গল কমছে, মানুষ বাড়ছে — বদলাচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য

ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্য এক সময় দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল—ব্রাজ়িল ছাড়াও প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার অংশবিশেষ পর্যন্ত। এই অরণ্যে বাস করত হাজার হাজার প্রজাতির গাছ, স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও কীটপতঙ্গ। এক কথায়, এটি ছিল প্রকৃতির এক বিশাল পরীক্ষাগার, যেখানে খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য ছিল নিখুঁতভাবে বজায় রাখা।

কিন্তু গত কয়েক শতকে মানুষের বসতি স্থাপন, চাষবাস, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে এই অরণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ বনভূমি টিকে আছে—তাও খণ্ড খণ্ড অবস্থায়। বনভূমি ছোট হতে থাকায় শুধু বড় প্রাণীরাই নয়, অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জীবনচক্রেও বিশাল পরিবর্তন এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একটি বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে প্রতিটি স্তরে—উদ্ভিদ থেকে শুরু করে শিকারি ও পরজীবী প্রাণীদের মধ্যেও। মশা তারই একটি উদাহরণ।

আগে মানুষ নয়, ছিল বহু বিকল্প

আজ আমরা যতটা ভাবি যে মশারা মানুষের রক্তেই বাঁচে, বাস্তবে কিন্তু তা সব সময় এমন ছিল না। বিবর্তনের ইতিহাস বলছে, মশারা এক সময় বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, উভচর ও সরীসৃপের রক্ত পান করত। অর্থাৎ, মানুষের রক্ত ছিল তাদের খাদ্যতালিকার মাত্র একটি অংশ—প্রধান নয়।

বনে যখন হরিণ, বানর, ইঁদুর, পাখি, ব্যাঙ, নানা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ছড়াছড়ি ছিল, তখন মশাদের পক্ষে খাদ্য উৎস বদলানো ছিল খুব সহজ। আজ এক প্রাণী, কাল আরেক প্রাণী—এভাবেই তাদের খাদ্যাভ্যাস চলত। এতে শুধু মশারাই নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্রই ভারসাম্যপূর্ণ থাকত।

কিন্তু বন উজাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীর সংখ্যা কমে গেল। অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হল, অনেকের সংখ্যা এতটাই কমে গেল যে তারা আর মশাদের কাছে সহজলভ্য খাদ্য উৎস রইল না। তখনই মশারা বাধ্য হল বিকল্প খুঁজতে—আর সেই বিকল্প হয়ে উঠল মানুষ।

কীভাবে করা হল এই গবেষণা?

এই গবেষণাটি করেছেন ব্রাজ়িলের ফেডারাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অলওয়াল্ডো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা আটলান্টিক অরণ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে মোট ১,৭১৪টি মশা সংগ্রহ করেন, যেগুলি ছিল ৫২টি ভিন্ন প্রজাতির।

এই ১,৭১৪টি মশার মধ্যে ১৪৫টি ছিল স্ত্রী মশা—কারণ শুধু স্ত্রী মশারাই রক্ত পান করে ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। পুরুষ মশারা সাধারণত ফুলের মধু বা উদ্ভিদের রসেই বেঁচে থাকে।

এই ১৪৫টি স্ত্রী মশার মধ্যে ২৪টির পেটের ভেতরের রক্ত পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, তারা শেষবার কাদের কামড়েছিল। আধুনিক জিনগত ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে রক্তের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো—

? ২৪টির মধ্যে ১৮টির পেটে পাওয়া গেছে মানুষের রক্ত
? বাকিদের পেটে মিলেছে ইঁদুর, পাখি, উভচর প্রাণী এবং ক্যানিড শ্রেণির (যেমন কুকুরজাতীয়) প্রাণীর রক্ত

এই পরিসংখ্যান থেকেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন—এই অঞ্চলের মশাদের মানুষের প্রতি ঝোঁক স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।

কেন মানুষের রক্তই এখন প্রথম পছন্দ?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতা শুধু কাকতালীয় নয়—বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তনের ফল।

প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া

জঙ্গল উজাড় হওয়ার ফলে বহু স্তন্যপায়ী ও পাখি প্রজাতি হয় বিলুপ্ত হয়েছে, নয়তো তাদের সংখ্যা এতটাই কমে গেছে যে তারা মশাদের কাছে আর সহজলভ্য নয়। ফলে মশারা বাধ্য হচ্ছে মানুষের দিকে ঝুঁকতে।

মানুষের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া

একই সঙ্গে বনভূমির আশেপাশে মানুষের বসতি বেড়েছে বহু গুণ। ফলে মশাদের কাছে মানুষের শরীর এখন সবচেয়ে সহজলভ্য ও স্থায়ী খাদ্য উৎস।

অভিযোজনের ক্ষমতা

মশারা অত্যন্ত অভিযোজ্য প্রাণী। পরিবেশ বদলালে তারা দ্রুত নিজেদের আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের রক্ত গ্রহণ করতে করতে এখন অনেক প্রজাতির মশার জিনগত বৈশিষ্ট্যেই এই প্রবণতা স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক সার্জিও মাচাদোর কথায়,

“মানুষ এখন ওই অঞ্চলের মশাদের কাছে ‘প্রিভ্যালেন্ট হোস্ট’—অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় এমন খাদ্য উৎস।”

মানুষের জন্য কী বিপদ বাড়ছে?

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল—রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।

মশারা শুধু কামড়ায় না, তারা এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বহন করে। ডেঙ্গি, জিকা, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়ায় মূলত মশার মাধ্যমেই।

যখন মশারা নানা প্রাণীর মধ্যে রক্ত শোষণ করত, তখন সংক্রমণের পথ ছড়ানো থাকত বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে। কিন্তু এখন যদি তারা মূলত মানুষকেই কামড়ায়, তাহলে—

? এক জন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য বহু মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে
? শহর ও গ্রামাঞ্চলে মহামারির ঝুঁকি বেড়ে যায়
? স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়

সার্জিও মাচাদোর মতে,

“মশারা যদি কোনও সংক্রামিত ব্যক্তিকে কামড়ায় এবং তার পরে অন্য মানুষকে কামড়ায়, তাহলে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

অর্থাৎ, জঙ্গল ধ্বংস শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যকেই বিপন্ন করছে।

পরিবেশ ধ্বংস আর জনস্বাস্থ্যের অদ্ভুত যোগসূত্র

এই গবেষণা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—পরিবেশ রক্ষা আর জনস্বাস্থ্য একে অপরের থেকে আলাদা বিষয় নয়। বরং তারা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

আমরা যখন বন কাটি, তখন শুধু গাছই কাটছি না—আমরা ভেঙে দিচ্ছি একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। তার প্রভাব পড়ছে—

✔️ খাদ্যশৃঙ্খলে
✔️ প্রাণীদের আচরণে
✔️ রোগের বিস্তারে
✔️ মানুষের জীবনযাত্রায়

news image
আরও খবর

মশাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস কমে যাওয়ায় তারা মানুষকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ফলে রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অর্থাৎ, প্রকৃতিকে আঘাত করলে সেই আঘাত ঘুরে এসে মানুষকেই লাগছে।

গবেষণার গুরুত্ব কী?

এই গবেষণাকে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলছেন কয়েকটি কারণে—

১. রোগ নিয়ন্ত্রণের নতুন পথ

যদি জানা যায় কোন অঞ্চলে মশারা বেশি মানুষের দিকে ঝুঁকছে, তাহলে সেই এলাকায় আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

২. পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা

এই গবেষণা প্রমাণ করে যে বন সংরক্ষণ শুধু প্রকৃতি রক্ষার বিষয় নয়—এটি মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়ও।

৩. মশার আচরণ বোঝা সহজ হচ্ছে

মশার খাদ্যাভ্যাস ও আচরণ সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি হলে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর রিপেলেন্ট, কীটনাশক বা জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

৪. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মশার বিস্তার ও আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বুঝতেও এই গবেষণা সাহায্য করবে

শহরেও কি একই চিত্র?

যদিও এই গবেষণা হয়েছে বনাঞ্চলে, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শহর ও আধা-শহর এলাকাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

নগরায়ণের ফলে—

✔️ পুকুর, জলাভূমি, খাল ভরাট হচ্ছে
✔️ পাখি ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে
✔️ মানুষের ঘনত্ব বাড়ছে

ফলে মশার কাছে মানুষই হয়ে উঠছে সবচেয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য খাদ্য উৎস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জল জমে থাকা আবর্জনা, নির্মাণাধীন বাড়ি, ফুলের টব, ফেলে রাখা টায়ার—যেগুলি মশার বংশবিস্তারকে আরও সহজ করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজ শহরে ডেঙ্গি বা চিকুনগুনিয়ার বাড়বাড়ন্ত আসলে পরিবেশগত অব্যবস্থাপনারই ফল।

কীভাবে এই তথ্য কাজে লাগানো যেতে পারে?

এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব—

১. ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিতকরণ

যেসব এলাকায় বন উজাড় হয়েছে বা প্রাণী বৈচিত্র কমে গেছে, সেখানে মশাবাহিত রোগের নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে।

২. পরিবেশ সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন

বনায়ন, জলাভূমি সংরক্ষণ ও প্রাণী বৈচিত্র ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে মশাদের বিকল্প খাদ্য উৎস তৈরি করা সম্ভব—যাতে তারা মানুষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়।

৩. জনস্বাস্থ্য নীতি উন্নত করা

এই গবেষণা স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে—বিশেষ করে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, জিকার মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে।

৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি

মানুষকে বোঝানো সম্ভব যে পরিবেশ রক্ষা মানেই শুধু গাছ বাঁচানো নয়—এটি নিজেদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়।

মশাদের অভিযোজন: প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দিক

এই গবেষণার আরেকটি দিক হল—মশাদের অভিযোজন ক্ষমতা। পরিবেশ বদলালে তারা কীভাবে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন চক্র ও আচরণ বদলে ফেলে, তা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

যেখানে অন্য অনেক প্রাণী পরিবেশ বদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে যায়, সেখানে মশারা ঠিক উল্টোটা করে—তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নতুন পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তারা দ্রুত বিবর্তিত হয়।

কিন্তু এই অভিযোজন মানুষের জন্য আশীর্বাদ নয়—বরং অভিশাপ হয়ে উঠছে। কারণ, মশার এই অভিযোজন ক্ষমতার ফলেই নতুন নতুন রোগ ছড়াচ্ছে, পুরনো রোগ আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষা মানেই স্বাস্থ্য রক্ষা

এই গবেষণা আমাদের সামনে এক গভীর সত্য তুলে ধরেছে—মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়। আমরা যতই ভাবি শহরে বসে আধুনিক জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই, বাস্তবে কিন্তু প্রতিটি গাছ কাটা, প্রতিটি বন উজাড়, প্রতিটি জলাভূমি ভরাটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে আমাদের শরীরেই—রোগ, মহামারি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মাধ্যমে।

মশারা তার সবচেয়ে ছোট কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক উদাহরণ। তারা দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে পরিবেশগত ভারসাম্য ভেঙে পড়লে ক্ষুদ্রতম প্রাণীও মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যতের আশঙ্কা কী?

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, যদি এই প্রবণতা চলতেই থাকে—

? আরও বেশি অঞ্চলে মশাবাহিত রোগ ছড়াবে
? নতুন নতুন ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে
? স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে
? শিশু, বয়স্ক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা মানুষদের ঝুঁকি বাড়বে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এই গবেষণা সেই আশঙ্কাকেই আরও বাস্তব করে তুলছে।

সমাধান কোথায়?

সমাধান একমাত্র কীটনাশক বা মশারি নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন,দীর্ঘমেয়াদি সমাধান লুকিয়ে আছে পরিবেশ রক্ষার মধ্যেই।

✔️ বন সংরক্ষণ
✔️ জলাভূমি রক্ষা
✔️ প্রাণী বৈচিত্র বজায় রাখা
✔️ পরিকল্পিত নগরায়ণ
✔️ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ

এই সব কিছুর মাধ্যমেই মশার স্বাভাবিক খাদ্যচক্র ও বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাতে তারা মানুষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবে না, আর রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে।

Preview image