সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সুনীল জানান, যে জিনিসে নিজে বিশ্বাস করেন না, মোটা অর্থের বিনিময়েও সেই জিনিসের প্রচার তিনি করেন না। তামাকের বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব পেয়ে কী বলেন অভিনেতা?পানমশলা, তামাক বা মদের বিজ্ঞাপন করে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পেলেও প্রায়ই কটাক্ষের শিকার হন একাধিক তারকা। এই তালিকায় শাহরুখ খান, অজয় দেবগন বা অক্ষয় কুমারের মতো নাম রয়েছে। সম্প্রতি, এই প্রসঙ্গে মুখ খোলেন সুনীল শেট্টী। ৪০ কোটি টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তামাকের বিজ্ঞাপনে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। যা ফিরিয়ে দেন অভিনেতা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সুনীল জানান, যে জিনিসে নিজে বিশ্বাস করেন না, মোটা অর্থের বিনিময়েও সেই জিনিসের প্রচার তিনি করেন না। অভিনেতা বলেন, “আমার কাছে আমার স্বাস্থ্য সর্বাগ্রে। আমার এই শরীরটার জন্যই ফিল্মের দুনিয়ায় সুনীল শেট্টী সুযোগ পেয়েছে। আমার শরীরকে আমি পুজোর যোগ্য না মনে করলে নিজের প্রতি অবিচার করা হবে। ছেলেমেয়েদের জন্য কী রেখে যাব তা হলে?”
সেখানেই তিনি ফাঁস করেন, তাঁর কাছে তামাকের বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব এসেছিল। সুনীল বলেন, “একটা তামাকের বিজ্ঞাপনের জন্য ৪০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ওঁদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘আপনাদের সত্যিই মনে হয় ওই ফাঁদে আমি পা দেব? দেব না।’ হয়তো আমার টাকাটা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু না। এমন কিছু আমি করব না, যাতে নিজেই বিশ্বাস করি না। এতে অহান (শেট্টী), আথিয়া (শেট্টী), (কেএল) রাহুল ও সকলে কালিমালিপ্ত হবে। তার পর থেকে কেউ আমাকে ওই প্রস্তাব দেওয়ার সাহসই করে না।”
নব্বইয়ের দশক থেকে আজ পর্যন্ত বলিউডে যাঁরা নিজেদের আলাদা করে চিহ্নিত করে রেখেছেন, সুনীল শেট্টী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন দায়িত্ববান নাগরিক, বাবা এবং সমাজসচেতন মানুষ হিসেবেও তিনি বহুবার নজির গড়েছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর যে মন্তব্য সামনে এসেছে, তা আবারও প্রমাণ করে দিল—গ্ল্যামার দুনিয়ার কৃত্রিম আলো-ছায়ার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরতে জানেন সুনীল শেট্টী।
সেই সাক্ষাৎকারে সুনীল স্পষ্ট ভাষায় জানান, যে জিনিসে তিনি নিজে বিশ্বাস করেন না, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়েও তার প্রচার তিনি কখনও করেন না। তাঁর কথায়, “আমার কাছে আমার স্বাস্থ্যই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই শরীরটার জন্যই আমি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পেরেছি। এই শরীরটাকে যদি আমি পুজোর যোগ্য বলে মনে না করি, তা হলে নিজের প্রতিই অবিচার করা হবে।” এই বক্তব্যে শুধু একজন অভিনেতার পেশাগত সততার কথা নয়, বরং একজন মানুষের জীবনদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আজকের দিনে যখন তারকারা কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন চুক্তিতে সই করছেন, তখন স্বাস্থ্যহানিকর পণ্যের প্রচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। তামাক, গুটখা, পানমশলার মতো পণ্যের বিজ্ঞাপনে বড় বড় তারকাদের মুখ দেখা যায় নিয়মিত। এমন বাস্তবতায় সুনীল শেট্টীর এই অবস্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তিনি নিজেই ফাঁস করেন, একবার তাঁর কাছে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপনের জন্য ৪০ কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছিল। সাধারণ মানুষের কাছে এই অঙ্ক কল্পনার বাইরে। কিন্তু সুনীলের কাছে সেই প্রস্তাব মানে ছিল নিজের নীতির সঙ্গে আপস করা।
সুনীল বলেন, যখন তাঁকে সেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি সোজাসাপটা প্রশ্ন করেছিলেন—“আপনাদের সত্যিই মনে হয়, ওই ফাঁদে আমি পা দেব?” তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস। তিনি জানতেন, এই সিদ্ধান্ত হয়তো আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির, কিন্তু নৈতিক দিক থেকে একশো শতাংশ সঠিক। তাঁর কথায়, “হয়তো তখন আমার টাকাটা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এমন কিছু আমি করব না, যেটাতে আমি নিজেই বিশ্বাস করি না।”
এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন প্রয়োজন আর নীতির মধ্যে বেছে নিতে হয়। অনেকেই প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে নীতির সঙ্গে আপস করেন। কিন্তু সুনীল শেট্টী দেখিয়েছেন, প্রয়োজন যত বড়ই হোক, আত্মসম্মান আর মূল্যবোধ তার থেকেও বড়। এই মানসিকতা আজকের প্রজন্মের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা প্রায়শই শুধুই টাকা আর খ্যাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সুনীলের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর পরিবারকে ঘিরে ভাবনা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরনের বিজ্ঞাপন করলে তাঁর সন্তান অহান শেট্টী, আথিয়া শেট্টী, জামাই কেএল রাহুল এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা কালিমালিপ্ত হতেন। একজন বাবা হিসেবে তিনি ভাবেন—তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন? শুধু সম্পত্তি আর ব্যাংক ব্যালান্স নয়, বরং একটি পরিষ্কার ভাবমূর্তি, একটি সৎ উত্তরাধিকার।
আথিয়া শেট্টী নিজেও বহুবার বলেছেন, তাঁর বাবার জীবনদর্শনই তাঁকে বাস্তব জীবনে পথ দেখায়। অহান শেট্টীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা হিসেবে অহান যখন নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন, তখন বাবার এই নৈতিক দৃঢ়তা নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। কেএল রাহুল, যিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, তিনিও স্বাস্থ্য, ফিটনেস আর শৃঙ্খলার প্রতীক। এমন পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে গেলে নিজের কাজকর্ম নিয়েও সচেতন থাকতে হয়—এই বোধটা সুনীল শেট্টীর কথাতেই স্পষ্ট।
এখানেই শেষ নয়। সুনীল শেট্টী দীর্ঘদিন ধরেই ফিটনেস আইকন হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে যখন জিম সংস্কৃতি এতটা জনপ্রিয় ছিল না, তখনও তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন। তাঁর শক্তপোক্ত শরীর, অ্যাকশন দৃশ্যে সাবলীলতা—সবই এসেছে কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার মাধ্যমে। তিনি বহুবার বলেছেন, শরীর হল মন্দিরের মতো। সেই মন্দিরকে নষ্ট করে এমন কোনও পণ্যের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে তিনি রাজি নন।
তামাকের বিজ্ঞাপন শুধু যে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, সমাজের উপরও এর প্রভাব মারাত্মক। তরুণ প্রজন্ম প্রিয় তারকাদের অনুসরণ করে। যখন তারা দেখে, তাদের প্রিয় অভিনেতা বা খেলোয়াড় তামাকজাত পণ্যের প্রচার করছেন, তখন সেই পণ্য গ্রহণ করাকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। সুনীল শেট্টী এই সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাটাও গভীরভাবে বোঝেন। তিনি জানেন, তাঁর একটি সিদ্ধান্ত হয়তো অনেক তরুণকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, অতীতে তিনি বহু সামাজিক উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন। ফিটনেস ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সচেতনতা অভিযান, যুবসমাজকে সঠিক পথে চলার বার্তা—এই সবকিছুর সঙ্গে তিনি যুক্ত থেকেছেন নীরবে। প্রচারের আলোয় না এসেও সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়ার মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
আজকের দিনে যখন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্স আর ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন সুনীল শেট্টীর মতো ব্যক্তিত্বরা এক বিকল্প পথ দেখান। তিনি প্রমাণ করেন, জনপ্রিয়তা মানেই সবকিছুর প্রচার নয়। বরং জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসে দায়িত্ব। কোন বার্তা আপনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, সেটাই আসল প্রশ্ন।
৪০ কোটি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা হয়তো শোনার মতো একটি খবর। কিন্তু তার থেকেও বড় হল সেই সিদ্ধান্তের পেছনের দর্শন। এই সিদ্ধান্তের পর, সুনীল নিজেই বলেন, তারপর থেকে কেউ আর তাঁকে ওই ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার সাহসই করে না। কারণ ইন্ডাস্ট্রি জেনে গেছে—সুনীল শেট্টীর কাছে টাকা নয়, আগে নীতি।
এই মনোভাবই হয়তো তাঁকে দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে টিকিয়ে রেখেছে সম্মানের সঙ্গে। সিনেমার সাফল্য-ব্যর্থতা আসে যায়, কিন্তু চরিত্র থেকে যায়। সুনীল শেট্টী সেই চরিত্রেরই উদাহরণ, যিনি পর্দার বাইরেও নায়ক। তাঁর এই অবস্থান শুধু প্রশংসার যোগ্য নয়, অনুকরণীয়ও।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সুনীল শেট্টীর এই বক্তব্য এবং সিদ্ধান্ত আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কীভাবে সাফল্যকে দেখি? শুধু অর্থের অঙ্কে, না কি নিজের আয়নায় নিজেকে দেখতে পারার সাহসে? সুনীল শেট্টী দেখিয়েছেন, সত্যিকারের সাফল্য সেইখানেই, যেখানে আপনি নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আপস না করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন।
এই প্রসঙ্গকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে বোঝা যায়, সুনীল শেট্টীর সিদ্ধান্ত আসলে শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা গোটা বিনোদন জগতের জন্য এক শক্ত বার্তা। আজকের কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত গ্ল্যামার দুনিয়ায় যেখানে প্রায় সবকিছুরই দাম আছে, সেখানে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নিজের মূল্যবোধের দাম ঠিক করতে রাজি নন। সুনীল শেট্টী সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন।
তাঁর এই অবস্থান প্রমাণ করে, সফল হওয়া মানেই সব সুযোগ লুফে নেওয়া নয়। বরং কোন সুযোগ গ্রহণ করবেন আর কোনটা প্রত্যাখ্যান করবেন—সেই বাছাই করার ক্ষমতাই একজন মানুষের চরিত্র গড়ে দেয়। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা অভিনয়, খেলাধুলা বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে চায়, তাদের জন্য সুনীলের এই সিদ্ধান্ত এক বড় শিক্ষা। খ্যাতি যত বাড়ে, দায়িত্বও তত বাড়ে—এই সত্যটা তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এছাড়া, তাঁর এই অবস্থান বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থাগুলোকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হয়তো ভবিষ্যতে তারা বুঝবে, সব তারকাকে টাকা দেখিয়ে রাজি করানো যায় না। এতে করে স্বাস্থ্যহানিকর পণ্যের প্রচার নিয়ে যে নৈতিক প্রশ্নগুলি দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে, সেগুলিও আরও জোরালো হবে।
সবশেষে বলা যায়, সুনীল শেট্টী শুধু অতীতের একজন সফল অভিনেতাই নন, বর্তমানের একজন বিবেকবান কণ্ঠস্বরও। তাঁর মতো মানুষরা মনে করিয়ে দেন—চকচকে সাফল্যের আড়ালেও যদি নৈতিকতা বেঁচে থাকে, তবেই সমাজ সত্যিকারের অর্থে এগিয়ে যায়।