ইউরোপীয় কমিশন এবং ভারতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের বাজার নিয়ে এই বিশাল বাণিজ্যিক চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই বিলিয়ন মানুষের বাজারে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লব
ভূমিকা বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির ভূ রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আসন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আলোচনা জল্পনা কল্পনা এবং নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে অবশেষে এই চুক্তিটি বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে উভয় পক্ষই এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই চুক্তিটি কেবল দুটি অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই মজবুত করবে না বরং বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে এক নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আলোচনার প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক যাত্রা ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা প্রথম শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। তবে শুল্ক কাঠামো মেধাসম্পদ অধিকার এবং পেশাদারদের চলাচলের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে মতবিরোধের কারণে ২০১৩ সালে এই আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২১ সালে পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়ন শীর্ষ সম্মেলনে পুনরায় এই আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হয়। এরপর থেকে উভয় পক্ষের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চুক্তি তৈরির লক্ষ্যে।
উরসুলা ফন ডার লেয়েন এর ঘোষণা ও বর্তমান পরিস্থিতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে উরসুলা ফন ডার লেয়েন যখন ঘোষণা করেন যে ভারত ও ইইউ এখন সীমানার ঠিক উপরে দাঁড়িয়ে আছে তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের জন্য নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী দুটি বিশাল শক্তির মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন অধ্যায়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক খসড়া এবং ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই বিলিয়ন মানুষের বিশাল বাজার এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিশাল ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রভাব। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা মিলিয়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক বাজার তৈরি হবে। এটি হবে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব। এই বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়িত্বের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
চুক্তির মূল গুরুত্ব ও প্রভাব ১ শুল্ক কাঠামো হ্রাস ও পণ্য আমদানিতে সুবিধা বর্তমানে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্ক বিদ্যমান। এই চুক্তির ফলে কৃষি পণ্য টেক্সটাইল গয়না এবং শিল্পজাত পণ্যের ওপর থেকে শুল্কের হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এতে করে ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের পণ্য পাবেন এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফার হার বৃদ্ধি পাবে। ২ রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি ভারতের জন্য এই চুক্তিটি হবে একটি গেম চেঞ্জার। বিশেষ করে নিম্নলিখিত খাতগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে বাংলাদেশের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ভারত আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। আইটি ও সফটওয়্যার পরিষেবা ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। ইউরোপের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য ভারতের দক্ষ আইটি পেশাদারদের চাহিদা এই চুক্তির মাধ্যমে আরও সুসংহত হবে। কৃষিপণ্য ভারতের ফল সবজি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের জন্য ইউরোপের একটি বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে। ৩ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো দীর্ঘকাল ধরে ভারতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী কিন্তু জটিল শুল্ক ও আমদানিনীতির কারণে অনেক সময় তারা পিছিয়ে ছিল। এই চুক্তির ফলে আইনি জটিলতা হ্রাস পাবে এবং একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি হবে। জার্মানি ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো থেকে ভারতে অটোমোবাইল ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে যা স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত বিশেষায়িত খাত ৪ প্রযুক্তি বিনিময় ও উদ্ভাবন চুক্তির একটি প্রধান স্তম্ভ হবে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তি এবং গ্রিন হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দক্ষতা ভারতের নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উভয় পক্ষ যৌথ গবেষণার সুযোগ পাবে। ৫ ডিজিটাল অর্থনীতি ও ডেটা নিরাপত্তা বর্তমান যুগে ডেটা বা তথ্য হলো নতুন জ্বালানি। ভারত ও ইইউ এর মধ্যে ডেটা সুরক্ষা এবং ডিজিটাল কমার্স নিয়ে একটি অভিন্ন রূপরেখা তৈরি হবে। এতে ই কমার্স ব্যবসা যেমন সহজ হবে তেমনি গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
চ্যালেঞ্জ ও কাটিয়ে ওঠার পথ যদিও চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। ডেইরি পণ্য এবং মদের শুল্ক নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলছে। এছাড়া শ্রমমান এবং পরিবেশগত শর্তাবলী ভারতের জন্য কিছুটা কঠিন হতে পারে। তবে উরসুলা ফন ডার লেয়েনের মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষই নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করছে যাতে একটি উইন উইন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বৈশ্বিক রাজনীতি ও কৌশলগত গুরুত্ব চীন পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করতে ইউরোপ এখন ভারতের দিকে ঝুঁকছে। এই চুক্তিটি কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি কৌশলগত সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।
উপসংহার ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কেবল কাগজের কলমে স্বাক্ষরিত একটি দলিল নয় এটি দুই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের একটি চাবিকাঠি। উরসুলা ফন ডার লেয়েন সঠিকভাবেই একে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন। এটি দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে যেখানে বাণিজ্য হবে অবাধ প্রযুক্তি হবে উন্মুক্ত এবং সমৃদ্ধি হবে সবার জন্য। বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনটির জন্য যখন ভারতের উদ্ভাবনী শক্তি এবং ইউরোপের উন্নত প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষমতায়ন ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই চুক্তির ফলে ভারতের স্থানীয় হস্তশিল্প চর্মজাত পণ্য এবং খেলনা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে। শুল্ক কমার ফলে এই ছোট উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামার সাহস পাবে। এটি কেবল ভারতের রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না বরং গ্রামীণ ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
মেধাসম্পদ অধিকার এবং আইনি নিরাপত্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তির একটি বড় শর্ত হলো মেধাসম্পদ অধিকার রক্ষা। এই চুক্তির ফলে ভারতে উদ্ভাবন ও গবেষণার পরিবেশ আরও সুরক্ষিত হবে। যখন বিদেশি কোম্পানিগুলো দেখবে যে তাদের প্রযুক্তি ও পেটেন্ট ভারতে সম্পূর্ণ নিরাপদ তখন তারা তাদের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলো এখানে নিয়ে আসতে দ্বিধা করবে না। এটি ভারতকে একটি সাধারণ অ্যাসেম্বলি হাব থেকে গ্লোবাল আরঅ্যান্ডডি হাবে রূপান্তরিত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে গ্রিন ডিল বা সবুজ অর্থনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতের সাথে এই চুক্তিতে পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ দুই পক্ষই এমন সব পণ্যের বাণিজ্যকে উৎসাহিত করবে যা কার্বন নিঃসরণ কমায়। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ কারণ এর মাধ্যমে ভারত উন্নত ইউরোপীয় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের শিল্পকারখানাগুলোকে আধুনিকীকরণ করতে পারবে।
উপসংহার এক নতুন যুগের সূচনা পরিশেষে বলা যায় ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয় এটি একটি সভ্যতার সাথে অন্য সভ্যতার অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন। উরসুলা ফন ডার লেয়েনের কথায় যে আশাবাদের প্রতিফলন ঘটেছে তা যদি বাস্তবে রূপ পায় তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এশীয় ও ইউরোপীয় শক্তির এক অভূতপূর্ব ভারসাম্য তৈরি হবে। দুই বিলিয়ন মানুষের এই বিশাল বাজার যখন একীভূত হবে তখন তার সুফল কেবল ভারত বা ইউরোপ নয় বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ভোগ করবে। এটি হবে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং সফল অর্থনৈতিক মাইলফলক।